সিপিডিসহ কয়েকটি প্রতিষ্ঠানের যৌথ উদ্যোগে আয়োজিত গোলটেবিল বৈঠকে বিশিষ্টজনরা বলেছেন, বাংলাদেশের জ্বালানি খাতে ক্রমবর্ধমান আমদানি নির্ভরতা এবং বৈশ্বিক অস্থিরতা দেশের অর্থনীতি ও টেকসই উন্নয়নের জন্য বড় ধরনের ঝুঁকি তৈরি করছে। তারা বলেছেন, দেশের জ্বালানি খাতকে পরিকল্পিতভাবে লুণ্ঠনের ক্ষেত্র বানানো হয়েছে। ‘নীতি, আইন এবং বাজার ব্যবস্থার দুর্বলতার কারণে এই খাতে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা ভেঙে পড়েছে, যার ফলে অযৌক্তিক ব্যয়, ঘাটতি এবং মূল্যবৃদ্ধির চাপ সরাসরি ভোক্তাদের ওপর পড়ছে।
গতকাল বৃহস্পতিবার সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগ (সিপিডি), ড্যানিশ দূতাবাস এবং দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ডের যৌথ উদ্যোগে আয়োজিত এক গোলটেবিল আলোচনায় এসব কথা বলেন তারা। ‘বাংলাদেশের জন্য জ্বালানি সার্বভৌমত্ব: টেকসই ও স্থিতিস্থাপক ভবিষ্যৎ নিশ্চিতকরণ’ শীর্ষক এ আলোচনায় দেশের জ্বালানি খাতের বর্তমান পরিস্থিতি, ঝুঁকি এবং ভবিষ্যৎ করণীয় বিষয়ে বিস্তারিত বিশ্লেষণ তুলে ধরা হয়।
বাংলাদেশের জ্বালানি খাতে ক্রমবর্ধমান আমদানি নির্ভরতা এবং বৈশ্বিক অস্থিরতা দেশের অর্থনীতি ও টেকসই উন্নয়নের জন্য বড় ধরনের ঝুঁকি তৈরি করছে। এমন মন্তব্য করেছেন ড. ফাহমিদা খাতুন, নির্বাহী পরিচালক, সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগ (সিপিডি)।
ড. খাতুন উল্লেখ করেন, গত কয়েক দশকে দ্রুত অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি, শিল্পায়ন, নগরায়ন এবং রফতানি খাতের সম্প্রসারণের ফলে দেশে জ্বালানির চাহিদা ব্যাপকভাবে বেড়েছে। বিশেষ করে তৈরি পোশাক শিল্প, পরিবহন, গৃহস্থালি ও শিল্প উৎপাদনে জ্বালানির ব্যবহার উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে। তবে এই বাড়তি চাহিদার বিপরীতে জ্বালানি সরবরাহ ব্যবস্থার কাঠামোগত দুর্বলতা এখনও কাটিয়ে ওঠা যায়নি, যা দীর্ঘমেয়াদে ঝুঁকি তৈরি করছে।
বাংলাদেশের বিদ্যুৎ উৎপাদনের বড় অংশ এখনও গ্যাসনির্ভর। যদিও আগে দেশীয় গ্যাসের ওপর নির্ভরতা ছিল, বর্তমানে সেই মজুদ দ্রুত হ্রাস পাচ্ছে। ফলে তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি) আমদানির ওপর নির্ভরতা বেড়েছে। এই আমদানি নির্ভরতা বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ, বাজেট এবং সামগ্রিক অর্থনীতির ওপর বাড়তি চাপ সৃষ্টি করছে।
নির্বাহী পরিচালক বলেন, জ্বালানির দাম বৃদ্ধি শুধু শিল্প খাতকেই নয়, সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রাকেও প্রভাবিত করে। পরিবহন খরচ, খাদ্যপণ্যের দাম এবং উৎপাদন ব্যয় সবকিছুই এর সঙ্গে যুক্ত। ফলে দীর্ঘমেয়াদে জ্বালানি খাতে স্থিতিশীলতা না থাকলে সামগ্রিক অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতাও ঝুঁকির মধ্যে পড়ে যায়। সংকটকালীন পরিস্থিতি থেকে শিক্ষা নেওয়া হলেও অনেক ক্ষেত্রে তা নীতিগতভাবে যথাযথভাবে বাস্তবায়িত হয় না। ফলে একই ধরনের সমস্যা বারবার ফিরে আসে। এই অবস্থা থেকে বেরিয়ে আসতে হলে জ্বালানিকে শুধু অর্থনৈতিক খাত হিসেবে নয়, বরং কৌশলগত খাত হিসেবে বিবেচনা করতে হবে।
নবায়নযোগ্য জ্বালানি প্রসঙ্গে তিনি বলেন, বাংলাদেশে নবায়নযোগ্য জ্বালানির অংশ এখনও খুবই সীমিত, যা মোট জ্বালানি ব্যবহারের মাত্র ৫ দশমিক ৩ শতাংশের মতো।জমির সীমাবদ্ধতা, গ্রিড অবকাঠামোর দুর্বলতা, বিনিয়োগ ঘাটতি এবং নীতিগত অনিশ্চয়তা এ খাতের বড় বাধা হিসেবে কাজ করছে। অথচ দীর্ঘমেয়াদে জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হলে নবায়নযোগ্য জ্বালানির দিকে অগ্রসর হওয়া ছাড়া বিকল্প নেই। বাংলাদেশ সংবাদ
ড. ফাহমিদা খাতুন আরো বলেন, জ্বালানি সার্বভৌমত্ব অর্জনের জন্য তিনটি মূল দিক অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। প্রথমত, রাজনৈতিকভাবে আমদানি নির্ভরতার ঝুঁকি স্বীকার করে একটি দীর্ঘমেয়াদি কৌশল গ্রহণ করা। দ্বিতীয়ত, অর্থনৈতিকভাবে দেশীয় সক্ষমতা বৃদ্ধি করে বৈদেশিক মুদ্রার ওপর চাপ কমানো। তৃতীয়ত, পরিবেশবান্ধব ও টেকসই জ্বালানি ব্যবস্থার দিকে ধীরে ধীরে রূপান্তর নিশ্চিত করা। জ্বালানি সার্বভৌমত্ব অর্জন করা মানে হলো দেশের নিজস্ব সক্ষমতা বাড়িয়ে জ্বালানি সরবরাহ ও চাহিদার ওপর আংশিক হলেও নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করা, যাতে বৈশ্বিক সংকটের প্রভাব কমিয়ে আনা যায়।
বাংলাদেশ পোশাক প্রস্তুতকারক ও রফতানিকারক সমিতির (বিজিএমইএ) পরিচালক রুমানা রশীদ বলেছেন, গ্যাস ও বিদ্যুৎ সংকটের কারণে দেশের পোশাক শিল্প খাতে উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে। জ্বালানির অনিয়মিত সরবরাহ ও ঘাটতির কারণে শিল্প প্রতিষ্ঠানগুলো পূর্ণ সক্ষমতায় উৎপাদন চালাতে পারছে না, যা রফতানি খাতের প্রতিযোগিতার ওপর সরাসরি প্রভাব ফেলছে।
