চাইলেন নির্বাচন সংস্কার বিচারের রোডম্যাপ

সংস্কার আওয়ামী লীগের বিচার এবং সুষ্ঠু নির্বাচনের জন্য সর্বদলীয় বৈঠকে প্রায় সব রাজনৈতিক দল প্রফেসর ড. ইউনূসের প্রতি আস্তার কথা জানিয়েছে। তারা প্রধান উপদেষ্টাকে পদত্যাগ না করার অনুরোধ জানিয়েছে। তারা সবাই প্রফেসর ইউনূসকে সুষ্ঠু,স্বচ্ছ, ইনক্লুসিভ নির্বাচন দেওয়ার অনুরোধ করেছেন। দেশজুড়ে চলমান পরিস্থিতিতে প্রফেসর ইউনূস পদত্যাগ করলে দেশ বিপদে পড়বে বলেও জানিয়েছে রাজনৈতিক দলগুলো।

গতকাল রোববার ও আগের দিন শনিবার প্রধান উপদেষ্টা প্রফেসর মুহাম্মদ ইউনূস বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল বিএনপি, বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী, ন্যাশনাল সিটিজেন পার্টি এনসিপিসহ মোট ২৩টি দলের শীর্ষ নেতার সঙ্গে কথা বলেছেন। এরমধ্যে শনিবার রাতে বিএনপির জামায়াত ও এনসিপি’র সাথে কথা বলেন দলগুলোর শীর্ষ নেতারা। তারা চলমান অস্থিরতা থামাতে সুনির্দিষ্ট কিছু সুপারিশ করেছেন।

গতকাল প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূসের সঙ্গে প্রথম ধাপে বৈঠকে বসেন বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের ১০ জন প্রতিনিধি। প্রধান উপদেষ্টার উপ-প্রেস সচিব আবুল কালাম আজাদ মজুমদার জানিয়েছেন, লিবারেল ডেমোক্রেটিক পার্টির (এলডিপি) সভাপতি কর্নেল (অব.) অলি আহমেদ, নাগরিক ঐক্যের সভাপতি মাহমুদুর রহমান মান্না, বিপ্লবী ওয়ার্কার্স পার্টির সাধারণ সম্পাদক সাইফুল হক, গণসংহতি আন্দোলনের প্রধান সমন্বয়কারী জোনায়েদ সাকি, রাষ্ট্র সংস্কার আন্দোলনের সমন্বয়ক হাসনাত কাইয়ুম, আমার বাংলা (এবি) পার্টির চেয়ারম্যান মজিবুর রহমান মঞ্জু, বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টির (সিপিবি) সাবেক সভাপতি মুজাহিদুল ইসলাম সেলিম, জাতীয় গণফ্রন্টের সমন্বয়ক টিপু বিশ্বাস, ভাসানী অনুসারী পরিষদের আহ্বায়ক বীর মুক্তিযোদ্ধা শেখ রফিকুল ইসলাম বাবলু, জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দলের (জেএসডি) সাধারণ সম্পাদক শহীদ উদ্দিন মাহমুদ স্বপন।

বৈঠক শেষে বেরিয়ে একে একে কথা বলেন নেতারা। আমার বাংলাদেশ পার্টির (এবি পার্টি) চেয়ারম্যান মজিবুর রহমান মঞ্জু বলেন, প্রধান উপদেষ্টা নির্বাচনের উপযুক্ত পরিবেশ পাবেন না বলে ধারণা করেছিলেন। তাই তিনি পদত্যাগ করতে চেয়েছিলেন। নির্বাচনের জন্য একটু শক্তিশালী প্রশাসন দরকার, সেটি প্রস্তুত হলেই নির্বাচন আয়োজন হবে বলে প্রধান উপদেষ্টা জানিয়েছেন। মুজিবুর রহমান মঞ্জু বলেন, ড. মুহাম্মদ ইউনূসকে বলেছি আপনি যদি দায়িত্ব ছেড়ে দেন এখন, তাহলে নির্বাচন, সংস্কার, সবকিছু অনিশ্চিত হয়ে যাবে। জাতি দিশেহারা হয়ে যাবে।

সিপিবির সাবেক সভাপতি মুজাহিদুল ইসলাম সেলিম বলেন, দেশে ও দেশের বাইরে থেকে গণঅভ্যুত্থানকে নস্যাৎ করতে ষড়যন্ত্র হচ্ছে। মতের পার্থক্য থাকবে এটা মেনে নিতে হবে, কিন্তু কোনটা কার্যকর হবে সেটা ঠিক করবে জনগণ। তিনি আরও বলেন, অবাধ নিরপেক্ষ নির্বাচনের জন্য যে সংস্কার দরকার, তা করে নির্বাচনের ব্যবস্থা করতে হবে। সময়ক্ষেপণ করলে পরিস্থিতি ঘোলাটে হবে, তখন কিছু করার থাকবে না।

নাগরিক ঐক্যের সভাপতি মাহমুদুর রহমান মান্না বলেন, ভারতীয় আধিপত্যবাদ আমাদের এ অর্জন মেনে নিতে পারছে না। পারলে একদিনে তা ধ্বংস করে দেবে। এটা যাতে কোনোভাবেই না হয়, সে জন্য সবাইকে ঐক্যবদ্ধ থাকতে হবে।

