ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রদল নেতা শাহরিয়ার আলম সাম্য হত্যা মামলার তদন্তে গাফিলতি ও ‘মূল হত্যাকারী’ গ্রেপ্তারের দাবিতে ঢাকার শাহবাগ মোড় অবরোধ করে প্রায় দুই ঘণ্টা বিক্ষোভ করেছেন সংগঠনটির নেতাকর্মীরা। গতকাল রোববার বিকাল ৪টার দিকে শাহবাগ মোড়ে অবস্থান নেন তারা। এতে শাহবাগসহ আশপাশের সড়কে তীব্র যানজট সৃষ্টি হয়। সন্ধ্যা ৬টার দিকে বিক্ষোভকারীরা শাহবাগ ছাড়লে যান চলাচল স্বাভাবিক হওয়া শুরু করে।

এর আগে সেখানে ছাত্রদলের সাধারণ সম্পাদক নাসির উদ্দিন নাসির বলেন, প্রাইম এশিয়ার শিক্ষার্থী পারভেজের মতো একই কায়দায় চুরিকাঘাতে সাম্যকে হত্যা করা হয়েছে। এখনো পারভেজ হত্যাকা-ের বিচার হয়নি। আমরা আজকের এ অবস্থান কর্মসূচি থেকে হুঁশিয়ার করে দিতে চাই, আমাদের আর কোনো কর্মীর ওপর এরকম হামলা হলে আমরা আর বসে থাকব না। তিনি বলেন, আমরা এ অথর্ব প্রশাসনের পদত্যাগ দাবি করছি। আপনারা দেখেছেন, মাননীয় উপাচার্য কী রকম হৃদয় বিদারক আচরণ করেছেন। তিনি সাম্যকে এখনও হৃদয়ে ধারণ করতে পারেননি। আমরা প্রক্টরকে একইভাবে দেখেছি। তোফাজ্জলকে যেভাবে হত্যা করা হয়েছে, তার যদি আজ বিচার হত, তাহলে এমন হত্যাকা- আর দেখতে হত না।

ছাত্রদলের সভাপতি রাকিবুল ইসলাম রাকিব বলেন, ঢাকা বিশ্ববিদ্যলয় প্রশাসন এখনও তাদের দায় স্বীকার আর নিরাপত্তার গাফিলতির কথা স্বীকার করছে না। তারা আজকের দিন পর্যন্ত আমাদের আশ্বস্ত করতে পারেনি, তারা সাম্য হত্যার বিচার করবে কি না। তাই আমরা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় শাখা ছাত্রদলের কর্মসূচির সঙ্গে ছাত্রদলের কেন্দ্রীয় সংসদের পূর্ণ সমর্থন জানাচ্ছি।

অন্তর্বর্তী সরকার ও জুলাই অভ্যুত্থানে নেতৃত্ব দেওয়া ছাত্রনেতাদের সমালোচনাও করেন ছাত্রদল সভাপতি। তিনি বলেন, আমরা সাম্য হত্যার পর থেকে সামান্য সহানূভূতিমূলক বক্তব্য এ সরকারের কাছ থেকে শুনিনি। এমনকি সাম্যের জানাযায় আমরা জুলাই-আগস্টের যারা কৃতিত্ব দাবি করেন, তাদেরকেও দেখি নাই। তারা বিভিন্ন সময় বলে, তারা সবসময় ঐক্য চায়। তারা কীসের ঐক্য চায়? সরকারকে উদ্দেশ করে রাকিব বলেন, বিগত ১৬ বছর যারা আওয়ামী লীগ সরকারের গুমের শিকার হয়েছে, তাদের জন্য ইউনূস সরকার কোনো সহানূভুতি জানায়নি। এমনকি জুলাইয়ের পর থেকে যারা শহীদ হয়েছেন, তাদের জন্যও কোনো সহানূভুতি আমরা দেখি নাই। ‘আপনাকে আজ আমরা হুঁশিয়ার করে দিতে চাই, আমরা যদি শাহবাগ থেকে যমুনায় পদযাত্রা করি, তাহলে আমাদের রুখে দেওয়ার কেউ নাই। আমরা এমন অবহেলা যদি আর দেখি, তাহলে যমুনায় কর্মসূচি দেব।