রুমানা রশীদ বলেন, দেশের গার্মেন্ট খাত অর্থনীতির অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ খাত হলেও বর্তমানে এটি জ্বালানি সংকটের কারণে চাপে রয়েছে। তার ভাষায়, পর্যাপ্ত গ্যাস সরবরাহ না থাকা এবং বিদ্যুৎ সরবরাহে অনিশ্চয়তার কারণে অনেক কারখানাকে বাধ্য হয়ে বিকল্প উৎসের দিকে যেতে হচ্ছে। বিশেষ করে নবায়নযোগ্য জ্বালানি, যেমন সোলার সিস্টেম নিয়ে ভাবতে হচ্ছে, যাতে উৎপাদন ধারাবাহিক রাখা যায়।
নবায়নযোগ্য জ্বালানির প্রসঙ্গে রুমানা জানান, পোশাক খাত ইতোমধ্যে কার্বন নির্গমন কমানোর জন্য বিভিন্ন উদ্যোগ নিয়েছে। বিজিএমইএ বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংস্থার সঙ্গে ডিকার্বনাইজেশন কার্যক্রমে কাজ করছে। পাশাপাশি অনেক কারখানায় এনার্জি অডিট করা হচ্ছে, যেখানে ব্র্যাক, বিআইজিডি এবং ড্যানিডার মতো সংস্থাগুলো সহযোগিতা করছে। প্রায় ৫০০ কারখানায় এ ধরনের অডিট চলমান রয়েছে।
রফতানি বাজারে দেশের অবস্থান ধরে রাখতে হলে জ্বালানি স্থিতিশীলতার পাশাপাশি পরিবেশবান্ধব উৎপাদন ব্যবস্থার দিকে এগোতে হবে বলেও তিনি মন্তব্য করেন। বিশেষ করে ইউরোপীয় ও অন্যান্য উন্নত বাজারে টেকসই উৎপাদন এখন একটি গুরুত্বপূর্ণ শর্ত হয়ে দাঁড়িয়েছে। পোশাক খাত শুধু রফতানির জন্য নয়, দেশের অর্থনীতির বড় অংশ জুড়ে রয়েছে। তাই এই খাতকে টিকিয়ে রাখতে হলে সরকার ও নীতিনির্ধারকদের সমন্বিত উদ্যোগ প্রয়োজন। তার মতে, জ্বালানি খাতে স্থিতিশীলতা না থাকলে বিনিয়োগ, উৎপাদন এবং রপ্তানি তিনটি ক্ষেত্রেই নেতিবাচক প্রভাব পড়বে।
দেশের জ্বালানি খাতকে পরিকল্পিতভাবে লুণ্ঠনের ক্ষেত্র বানানো হয়েছে বলে অভিযোগ করেছেন কনজ্যুমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (ক্যাব)-এর জ্বালানি উপদেষ্টা অধ্যাপক ড. এম শামসুল আলম। তিনি বলেন, ‘নীতি, আইন এবং বাজার ব্যবস্থার দুর্বলতার কারণে এই খাতে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা ভেঙে পড়েছে, যার ফলে অযৌক্তিক ব্যয়, ঘাটতি এবং মূল্যবৃদ্ধির চাপ সরাসরি ভোক্তাদের ওপর পড়ছে।
শামসুল আলম বলেন, ‘জ্বালানি খাতে রিনিউয়েবল এনার্জির অংশগ্রহণ নিয়ে যে তথ্য দেওয়া হয়, তা বাস্তবতার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়।’ তার ভাষায়, কিলোওয়াট-আওয়ার ভিত্তিতে হিসাব করলে নবায়নযোগ্য জ্বালানির অবদান এক শতাংশেরও কম। অথচ নীতিগত লক্ষ্য ছিল ২০২১ সালের মধ্যে ১০ শতাংশ অর্জন করা, যা এখনো পূরণ হয়নি। তিনি প্রশ্ন তোলেন, এই সম্ভাবনা থাকা সত্ত্বেও কেন আমরা তা কাজে লাগাতে পারিনি?