বিপ্লবী ওয়ার্কার্স পার্টির সাধারণ সম্পাদক সাইফুল হক বলেন, গেলো কয়দিনের ঘটনায় প্রধান উপদেষ্টার মন খারাপ ছিল। এজন্য তিনি পদত্যাগ করার সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন। মাঝনদীতে মাঝি বদলাতে হয় না উল্লেখ করে তিনি বলেন, এ জন্য ড. ইউনূসের ওপর সবাই আস্থা রাখাতে চায় বলে তাকে জানানো হয়েছে।

তিনি আরও বলেন, অনেকক্ষেত্রে অন্তর্বর্তী সরকার দলনিরপেক্ষ অবস্থা বজায় রাখতে পারছে না। এটি পরিহার করে নিরপেক্ষ আচরণ দেখতে চাই। এক সরকারের মধ্যে আরেকটি সরকার দেখতে চাই না। মানবিক করিডোরসহ জাতীয় কোন সিদ্ধান্ত রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে আলোচনা ছাড়া নেয়া উচিত নয় বলেও বৈঠকে মন্তব্য করেন সাইফুল হক।

গণসংহতি আন্দোলনের প্রধান সমন্বয়কারী জোনায়েদ সাকী বলেন, সুষ্ঠু নির্বাচনের ব্যবস্থা করেই তাকে (ড. ইউনূস) যেতে হবে। নানা ধরনের অনাস্থা তৈরি হচ্ছে, এরমধ্য দিয়ে দূরত্ব তৈরি হচ্ছে। এই জায়গাটা দূর করতে হবে বলেও তিনি বৈঠকে জানিয়েছেন। তিনি বলেছেন, জনগন দৃশ্যমান বিচার দেখতে চায়। বিচারের আন্তর্জাতিক মান যাতে বজায় থাকে, সে ব্যাপারেও দৃষ্টি দেয়ার আহ্বান জানান তিনি। বৈঠকে নির্বাচনের সুনির্দিষ্ট রোডম্যাপ চেয়েছেন সাকী। প্রধান উপদেষ্টাও বলেছেন, এটা যে জরুরি তা সরকারও মনে করে। তবে, নির্বাচনের জন্য যে পরিবেশ দরকার, যে প্রতিষ্ঠানগুলো জড়িত, সে প্রতিষ্ঠানগুলো যখন আত্মবিশ্বাসী হবেন যে সুষ্ঠু নির্বাচনের জন্য তারা প্রস্তুত, তখনই নির্বাচনের তারিখ ঘোষণা করা হবে বলে জানিয়েছেন।

এরপর প্রফেসর ইউনূসের সাথে বৈঠক করেন ইসলামী ভাবধারার দলগুলোর সাথে। দ্বিতয়ি ধাপের বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়।

উল্লেখ্য, আগেরদিন শনিবার বিএনপি, জামায়াতে ইসলামী ও জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) সঙ্গে বৈঠক করেন প্রধান উপদেষ্টা। বিএনপির পক্ষ থেকে বলা হয়েছে গণঅভ্যুত্থানের মাধ্যমে যে জাতীয় ঐক্য গড়ে উঠেছিল, তা এখন বিভক্তির পথে। তারা আশঙ্কা প্রকাশ করে বলেছে, এ ঐক্যের ভিত্তিতেই আগামীর বাংলাদেশ গড়ে উঠবেÑএটা যদি ভেঙে পড়ে, তবে তা হবে জনগণের স্বপ্নভঙ্গের শামিল। দলটির অভিযোগ, সরকারের সাম্প্রতিক নানা কর্মকা-ে জনমনে এর নিরপেক্ষতা নিয়ে সন্দেহ দানা বেঁধেছে। তারা বলেছে, কিছু উপদেষ্টা সরকারের ভাবমূর্তি ক্ষুণœ করছে। বিশেষ করে যেসব উপদেষ্টা রাজনৈতিকভাবে যুক্ত, তাদের অব্যাহতি দেওয়া জরুরি।

বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর পক্ষ থেকে আমীর ডা. শফিকুর রহমান বলেন, ‘আমাদের সকলের দাবি ছিল, অর্থবহ একটি সংস্কার হবে। এই সংস্কার ও বিচারের মধ্য দিয়েই একটা অর্থবহ নির্বাচন হবে। এই নির্বাচনের সুস্থ মাঠ থাকবে, যারা অংশগ্রহণ করবে তারা ষড়যন্ত্রের শিকার হবে না, পেশীশক্তির প্রবণতা থাকবে না। সাড়ে ১৫ বছর জনগণ ভোটের অধিকার থেকে বঞ্চিত হয়েছে, এবার তারা ভোট দিতে পারবে, সেটা নিশ্চিত হবে- এটাই ছিল আমাদের দাবি।

এনসিপির পক্ষ থেকে পাঁচ দাবি জানানো হয়। আহ্বায়ক নাহিদ ইসলাম বলেন, আওয়ামী লীগ নিষিদ্ধের আন্দোলনে জুলাই ঘোষণাপত্র একটি দাবি ছিল এবং সেটি বাস্তবায়নে সরকারের পক্ষ থেকে ৩০ কার্যদিবস সময় নেয়া হয়েছিল; সেটি যেন নির্ধারিত সময়ের মধ্যেই বাস্তবায়ন করা হয় সে দাবি জানিয়েছি। আমাদের এ দাবির পরিপ্রেক্ষিতে ড. ইউনূস স্যারের পক্ষ থেকে আশ্বস্ত করা হয়েছে যে, নির্ধারিত সময়ে জুলাই ঘোষণাপত্র প্রকাশ করা হবে।