রাজধানীর যাত্রাবাড়ীর মধুবাগ এলাকার এক দরিদ্র পরিবার থেকে উঠে আসা এক সাহসী তরুণ, শহীদ মিরাজ হোসেন, ২০২৪ সালের বৈষম্যবিরোধী গণআন্দোলনে শহীদ হন। ১১ মার্চ ১৯৯৫ সালে জন্মগ্রহণকারী মিরাজ শৈশব থেকেই জীবন সংগ্রামে জড়িয়ে পড়েন। পিতার অসুস্থতা, বোনের বৈবাহিক বিচ্ছেদ ও পারিবারিক দীনতার মাঝেও এক হাতে পরিবার পরিচালনার দায়িত্ব তুলে নিয়েছিলেন তিনি।

মাত্র ১৫ বছর বয়সে "আলো ডোর হাউজ স্টোরে" কর্মচারী হিসেবে কাজ শুরু করে অদম্য পরিশ্রমে ক্যাশিয়ার পদে উন্নীত হন মিরাজ। নিজের চাহিদা উপেক্ষা করে ভাইয়ের দাবা ক্যারিয়ার, বাবার চিকিৎসা ও সংসারের খরচ চালিয়ে যাচ্ছিলেন একা হাতে। তার ছোট ভাই আবদুল্লাহ বর্তমানে একজন জাতীয় দাবাড়– হলেও মিরাজের অবদানের কথা ভোলেননি কখনও।

বিক্ষোভ, গুলী ও শহীদ হবার বেদনাময় মুহূর্ত : ২০২৪ সালের জুলাইয়ে সারাদেশে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন শুরু হয়। চাকরির ক্ষেত্রে কোটা বৈষম্যের প্রতিবাদে সারাদেশের শিক্ষার্থীরা রাস্তায় নামে। “দাবি এক দফা একÑখুনি হাসিনার পদত্যাগ” এই স্লোগানে মুখরিত হয় রাজপথ।

৫ আগস্ট যাত্রাবাড়ী থানার সামনে আয়োজিত বিজয় মিছিলে অংশ নেন মিরাজ। মিছিল চলাকালীন পুলিশ বাহিনী বিক্ষোভকারীদের লক্ষ্য করে গুলী চালায়। সেখানেই গুলীবিদ্ধ হয়ে মাটিতে লুটিয়ে পড়েন মিরাজ হোসেন। স্থানীয় এক কর্মীর সহায়তায় মিটফোর্ড হাসপাতালে নেওয়া হলে কর্তব্যরত চিকিৎসক তাকে মৃত ঘোষণা করেন।

ছাত্র-জনতার প্রবল আন্দোলনের মুখে শেখ হাসিনা পদত্যাগ করে পালিয়ে যাওয়ার পর 'বিজয় মিছিলে যোগদান করে মিরাজ হোসেন। যাত্রাবাড়ী থানার সামনে মিছিল চলাকালীন ঘাতক পুলিশ বাহিনী তাকে লক্ষ্য করে গুলী চালায়। গুলীবিদ্ধ হয়ে মুহূর্তে লুটিয়ে পড়েন মিরাজ। এই অবস্থায় তাকে ঘটনাস্থল থেকে উদ্ধার করে এক প্রাইভেট হাসপাতাল কর্মী। অতঃপর তাকে মিটফোর্ড হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয়। হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ জানায় তিনি মৃত্যুবরণ করেছেন। শাহাদাতের খবর মুহূর্তেই ছড়িয়ে পড়ে। লাশ বাড়িতে এসে পৌঁছায়। শহীদের বাবা-মা, আত্মীয়-স্বজন শোকের মাতমে ভাসে। ছেলের মুখে শেষ চুম্বন দেয় মমতাজ বেগম। প্রতিবেশীদের ভালবাসা ও সম্মানে অধিষ্ঠিত হয়ে জাতীয় বীর উপাধি লাভ করেন শহীদ মিরাজ হোসেন।

ছোট ভাই মাথার কাছে বসে বারবার ডাকতে থাকে- ভাইয়া, ভাইয়া একবার কথা বল। আদরের ছোট ভাইকে হারিয়ে নিঃস্ব হয়ে পড়ে তার বোন। সন্তানকে রবের সান্নিধ্যে পৌঁছে দিতে নিজের কাঁধে খাটিয়া তুলে নেন আব্দুর রব। ছলছল চোখে জানাযা প্রাঙ্গণে পৌঁছান। শতশত মানুষের উপস্থিতিতে ডগাইর মসজিদের সামনে জানাযা সম্পন্ন হয়। এরপর পিতা আব্দুর রব তার শহীদ সন্তানকে নিজ হাতে ডগাইর কবরস্থানে দাফন করেন।

মায়ের প্রতি ভালোবাসা : মা মমতাজ বেগমের সঙ্গে মিরাজের ছিল গভীর সখ্যতা। সারাদিন কাজ শেষে ঘরে ফিরে সবার আগে খুঁজতেন মাকে। খেতে বসে বলতেন, “তুমি পাশে না বসলে আমি খেতে পারি না মা।” মায়ের কণ্ঠে আজ শোকের সুর, “ও আমার সংসারের একমাত্র ভরসা ছিল, আল্লাহ ওকে জান্নাত দান করুন।”

বোন পপি কাঁদতে কাঁদতে বলেন, “এখন আমি কাকে ভাই বলে ডাকব?”

ভাই আবদুল্লাহ স্মরণ করেন, “এক খাটে ঘুমাতাম, গল্প করতাম, এখন সে নেই। আমি যেন একা হয়ে গেছি।”