ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী শাহরিয়ার আলম সাম্য হত্যার বিচারের দাবিতে অবস্থান কর্মসূচিতে নামা ছাত্রদল নেতাকর্মীরা প্রায় সাত ঘণ্টা পর রাজধানীর শাহবাগ মোড় ছেড়েছেন। এর আগে গতকাল বৃহস্পতিবার সকাল ১০টা থেকে শাহবাগ ও হোটেল ইন্টারকন্টিনেন্টাল মোড়ে জড়ো হতে থাকেন ছাত্রদলের বিভিন্ন স্তরের নেতাকর্মীরা। অবস্থান কর্মসূচির সময় তারা ‘আট দিন হয়ে গেল, কেউ কিছু জানে না’, ‘আর চাই না, আর চাই না এনএসআইয়ের প্রক্টর,’ ‘ক্যাম্পাসে লাশ ঝুলে, প্রক্টর কী করে’, ‘আমার ভাই কবরে, খুনি কেন বাহিরে’, ‘বিচার বিচার বিচার চাই, সাম্য হত্যার বিচার চাই’ ইত্যাদি স্লোগান দেন।
বিকেল পাঁচটার দিকে ছাত্রদলের সভাপতি রাকিবুল ইসলাম এদিনের মতো অবস্থান কর্মসূচির সমাপ্তি ঘোষণা করেন। এ সময় ছাত্রদলের নেতা-কর্মীরা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রদল নেতা শাহরিয়ার আলম সাম্য হত্যাকা-ের সঙ্গে জড়িত ব্যক্তিদের দ্রুত গ্রেপ্তার ও বিচারের দৃশ্যমান অগ্রগতির দাবি জানান।
শাহবাগ মোড়ে অবস্থান কর্মসূচির নেতৃত্ব দেন ছাত্রদলের কেন্দ্রীয় সভাপতি রাকিবুল ইসলাম। হোটেল ইন্টারকন্টিনেন্টাল মোড়ে অবস্থান কর্মসূচির নেতৃত্ব দেন ছাত্রদলের সাধারণ সম্পাদক নাছির উদ্দীন।
সরকার ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর উদ্দেশে ছাত্রদলের সভাপতি রাকিবুল ইসলাম রাকিব বলেন, তারা আমাদের এখনও আশ্বস্ত করতে পারেনি। এখনও তারা প্রকৃত হত্যাকারীদের চিহ্নিত করতে পারেনি। এ ঘটনায় অন্তর্বর্তী সরকারের দায় রয়েছে। তারা সাম্যের হত্যার পর এখনও কোনো সহমর্মিতা দেখিয়ে বিজ্ঞপ্তি দেয়নি শুধু ছাত্রদল নেতা হওয়ার কারণে। আমরা তার তীব্র নিন্দা জানাচ্ছি। তিনি বলেন, আমরা যদি সাম্য হত্যার বিচার না পাই, তীব্র আন্দোলনে যাব। আমরা রাজপথ ছাড়ব না। আমরা সরকারের কাছে আহ্বান জানাচ্ছি, দ্রুত সময়ের মধ্যে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর শক্তি প্রয়োগ করে হলেও এ হত্যাকা-ের সুষ্ঠু তদন্ত করতে হবে। এটা জনগণের কাছে কী ম্যাসেজ যায়? একজন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী সুষ্ঠু বিচার পাচ্ছে না, তাহলে জনগণ কী বিচার পাবে?
ছাত্রদল সভাপতি বলেন, গত নয় মাস ধরে সেনাবাহিনী যে সাপোর্ট দিয়ে যাচ্ছে, তারপরও যদি পুলিশ প্রশাসনে এত দুর্বলতা থাকে, তাহলে দেশের জনগণ কোথায় যাবে। বিগত নয় মাসে দেশে কোনো সংস্কার হয়নি; সংস্কারের নামে সরকার কালক্ষেপণ করছে বলেও অভিযোগ করেন রাকিব।
গত ১৩ মে রাত ১১টার দিকে সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে ছুরিকাঘাতে আহত হন শাহরিয়ার আলম সাম্য। রাত ১২টার দিকে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নেওয়া হলে চিকিৎসক তাকে মৃত ঘোষণা করেন। এ ঘটনায় পরদিন সকালে সাম্যের বড় ভাই শরীফুল আলম শাহবাগ থানায় ’১০-১২ জনকে’ আসামী করে মামলা করেন। ওই মামলায় তিনজনকে গ্রেপ্তার করে রিমান্ডে নেয় পুলিশ।
সাম্য ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের ২০১৮-১৯ শিক্ষাবর্ষের শিক্ষার্থী ছিলেন। এ এফ রহমান হল ছাত্রদলের সাহিত্য ও প্রকাশনা সম্পাদক ছিলেন তিনি। তার বাড়ি সিরাজগঞ্জের বেলকুচিতে।
তার হত্যাকা-ের বিচার দাবিতে এক সপ্তাহ ধরে আন্দোলন করে আসছেন ছাত্রদল ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার্থীরা। এর আগেও তারা শাহবাগ মোড় অবরোধ করে বিক্ষোভ-সমাবেশ করেন।
শাহবাগ মোড়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়, কবি নজরুল সরকারি কলেজ, তেজগাঁও কলেজ, ঢাকা কলেজ, ঢাকা মহানগর পূর্বসহ ছাত্রদলের বিভিন্ন শাখার নেতা-কর্মীদের অবস্থান করতে দেখা যায়। আর ইন্টারকন্টিনেন্টাল মোড়ে রাজধানীর সরকারি বাঙলা কলেজ, তিতুমীর কলেজ, ঢাকা মহানগর পশ্চিমসহ ছাত্রদলের বিভিন্ন শাখার নেতা-কর্মীরা অবস্থান নেন।
খুনিদের গ্রেপ্তারের দাবিতে অবস্থান শিক্ষক-সহপাঠীদের
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রদল নেতা শাহরিয়ার আলম সাম্য হত্যার মূল কারণ উদঘাটন এবং প্রকৃত আসামীকে গ্রেপ্তারের দাবিতে অবস্থান কর্মসূচি ও সমাবেশ করেছেন বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের শিক্ষক, শিক্ষার্থী এবং শাহরিয়ারের সহপাঠী-বন্ধুরা। বৃহস্পতিবার দুপুর ১২টা ২০ মিনিট থেকে বেলা ১টা পর্যন্ত তারা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অপরাজেয় বাংলার সামনে অবস্থান কর্মসূচি ও সংক্ষিপ্ত সমাবেশ করেন। এর আগে বেলা সাড়ে ১১টা থেকে শিক্ষার্থীরা নিজ বিভাগের সামনে জড়ো হতে শুরু করেন। পরে তারা সেখান থেকে মিছিল নিয়ে হলপাড়া হয়ে অপরাজেয় বাংলার সামনে অবস্থান নেন।
এর আগে গত মঙ্গলবার একই দাবিতে সংবাদ সম্মেলনে অবস্থান কর্মসূচি পালনকারীরা জানিয়েছিলেন, গতকাল (বৃহস্পতিবার) পর্যন্ত তারা তদন্ত কার্যক্রমের অগ্রগতি দেখবেন। তদন্ত কার্যক্রমে সন্তুষ্ট না হলে এবং মূল খুনিদের বৃহস্পতিবারের মধ্যে গ্রেপ্তার করা না হলে তারা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়কে সঙ্গে নিয়ে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় অভিমুখে লংমার্চ করবেন।
তবে গতকাল অবস্থান কর্মসূচি থেকে আগামী রোববার পর্যন্ত সময় বেঁধে দেওয়া হয়। শিক্ষা ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের শিক্ষার্থী ও শাহরিয়ারের সহপাঠী মশিউর আমিন বলেন, রোববারের মধ্যে যদি হত্যার মূল কারণ উদঘাটন ও প্রকৃত আসামীকে গ্রেপ্তার না করা হয়, তাহলে রোববার বা সোমবার স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় অভিমুখে লংমার্চ করা হবে।
অবস্থান কর্মসূচিতে মশিউর আমিন বলেন, ‘বলা হচ্ছে, তদন্তের স্বার্থে নাকি অনেক কিছু বলা যাবে না। কিন্তু মনে হচ্ছে, এটা পরিকল্পিত হত্যাকা-। এটা খুবই দুঃখজনক যে বিশ্ববিদ্যালয়ের পাশের এলাকায় আমরা নিরাপদ নই। আমাদের চাওয়া হলো, হত্যাকারী যেন বাঁচতে না পারে। তার (শাহরিয়ার আলম সাম্য) হত্যাকারীর যেন দ্রুত বিচার হয়। কিন্তু আজ প্রায় ১০ দিন পার হয়ে গেলেও সাম্য হত্যার মূল আসামীকে পুলিশ বা ডিবি গ্রেপ্তার করতে পারেনি। অথচ হত্যাকারী কে, এটা বের করা আসলে খুব কঠিন কিছু নয়। আসামীদের রিমান্ড শেষ হওয়ার পরও যদি প্রকৃত খুনিকে গ্রেপ্তার করা না হয়, তবে আমাদের শক্ত অবস্থানে যেতে হবে। আমরা স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় অভিমুখে লংমার্চ করতে বাধ্য হবো।’
একই বিভাগের শিক্ষক অধ্যাপক আবদুল হালিম সংক্ষিপ্ত সমাবেশে বলেন, ‘আমরা সঠিক বিচার চাই। আমরা সাম্যকে হারিয়েছি। সাম্য হয়তো ফিরে আসবে না, কিন্তু কোনো সাম্য যেন আর হত্যার শিকার না হয়, দুর্ঘটনার শিকার না হয় সেই অবস্থা আমরা আর দেখতে চাই না।’