ইশরাক হোসেনকে ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশন-ডিএসসিসির মেয়রের দায়িত্ব বুঝিয়ে দেওয়ার দাবিতে আন্দোলনের মধ্যে স্থানীয় সরকার উপদেষ্টা আসিফ মাহমুদ সজীব ভূইয়াকে নগর ভবনে ‘অবাঞ্ছিত’ ঘোষণা করা হয়েছে। ‘ঢাকার সাধারণ ভোটার’ ব্যানারে গতকাল শনিবার নগর ভবনের সামনে তৃতীয় দিনের মত অবস্থান ও সচিবালয় অভিমুখে যাত্রা কর্মসূচি পালন করে কয়েকশ’ মানুষ।
সকালে নগর ভবনের সামনে জড়ো হন তারা। বেলা ১১টার দিকে নগর ভবন থেকে খ- খ- মিছিল গোলাপশাহ মাজার, জিপিও হয়ে পল্টনের দিকে এগোতে থাকে। জিপিও মোড় থেকে সচিবালয়ের দিকে প্রবেশের পথে পুলিশ ব্যারিকেড দেওয়ায় বিক্ষোভকারীরা পল্টন হয়ে প্রেস ক্লাবের সামনে আসেন। সেখানে কিছুক্ষণ অবস্থানের পর বিক্ষোভকারীরা আবার নগরে ভবনের সামনে গিয়ে অবস্থান নেন।
বিক্ষোভকারীরা স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয় এবং যুব ও ক্রীড়া মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা আসিফ মাহমুদ সজীব ভূঁইয়ার পদত্যাগ চেয়ে নানা স্লোগান দেন। বিক্ষোভে অংশ নেওয়া শাহবাগ এলাকার খলিল শাহীন নামে একজন বলেন, ইশরাকের শপথ নিয়ে সরকার টালাবাহানা করছে, বিএনপির নেতারা যেন ভালো কোনো অবস্থানে যেতে না পারে।
ধানমন্ডির শাহাদাত হোসেন সৈকত বলেন, ইশরাক হোসেন জনতার মেয়র। স্বৈরাচার সরকারের আমলে জনগণের রায় কেড়ে নিয়ে আরেকজনকে মেয়র পদে বসানো হয়েছিল। এখন আদালত রায় দিয়েছে উনাকে মেয়র স্বীকৃতি দিয়ে। কিন্তু সরকার শপথ নেয়ার ব্যবস্থা করছে না।
দুপুর ১টা পর্যন্ত নগর ভবনের সামনে অবস্থান করেন ইশরাকের সমর্থকরা। নগর ভবনের প্রধান ফটকে দেওয়া বক্তব্যে সাবেক সিনিয়র সচিব মশিউর রহমান উপদেষ্টা আসিফ মাহমুদকে নগর ভবনে অবাঞ্ছিত ঘোষণা করেন। তনি বলেন, আসিফ মাহমুদকে নগর ভবনে অবাঞ্ছিত ঘোষণা করা হল। তাকে যেখানেই পাওয়া যাবে সেখানেই প্রতিহত করা হবে।
ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের প্রধান কার্যালয়ের ১৪ ও ১৫ তলায় স্থানীয় সরকার বিভাগের অফিস। সচিবালয়ে অগ্নিকা-ের পর স্থানীয় সরকার বিভাগের কার্যক্রম সেখানে নিয়ে যাওয়া হয়েছে। উপদেষ্টা সেখানেই বসেন। তবে গত বুধবার থেকে তিনি নগর ভবনে আসছেন না।
স্থানীয় সরকার বিভাগের জনসংযোগ কর্মকর্তা মো. সালাহ উদ্দিন গতকাল শনিবার বলেন, স্যার ক্রীড়া মন্ত্রণালয়েরও উপদেষ্টা। সে কারণে জাতীয় ক্রীড়া পরিষদ ভবনের ওনার অফিস আছে। আপাতত সেখানে বসছেন তিনি।
নগর ভবন প্রায় অচল
গতকাল শনিবার সকাল থেকে নগর ভবনের সামনে অবস্থান নেন ইশরাক সমর্থকেরা। এতে নগর ভবনের সামনের সড়কে যান চলাচল বন্ধ হয়ে যায়। এ সময় নগর ভবনের প্রধান ফটক বন্ধ করে দেওয়া হয়। তবে ছোট গেট দিয়ে ভেতরে যাওয়া যাচ্ছিল। এ সময় বিক্ষুব্ধরা নগর ভবনের বিভিন্ন কার্যালয়ে তালা ঝুলিয়ে দেন। এতে কর্মকর্তা-কর্মচারীরা অফিসে আসতে পারেননি। বিক্ষোভকারীদের কয়েকজন বলেন, তাঁরা নগর ভবনে মোট ৬৫টি তালা লাগিয়েছেন।
শপথ দিতে স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ে ইশরাকের আবেদন
ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের মেয়র হিসেবে শপথ পাঠ করানোর জন্য স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রণালয়ে আবেদন করেছেন বিএনপি মনোনীত প্রার্থী ইশরাক হোসেন। গতকাল শনিবার এই আবেদন করেন তিনি। এতে গত ২৭ মার্চের রায় ও নির্বাচন কমিশন থেকে প্রকাশিত গেজেট যুক্ত করা হয়।
আবেদনে বলা হয়, আমি ইশরাক হোসেন ২০২০ সালের ১ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের নির্বাচনে বিএনপি থেকে মনোনীত প্রার্থী হিসেবে মেয়র পদে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করি। তফসিল ঘোষণার পর থেকে নির্বাচনের দিন পর্যন্ত আওয়ামী লীগের প্রার্থী ফজলে নূর তাপস নানা রকম অনিয়ম করে ভোটারবিহীন কেন্দ্রে ইভিএম মেশিন দখলে নিয়ে ভোট সম্পন্ন করে। তৎকালীন নির্বাচন কমিশন ও রিটার্নিং অফিসারের যোগসাজশে নৌকা প্রতীকের প্রার্থী ফজলে নূর তাপসকে বিজয়ী ঘোষণা করা হয় এবং বিগত ২০২০ সালের ৪ ফেব্রুয়ারি গেজেট প্রকাশ করা হয়।
গেজেট প্রকাশিত হওয়ার পর নির্বাচনী ট্রাইব্যুনাল গঠিত হলে আমি স্থানীয় সরকার নির্বাচন বিধিমালায় বর্ণিত সময়ের মধ্যে ওই নির্বাচনী ট্রাইব্যুনালে নৌকা প্রতীকের প্রার্থী ফজলে নূর তাপসকে মেয়র হিসেবে বিজয়ী ঘোষণা করার গেজেট বাতিল ও আমাকে নির্বাচিত মেয়র হিসেবে ঘোষণা করার প্রার্থনা করে দায়ের করি। ট্রাইব্যুনাল শুনানি নিয়ে গত ২৭ মার্চ রায় ঘোষণা করেন এবং রায়ে ফজলে নূর তাপসকে মেয়র হিসেবে বিজয়ী ঘোষণা করার গেজেট বাতিল করেন এবং আমাকে নির্বাচিত মেয়র হিসেবে ঘোষণা করেন। অতঃপর নির্বাচন কমিশনকে রায়ের অনুলিপি প্রাপ্তির ১০ কর্মদিবসের মধ্যে গেজেট প্রকাশের নির্দেশ দেন। নির্বাচন কমিশন ওই রায় পাওয়ার পর গত ২৭ এপ্রিল আমাকে নির্বাচিত মেয়র হিসেবে গেজেট প্রকাশ করেন।
স্থানীয় সরকার (সিটি করপোরেশন) আইনে উল্লেখ আছে যে, মেয়র বা কাউন্সিলরদের নাম সরকারি গেজেটে প্রকাশিত হওয়ার ৩০ দিনের মধ্যে সরকার বা মনোনীত কর্তৃপক্ষ মেয়র ও সব কাউন্সিলরকে শপথ গ্রহণ বা ঘোষণা দেওয়ার ব্যবস্থা করবেন। এতে স্পষ্ট যে এই ধারা অনুযায়ী নির্বাচিত মেয়রকে গেজেট প্রকাশ হওয়ার ৩০ দিনের মধ্যে শপথ পাঠ করানোর আইনি বাধ্যবাধকতা রয়েছে। কিন্তু এটা পরিলক্ষিত হচ্ছে যে, গেজেট প্রকাশের পর দীর্ঘদিন অতিবাহিত হলেও আমাকে ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশন মেয়র হিসেবে শপথ পাঠ করানোর কোনো ব্যবস্থাই এখন পর্যন্ত গ্রহণ করা হয়নি।
এমতাবস্থায়, বাংলাদেশ নির্বাচন কমিশন থেকে প্রকাশিত গেজেট এবং স্থানীয় সরকার আইনে বর্ণিত বাধ্যবাধকতার আলোকে আমাকে অনতিবিলম্বে ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের মেয়র হিসেবে শপথ পাঠ করানোর প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করার জোর দাবি জানাচ্ছি।
ইশরাককে মেয়র পদে শপথ না পড়াতে রিটের শুনানি হতে পারে আজ
বিএনপি নেতা ইঞ্জিনিয়ার ইশরাক হোসেনকে ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের মেয়র হিসেবে শপথ না পড়ানোর নির্দেশনা চেয়ে উচ্চ আদালতে দায়ের করা রিট আবেদনের ওপর শুনানি হতে পারে আজ রোববার। রিটকারীর আইনজীবী জানান, এ সংক্রান্ত বিষয়ে আজ রোববার শুনানির জন্য (কজলিস্টে) কার্যতালিকায় রিটটি নিচের দিকে থাকলে সেটি শুনানির জন্য এগিয়ে আনতে হাইকোর্টে উপস্থাপন করবো।