“বিদেশে গিয়ে পরিবারের অভাব দূর করব”Ñএই স্বপ্ন ছিল সোহেল মিয়ার। কিন্তু সেই স্বপ্ন আর পূরণ হলো না। ২৪ এর ৫ আগস্ট সন্ধ্যায় ঢাকার মেরুল বাড্ডায় আওয়ামী সন্ত্রাসীদের গুলীতে প্রাণ হারান এই তরুণ সংগ্রামী। স্বপ্নভঙ্গের করুণ এক গল্প হয়ে রয়ে গেল শহীদ সোহেল মিয়ার জীবন।
ময়মনসিংহ জেলার গোয়াতলা ইউনিয়নের জোকা গ্রামের দরিদ্র কৃষক পরিবারের সন্তান সোহেল মিয়া (২৬)। জন্ম ১৯৯৭ সালের ৬ সেপ্টেম্বর। ছোটবেলা থেকেই সৎ, নির্ভীক ও অন্যায়ের বিরুদ্ধে আপসহীন মনোভাবের অধিকারী ছিলেন তিনি। জীবনযুদ্ধে হাল না ছেড়ে, পরিবারকে বাঁচাতে পড়াশোনা বন্ধ করে ঢাকায় এসে একটি হোটেলে কাজ শুরু করেন। মাসিক মাত্র ১৮ হাজার টাকা বেতনে দীর্ঘ সাত বছর কাজ করেছেন। সেই আয় দিয়েই টেনেটুনে চলতো পরিবার, বৃদ্ধ বাবা-মা এবং স্ত্রী-সন্তানের সংসার।
পরিবারের ভাগ্য ফেরাতে বিদেশ যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেন সোহেল। পাসপোর্ট ও ভিসার কাজ শুরু করতেই চড়তে হয় ঋণের বোঝাÑপাঁচ হাজার টাকার বেশি ধার করতে হয় পরিচিতদের কাছ থেকে।
২০২৪ সালের ৫ আগস্ট, দেশে স্বৈরাচারবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের বিজয় উপলক্ষে বের হয় আনন্দ মিছিল। মিছিল শেষে সোহেল মিয়া মেরুল বাড্ডার ব্র্যাক ইউনিভার্সিটির সামনে পৌঁছালে সন্ত্রাসীদের গুলীতে গুরুতর আহত হন। শরীর থেকে ঝরতে থাকে রক্ত। ঘটনাস্থলেই মাটিতে লুটিয়ে পড়েন। পরে জানা যায়, তাকে হত্যা করার পর তার লাশ গুমেরও চেষ্টা করা হয়। অনেক অনুনয়-বিনয়ের পর ৫২ হাজার টাকার বিনিময়ে লাশ পরিবারের কাছে হস্তান্তর করা হয়।
পরদিন ৬ আগস্ট সকালে ঢাকার ভাটারায় তার লাশ আনা হয়। সেখানে আত্মীয়-স্বজন ও স্থানীয় বাসিন্দারা তাকে শেষ বিদায় জানান কান্নায় ভেঙে পড়ে। রাতে লাশ গ্রামের বাড়ি ময়মনসিংহের ধোবউড়ায় নিয়ে যাওয়া হয়, সেখানেই জানাযা শেষে দাফন সম্পন্ন হয়।
শহীদ সোহেলের পরিবার এখন নিঃস্ব। একটি চার বছরের ছেলে রয়েছে তার। স্ত্রী ও পিতা-মাতা বর্তমানে অভাব আর ঋণের চাপে দিশেহারা। শিশুটি এখন বাবাহীন, ভবিষ্যৎ অনিশ্চিত। পরিবার বলছে, আমরা শুধু চাই, রাষ্ট্র তার ত্যাগকে সম্মান দিকÑআমরা যেন মাথা গোঁজার একটু ঠাঁই পাই, শিশুটির যেন ভবিষ্যৎ থাকে।
একজন সাহসী ছাত্র আন্দোলনকর্মী ও সংগ্রামী জীবনের প্রতীক ছিলেন শহীদ সোহেল মিয়া। সমাজ বদলের যে স্বপ্ন তিনি দেখেছিলেন, সেই স্বপ্ন বাস্তবায়নে এখন প্রয়োজন রাষ্ট্র ও নাগরিক সমাজের দায়িত্বশীল ভূমিকা।