স্টাফ রিপোর্টার : গাবতলী হাটের পর এবার ঢাকা পলিটেকনিক ইনস্টিটিউট সংলগ্ন খেলার মাঠ-এ কুরবানির পশু হাট ইজারা নিয়ে অনিয়মের অভিযোগ উঠেছে। সর্বোচ্চ দরদাতাকে ইজারা না দিয়ে ৩ নম্বরে থাকা এসএফ কর্পোরেশনকে হাট ইজারা দিয়েছে ঢাকা উত্তর সিটি কর্পোরেশন। এতে সরকারের কমপক্ষে ৭৭ লাখ টাকা লোকসান হবে। এর পেছনে কর্পোরেশনের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা অতিরিক্ত সচিব কামরুজ্জামান কলকাঠি নেড়েছেন বলে অভিযোগ সর্বোচ্চ দরদাতার। গত শনিবার ৩ নম্বরে থাকা এসএফ কর্পোরেশনকে হাট ইজারা দিয়ে কার্যাদেশ জারি করা হয়েছে। সংশ্লিষ্ট সূত্রে এসব তথ্য জানা গেছে।
কর্পোরেশনের প্রধান সম্পত্তি কর্মকর্তা মোহাম্মদ শওকত ওসমান স্বাক্ষরিত আদেশে বলা হয়েছে, এসএফ কর্পোরেশনের দাখিলকৃত ১ কোটি ৪০ লাখ টাকা সর্বোচ্চ দরদাতা হওয়ায় দরপত্র মূল্যায়ন কমিটি কর্তৃক গৃহীত ও অনুমোদিত হয়েছে। প্রতিষ্ঠানটিকে ৩ কার্যদিবসের মধ্যে টাকা জমা দিয়ে চুক্তি সম্পাদন ও কার্যাদেশ নিতে বলা হয়েছে।
এই প্রক্রিয়ায় অনিয়মের অভিযোগ করে রোববার ঢাকা উত্তর সিটি কর্পোরেশনের প্রশাসককে চিঠি দিয়েছে সর্বোচ্চ দরদাতা জায়ান এন্টারপ্রাইজ। এর আগে রাজধানীর গাবতলীর পশুর হাট সর্বোচ্চ দরদাতাকে ইজারা না দিয়ে খাস আদায়ের অভিযোগ উঠে করপোরেশনের প্রশাসক মোহাম্মদ এজাজের বিরুদ্ধে।
জানা গেছে, গাবতলীর পশুর হাটের জন্য সরকারনির্ধারিত দর ছিল ১৪ কোটি ৬১ লাখ ৭৯ হাজার টাকা। সর্বোচ্চ দর পড়েছিল সোয়া ২২ কোটি টাকা, যা নির্ধারিত দরের চেয়ে সাত কোটি টাকার বেশি। সঙ্গে আরও ২৫ শতাংশ মূল্য সংযোজন কর ও আয়কর (ভ্যাট ও আইটি) রাজস্ব খাতে যুক্ত হতো। তবে সর্বোচ্চ দরদাতাকে হাটের ইজারা দেয়নি ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশন (ডিএনসিসি)।
অভিযোগ উঠেছে, গাবতলী হাটের দরপত্র প্রক্রিয়ায় প্রশাসকের পছন্দের ব্যক্তি সর্বোচ্চ দরদাতা হতে পারেননি। তাই তিনি দরপত্র আহ্বানে প্রক্রিয়াগত ভুল দেখিয়ে ইজারার পরিবর্তে খাস আদায়ের সিদ্ধান্ত দিয়েছেন। বাস্তবে খাস আদায়ের নামে ওই হাট থেকে হাসিল আদায় করছেন প্রশাসকের পছন্দের দরদাতা ও তাঁর লোকজন। বিষয়টি জানাজানি হলে সমালোচনার মুখে গত ২২ মে আবারো গাবতলী হাটের পুনঃদরপত্র আহ্বানের অনুমোদন দেন তিনি।
জানা গেছে, প্রতিষ্ঠানটি ২ কোটি ১৭ লাখ ৫৭ হাজার ৭শ টাকা দর দেয়। আর এসএফ কর্পোরেশন দর দিয়েছে ১ কোটি ৪০ লাখ টাকা।
ঢাকা উত্তর সিটি কর্পোরেশনের প্রশাসককে দেয়া চিঠিতে জায়ান এন্টারপ্রাইজের মোহাম্মাদ মনিরুজ্জামান মনির বলেন, গত ১৮ই মে তারিখে পবিত্র ঈদুল আযহা-২০২৫ উপলক্ষে কুরবানির পশুর হাট অস্থায়ী ভিত্তিতে ইজারা নীতিমালা ও পিপিআর -২০০৮ ও সংশোধিত নীতিমালা অনুযায়ী এবং দরপত্র দলিলের সকল শর্তাবলী অনুসরণ করে চাহিত কাগজ পত্রাদিসহ ঢাকা পলিটেকনিক ইনস্টিটিউট সংলগ্ন খেলার মাঠ এ অস্থায়ী ইজারাতে অংশগ্রহণ করি। হাটটি ইজারা নেয়ার জন্য ১১টি প্রতিষ্ঠান দরপত্রে জমা দেয়। এতে আমার প্রতিষ্ঠান জায়ান এন্টারপ্রাইজ ২ কোটি ১৭ লাখ ৫৭ হাজার ৭শ টাকা, বি এম এন্টারপ্রাইজ ১ কোটি ৫১ লাখ টাকা, এস এফ করপোরেশন ১ কোটি ৪০ লাখ টাকা, এম এইচ টি পাওয়ার ইঞ্জিয়ারিং ১ কোটি ৩৬ লাখ টাকা, আইফাজ এন্টারপ্রাইজ ১ কোটি ২৭ লাখ টাকা, পূর্বদেশ এজেন্সি ১ কোটি ২৭ লাখ টাকা, আবু তাহের এন্ড কোং ১ কোটি ১১ লাখ টাকা, চায়না বাংলা ট্রেড লিংক ১ কোটি টাকা, আতিকুর রহমান ৯৩ লাখ টাকা, মেসার্স রাইয়ান এন্টারপ্রাইজ ৭৬ লাখ ৬৪ হাজার টাকা এবং শেফালী ট্রেডার্স ৭০ লাখ টাকা দর দেয়।
দরপত্র উন্মুক্তকরণ সভায় সবার উপস্থিতিতে এটা জানানো হয়। ইজারা নিতে আগ্রহী প্রতিষ্ঠানগুলোর দর অনুযায়ী এবং দরপত্রের শর্তাবলী অনুসারে ইজারা নীতিমালা ও পিপিআর অনুসরণপূর্বক দরপত্রের জামানতের ভিত্তিতে আমিই সর্বোচ্চ দরদাতা। কিন্তু এই বিষয়টি এড়িয়ে নিয়ম নীতি অনুসরণ না করে এবং কোনোরূপ ত্রুটি বিচ্যুতি না থাকার পরও আমাকে কার্যাদেশ না দিয়ে ৩য় সর্বোচ্চ দরদাতা এস এফ করপোরেশন কে কার্যাদেশ দেয়ার জন্য সুপারিশ করা হয়েছে বলে আমি জানতে পেরেছি। যা অনৈতিক, বেআইনি ও বৈষম্যমূলক।
চিঠিতে বলা হয়, আমাকে না দিয়ে ৩য় দরদাতাকে কুরবানির হাট ইজারা দেয়া হলে এতে রাষ্ট্রের রাজস্ব ক্ষতি হবে প্রায় ৬৭ লক্ষ টাকা। এছাড়া আরও উল্লেখ্য যে প্রতিষ্ঠানকে কার্যাদেশ প্রদানের চেষ্টা করা হচ্ছে সেই প্রতিষ্ঠান চলতি বছরের ১৯ মার্চ গাবতলি পশুরহাটের বাৎসরিক ইজারা দেয়ার দরপত্রেও অংশ নেয়। সেই দরপত্রে এই প্রতিষ্ঠানের প্রোপ্রাইটর শেখ ফরিদ হোসেন এর দাখিলকৃত জামানত ৮ কোটি ৫০ লাখ টাকার পে অর্ডার: ৫৯৩১৫০৫,তারিখ : ১৮/০৩/২০২৫ ভুয়া প্রমাণিত হয়েছে (যা ঢাকা সিটি কর্পোরেশন থেকে যাচাই করা হয়েছে এবং অগ্রণী ব্যাংক আগ্রাবাদ কর্পোরেট শাখা কর্তৃক প্রেরিত পত্র মোতাবেক)। ফলে এই অনৈতিক ও অসদুপায় অবলম্বনের জন্য এস এফ কর্পোরেশন যেখানে কালো তালিকাভুক্ত কিংবা আইনের আওতায় প্রতারণা ও শাস্তির পাওয়ার অপরাধ করেছে সেখানে এই দরপত্রে তাকে বিধিবহির্ভূতভাবে কার্যাদেশ দেয়ার জন্য সুপারিশ করা হয়েছে।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে জায়ান এন্টারপ্রাইজের মোহাম্মাদ মনিরুজ্জামান মনির বলেন, তারা বলছে আমার ট্রেড লাইসেন্স আপডেট না। এটা মিথ্যা আমার লাইসেন্স আপডেট আছে। না থাকলে কোনো দরপত্র জমা দেয়াই যায় না। আমরা সোমবার আদালতে যাবো। প্রশাসক আমাদের জানিয়েছেন তিনি এ বিষয়ে কিছুই জানেন না।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে কর্পোরেশনের প্রশাসক মোহাম্মদ এজাজ বলেন, আমি এ বিষয়ে কিছুই জানি না। এটা আজকে আমার নলেজে এসেছে। এটার কমিটিতে যারা আছে তাদেরকে বলেছি বিষয়টি ইনভেস্টিগেট করে আমাকে জানানোর জন্য। কমিটিতে যারা আছে তাদের সাথে কথা বলার পরামর্শ দেন তিনি। তিনি বলেন, আমি এটা জানতাম না, এটা আমার নলেজে নাই।
এ বিষয়ে কথা বলার জন্য কর্পোরেশনের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা অতিরিক্ত সচিব কামরুজ্জামানকে একাধিকবার ফোন করা হলেও তিনি সাড়া দেননি।