৬ জেলার সীমান্ত দিয়ে ১০৫ জনকে ঠেলে পাঠাল বিএসএফ
বুধবার ভোর থেকে বৃহস্পতিবার সকাল এই কয়েক ঘণ্টার মধ্যে দেশের ছয় জেলার বিভিন্ন সীমান্ত দিয়ে নারী, শিশুসহ অন্তত ১০৫ জনকে পুশ ইন করেছে ভারতীয় সীমান্তরক্ষী বাহিনী (বিএসএফ)। বুধবার রাত থেকে বৃহস্পতিবার পর্যন্ত কুমিল্লা, পঞ্চগড়, লালমনিরহাট, মৌলভীবাজার, খাগড়াছড়ি ও ফেনী জেলায় এসব ঘটনা ঘটে। পরে এই ব্যক্তিদের তাৎক্ষণিকভাবে আটক করেছে বিজিবি। বিজিবি জানিয়েছে, পুশইন করা ব্যক্তিদের মধ্যে অধিকাংশই নারী ও শিশু। আর প্রাপ্তবয়স্ক ব্যক্তিদের অধিকাংশই আগে থেকেই ভারতে অবস্থান করে বিভিন্ন কাজ করছিলেন। তাদের প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদ শেষে আইনগত প্রক্রিয়া চলছে। আমাদের লালমণিরহাট, পঞ্চগড়,কুমিল্লা, ফেনী, কুলাউড়া সংবাদদাতারা এ তথ্য জানান ।
পঞ্চগড় সদর উপজেলার জয়ধরভাঙ্গা সীমান্ত দিয়ে গতকাল ভোরে নারী, শিশুসহ ২১ জনকে ঠেলে পাঠায় বিএসএফ। তাদের মধ্যে ১৪ জন শিশু-কিশোর, ৬ জন নারী ও ১ জন তরুণ।
বেলা পৌনে ১১টার দিকে নীলফামারী ৫৬ বিজিবি ব্যাটালিয়নের অধিনায়ক লেফটেন্যান্ট কর্নেল শেখ বদরুদ্দোজা বিষয়টি নিশ্চিত করেন। আটক ব্যক্তিদের প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদের বরাতে তিনি জানান, বুধবার বিকেলে ভারতের গুজরাট এলাকা থেকে ওই ২১ জনকে আটক করে দেশটির পুলিশ। দীর্ঘদিন ধরেই তারা ভারতে ছিলেন এবং প্রাপ্তবয়স্করা সেখানে বিভিন্ন কাজ করতেন। প্রথমে তাদের বিমানে ও পরে বাসে করে সীমান্ত এলাকায় নিয়ে বিএসএফের হাতে তুলে দেওয়া হয়। বিএসএফের সদস্যরা তাদের সীমান্তে নিয়ে বাংলাদেশের দিকে ঠেলে পাঠান।
লালমনিরহাটের পাটগ্রাম উপজেলার গাটিয়ারভিটা সীমান্ত দিয়ে বুধবার গভীর রাতে ভারত থেকে ২০ জনকে ঠেলে পাঠানো হয়। তাদের মধ্যে ১১ জন নারী, ৭টি শিশু ও ২ জন পুরুষ। বিষয়টি নিশ্চিত করে পাটগ্রাম থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মিজানুর রহমান বলেন, আটক ব্যক্তিরা জানিয়েছেন, তারা ২০ থেকে ২৫ দিন ভারতের জেলে বন্দী ছিলেন। পরে পুলিশ তাদের সীমান্তে এনে এ পাশে ঠেলে দেয়।
মৌলভীবাজারের বৃহস্পতিবার ভোরে কুলাউড়ার মুরইছড়া সীমান্ত দিয়ে ৭ জনকে ঠেলে পাঠায় বিএসএফ। তাদের মধ্যে ২ জন পুরুষ, ২ জন নারী ও ৩টি শিশু। পরে আজ সকালে উপজেলার তুতবাড়ি বাজার এলাকা থেকে তাদের আটক করে বিজিবি। মুরইছড়া ক্যাম্প কমান্ডার আবু তাহের বলেন, ভোরে প্রচ- বৃষ্টির মধ্যে ওই ৭ জনকে ঠেলে পাঠায় বিএসএফ। ভারতে ইটভাটায় শ্রমিক হিসেবে কাজ করতেন তারা। প্রাথমিক যাচাইয়ের পর তাদের পুলিশের কাছে হস্তান্তর করা হবে।
ফেনীর ফুলগাজীসহ বিভিন্ন সীমান্ত দিয়ে গতকাল মধ্যরাতের পর থেকে বৃহস্পতিবার ভোর পর্যন্ত ৩৯ জনকে বাংলাদেশে ঠেলে পাঠিয়েছে বিএসএফ। ফেনী সীমান্তের দায়িত্বরত বিজিবি ৪ ফেনী ব্যাটালিয়ন ও বিজিবি ১০ কুমিল্লা ব্যাটালিয়ন তাদের আটক করে। বৃহস্পতিবার ভোরে ছাগলনাইয়া উপজেলার যশপুর ও ফুলগাজী উপজেলার খেজুরিয়া বিওপির দায়িত্বপূর্ণ সীমান্ত দিয়ে ৬টি পরিবারের ২৪ জনকে বাংলাদেশে ঠেলে পাঠায় বিএসএফ। স্থানীয় লোকজনের মাধ্যমে সংবাদ পেয়ে বিজিবি ও পুলিশ গিয়ে তাদের আটক করে। এ ছাড়া ফুলগাজী সীমান্তে আরও ১৩ জনকে আটক করা হয়েছে।
