বিএনপি নেতা ইশরাক হোসেনকে ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের মেয়র পদে বসানোর সিদ্ধান্ত নিতে সময়সীমা বেঁধে দিয়েছেন আন্দোলনকারীরা। এর মধ্য দিয়ে গতকালের মতো কর্মসূচি শেষ করেছেন তাঁরা। আন্দোলনকারীরা বলছেন, আজ বুধবার সকাল ১০টার মধ্যে দাবি মানা না হলে কঠোর কর্মসূচির ঘোষণা দেওয়া হবে। গতকাল মঙ্গলবার বিকেল চারটার দিকে নগর ভবনের সামনে অবস্থিত অস্থায়ী মঞ্চ থেকে এ ঘোষণা দেওয়া হয়। এ আন্দোলনের সমন্বয়কারী সাবেক সচিব মশিউর রহমান এ ঘোষণা দেন।

মশিউর রহমান বলেন, ‘আগামীকাল সকাল ১০টায় নগর ভবনের সামনে আমরা হাজির হবো। দাবি না মানলে অবস্থা বুঝে নতুন কর্মসূচি ঘোষণা করা হবে।’ স্থানীয় সরকার উপদেষ্টা আসিফ মাহমুদ সজীব ভুঁইয়া যে বক্তব্য দিয়েছেন, তা জাতির সঙ্গে প্রতারণা, গণতন্ত্রের সঙ্গে প্রতারণার শামিল বলে মন্তব্য করেন তিনি। সোমবার এই উপদেষ্টা ফেসবুক পোস্টে বলেন, গায়ের জোরে নগর ভবন বন্ধ করে বিএনপি আন্দোলন করছে।

এ সময় কর্মসূচি ঘোষণার মঞ্চে এই আন্দোলন ও দাবির সঙ্গে একাত্মতা প্রকাশ করেন ঢাকা সিটি করপোরেশনের সর্বস্তরের কর্মচারী ইউনিয়ন। ইউনিয়নগুলো আজ সকাল ১০টার মধ্যে দাবি মানা না হলে এর পর থেকে পরিচ্ছন্নতাসেবা, ময়লা পরিবহনসেবা, বিদ্যুৎ-সেবাসহ সব ধরনের নাগরিক সেবা বন্ধ করে দেওয়ার হুঁশিয়ারি দেয়। সংগঠনগুলো হলো স্ক্যাভেঞ্জার অ্যান্ড ওয়ার্কার্স ইউনিয়ন, পরিবহন চালক ও শ্রমিক কর্মচারী ইউনিয়ন, বিদ্যুৎ কর্মচারী সমাজকল্যাণ সমিতি, ৪র্থ শ্রেণি কর্মচারী সমাজকল্যাণ সমিতি।

ইশরাক হোসেনকে ঢাকা দক্ষিণ সিটির মেয়র পদে শপথের মাধ্যমে দায়িত্ব বুঝিয়ে দেওয়ার দাবিতে গত বুধবার থেকে আন্দোলনে নেমেছেন তাঁর সমর্থকেরা। এরই ধারাবহিকতায় গতকাল সকাল ১০টা থেকে বিকেল ৪টা পর্যন্ত নগর ভবনের সামনে অবস্থান নিয়ে বিক্ষোভ করেন তাঁরা। এই আন্দোলনের ফলে বন্ধ রয়েছে ডিএসসিসির সব নাগরিক সেবা। সেবা নিতে এসে ভোগান্তিতে পড়ছেন অনেক মানুষ।

ঢাকা দক্ষিণ সিটির মেয়র পদে নির্বাচন হয় ২০২০ সালের ১ ফেব্রুয়ারি। সেই নির্বাচনে ব্যাপক অনিয়ম ও জালিয়াতির অভিযোগ ওঠে। নির্বাচনে বিএনপির প্রার্থী ছিলেন ইশরাক হোসেন।

গত বছরের ৫ আগস্ট গণ-অভ্যুত্থানে আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর মেয়র পদ থেকে শেখ ফজলে নূর তাপসকে অপসারণ করে সরকার। অন্যদিকে চলতি বছরের ২৭ মার্চ একটি নির্বাচনী ট্রাইব্যুনাল ইশরাক হোসেনকে গত সিটি নির্বাচনে বিজয়ী ঘোষণা করেন। এরপর ইশরাককে মেয়র ঘোষণা করে গত ২৭ এপ্রিল গেজেট প্রকাশ করে নির্বাচন কমিশন।

এর আগে ইশরাক হোসেনকে মেয়র পদে বসানোর দাবিতে গতকাল মঙ্গলবার নগর ভবনের মূল ফটকের সামনে অবস্থান নেয় তাঁর সমর্থকেরা। সেখানে মঞ্চ বানানো হয়েছে। সকাল সাড়ে ১০টা থেকে বঙ্গবাজার-গোলাপ শাহ মাজার পর্যন্ত সড়ক হয়ে সব ধরনের যান চলাচল বন্ধ হয়ে পড়ে। গোলাপ শাহ মাজার মোড়েও সড়কে অবস্থান নেয় ইশরাকের সমর্থকেরা। নগর ভবনের মূল ফটকে তালা লাগিয়ে সকাল ১০টা থেকে এই কর্মসূচি চলছে। এতে বন্ধ রয়েছে ডিএসসিসির সব নাগরিক সেবা। সেবা নিতে এসে ভোগান্তিতে পড়েছেন অনেক মানুষ।

