মেগাসিটি ঢাকা কি অদূর ভবিষ্যতে পুরোপুরি মানব বসবাসের অযোগ্য হয়ে পড়ছে? এই প্রশ্নটি এখন আর কেবল তাত্ত্বিক আলোচনার মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। অপরিকল্পিত নগরায়ণ, বনভূমি ধ্বংস, জলাশয় ভরাট এবং মাত্রাতিরিক্ত দূষণের কারণে প্রতিনিয়ত প্রাকৃতিক ভারসাম্য হারাচ্ছে দেশের রাজধানী। বাস্তুতন্ত্র বা ইকোসিস্টেম ভেঙে পড়ার সবচেয়ে প্রত্যক্ষ ও ভয়াবহ ফল হিসেবে সামনে এসেছে ডেঙ্গুর প্রাণঘাতী উপদ্রব। পরিবেশবিদ ও প্রাণী বিশেষজ্ঞদের মতে, ঢাকা শহর থেকে মূলত গুরুত্বপূর্ণ কিছু প্রাণীর দ্রুত বিলুপ্তি বা আশঙ্কাজনক হারে হ্রাস পাওয়ার কারণেই এখানে মশা ও ডেঙ্গুর প্রকোপ নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে গেছে। পতঙ্গভোজী বাদুড়, উভচর ব্যাঙ, গৃহস্থালি শিকারী (টিকটিকি ও মাকড়সা) বিলুপ্তি মশা বৃদ্ধি অন্যতম একটি কারণ। ঢাকায় মশা মারতে বছরের পর বছর কোটি কোটি টাকার কীটনাশক ছিটানো হলেও প্রাকৃতিক শিকারী হারিয়ে যাওয়ায় মশা এখন নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে গেছে। এদিকে ২০১১-২০১৩ সালে ঢাকার ১২টি ওয়ার্ডে পরিচালিত এক গবেষণায় ১২,৬৮০টি মশার লার্ভা ও পিউপা সংগ্রহ করা হয়েছিল। শনাক্ত করা অপরিণত মশার প্রায় ৮২ শতাংশ ছিল এডিস মশা। গবেষণায় সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রজননস্থল হিসেবে পাওয়া যায়—পরিত্যক্ত টায়ার, ফ্রিজের ট্রে, প্লাস্টিক ড্রাম, গাড়ির যন্ত্রাংশ, ফেলে দেওয়া নির্মাণসামগ্রী। গবেষণায় আরও দেখা যায়, বৃষ্টিপাত, তাপমাত্রা ও আপেক্ষিক আর্দ্রতা মশার প্রাচুর্যের সঙ্গে উল্লেখযোগ্যভাবে সম্পর্কিত ছিল। বাংলাদেশের সরকারি হিসাব অনুযায়ী, ৯ সেপ্টেম্বর ২০২৬ পর্যন্ত দেশে এ বছর ৪৬ হাজার ৯৩৮ জন ডেঙ্গু রোগী হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন এবং ১৩৩ জনের মৃত্যু হয়েছে। শুধু সিটি করপোরেশন এলাকার মধ্যেই আক্রান্তের সংখ্যা ১১ হাজারের বেশি।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার সাম্প্রতিক বিশ্লেষণ বলছে, তাপমাত্রা বৃদ্ধি ও বৃষ্টিপাতের পরিবর্তন মশার প্রজনন ও টিকে থাকার পরিবেশকে প্রভাবিত করতে পারে। দ্রুত নগরায়ণ, ঘনবসতি, পানি-স্যানিটেশন ব্যবস্থার দুর্বলতা এবং মানুষের চলাচলও ডেঙ্গু সংক্রমণের ঝুঁকি বাড়ায়। ঢাকা নিয়ে ২০২৩ সালের একটি গবেষণায় স্যাটেলাইট তথ্য ব্যবহার করে নগরের তাপমাত্রা, নগর তাপদ্বীপ, ভূমি ব্যবহার, বৃষ্টিপাত, আর্দ্রতা ও ডেঙ্গু রোগীর তথ্য বিশ্লেষণ করা হয়। গবেষণায় দেখা যায়, ঢাকার যেসব এলাকায় ঁৎনধহ যবধঃ রংষধহফ বা নগর তাপদ্বীপের প্রভাব বেশি ছিল, ২০১৯ সালে সেসব এলাকায় ডেঙ্গুর ঘটনাও বেশি ছিল।

জীববিজ্ঞানীদের মতে, প্রকৃতিতে যেকোনো জীবের বংশবৃদ্ধি অন্য কোনো শিকারী প্রাণীর ওপর নির্ভর করে। একে বলা হয় ‘জৈবিক নিয়ন্ত্রণ’। ঢাকা শহরে এই প্রাকৃতিক নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা সম্পূর্ণ ধ্বংস হয়ে গেছে। গবেষণা দেখাচ্ছে, ঢাকায় এডিস মশা বৃদ্ধির সঙ্গে পানি জমে থাকা পাত্র, ফেলে দেওয়া টায়ার, ফ্রিজের ট্রে, প্লাস্টিক ড্রাম, গাড়ির যন্ত্রাংশ, নির্মাণসামগ্রী, তাপমাত্রা, বৃষ্টিপাত ও আর্দ্রতার সম্পর্ক রয়েছে।