এর আগে দুপুর বেলা ১টার দিকে সাম্য হত্যার বিচার, উপাচার্য-প্রক্টরের পদত্যাগ ও নিরাপদ ক্যাম্পাসের দাবিতে কালো পতাকা নিয়ে মিছিল করে ছাত্রদলের ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় শাখা।

মঙ্গলবার রাত ১১টার দিকে সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে ‘ছুরিকাঘাতে’ আহত হন শাহরিয়ার আলম সাম্য। রাত ১২টার দিকে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নেওয়া হলে চিকিৎসক তাকে মৃত ঘোষণা করেন। এ ঘটনায় বুধবার সকালে নিহতের বড় ভাই শরীফুল আলম শাহবাগ থানায় ‘১০ থেকে ১২ জনকে’ আসামী করে মামলা করেন। ওই মামলায় তিনজনকে গ্রেপ্তার করার তথ্য দিয়েছে পুলিশ।

সাম্য ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের ২০১৮-১৯ শিক্ষাবর্ষের শিক্ষার্থী ছিলেন। এ এফ রহমান হল ছাত্রদলের সাহিত্য ও প্রকাশনা সম্পাদক ছিলেন তিনি। তার বাড়ি সিরাজগঞ্জের বেলকুচিতে।

প্রকৃত খুনি খুঁজতে ৪৮ ঘণ্টার আলটিমেটাম সাদা দলের

সাম্য (২৫) হত্যার প্রকৃত খুনিকে খুঁজে বের করতে ৪৮ ঘণ্টার আলটিমেটাম দিয়েছে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলাদেশী জাতীয়তাবাদে বিশ্বাসী শিক্ষকদের সংগঠন সাদা দল। এ সময়ের মধ্যে শাহরিয়ার হত্যার প্রকৃত খুনিকে খুঁজে বের করতে না পারলে কঠোর আন্দোলনে যাওয়ার হুমকি দিয়েছেন তারা। গতকাল রোববার বেলা সাড়ে ১১টার দিকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অপরাজেয় বাংলার পাদদেশে আয়োজিত এক মানববন্ধনে এই আলটিমেটাম দেওয়া হয়।

সাদা দলের আহ্বায়ক মোর্শেদ হাসান খান বলেন, শাহরিয়ার হত্যার পর আমরা একটি আইওয়াশ অ্যারেস্ট দেখেছি, যা আমরা মানতে বাধ্য না। সাম্য হত্যার প্রকৃত হত্যাকারী কে, তা বের করার জন্য আমরা বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন ও স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের কাছে জোরালো দাবি জানাচ্ছি। আমরা ৪৮ ঘণ্টার আলটিমেটাম দিচ্ছি। এর মধ্যে যদি প্রকৃত খুনিকে খুঁজে বের করা না হয়, তাহলে আমরা আরও জোরালো আন্দোলনে যাব।

শাহরিয়ার হত্যার মোটিভকে একটি গ্রুপ অন্যদিকে নিয়ে যেতে চাইছে বলেও অভিযোগ করেন মোর্শেদ হাসান খান। শাহরিয়ারকে ‘টার্গেটেড কিলিং’ করা হয়েছে মন্তব্য করে মোর্শেদ হাসান খান বলেন, ‘তাকে (শাহরিয়ার) যেভাবে আঘাত করা হয়েছে, আমরা সাধারণ লোক সেভাবে আঘাত করতে পারব না। প্রকৃত খুনিকে বের করতে হবে। বিচার করতে হবে।’

মানববন্ধনে বাংলাদেশ উন্মুক্ত বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য এ বি এম ওবায়দুল ইসলাম বলেন, ‘একজন নাগরিক হিসেবে আমার যে দায়িত্ব, সেটা পালন করতে পারছি না। একজন বাবার কাছে সন্তানের লাশ অনেক ভারী। একজন শিক্ষকের কাছে শিক্ষার্থীর লাশ অনেক ভারী, অনেক বেদনাদায়ক, কষ্টদায়ক। আমার শিক্ষার্থী দুর্বৃত্তের ছুরির আঘাতে মৃত্যুবরণ করেছে। আমাদের এই ক্যাম্পাস নিরাপদ না। নিরাপদ করতে পারছি না।’

জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের সহ-উপাচার্য লুৎফর রহমান বলেন, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় যখন নতুনভাবে শিক্ষার পরিবেশ কায়েম করেছে, তখন পরিকল্পিতভাবে শাহরিয়ারকে হত্যা করা হয়েছে। শুধু বিশ্ববিদালয় নয়, রাষ্ট্রীয়ভাবে বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে নেওয়ার আহ্বান জানান তিনি। যত দ্রুত সম্ভব দোষী ব্যক্তিদের বিচার করার দাবি জানান।

মানববন্ধনে উপস্থিত ছিলেন সাদা দলের যুগ্ম আহ্বায়ক আবদুস সালাম ও আবুল কালাম সরকার, কলা অনুষদের ডিন ছিদ্দিকুর রহমান খান, ব্যবসা প্রশাসন ইনস্টিটিউটের (আইবিএ) অধ্যাপক মহিউদ্দিন, শেখ মুজিবুর রহমান হলের প্রাধ্যক্ষ মো. আখতারুজ্জামান, মার্কেটিং বিভাগের অধ্যাপক এ বি এম শহিদুল ইসলাম, শিক্ষা ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের অধ্যাপক মো. আলী জিন্নাহ প্রমুখ।

সাম্য হত্যা: তদন্তভার ডিবিকে দেওয়ার আশ্বাসেও ‘পুরোপুরি’ সন্তুষ্ট নন শিক্ষার্থীরা

“আমরা প্রত্যাশা করেছিলাম, আশানুরূপ অগ্রগতি দেখবো। কিছু অগ্রগতি ছিল, তবে সেটা আশানুরূপ না,” বলেন এক শিক্ষার্থী।

তদন্তভার ডিবিকে দেওয়ার আশ্বাসেও ‘পুরোপুরি’ সন্তুষ্ট নন শিক্ষার্থীরা

সাম্য হত্যাকা-ের তদন্তভার ঢাকা মহানগর পুলিশ-ডিএমপির গোয়েন্দা শাখাকে (ডিবি) দেওয়ার আশ্বাস দিয়েছেন স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টা মো. জাহাঙ্গীর আলম চৌধুরী। তবে গত পাঁচদিনেও হত্যাকা-ের মূল হোতা ধরা পড়েনি অভিযোগ করে শিক্ষার্থীরা বলছেন, তারা উপদেষ্টার আশ্বাসে ‘পুরোপুরি’ সন্তুষ্ট হতে পারেননি। গতকাল রোববার ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক নিয়াজ আহমেদ খানের নেতৃত্বে শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের একটি প্রতিনিধি দল সচিবালয়ে স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টার সঙ্গে দেখা করতে যায়। দলে আরও ছিলেন শিক্ষা গবেষণা ইনস্টিটিউটের পরিচালক অধ্যাপক হোসনে আরা বেগম।