সরেজমিনে দেখা যায়, ঢাকা দক্ষিণ সিটির বিভিন্ন ওয়ার্ড থেকে খ- খ- মিছিল নিয়ে ইশরাক হোসেনের সমর্থকেরা নগর ভবনের সামনে এসে জড়ো হয়েছেন। তাঁরা স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা আসিফ মাহমুদ সজীব ভুঁইয়াকে অপসারণের পাশাপাশি শপথ নিয়ে আর টালবাহানা না করার দাবিতে নানা স্লোগান দিয়ে যাচ্ছেন। বিএনপি ও এর অঙ্গসহযোগী সংগঠনের বিভিন্ন পর্যায়ের নেতা-কর্মীদের পাশাপাশি ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের কর্মকর্তা ও কর্মচারীদের একাংশ এই আন্দোলনে সংহতি জানিয়ে অংশ নিয়েছে। গোলাপ শাহ মাজার থেকে বঙ্গবাজার মোড় পর্যন্ত সড়কের মাঝে থাকা বৈদ্যুতিক খুঁটিতে বেশ কয়েকটি মাইক লাগানো হয়েছে।

সেবাবঞ্চিত নাগরিকেরা : ডিএসসিসির নগর ভবনে জন্ম ও মৃত্যুনিবন্ধন, ট্রেড লাইসেন্স, হোল্ডিং ট্যাক্স, নির্মাণ অনুমোদনসহ নানা কার্যক্রম আটকে আছে। পুরান ঢাকার বাসিন্দা নুরজাহান বেগম বলেন, ‘তিন দিন ধরে ঘুরছি। ফটক বন্ধ, কারও সঙ্গে দেখা করতেও দিচ্ছে না।’ আরেক সেবাপ্রত্যাশী শাহ আলম বলেন, ‘ট্রেড লাইসেন্স নবায়নের সময় পার হয়ে যাচ্ছে। অফিসে ঢুকতেই দিচ্ছে না।’

ইশরাকপন্থীরা বলছেন, আসিফ মাহমুদ নিজেই ইশরাকের শপথ গ্রহণের প্রক্রিয়ায় বারবার বাধা দিচ্ছেন। তাঁদের অভিযোগ, শপথ অনুষ্ঠানের বিষয়ে ‘আইনগত জটিলতা’, ‘অনুচ্ছেদ ব্যাখ্যা’, ‘মন্ত্রণালয়ের মতামত’ ইত্যাদি নানা অজুহাত তুলে সময়ক্ষেপণ করা হচ্ছে।

নগর ভবনের একাধিক কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, তাঁরা দাপ্তরিক কাজে আসছেন, কিন্তু মূল ভবনে ঢুকতে পারছেন না।

আমাকে আক্রমণ করে লাভ নেই, আদালতে লড়তে হবে: ইশরাক ইস্যুতে আসিফ মাহমুদ

বিএনপি নেতা ইশরাক হোসেন প্রসঙ্গে স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা আসিফ মাহমুদ সজীব ভূঁইয়া বলেছেন, ‘মেয়র হিসেবে দায়িত্ব দেওয়ার বিষয়টিতে আইনি জটিলতা আছে এবং আদালতের বিচারাধীন বিষয়, এখানে আমাকে ব্যক্তিগতভাবে আক্রমণ করে আসলে লাভ নেই। আদালতের যেই আইনি লড়াই, সেটি লড়তে হবে। যেই জটিলতাগুলো আছে, সেই সংক্রান্তে আমরা আইন মন্ত্রণালয়ের মতামত চেয়েছি। যেহেতু আইন মন্ত্রণালয় এ বিষয়ে বিশেষজ্ঞ, তাদের মতামতের ভিত্তিতে আমরা একটা সিদ্ধান্তে পৌছাতে পারবো।’ গতকাল মঙ্গলবার দুপুরে ঢাকার সাভারের জাতীয় যুব উন্নয়ন ইনস্টিটিউটে আয়োজিত যুব সমাবেশ ২০২৫-এ প্রধান অতিথি হিসেবে যোগ দিয়ে সাংবাদিকদের তিনি এ কথা বলেন।

আসিফ মাহমুদ বলেন, ‘সরকার একটা বডি হিসেবে কাজ করে। কেউ ব্যক্তিগতভাবে এখানে কোনও সিদ্ধান্ত নেওয়ার সুযোগ নেই। বিশেষ করে এ ধরনের বড় ডিসিশন, একা ব্যক্তি হিসেবে আমি নিচ্ছি এটা ভাবার কোনও কারণ নেই।’

এই উপদেষ্টা বলেন, ‘আদালতে বিচারাধীন বিষয় নিয়ে কোনও মন্তব্য করা সমীচীন হবে না। যে বিষয়টি নিয়ে আন্দোলন চলছে, সেটির যে মামলা ছিল সেই মামলায় স্থানীয় সরকার বিভাগ পক্ষভুক্ত ছিল না এবং রায়েও স্থানীয় সরকার বিভাগের প্রতি কোনও নির্দেশনা ছিল না।’