ভারতের পানি আগ্রাসনের হুমকি দেশ ও জাতির অস্তিত্বের জন্য হুমকি বলে উল্লেখ করেছেন বর্ডার গার্ড বাংলাদেশের (বিজিবি) সাবেক মহাপরিচালক মেজর জেনারেল (অব.) আ ল ম ফজলুর রহমান।

গতকাল সোমবার বেলা ১১টায় বিশ্ববিদ্যালয়ের সামাজিক বিজ্ঞান অনুষদ ভবনের মোজাফফর আহমেদ চৌধুরী অডিটোরিয়ামে দ্য জুলাই রেভ্যুলেশন অ্যান্ড বিয়ন্ড: রিথিংকিং সিকিউরিটি, সাসটেইনেবলিটি অ্যান্ড পিস ইন সাউথ এশিয়া শীর্ষক সেমিনারে মূল বক্তা হিসেবে বক্তব্য প্রদানকালে তিনি এই কথা বলেন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের চেয়ারপারসন অধ্যাপক নাছিমা খাতুনের সভাপতিত্বে ও ঢাবি’র রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক মো. শরীফুল ইসলামের সঞ্চালনায় সেমিনারে আরও বক্তব্য দেন বাংলাদেশ উন্মুক্ত বিশ্ববিদ্যালয়ের উপ-উপাচার্য অধ্যাপক দিল রওশন জিন্নাত আরা নাজনীন, পটুয়াখালী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে সাবেক উপাচার্য অধ্যাপক আবদুল লতিফ মাসুম, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সামাজিক বিজ্ঞান অনুষদের ডিন অধ্যাপক তৈয়েবুর রহমান, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের চেয়ারম্যান মেজবা-উল-আযম সওদাগর, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক ফরিদ উদ্দিন আহমেদ, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের সহকারী অধ্যাপক শাহনেওয়াজ খান চন্দন প্রমুখ। এ সময় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক স ম আলী রেজা উপস্থিত ছিলেন। সেমিনারে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়সহ বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীরা উপস্থিত ছিলেন।

এসময় তিনি বলেন, ভারত-বাংলাদেশের অভিন্ন নদীতে সাড়ে চার হাজার বাঁধ নির্মাণ করেছে ভারত। আমি নিশ্চিত ভারত আমাদের পানি দেবে না। নিতে গেলে যুদ্ধ করতে হবে। জাতিকে যদি মাথা উঁচু করে বাঁচতে হয়, পানিকে আশীর্বাদে রুপান্তর করতে হবে। বাংলাদেশ হিমালয়ের ড্রেনেজ সিস্টেমের অংশ। পানি বাংলাদেশের ওপর দিয়ে যায় এবং এসব পানি পলি মাটি আনে তাই এর সদ্ব্যবহার করতে হবে উল্লেখ করে তিনি আরো বলেন, বন্যা আমাদের জন্য আশীর্বাদ হতে পারে। তবে এখন এটা আমাদের জন্য ধ্বংসের বিষয়। পরিকল্পনা করে এগোলে আমরা শুধু বন্যার হাত থেকে বাঁচবো না, ভবিষ্যতে উন্নত দেশ হয়ে উঠবো।

‘ইমারত মডেল’ নামের একটি ধারণা প্রসঙ্গে তিনি জানান, নিচু অঞ্চলে বহুতল ভবন নির্মাণ করা যেতে পারে। নিচতলা ফাঁকা রেখে ওপরে বসবাস করতে হবে। বন্যার পানি ব্যবহার করতে হবে। আবাদি জমিতে মাছের ঘেরের মতো করে বন্যার পানি আটকে রাখতে হবে। এটাও বিনিয়োগ। বন্যার পানি দিয়ে মাছ চাষ হবে। এছাড়াও পানি ধরে রেখে সেচের পানি হিসেবেও ব্যবহার করা যায়। আমরা ফ্লাড-ট্যুরিজম করতে পারি। যতই ব্যয়বহুল হোক, যদি আমরা সারা দেশকে কানেক্ট করে ফেলতে পারি, তাহলে বাংলাদেশকে আমরা আয়বর্ধক দেশ হিসেবে গড়ে তুলতে পারব।

সেমিনারের সম্মানিত অতিথি বাংলাদেশ উন্মুক্ত বিশ্ববিদ্যালয়ের উপ-উপাচার্য অধ্যাপক দিল রওশন জিন্নাত আরা নাজনীন বলেন, ভারত ভাবে ওরা আমাদের দেশ স্বাধীন করেছে। তারপর দেশটা আমাদের গিফট করেছে। এগুলো শুনলে মাথায় রক্ত উঠে যায়। আমরা যুদ্ধ করে দেশ স্বাধীন করেছি। জুলাই-আগস্টে ছাত্ররাসহ আমরা রাস্তায় নামি। ছাত্রদের ভূমিকার জন্য ওদের ধন্যবাদ দেই। তাদের জন্যই আমরা এখন সবার বিরুদ্ধে কথা বলতে পারি।

পটুয়াখালী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে সাবেক ভিসি প্রফেসর ড. আবদুল লতিফ মাসুম বলেন, আমরা আমাদের প্রতিবেশি পরিবর্তন করতে পারি না। তবে বাংলাদেশের মানুষ একাই একশো। আমরা যুদ্ধ করতে জানি। আমরা স্বাধীনতা ছিনিয়ে এনেছি এবং তা রক্ষা করতেও জানি। এই জাতির মনস্তত্ত্ব এমন অবস্থায় পৌছেছে যে আমরা সাহসী জাতি থেকে গোলামির জাতিতে পরিণত হচ্ছিলাম। তবে জুলাইয়ে আমরা প্রমাণ করেছি আমরা সাহসী।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সামাজিক বিজ্ঞান অনুষদের ডিন প্রফেসর তৈয়েবুর রহমান বলেন, ভারত-পাকিস্তানের যুদ্ধের মাঝখানে বাংলাদেশের জন্ম হয়েছে। এই বয়ান পুরোপুরি ভুল। আমাদের এত মানুষের সাক্রিফাইস কি জলে যাবে? আমরা তাদের এই বয়ানকে মানি না। জুলাই অভ্যুত্থানের মাধ্যমে বাংলাদেশ নতুন যাত্রা শুরু করেছে।

জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের চেয়ারম্যান মেজবা-উল-আযম সওদাগর বলেন, কোনো রাষ্ট্র আন্তর্জাতিক আইন অনুযায়ী পানির প্রবাহ বন্ধ করতে পারে না। তবে সম্প্রতি ভারত পাকিস্তানের সাথে এটা করেছে এবং বাংলাদেশের সাথে ঐতিহাসিকভাবে করে আসছে। বাংলাদেশ এতকাল ভেবে এসেছে পানি চুক্তি করতে হবে। তবে মেজর জেনারেল ফজলুর রহমান বিকল্প সমাধান প্রস্তাব করেছেন। ফারাক্কা চুক্তির প্রসঙ্গ তুলে তিনি বলেন, ফারাক্কা চুক্তি শুভঙ্করের ফাঁকি। নদীর পানি ৪০০টি ক্যানেলের মাধ্যমে প্রত্যাহার করে নেয় ভারত। অবশিষ্ট পানির ওপর চুক্তি করা হয়েছে। পানি আগ্রাসনকে অ্যাডাপটেশনের মাধ্যমে মোকাবিলা করতে হবে।

এর আগে শুরুতে স্বাগত বক্তব্য রাখেন এবং সেমিনারটি সঞ্চালনা করেন সেমিনারটির আহবায়ক ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের প্রফেসর মো. শরীফুল ইসলাম। তিনি বলেন, আমি আমার টিচিং ক্যারিয়ারে অনুভব করেছি অ্যাকাডেমিয়ার সাথে বাস্তবের সম্পর্ক দরকার। মেজর জেনারেল ফজলুর রহমানের আইডিয়া তাত্ত্বিক কাঠামোতে রুপান্তরের সুযোগ রয়েছে।