ফুলগাজী থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মোহাম্মদ লুৎফর রহমান বলেন, সীমান্তে আটক ২৭ জনকে বিজিবি থানায় হস্তান্তর করেছে। আপাতত তারা পুলিশ হেফাজতে রয়েছেন। বিষয়টি ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে জানানো হয়েছে। ছাগলনাইয়া থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) নজরুল ইসলাম বলেন, ছাগলনাইয়া সীমান্তে বিজিবির হাতে আটক ১২ জনকে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার মাধ্যমে ছাগলনাইয়া থানায় হস্তান্তর করা হয়েছে। আটক ১২ জন ভারতের হরিয়ানা রাজ্যের বাসিন্দা। বর্তমানে তারা ছাগলনাইয়া থানার তত্ত্বাবধানে রয়েছেন। তাদের খাবারের ব্যবস্থা করা হচ্ছে। পরবর্তী কার্যক্রমের বিষয়ে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষ সিদ্ধান্ত জানাবে।
কুমিল্লার সীমান্ত দিয়ে ১৩ জনকে ঠেলে পাঠিয়েছে বিএসএফ। বৃহস্পতিবার ভোর ৪টার দিকে কুমিল্লা আদর্শ সদর উপজেলার গোলাবাড়ী সীমান্ত এলাকা থেকে নারী, পুরুষ, শিশুসহ ওই ১৩ জনকে আটক করে বিজিবি। বিজিবির কুমিল্লা ব্যাটালিয়নের (১০ বিজিবি) অধিনায়ক লেফটেন্যান্ট কর্নেল মীর আলী এজাজ এই তথ্য নিশ্চিত করেন। এদিন ভোর ৪টার দিকে কুমিল্লা আদর্শ সদর উপজেলার গোলাবাড়ী সীমান্ত এলাকা দিয়ে অবৈধভাবে বিএসএফ নারী-শিশুসহ ১৩ জনকে ঠেলে পাঠায়। বাংলাদেশে অনুপ্রবেশের সময় ৬০ বিজিবির একটি টহল দল তাদের আটক করে। তাদের মধ্যে পুরুষ ৩ জন, ৩ জন নারী ও ৭টি শিশু। প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে তারা জানান, বিএসএফ তাদের ঠেলে পাঠিয়েছে।
বিজিবির কুমিল্লা ব্যাটালিয়নের (১০ বিজিবি) অধিনায়ক লেফটেন্যান্ট কর্নেল মীর আলী এজাজ আজ দুপুরে সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে জানান, কুমিল্লা ও ফেনী জেলার সীমান্ত এলাকা দিয়ে রাতের আঁধারে সর্বমোট ৫২ জনকে পুশ ইন করা হয়েছে। তাদের মধ্যে ১৯ জন পুরুষ, ১৫ জন নারী এবং শিশু ও কিশোর ১৮ জন। অবৈধভাবে বাংলাদেশে অনুপ্রবেশের সময় ওই ৫২ জনকে আটক করা হয়েছে। প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে জানা যায়, তাদের বিএসএফ কর্তৃক বাংলাদেশে পুশ ইন করা হয়েছে। তাদের পরিচয় নিশ্চিত করার কার্যক্রম চলমান। যাচাই-বাছাইয়ের কাজ শেষে তাদের সংশ্লিষ্ট জেলা প্রশাসনের কাছে হস্তান্তর করা হবে।
খাগড়াছড়ির রামগড় সীমান্ত দিয়ে শিশুসহ পাঁচজনকে ঠেলে পাঠিয়েছে বিএসএফ। বৃহস্পতিবার ভোরের দিকে তাদের আটক করে বিজিবি। প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে আটক ব্যক্তিরা জানান, তারা ভারতের হরিয়ানার একটি ইটভাটায় শ্রমিক হিসেবে কাজ করতেন। ভারতের ত্রিপুরা রাজ্যের সাব্রুম সীমান্তের ফেনী নদীতে গভীর রাতে হাত-পা বেঁধে ফেলে দেওয়া হয় তাদের। ভোরবেলা তারা বাংলাদেশ সীমান্তে প্রবেশ করেন। এ বিষয়ে রামগড় উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (দায়িত্বপ্রাপ্ত) ইসমত জাহান বলেন, পাঁচজনকে সাময়িকভাবে রামগড় সরকারি উচ্চবিদ্যালয়ের একটি কক্ষে রাখা হয়েছে। মানবিক দিক বিবেচনা করে তাদের উপজেলা প্রশাসন থেকে খাবার দেওয়া হচ্ছে। বিষয়টি নিয়ে বিজিবি, উপজেলা প্রশাসন ও রামগড় থানা সমন্বিতভাবে কাজ করছে। তদন্ত শেষে বিস্তারিত জানানো হবে। এর আগে ৭ মে খাগড়াছড়ির মাটিরাঙ্গা উপজেলার শান্তিপুর দিয়ে ২৭ জন, তাইন্দং দিয়ে ১৫ জন ও পানছড়ি উপজেলার লোগাং সীমান্ত দিয়ে ৩০ জনকে বাংলাদেশ সীমান্তে ঠেলে দেয় ভারতীয় সীমান্তরক্ষী বাহিনী (বিএসএফ)।