পরিবেশ গবেষণা ও জনস্বাস্থ্য বিষয়ক একটি আন্তর্জাতিক বৈজ্ঞানিক জার্নাল; ইন্টারন্যাশনাল জার্নাল অব এনভায়রনমেন্টাল রিসার্চ অ্যান্ড পাবলিক হেলথ (আইজেইআরপিএইচ) গবেষণায় বলা হয়, প্রকৃতিতে ক্ষুদ্রাকৃতির পতঙ্গভোজী বাদুড় রাতের প্রধান কীট-শিকারী। একটি ছোট পতঙ্গভোজী বাদুড় এক রাতে শত শত উড়ন্ত মশা ও ক্ষতিকর পোকা সাবাড় করতে পারে। কিন্তু ঢাকার প্রাচীন শতবর্ষী গাছ কেটে ফেলা, বনভূমি না থাকায় এবং বহুতল ভবনের আধিক্যের কারণে এদের আশ্রয়স্থল ধ্বংস হয়ে গেছে। ফলে রাতের আকাশে মশা শিকার করার মতো কেউ অবশিষ্ট নেই।

উভয়চর ব্যাঙ: মশার প্রাথমিক রূপ বা লার্ভা দমনে কুনোব্যাঙ ও সোনাব্যাঙ সবচেয়ে কার্যকর ভূমিকা রাখে। জমা পানি ও ড্রেনের ওপরের লার্ভা খেয়ে এরা মশার বংশবৃদ্ধি গোড়াতেই বিনষ্ট করে। কিন্তু ঢাকায় নিচু জমি, পুকুর ও ড্রেনগুলো ধ্বংস করা এবং বিষাক্ত কেমিক্যালের ব্যবহারে ব্যাঙের উপস্থিতি এখন প্রায় শূন্যের কোঠায়।

গৃহস্থালি শিকারী (টিকটিকি ও মাকড়সা): ঘরের অভ্যন্তরীণ পরিবেশে মশা ও মাছি শিকার করার ক্ষেত্রে টিকটিকি এবং মাকড়সা প্রাকৃতিক দেয়াল হিসেবে কাজ করে। অতিরিক্ত কয়েল ও মশার স্প্রে ব্যবহারের কারণে ঘরের ভেতরেও এসব উপকারী প্রাণীর সংখ্যা আশঙ্কাজনকভাবে কমেছে। বৈজ্ঞানিক গবেষণাগারে টিকটিকি মশা খেতে দেখা গেছে। একটি পরীক্ষায় এক ঘণ্টায় দেওয়া ৪০টি মশার প্রায় সবই শিকার করেছিল।

অন্যান্য জলজ ও আকাশচারী বন্ধু: পানিতে থাকা ড্রাগনফ্লাই বা ফড়িংয়ের লার্ভা এবং বিশেষ প্রজাতির ছোট মাছ (যেমন- গুপি) মশার লার্ভা খেয়ে ফেলে। এছাড়া হাঁসও পানির মশার লার্ভা ধ্বংস করতে পারে। শহর থেকে জলাশয় হারিয়ে যাওয়ার সাথে সাথে এই প্রাণীগুলোও বিলুপ্ত হয়ে গেছে।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণীবিজ্ঞান বিভাগের বিশেষজ্ঞদের মতে, কেবল রাসায়নিক ওষুধ ছিটিয়ে কোনো শহরকে মশামুক্ত করা অসম্ভব। কারণ দীর্ঘদিন একই কেমিক্যাল ব্যবহারের ফলে মশার মধ্যে ওষুধ প্রতিরোধী ক্ষমতা তৈরি হয়েছে। বিজ্ঞানীদের স্পষ্ট বক্তব্য—আমরা কৃত্রিম উপায়ে মশা মারতে গিয়ে প্রকৃতির নিজস্ব ‘ফুটপ্রিন্ট’ নষ্ট করে ফেলেছি। যখন গাছে বাদুড়, পানিতে ব্যাঙ ও লার্ভাখেকো মাছ, এবং ঘরের কোনায় টিকটিকি ও মাকড়সা পর্যাপ্ত পরিমাণে ছিল, তখন মশার জনসংখ্যা একটি প্রাকৃতিক ভারসাম্যের মধ্যে থাকত।

বাংলাদেশ পরিবেশ আন্দোলন-বাপার সাধারণ সম্পাদক আলমগীর কবির বলেন, আন্তর্জাতিক বাসযোগ্যতার সূচকে ঢাকার অবস্থান তলানিতে থাকার প্রধানতম কারণ পরিবেশগত বিপর্যয়। সবুজ অঞ্চল বিলুপ্ত হয়ে শহরটি ‘আরবান হিট আইল্যান্ড’-এ পরিণত হয়েছে। ড্রেনেজ ব্যবস্থা ও স্বাভাবিক জলাশয় না থাকায় বর্ষায় কৃত্রিম জলাবদ্ধতা তৈরি হয়, যা এডিস মশার প্রজননক্ষেত্রে পরিণত হয়। নগর থেকে উপকারী বন্যপ্রাণী ও পাখি বিলুপ্ত হওয়ার কারণে রোগব্যাধি ছড়ানোর মাধ্যমগুলো (যেমন মশা) নিয়ন্ত্রণহীন হয়ে পড়েছে।