তিনি আরো বলেন, ‘২০০৮ সালে নবায়নযোগ্য জ্বালানি নীতি গ্রহণের সময় যে লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছিল, তা ছিল বাস্তবায়নের দিক থেকে অনেক দূরবর্তী। ২০২৬ সালে এসেও কাক্ষিত অগ্রগতি না হওয়ার বিষয়টি নীতিগত ব্যর্থতার স্পষ্ট উদাহরণ। পরিকল্পনা থাকলেও বাস্তবায়নে ধারাবাহিকতা ও রাজনৈতিক অঙ্গীকারের অভাব ছিল।’
অধ্যাপক শামসুল আলম দ্রুত বিদ্যুৎ ও জ্বালানি সরবরাহ আইন নিয়ে তীব্র সমালোচনা করেন। সংকট মোকাবিলার অজুহাতে প্রতিযোগিতা ছাড়াই বেসরকারি খাতে সুযোগ দেওয়া হয়েছে, যা শেষ পর্যন্ত খাতে অস্বচ্ছতা ও অতিরিক্ত ব্যয় বাড়িয়েছে। এই আইন প্রথমে দুই বছরের জন্য আনা হয়েছিল, পরে বারবার মেয়াদ বাড়ানো হয়েছে। কিন্তু সমস্যার সমাধান হয়নি, বরং তা আরো বেড়েছে। এই নীতিগত কাঠামোর কারণে জ্বালানি খাতে ঘাটতি ও ভর্তুকির পরিমাণ বৃদ্ধি পেয়েছে, যা শেষ পর্যন্ত মূল্যস্ফীতি বাড়াতে ভূমিকা রেখেছে।
তিনি আরো বলেন, সরকার এখন বিদ্যুৎ ও জ্বালানির মূল্য সমন্বয়ের দিকে যাচ্ছে আন্তর্জাতিক আর্থিক সংস্থাগুলোর চাপের কারণে, বিশেষ করে আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) কিস্তি ছাড়ের শর্ত পূরণের অংশ হিসেবে। বিশ্বব্যাংক ও আইএমএফ দীর্ঘদিন ধরেই জ্বালানি খাতকে বাণিজ্যিক খাতে রূপান্তরের দিকে ঠেলে দিচ্ছে, যা ভর্তুকি কমিয়ে মূল্য বাড়ানোর প্রবণতা তৈরি করছে। এতে করে সাধারণ মানুষের ওপর সরাসরি চাপ বাড়ছে এবং জ্বালানি একটি সেবা খাত থেকে ব্যবসায়িক খাতে পরিণত হয়েছে।
নবায়নযোগ্য জ্বালানি প্রসঙ্গে তিনি বলেন, বাংলাদেশে এই খাতের বিপুল সম্ভাবনা থাকলেও তা কাজে লাগানো যায়নি। বিশেষ করে জমি সংকট, নীতিগত অনিশ্চয়তা এবং বিনিয়োগ কাঠামোর দুর্বলতা এই অগ্রগতিকে বাধাগ্রস্ত করছে। প্রতিবেশী দেশগুলো তুলনামূলকভাবে কম দামে নবায়নযোগ্য বিদ্যুৎ উৎপাদন করতে পারলেও বাংলাদেশে তা অনেক বেশি খরচে হচ্ছে। সোলার বা রিনিউয়েবল প্রকল্পে প্রকৃত উৎপাদন খরচ অনেক কম হলেও নীতিগত কাঠামোর কারণে বাজারমূল্য কয়েকগুণ বেশি রাখা হচ্ছে। এতে করে সাধারণ ভোক্তা ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে এবং রাষ্ট্রীয় ভর্তুকির চাপ বাড়ছে।
অধ্যাপক শামসুল আলম জ্বালানি খাতের কাঠামোগত সংস্কারের ওপর জোর দিয়ে বলেন, এই খাতে যদি লুন্ঠনের সুযোগ বন্ধ না করা যায়, তাহলে জ্বালানি নিরাপত্তা বা সার্বভৌমত্ব কোনোভাবেই নিশ্চিত করা সম্ভব নয়। তার মতে, আগে অযৌক্তিক ব্যয় ও দুর্নীতি চিহ্নিত করে তা বন্ধ করতে হবে, এরপরই মূল্য নির্ধারণ বা নীতি সমন্বয়ের প্রশ্ন আসতে পারে। জ্বালানি খাতকে সত্যিকার অর্থে জনগণের সেবামূলক খাত হিসেবে প্রতিষ্ঠা করতে হলে স্বচ্ছতা, জবাবদিহিতা এবং ন্যায্য প্রতিযোগিতা নিশ্চিত করতে হবে। একই সঙ্গে জ্বালানি খাতে দায়ী ব্যক্তিদের বিচার এবং কাঠামোগত সংস্কার নিশ্চিত করতে হবে।