উপদেষ্টা এই মামলার তদন্তভার গোয়েন্দা পুলিশের কাছে হস্তান্তর করা হবে বলে আশ্বাস দিয়েছেন বলে শিক্ষক-শিক্ষার্থীরা জানিয়েছেন। সাক্ষাতের পর অধ্যাপক হোসনে আরা বেগম সাংবাদিকদের বলেন, মূলত সাম্য হত্যার বিচারের বিষয়টি নিয়ে স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টার সঙ্গে কথা হয়েছে। আমরা চাই দ্রুততম সময়ের মধ্যে এটা সুন্দরভাবে সম্পূর্ণ হবে। উপদেষ্টা কথাগুলো মনোযোগ দিয়ে শুনেছেন। নোট নিয়েছেন। উনি বলেছেন, চেষ্টা করছেন এবং এটা এগিয়ে নিয়ে যাবেন।

এরপরেই শিক্ষার্থীদের পক্ষ থেকে বক্তব্য দেওয়ার জন্য বলা হলে সাম্যর বন্ধু পরিচয় দিয়ে নাহিন ইসলাম বলেন, আপনারা জানেন, আমরা শাহবাগ থানাকে ৪৮ ঘণ্টা সময় দিয়েছিলাম। আমরা প্রত্যাশা করেছিলাম, আশানুরূপ অগ্রগতি দেখবো। কিছু অগ্রগতি ছিল, তবে সেটা আশানুরূপ না। পাঁচ দিন পরেও সাম্য হত্যার মূল হোতা বা যে গ্রুপটা ছিল তাদের ধরা হয়নি বলে সাংবাদিকদের কাছে অভিযোগ করেন তিনি।

মামলাটি ডিবির কাছে হস্তান্তর ও আইন মন্ত্রণালয় থেকে বিশেষ ট্রাইবুন্যালে বিচারের ব্যবস্থা করার আশ্বাস পাওয়ার বিষয়ে নাহিন বলেন, আমরা কিছুটা আশ্বস্ত হয়েছি কিন্তু এখনও পুরোপুরি হতে পারিনি। আমরা তখনই আশ্বস্ত হব, যখন এই হত্যার মূল হোতাদের থানায় ও বিচারের আওতায় এসেছে দেখবো। তবে এ মুহূর্তে স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টার যে সদিচ্ছা দেখতে পাচ্ছি সেটা থেকে আমরা প্রত্যাশা করতে পারি সাম্যের যারা খুনি তারা দ্রুততম সময়ের মধ্যে গ্রেপ্তার হবে এবং বিচারের আওতায় আসবে। আন্দোলনের কর্মসূচির ব্যাপারে পরবর্তীতে সবার সঙ্গে কথা বলে ক্যাম্পাস থেকে নির্ধারণ করার কথা বলেন তিনি।

এক সাংবাদিকের প্রশ্নের জবাবে নাহিন বলেন, আপনারা জানেন ক্যাম্পাসে বিভিন্ন রাজনৈতিক মহল ও রাজনৈতিক দল বিভিন্নভাবে এটার সুযোগ নেওয়ার পাশাপাশি তারা তাদের দাবি দাওয়া জানাচ্ছে। কোন দাবি নৈতিক বা অনৈতিক, সেটা বলার আমি কেউ না। বারবার বলে আসছি, আমরা একটা দাবি নিয়ে আসছি। সেটা হলো সাম্যের বিচার। সেটার জন্য আমাদের যেটা করা প্রয়োজন আমরা সেভাবেই এগিয়ে যাব। সেক্ষেত্রে বাকিদের সঙ্গে কথা বলে আমরা সিদ্ধান্ত নেব আরো কঠোর হব কিনা।

‘আল্টিমেটাম’ থেকে সরে যাওয়া বা না যাওয়ার বিষয়ে এক প্রশ্নের জবাবে এই শিক্ষার্থী বলেন, আল্টিমেটাম থেকে সরে যাওয়া না। আল্টিমেটাম ছিল আমরা যাতে দৃশ্যমান অগ্রগতি দেখতে পারি। স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টা আমাদের আশ্বস্ত করেছেন, যেহেতু ডিবির কাছে হস্তান্তর হচ্ছে তাই আমরা আশাবাদী ইতিবাচক কিছু দেখতে পাব।