সরকার গঠনের ছয় মাসের মাথায় আকার বাড়লো প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের মন্ত্রিসভার। শুক্রবার সন্ধ্যার পর মন্ত্রিসভায় প্রথমবারের মতো রদবদল হলো। এতে নতুন করে মন্ত্রী-প্রতিমন্ত্রী হিসেবে যুক্ত হয়েছেন পাঁচজন জন। এদের মধ্যে একজন প্রতিমন্ত্রীকে পদোন্নতি দিয়ে মন্ত্রী করা হয়েছে। নতুন করে মন্ত্রী পদে শপথ নেন বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য ড. আবদুল মঈন খান এমপি, বাংলাদেশ জাতীয় পার্টির (বিজেপি) চেয়ারম্যান ব্যারিস্টার আন্দালিব রহমান পার্থ এমপি, বান্দরবান থেকে নির্বাচিত সংসদ সদস্য সাচিং প্রু জেরী ও রশিদুজ্জামান মিল্লাত। আর প্রতিমন্ত্রী হিসেবে শপথ নিয়েছেন হুমায়ুন কবির ও মোহাম্মদ শামীম কায়সার লিংকন। এদিকে মন্ত্রীসভায় রদ বদলে খাদ্য মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব পেয়েছেন আফরোজা খানম রিতা।

বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরকে রাষ্ট্রপতি করার সিদ্ধান্তের পর মুখে মুখে কিছু কথা রটিয়ে দেওয়া হয়েছিল। তার মধ্যে কে হচ্ছেন ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব ? আর কে-ই বা পাচ্ছেন স্থানীয় সরকার ও পল্লী উন্নয়ন মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব ? সেখানে আলোচনা ডালপালা গজায় যে, স্থায়ী কমিটির সদস্য সালাহ উদ্দিন আহমেদ-ই হচ্ছে এলজিআরডি মন্ত্রী আর সাবেক ছাত্র নেতা শহীদ উদ্দিন চৌধুরী এ্যানি হচ্ছে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী। কিন্তু না-হ। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান মন্ত্রীসভার কলেবর বৃদ্ধি আর রদ-বদলকে অন্যদের সামনে এনেছেন এসিড টেস্ট হিসেবে। বলা যায়, প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান ছয় মাসের মাথায় মন্ত্রী সভায় রদবদলে চমক দিয়েছেন।

বিশ্লেষকরা বলছেন, ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিজয়ের পর ২০২৬ সালের ১৭ ফেব্রুয়ারি গঠিত প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নেতৃত্বাধীন বিএনপি সরকার প্রথম ছয় মাসের কাজের মূল্যায়ন এবং শূন্যস্থান পূরণের লক্ষ্যেই এই মন্ত্রিসভায় বড় রদবদল ও সম্প্রসারণ করেছে। নতুন রাষ্ট্রপতি হিসেবে মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের শপথ নেওয়ার পরপরই শুক্রবার বঙ্গভবনে নতুন ৪ জন মন্ত্রী ও ২ জন প্রতিমন্ত্রীর শপথ গ্রহণের মাধ্যমে এই পরিবর্তন আনা হয়। রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক বিশ্লেষকদের মতে, প্রধানমন্ত্রী এই রদ-বদলে মূলত ৫টি বিশেষ বার্তা বহন করে।

প্রথমত কাজের মূল্যায়ন ও প্রশাসনিক গতিশীলতা বৃদ্ধিসরকার গঠনের ১৮০ দিন বা ছয় মাস পূর্তিতে মন্ত্রীদের পারফরম্যান্স মূল্যায়ন করা হয়েছে। প্রশাসনের স্থবিরতা কাটানো, নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়ন এবং গুরুত্বপূর্ণ মন্ত্রণালয়গুলোর নীতি বাস্তবায়নে গতি বাড়াতে এই পরিবর্তন আনা হয়েছে।

দ্বিতীয়ত, বিএনপির নেতৃত্বাধীন যুগপৎ আন্দোলনে সক্রিয় থাকা জোটসঙ্গী দলগুলোকে সরকারে অন্তর্ভুক্ত করার স্পষ্ট বার্তা দেওয়া। উদাহরণ হিসেবে বলা যায়, বাংলাদেশ জাতীয় পার্টি (বিজেপি) চেয়ারম্যান আন্দালিভ রহমান পার্থকে তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রণালয়ের পূর্ণ মন্ত্রী করার মাধ্যমে আন্দোলনের সহযোগীদের পুরস্কৃত করা এবং সরকারের পক্ষে জোরালো জনমত তৈরির কৌশল।

তৃতীয়ত, জ্যেষ্ঠ ও অভিজ্ঞ নেতাদের রাষ্ট্রীয় দায়িত্বে আনা মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর রাষ্ট্রপতি হিসেবে দায়িত্ব নেওয়ায় স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়টি শূন্য হয়ে পড়েছিল। সেই গুরুত্বপূর্ণ স্থানে বিএনপির স্থায়ী কমিটির অত্যন্ত অভিজ্ঞ ও সিনিয়র সদস্য ড. আবদুল মঈন খানকে দায়িত্ব দিয়ে সরকার বার্তা দিলো যে, জনগুরুত্বপূর্ণ খাতে অভিজ্ঞ নেতৃত্বকেই প্রাধান্য দেওয়া হলো।

চতুর্থত, ছয় মাসে বিভিন্ন কারণে শূন্য হওয়া পদগুলো পূরণের একটি প্রশাসনিক বাধ্যবাধকতা ছিল। পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক মন্ত্রী দিপেন দেওয়ানের পদত্যাগ এবং মির্জা ফখরুলের রাষ্ট্রপতি হওয়া সহ বিভিন্ন শূন্যতা কাটাতে বান্দরবানের এমপি সাচিং প্রু জেরীকে পার্বত্য মন্ত্রী করা এবং দক্ষতাসম্পন্ন ব্যক্তিদের পুনর্বিন্যাস করা হয়েছে।