পরিবেশ ও জলবায়ু বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক ড. আহমদ কামরুজ্জামান মজুমদার বলেন, প্রকৃতিকে বাদ দিয়ে শুধু মানবকেন্দ্রিক নগরায়ণ কখনোই স্থায়ী হতে পারে না। ভবিষ্যৎ ঢাকা শহরকে মহামারি ও বাসযোগ্যতার সংকট থেকে বাঁচাতে জরুরি কিছু পদক্ষেপ নিতে হবে। শহরের অবশিষ্ট উদ্যান, পার্ক ও বড় বড় গাছ সংরক্ষণ করা। জলাশয় ও পুকুর ভরাট বন্ধ করে সেগুলোকে উন্মুক্ত ও দূষণমুক্ত রাখা এবং সেখানে লার্ভাখেকো মাছ, হাঁস ও ব্যাঙের প্রজনন ঘঠানো। রাসায়নিক স্প্রের ওপর নির্ভরতা কমিয়ে পরিবেশবান্ধব ও সমন্বিত মশক নিধন পদ্ধতি গ্রহণ করা। প্রকৃতির ভারসাম্য ফিরিয়ে না আনলে ডেঙ্গুর মতো সংক্রামক ব্যাধি প্রতি বছর আরও ভয়াবহ আকার ধারণ করবে এবং ঢাকা শহর মানুষের বসবাসের অযোগ্য একটি তপ্ত কংক্রিটের স্তূপে পরিণত হবে।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষকদের একটি গবেষণায় ২০১৯ সালের ঢাকার ডেঙ্গু তথ্যের সঙ্গে স্যাটেলাইটভিত্তিক ভূমির তাপমাত্রা, আরবান হিট আইসল্যান্ড, ভূমি ব্যবহার, জনসংখ্যা, বৃষ্টিপাত ও আর্দ্রতার সম্পর্ক বিশ্লেষণ করা হয়েছে।

পরিবেশ ও জলবায়ু বিশেসজ্ঞ অধ্যাপক ড. আহমদ কামরুজ্জামান মজুমদার আরও বলেন, বাসযোগ্যতা শুধু ডেঙ্গু দিয়ে নির্ধারিত হয় না। বায়ুদূষণ, তাপমাত্রা, সবুজ এলাকা, জলাভূমি, পানি ও স্যানিটেশন, বর্জ্য ব্যবস্থাপনা, যানজট, শব্দদূষণ, জনঘনত্ব এবং স্বাস্থ্যঝুঁকি—সবগুলো বিষয় বিবেচনা করতে হয়। কিন্তু যখন একই শহরে জলাভূমি কমে, গাছ কমে, প্রাকৃতিক আবাসস্থল ভেঙে যায়, বর্জ্য পড়ে থাকে এবং ছোট ছোট পাত্রে পানি জমে থাকে, তখন মানুষের তৈরি পরিবেশ এমনভাবে পরিবর্তিত হয় যে মশার মতো কিছু প্রজাতি বরং সুবিধা পায়। ২০২২ সালের একটি ঢাকা গবেষণাতেও দেখা গেছে, অধিক নগরায়িত এলাকায় এডিস মশা-এর লার্ভার উপস্থিতি, বিকাশ এবং পূর্ণাঙ্গ মশার কিছু জীবন-ইতিহাস বৈশিষ্ট্য তুলনামূলকভাবে বেশি ছিল।

বাংলাদেশ পরিবেশ আন্দোলন-বাপার সাধারণ সম্পাদক আলমগীর কবির বলেন, একটি সুস্থ নগর বাস্তুতন্ত্রে দরকার—দেশীয় গাছপালা; জলাভূমি ও ছোট জলাধার; ব্যাঙ ও অন্যান্য উভচর; পাখি; বাদুড়; গেকো ও অন্যান্য কীটভুক প্রাণী; মাকড়সা ও উপকারী কীটপতঙ্গ; মাছ ও জলজ শিকারি; মাটির জীববৈচিত্র্য। তাই বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা বলছে, ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণে শুধু কীটনাশক বা ফ্রগিং যথেষ্ট নয়। ঢাকার ডেঙ্গু সমস্যাকে শুধু ‘মশার সমস্যা’ হিসেবে দেখলে ভুল হবে। এটি একই সঙ্গে নগর পরিকল্পনা, পরিবেশ, জলবায়ু, বর্জ্য ব্যবস্থাপনা, পানি ব্যবস্থাপনা, জীববৈচিত্র্য এবং জনস্বাস্থ্যের সমস্যা।