কবির আহমদ, সিলেট ব্যুরোঃ চরম বিপাকে পড়েছেন সিলেট বিভাগের বিদ্যুৎ গ্রাহকরা। ঘনঘন লোডশেডিং এর কারণে ব্যবসা প্রতিষ্ঠানের অচলাবস্থা বিরাজ করছে। অনেক বিপনীবিতানে ঘনঘন বিদ্যুৎ চলে যাওয়ার কারণে জেনারেটর চালিয়েও কাজে আসছে না। ফলে ব্যবসায়ীদের মধ্যে চরম ক্ষোভ ও হতাশা বিরাজ করছে। দিনের বেলা বিদ্যুৎ বেশীরভাগ সময় থাকে না আবার রাত ৮ টার মধ্যে ব্যবসা প্রতিষ্ঠান বন্ধ করে দিতে হয়। সাধারণ শ্রমিকরা দিনের বেলা কাজকর্ম করে রাতে বাজার করতে গেলে দোকানপাঠ বন্ধ পায়। এতে সাধারণ মানুষও ক্ষতিগ্রস্থ হচ্ছে। যারা দিনে আনে দিনে খায় এই ধরনের নি¤œ-মধ্যবিত্ত মানুষের মধ্যে বিরাজ করছে চরম ক্ষোভ ও হতাশা।
বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের (বিপিডিবি) তালিকায় সিলেট বিভাগের সিলেট জেলা ও হবিগঞ্জ জেলায় রয়েছে ১৫টি বিদ্যুৎ উৎপাদন কেন্দ্র। কিন্তু বিদ্যুতের সংকট কাটছে না। তীব্র থেকে তীব্রতর সংকটে পড়ছে সিলেটের বিদ্যুৎ কেন্দ্রগুলো। বিদ্যুৎ উৎপাদনের বড় কেন্দ্র হিসেবে পরিচিত সিলেট বিভাগ। এগুলোর সম্মিলিত স্থাপিত ক্ষমতা প্রায় ২৭০০ মেগাওয়াট। কিন্তু বর্তমানে পুরো সক্ষমতায় উৎপাদন সম্ভব হচ্ছে না। কোনটি আছে আংশিক উৎপাদনে, কোনটির উৎপাদন শূণ্যের কোটায়। আর একটি কেন্দ্র দীর্ঘদিন ধরে বিকল। উৎপাদন কমে যাওয়ার পেছনে গ্যাসের অভাব ও প্ল্যান্টগুলোর যান্ত্রিক সক্ষমতা কমে যাওয়াকে দায়ি করছেন সংশ্লিরা।
বিগত ২০২২ সালের ২৯ মে অগ্নিকা-ে ক্ষতিগ্রস্থ হওয়ার পর থেকে হবিগঞ্জের মাধবপুর উপজেলার শাহজীবাজার ৩৩০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎকেন্দ্রটি বন্ধ ছিল। দীর্ঘদিন পর চলতি বছরের মার্চ থেকে কেন্দ্রটি আংশিক উৎপাদনে ফিরেছে। বর্তমানে বিদ্যুৎকেন্দ্রটি থেকে ১৪০ মেগাওয়াটের মতো বিদ্যুৎ পাওয়া যাচ্ছে। শাহজীবাজারের ১০০ মেগাওয়াট গ্যাস টারবাইন কেন্দ্রটি গেল প্রায় ছয় বছর ধরে বন্ধ আছে।
সিলেট বিভাগের মধ্যে সবচেয়ে বেশি বিদ্যুৎ উৎপাদন হয় বিবিয়ানা থেকে। বিপিডিবি’র তথ্যমতে, বিবিয়ানা থেকেই সবচেয়ে বেশি বিদ্যুৎ উৎপাদন ও গ্রিড লাইনে সরবরাহ হচ্ছে। সাম্প্রতিক সময়ে ৩৪১ মেগাওয়াটের বিবিয়ানা কেন্দ্র থেকে গড়ে ৩০০ মেগাওয়াটের বেশি এবং ৪০০ মেগাওয়াটের বিবিয়ানা-৩ কেন্দ্র থেকে ৩৮০ মেগাওয়াটের উপরে বিদ্যুৎ পাওয়া যাচ্ছে। ৩৮৩ মেগাওয়াট বিবিয়ানা সাউথ কেন্দ্র থেকেও মিলছে সন্তোষজনক বিদ্যুৎ।
সিলেটের ফেঞ্চুগঞ্জের দুটি বিদ্যুৎকেন্দ্রের উৎপাদন সক্ষমতা ১৬০ মেগাওয়াট হলেও এই দুটি কেন্দ্র থেকে গড়ে পাওয়া যাচ্ছে ৮০ মেগাওয়াট। ফেঞ্চুগঞ্জের ১৬৩ মেগাওয়াটের কুশিয়ারা বিদ্যুৎকেন্দ্রটি সংস্কার কাজের জন্য বন্ধ রয়েছে। সিলেটের ২৩১ মেগাওয়াট বিদ্যুৎকেন্দ্রে গড়ে ১২০-১২৫ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদন হচ্ছে।
এছাড়া ছোট কেন্দ্রগুলোর মধ্যে ৭০ মেগাওয়াটের শাহজীবাজার জিটি কেন্দ্র থেকে ২৫-৩০ মেগাওয়াট, ২৫ মেগাওয়াটের শাহজাহান উল্লাহ কেন্দ্র থেকে ৮-১০ মেগাওয়াট, সিলেটের ২০ মেগাওয়াট জিটি থেকে অনিয়মিতভাবে বিদ্যুৎ মিলছে, ৮৬ মেগাওয়াটের শাহজীবাজার কেন্দ্র থেকে গড়ে ৮০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদন হচ্ছে।
বিদ্যুৎ বিক্রয় ও বিতরণ বিভাগ সিলেটের প্রধান প্রকৌশলী ইমাম হোসেন গনমাধ্যমকে জানান, বর্তমানে সিলেটে বিদ্যুতের খুব একটা সংকট নেই। বিভাগের চার জেলার পিডিবির গ্রাহকদের চাহিদা গড়ে ২৫০ মেগাওয়াট। চাহিদার ৯০ শতাংশ সরবাহ মিলছে। কিন্তু এই প্রধান প্রকৌশলীর বক্তব্যের সাথে গ্রাহকদের বক্তব্য মিলছে না। তার বক্তব্য যেন সাংঘর্ষিক।
সিলেট সিটি কর্পোরেশন এলাকার ২৫ নং ওয়ার্ডের দাউদপুর গ্রামের বাসিন্দা, সিলেট এমসি কলেজ থেকে রসায়ন বিভাগে এম.এস.সি পাশ করা কম্পিউটার ব্যবসায়ী আলআমীন আহমদ দৈনিক সংগ্রামকে জানান, ‘এই প্রকৌশলীর বক্তব্য বিদ্যুৎ গ্রাহকদের কাটা গায়ে লবণ দেয়ার শামিল। বিদ্যুৎ গ্রাহকরা জানে কত কষ্টে গরমের মধ্যে আমরা জীবন যাপন করছি। লোডশেডিং এর কারণে স্কুল কলেজে পড়–য়া শিক্ষার্থীরা চরম বিপাকে পড়েছেন। শিশু ও বৃদ্ধরা অসুস্থ হয়ে পড়ছেন। অতিবিলম্বে বিদ্যুৎ সংকটের সমাধান না করলে সাধারণ মানুষ রাজপথে নামতে বাধ্য হবে’। এই মেধাবী জানান, ‘আমি লেখাপড়া শেষ করে সবেমাত্র একটি ব্যবসা প্রতিষ্ঠান চালু করেছি। কিন্তু বিদ্যুতের কারণে আমাদের দুর্যোগ দুর্ভোগ বেড়েই চলেছে। বেশীরভাগ সময় বিদ্যুৎ থাকে না, আবার রাত ৮ টার মধ্যে সরকারের নির্দেশনা অনুযায়ী ব্যবসা প্রতিষ্ঠান বন্ধ করতে হয়। ফলে অর্থনৈতিকভাবে ব্যবসায়ীরা মারাত্মক ক্ষতিগ্রস্থ হচ্ছেন। এর খারাপ প্রভাব পড়ছে ব্যবসায়ীদের পরিবারের উপরও’।