পঞ্চমত, দক্ষ টেকনোক্র্যাট ও তরুণদের সমন্বয় প্রধানমন্ত্রীর পররাষ্ট্র উপদেষ্টা হুমায়ুন কবিরকে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের টেকনোক্র্যাট প্রতিমন্ত্রী করার মাধ্যমে বৈশ্বিক কূটনীতিতে পেশাদারিত্ব বাড়ানোর ইঙ্গিত দেওয়া হয়েছে। একই সঙ্গে তরুণ ও মাঠপর্যায়ের সংসদ সদস্যদের (যেমন: গাইবান্ধা-৪ আসনের মোহাম্মদ শামীম কায়সার লিংকন) প্রতিমন্ত্রী হিসেবে যুক্ত করে অভিজ্ঞ ও নবীনের ভারসাম্য তৈরি করা হয়েছে।

মন্ত্রীদের দপ্তর বন্টনে খাদ্য মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে পর্যটন মন্ত্রী আফরোজা খানম রিতাকে। মন্ত্রীসভার কলেবর বৃদ্ধি আর রদবদলের মূল্যায়নে সাবেক সচিব আবদুল আউয়াল মজুমদার মনে করেন, সরকার গঠনের পরপরই তারেক রহমান বিভিন্ন আলোচনায় বলেছেন, মন্ত্রীদেরও ‘পারফরমেন্স’ বিবেচনা করে তিনি সিদ্ধান্ত নেবেন। আর মন্ত্রিসভায় যারা এসেছিলেন, তাদের বেশিরভাগও ছিলেন অনভিজ্ঞ ও নতুন। এখন ছয় মাস পার এসে তিনি দেখেছেন, কোথায় কোথায় পরিবর্তন করা দরকার এবং সেভাবে পরিবর্তন করছেন।

তথ্য এবং বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটন মন্ত্রণালয়ে পরিবর্তনের কারণ প্রকাশ পেলে অন্যরাও সতর্ক হবেন বলে মনে করছেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক কাজী মাহবুবুর রহমান। তিনি বলেন, এই পরিবর্তনের মূল কারণটা যেটা আসবে বা প্রকাশ পাবে, সেটার ভিত্তিতে অন্যদের কাছেও বার্তা যাবে। নেতিবাচক কারণে পরিবর্তন হলে অন্য মন্ত্রীরাও সাবধান হবেন। ব্যারিস্টার আন্দালিভ রহমান পার্থকে মন্ত্রিসভায় নিয়ে আসার মাধ্যমে দলীয় কাজে জহির উদ্দিন স্বপনকে আরও বেশি সম্পৃক্ত করা হচ্ছে। এই মন্ত্রণালয়ে সামান্য কিছু পরিবর্তন এনে গতি বা মাত্রা বাড়ানো যায় কি-না, সেই চিন্তা করা হয়েছে।

নতুন মন্ত্রীত্ব প্রাপ্তিতে মূল্যায়নের ক্ষেত্রে এলজিআরডি মন্ত্রী ড. আবদুল মঈন খান দীর্ঘ রাজনৈতিক জীবনের পাশাপাশি অর্থনীতি ও প্রশাসনিক বিষয়ে তার অভিজ্ঞতা রয়েছে। ড. আবদুল মঈন খান ইতিপূর্বে বিজ্ঞান ও তথ্য-প্রযুক্তি এবং তথ্য মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রীর দায়িত্ব পালন করেছেন। গণতান্ত্রিক আন্দোলনে রাজপথে সক্রিয়তা এবং কূটনৈতিক মহলে যোগাযোগ তাকে বিএনপির অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ নীতিনির্ধারক হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছে।

তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রণালয়ের দায়িত¦প্রাপ্ত আন্দালিব রহমান মূলত পারিবারিক ঐতিহ্য, দলীয় নেতৃত্ব এবং সংসদীয় কার্যক্রমের মধ্য দিয়ে বিকশিত হয়েছে।

পাবত্য মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব প্রাপ্ত সাচিং প্রু জেরী বান্দরবানের ঐতিহ্যবাহী বোমাং রাজপরিবারের সন্তান সাচিং প্রু জেরী। পারিবারিক ঐতিহ্যের পাশাপাশি স্থানীয় পর্যায়ে সামাজিক ও রাজনৈতিকভাবেও পরিচিতি রয়েছে জেরীর।

ধর্ম প্রতিমন্ত্রীর দায়িত্ব পাওয়া শামীম কায়সার লিংকন এমবিএ অধ্যয়নরত অবস্থায় তাঁর বাবার মৃত্যুর পর রাজনীতিতে সক্রিয় হন। পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রীর দায়িত্ব পাওয়া হুমায়ুন কবিরের রয়েছে যুক্তরাজ্যের বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে পড়াশোনার পাশাপাশি ব্রিটিশ রাজনীতিতেও অভিজ্ঞতা। লন্ডনের মেয়রের দপ্তরে কৌশল সহকারী এবং পরে লিউইশাম এক্সিকিউটিভ মেয়রের কার্যালয়ে কেবিনেট উপদেষ্টা হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন তিনি।

প্রতিমন্ত্রী থেকে পূর্ণমনত্রী এম রশিদুজ্জামান মিল্লাত বিএনপির কেন্দ্রীয় কমিটির কোষাধ্যক্ষ। ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিএনপির ‘ধানের শীষ’ প্রতীকে বিপুল ভোটে জয়ী হয়ে দ্বিতীয়বার সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন।