দাবি-দাওয়া নিয়ে প্রায় প্রতিদিনই রাজধানীর গুরুত্বপূর্ণ স্থানে একাধিক ব্যক্তি বা সংগঠন আন্দোলন-বিক্ষোভ করছে। এতে যানচলাচল ব্যাহত হচ্ছে। তীব্র যানজটে স্থবির হয়ে পড়েছে রাজধানী। মানুষের দুর্ভোগের সীমা পৌঁছে চরমে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের (ঢাবি) শিক্ষার্থী ও ছাত্রদল নেতা শাহরিয়ার আলম সাম্য হত্যার বিচার দাবিতে কদিন ধরেই বিক্ষোভ করছে ছাত্রদল।
গতকাল বৃহস্পতিবার সকাল থেকে বৃষ্টি উপেক্ষা করেই শাহবাগ থেকে হোটেল ইন্টারকন্টিনেন্টাল পর্যন্ত সড়ক অবরোধ করে তারা। ফলে ওই এলাকায় সড়কে যান চলাচল বন্ধ হয়ে গেছে।
এদিকে ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের (ডিএসসিসি) মেয়র হিসেবে ইশরাক হোসেনের শপথের দাবিতে মৎস ভবন মোড় বুধবার থেকে টানা অবরোধ করে রেখেছিলেন তার অনুসারীরা। আজ হাইকোর্টের রায়ের পর এই ইস্যু থেকে সরে দাঁড়ায় বিক্ষোভকারীরা। তবে উপদেষ্টা আসিফ মাহমুদ সজীব ভূঁইয়া ও মাহফুজ আলমের পদত্যাগের দাবিতে আবারও মৎস্য ভবন মোড় থেকে যমুনা অবরোধ করেছেন তারা। পরবর্তীতে বিকেলে অবরোধ স্থগিত করায় যানচলাচল স্বাভাবিক হয়।
এর আগে গুরুত্বপূর্ণ পয়েন্ট বন্ধ থাকায় স্থবির হয়ে পড়ে ঢাকা শহর। সায়েন্স ল্যাব, পান্থপথ, বাংলামটর, কাওরান বাজার, ফার্মগেট, বিজয় সরণির দিকে শত শত যানবাহন সড়কে আটকে পড়ে। শাহবাগ থেকে হোটেল ইন্টারকন্টিনেন্টাল পর্যন্ত বন্ধ থাকায় পাশেপাশের অলিগলিও স্থবির হয়ে পড়ে।
সরেজমিন দেখা গেছে, প্রেসক্লাব থেকে শাহবামুখী এবং শাহবাগ থেকে পল্টন-গুলিস্তানমুখী সম্পূর্ণ সড়কে বন্ধ ছিল যান চলাচল। গণপরিবহনের চালকরা যানবাহন বন্ধ করে বসে থাকে। অধিকাংশ গাড়ি থেকে যাত্রীরা নেমে পায়ে হেঁটে গন্তব্যের উদ্দেশে যাত্রা করেন।
পরিবহন শ্রমিকরা বলছেন, প্রতিদিন এমন সড়ক অবরোধের কারণে আমরা বড় ধরনের ক্ষতির মুখে পড়ছি। কাজে আসলেও দিন শেষে খালি হাতে ফিরতে হচ্ছে। ফলে গাড়ির মালিককে খরচের টাকা দিতেই হিমসিম খেতে হচ্ছে।
শাহবাগ থেকে মোহাম্মদপুরের দিকে রওনা করা জিয়াউর রহমান নামে এক ব্যক্তি বলেন, গাড়ি চলছে না সকাল থেকেই। হাঁটা ছাড়া উপায় নেই। হেঁটেই যাচ্ছি, দেখি কতদূর যাওয়া যায়।
বাংলামটরে আটকা পড়া আরেক যাত্রী তানিয়া বেগম বলেন, ঢাকা মেডিক্যাল হাসপাতালে যাবো। রিকশা নিয়েছিলাম উঠার পরই নেমে গেলাম। গলিতে ঢুকেই রিকশা আর সামনে যাচ্ছে না। এভাবে একটা দেশে চলা যায় না। আমরা কী ঘর থেকে বের হবো না?
