বাঙালির সব আবেগ, অনুভূতিতে জড়িয়ে আছেন চিরবিদ্রোহী কবি কাজী নজরুল ইসলাম। তার কবিতা, গান, উপন্যাস ও গল্পে বাঙালি জেনেছে বীরত্বের ভাষা, দ্রোহের মন্ত্র ও অন্যায়ের প্রতিবাদের শক্তি। দীর্ঘ সময় পেরিয়ে গেলেও বাঙালির মন ও মননে জায়গা দখল করে আছেন তিনি। নজরুলের গান, কবিতা ও উপন্যাস বাংলা সাহিত্যকে এগিয়ে নিয়েছে অনেক দূর। চিরবিদ্রোহী কবি কাজী নজরুল ইসলামের জন্মদিন উৎসবের ঢংয়ে উদযাপন হয়েছে দেশজুড়ে।
রাজধানী ঢাকাসহ দেশের বড় শহরগুলো এ উৎসব পালন করেছে। দেশজুড়ে কবির প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে বিভিন্ন সামাজিক-সাংস্কৃতিক সংগঠন দিনটি পালন করে বর্ণাঢ্য আয়োজনে।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আয়োজনে জতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলামের জীবন ও সাহিত্যকর্ম থেকে শিক্ষা গ্রহণের উপর গুরুত্বারোপ নিয়ে স্মরণ সভা হয়েছে। সেখানে ঢাবি ভিসি অধ্যাপক ড. নিয়াজ আহমদ খান বলেছেন, কবির জীবন ও সাহিত্যকর্ম অন্যায়ের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ অব্যাহত রাখার শিক্ষা দেয়। সর্বাবস্থায় সাম্য ও শান্তি বজায় রেখে নিজেদের মধ্যে ইস্পাত কঠিন ঐক্য ধরে রাখার শিক্ষাও আমরা নজরুলের সাহিত্যকর্ম থেকেই পাই।
স্মরণসভায় প্রো-ভাইস চ্যান্সেলর (প্রশাসন) অধ্যাপক ড. সায়মা হক বিদিশা এবং কোষাধ্যক্ষ অধ্যাপক ড. এম. জাহাঙ্গীর আলম চৌধুরী বক্তব্য রাখেন । বাংলা একাডেমির মহাপরিচালক ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় বাংলা বিভাগের অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ আজম ‘চব্বিশের গণ অভ্যুত্থান: কাজী নজরুলের উত্তরাধিকার’ শীর্ষক স্মারক বক্তৃতা প্রদান করেন। বাংলা বিভাগের চেয়ারম্যান অধ্যাপক ড. সিরাজুল ইসলাম (সিরাজ সালেকীন) অনুষ্ঠান সঞ্চালন করেন। সংগীত বিভাগের শিক্ষক-শিক্ষার্থীগণ অনুষ্ঠানে নজরুল সংগীত পরিবেশন করেন।
সংস্কৃতি মন্ত্রণালয়ের আয়োজনে মানিকগঞ্জে নজরুল পতœী প্রমীলা দেবীর জন্মস্থান তেওতায় জেলা প্রশাসকের আমন্ত্রণে ‘দামাল ছেলে নজরুল’ নাটক মঞ্চস্থ করা হয়। এদিকে বাংলা ভাষা ও সংস্কৃতির বিকাশে নিবেদিত প্রতিষ্ঠান বাংলা একাডেমিতে দিনব্যাপী জমজমাট অনুষ্ঠানমালায় জেনেসিস থিয়েটারের শিশু-কিশোরদের অংশগ্রহণে পরিবেশিত হয় গীতি-নাট্য ‘দেখব এবার জগৎটাকে’।
সংস্কৃতিবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের আয়োজনে, বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমির সহযোগিতায় ও কুমিল্লা জেলা প্রশাসনের ব্যবস্থাপনায় এবং ২৬ ও ২৭ মে কুমিল্লায় অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়। মন্ত্রণালয়ের সচিব মো. মফিদুর রহমানের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠানে বিশেষ অতিথির বক্তৃতা করেন জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম ইনস্টিটিউটের নির্বাহী পরিচালক মো. লতিফুল ইসলাম শিবলী এবং কবি পৌত্রী ও জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম ইনস্টিটিউট ট্রাস্টি বোর্ডের চেয়ারম্যান খিলখিল কাজী।
স্মারক বক্তৃতা করবেন অধ্যাপক সলিমুল্লাহ খান এবং স্বাগত বক্তৃতা করেন কুমিল্লা জেলা প্রশাসক মো. আমিরুল কায়ছার। অনুষ্ঠানে ‘নজরুল পুরস্কার ২০২৩ ও ২০২৪’-এর জন্য মনোনীত গুণিজনদের হাতে পুরস্কার তুলে দেয়া হয়।
এদিকে সংস্কৃতি বিষয়ক উপদেষ্টা মোস্তফা সরয়ার ফারুকী বলেন, জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলামের শৈল্পিক শক্তির গান নিয়েই জুলাই-আগস্ট গণঅভ্যুত্থান পরিচিতি হয়েছে। তিনি জেলায় তিন দিনব্যাপী নজরুল জন্মবার্ষিকীর উদ্বোধনী অনুষ্ঠান শেষে সাংবাদিকদের এক প্রশ্নের জবাবে এ কথা বলেন।
সাংবাদিকদের মোস্তফা সরয়ার ফারুকী বলেন, জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলামের জীবনী নিয়ে সিনেমা তৈরি এবং তার রচিত গ্রন্থগুলো অনুবাদ করার উদ্যোগ নেয়া হবে। অপর এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, গত জুলাইয়ের আন্দোলনে কাজী নজরুল ইসলাম ব্যাপকভাবে প্রাসঙ্গিক হয়ে উঠেছেন। ৫ আগস্ট এর পরে আমরা একটি নতুন বাংলাদেশে প্রবেশ করেছি এবং বাংলাদেশের দেয়াল লেখনিতে দেখবেন নজরুলের কবিতা গান কীভাবে ব্যবহৃত হয়েছিল।
তিনি বলেন, কাজী নজরুল ইসলামের যে শৈল্পিক শক্তির গান কবিতা, তা ১০০ বছর পরেও বাংলাদেশের মানুষের অবলম্বন হয়ে উঠেছে। সেই অবলম্বন নিয়েই একটি গণঅভ্যুত্থান পরিচালিত হয়েছে। তাই বলা যায় শিল্পের শক্তি নজরুলের শক্তি। জাতীয় কাজী নজরুল ইসলামের স্মৃতি সংরক্ষণ বিষয়ে সংস্কৃতি উপদেষ্টা বলেন, নজরুলের স্মৃতি অবহেলিত। আমি জানি। কিন্তু আমরা স্মৃতি রক্ষা শুরু করি কিন্তু স্মৃতি সংরক্ষণ করি না। এটি আমাদের খারাপ দিক। তবে আমাদের সুনজর রয়েছে।
নজরুল পুরস্কার ২০২৪-এর জন্য মনোনীত গুণিজন হলেন নজরুল-গবেষণায় অনন্য সাধারণ অবদানের জন্য আবদুল হাই শিকদার। তিনি নজরুল-গবেষক ও দৈনিক যুগান্তর সম্পাদক। নজরুলের কবিতা আবৃত্তিতে অনন্য সাধারণ অবদানের জন্য নাসিম আহমেদ। তিনি আবৃত্তিকার, আবৃত্তি প্রশিক্ষক ও সুপ্রিম কোর্টের সিনিয়র আইনজীবী। ‘চব্বিশের গণঅভ্যুত্থান: কাজী নজরুলের উত্তরাধিকার’ এ প্রতিপাদ্য নিয়ে কুমিল্লায় এবার বর্ণাঢ্য আয়োজনে তিন দিনব্যাপী কবি কাজী নজরুল ইসলামের ১২৬তম জন্মবার্ষিকী উদযাপন হচ্ছে। বিশিষ্টজনদের আলোচনা সভা ও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের মধ্য দিয়ে এই তিন দিন স্মরণ করা হবে বিদ্রোহ ও সাম্যের কবি কাজী নজরুলকে।
জাতীয় কবির জন্মবার্ষিকীর অনুষ্ঠানের সমাপনী
খুলনা ব্যুরো : জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলামের ১২৬তম জন্মবার্ষিকী- ২০২৫ উদযাপন উপলক্ষ্যে সাহিত্য ও সাংস্কৃতিক প্রতিযোগিতার উদ্বোধন, পুরস্কার বিতরণ ও সমাপনী অনুষ্ঠান রোববার (২৫মে ) দুপুরে খুলনা মহানগরীর টুটপাড়া মডেল সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় নজরুল মিলনায়তনে অনুষ্ঠিত হয়। এতে প্রধান অতিথি ছিলেন খুলনার অতিরিক্ত বিভাগীয় কমিশনার (উন্নয়ন) আবু সায়েদ মো. মনজুর আলম।
অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি বলেন, জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম তাঁর জীবনের অধিকাংশ সময় দারিদ্র্যতার সাথে সংগ্রাম করে জীবন অতিবাহিত করেছেন। শত দারিদ্র্যতার মধ্য দিয়ে গেলেও তিনি বাংলার নিপীড়িত মানুষের অধিকারের বিষয় থেকে পিছু হননি। একাধারে তিনি সাম্য, প্রেম, মানবতা ও বিদ্রোহের কবি। সর্বদা তিনি তার সাহিত্যের মাঝে নিপিড়ীত মানুষের কথা তুলে ধরেছেন। ভারতবর্ষের স্বাধীনতা কামনা করার জন্য বিভিন্ন সময়ে তাকে কারাবন্দী হতে হয়েছে। তবুও তিনি অন্যায়ের কাছে মাথা নত করেননি। জাতীয় কবির এই আদর্শকে আমাদের মননে ধারণ করার জন্য আজকের শিশুদেরকে নজরুল সাহিত্যে মনোযোগী করে গড়ে তুলতে হবে।
অনুষ্ঠানে বিশেষ অতিথি ছিলেন জেলা তথ্য অফিসের পরিচালক গাজী জাকির হোসেন ও থানা শিক্ষা অফিসার মো. শাহজাহান। এতে সভাপতিত্ব করেন নজরুল একাডেমির সাধারণ সম্পাদক মাসুদ মাহমুদ। খুলনা নজরুল একাডেমি এ অনুষ্ঠানের আয়োজন করে। অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি বিজয়ী শিশুদের মাঝে পুরস্কার বিতরণ করেন।