যানজটে আটকে আছেন সিএনজি অটোরিকশা চালক আক্তার হোসেন। তিনি বলেন, সকাল থেকে মাত্র একটা ভাড়া পেয়েছি। তারপর থেকেই যানজটে আটকে আছি। সারা দিন যদি এভাবে আটকা থাকতে হয় তাহলে মালিককে গাড়ির টাকা দেবো কেমন করে? আর নিজের পরিবারের খরচ তুলবো কেমন করে?
এ প্রসঙ্গে রমনা জোনের ট্রাফিক সার্জেন্ট নাফিস আহমেদ বলেন, অবরোধের কারণে সকাল থেকে সাতটি পয়েন্ট বন্ধ। কোনও দিকে গাড়ি যাচ্ছে না। আমাদের কোনও উপায় নেই। অবরোধ ছেড়ে রাস্তা থেকে সরে না দাঁড়ালে যানজট কমবে না। দিক না পেয়ে বড় বড় যানবাহন অলিগলিতে ঢুকে গেছে। ফলে যানজট আরও বেড়েছে।
ঢাকায় মাত্র আধাঘণ্টার টানা বৃষ্টিতে সৃষ্টি হয়েছে জলাবদ্ধতা। একইসঙ্গে বিএনপি ও ছাত্রদলের কর্মসূচির কারণে শহরের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ সড়কে দেখা দিয়েছে ভয়াবহ যানজট। এতে চরম ভোগান্তিতে পড়েছেন সাধারণ মানুষ।
বিএনপি নেতা ইশরাক হোসেনকে ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের মেয়র হিসেবে দ্রুত শপথ গ্রহণের দাবিতে সকাল ১০টা থেকে তার সমর্থকরা নগর ভবন, হাইকোর্ট মোড়, মৎস্য ভবন ও কাকরাইল মোড়ে অবস্থান কর্মসূচি পালন করেন। একারণে এসব এলাকায় যান চলাচল প্রায় অচল হয়ে পড়ে।
অন্যদিকে, জাতীয়তাবাদী ছাত্রদলও একই সময় শাহবাগ মোড় ও হোটেল ইন্টারকন্টিনেন্টালের সামনে অবস্থান নেয়। সংগঠনটি অভিযোগ করেছে, তাদের নেতা সাম্যর হত্যার বিচারে বিলম্ব ঘটায় তারা এই কর্মসূচি দিয়েছে। ফলে ওইসব এলাকায়ও যানজট ভয়াবহ রূপ নেয়।
একই সময়ে রাজধানীতে শুরু হয় বৃষ্টি। ধানমন্ডি, নিউমার্কেট, সায়েন্সল্যাব ও বাটা সিগন্যালসহ বিভিন্ন এলাকায় হাঁটু সমান পানি জমে যায়। স্থানীয় ও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম সূত্রে জানা যায়, জলাবদ্ধতার কারণে বিপণিবিতানগুলোতেও পানি ঢুকে গেছে। সড়কে যান চলাচল প্রায় বন্ধ হয়ে গেছে। বাটা সিগন্যাল এলাকায় বাসগুলো যাত্রী নামিয়ে দিয়ে চলাচল বন্ধ করে দেয়।
এক বাসচালক বলেন, ‘উত্তরা থেকে গুলিস্তান যাওয়ার কথা ছিল, কিন্তু একই জায়গায় এক ঘণ্টা ধরে দাঁড়িয়ে আছি। এই অবস্থায় সারাদিনেও পৌঁছাতে পারব কি না সন্দেহ।’একজন ব্যবসায়ী জানান, জরুরি কাজে মতিঝিল যেতে চেয়েছিলেন মোটরসাইকেলে করে, কিন্তু আধাঘণ্টা ধরে মৎস্য ভবনের সামনে দাঁড়িয়ে আছেন। জানা গেছে, রাজধানীর মগবাজার, কারওয়ানবাজার, পান্থপথ, এয়ারপোর্ট রোড, খিলগাঁও, মালিবাগ, রামপুরা, হাতিরঝিল, মহাখালীসহ আরও অনেক এলাকায় যানজট ছড়িয়ে পড়েছে।