জাতীয় সংসদের চিফ হুইপ নূরুল ইসলাম মণি বলেছেন, জুলাই সনদের অঙ্গীকার অনুযায়ী রাষ্ট্রীয় সংস্কার এবং জনগণের ম্যান্ডেট বাস্তবায়নে সংবিধান সংশোধন করা ছাড়া বর্তমান সরকারের সামনে আর কোনো পথ খোলা নেই। এই নির্বাচনে যারা জনগণের ম্যান্ডেট পেয়েছে, তাদের মূল লক্ষ্যই হলো জুলাই সনদের প্রতিটি লাইন, সেমিকলন ও দাঁড়ি-কমা হুবহু বাস্তবায়ন করা।

গতকাল সোমবার জাতীয় সংসদ ভবনের এলডি হলে সাংবাদিকদের সাথে মতবিনিময়ের সময় প্রধান অতিথির বক্তব্যে চিফ হুইপ এ কথা বলেন। মতবিনিময় সভায় অন্য চার হুইপ রুহুল কুদ্দুস তালুকদার দুলু, জি কে গউস, নূরুদ্দিন অপু ও আখতারুজ্জামান উপস্থিত ছিলেন।

চিফ হুইপ দেশের সাধারণ মানুষের অর্থনৈতিক ও সামাজিক নিরাপত্তার ওপর গুরুত্বারোপ করে বলেন, প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান এর মূল দর্শন হলো দেশের প্রতিটি মানুষের মুখে খাবার তুলে দেওয়া এবং কামার, কুমার, তাঁতী, স্বর্ণকারসহ সব শ্রেণি-পেশার মানুষের কর্মসংস্থান নিশ্চিত করা।

তিনি প্রশ্ন রেখে বলেন, যদি আপনার ভাই কাজ না পায় এবং প্রতিবেশী না খেয়ে থাকে, তবে সেই রাষ্ট্রের সার্থকতা কোথায়? মানুষের জীবনের প্রথম মৌলিক চাহিদা হলো অন্ন। এই চাহিদা পূরণের জন্যই দেশে গণতন্ত্রের সুবাতাস থাকা প্রয়োজন। গণতান্ত্রিক পরিবেশ থাকলে এবং সামাজিকভাবে স্থিতিশীলতা বজায় থাকলে মানুষ অর্থনৈতিকভাবে স্বাবলম্বী হওয়ার সুযোগ পায়। যদি দেশে গণতান্ত্রিক পরিবেশ না থাকে, তবে সাধারণ রিকশাচালক থেকে শুরু করে বড় ব্যবসায়ী কারো জীবনেরই নিরাপত্তা নিশ্চিত হবে না।

রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট তুলে ধরে নূরুল ইসলাম মণি বলেন, স্বাধীনতার পর একটি বিশেষ শাসনামলে এ দেশের মানুষের ওপর চরম অত্যাচার চালানো হয়েছিল। সেই সময় বিচার বিভাগের কোনো স্বাধীনতা ছিল না এবং সংবাদপত্রের কণ্ঠরোধ করে মাত্র চারটি পত্রিকা চালু রাখা হয়েছিল। বাকশালের সেই অন্ধকার সময়ে মানুষের কথা বলার অধিকার কেড়ে নেওয়া হয়েছিল। সেই ধ্বংসস্তূপ থেকে শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান বহুদলীয় গণতন্ত্র ফিরিয়ে এনেছিলেন এবং দুর্ভিক্ষপীড়িত একটি জাতিকে তিন বছরের মাথায় খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণ করেছিলেন। পরবর্তীতে বেগম খালেদা জিয়াও ধ্বংসপ্রায় অর্থনীতি ও গণতন্ত্রকে সোজা করার কাজ করেছেন। কিন্তু বিগত দেড় দশকের শাসনামলে দেশের গণতন্ত্র ও অর্থনীতিকে আবারও চূর্ণ-বিচূর্ণ করে দেওয়া হয়েছে। ২৭ লক্ষ কোটি টাকা দেশ থেকে পাচার হওয়ার ফলে অর্থনীতি এখন এক ভঙ্গুর অবস্থার মুখে দাঁড়িয়েছে।

জুলাই সনদ ও সংবিধান সংশোধন প্রসঙ্গে তিনি বলেন, বর্তমানে সংসদ সংবিধানের ১১৫ নম্বর অনুচ্ছেদ ও ১৫৩টি আর্টিকেলের ভিত্তিতেই পরিচালিত হচ্ছে। এমনকি অন্তর্বর্তীকালীন সরকার ও নির্বাচন কমিশনও এই সংবিধানের ভিত্তিতেই শপথ নিয়েছে। কিন্তু জনগণের আশা-আকাক্সার প্রতিফলন ঘটাতে এই সংবিধান সংশোধন করার বিকল্প নেই।

তিনি বলেন, আমাদের নেতা তারেক রহমান জুলাই সনদের প্রতিটি শর্ত মেনে চলার বিষয়ে দৃঢ়প্রতিজ্ঞ। সংসদে বর্তমানে ২২০ জন নতুন সদস্য রয়েছেন যাদের সংসদীয় রীতি-নীতি সম্পর্কে শিখতে আরও কয়েকটা অধিবেশন সময় লাগবে। তবে বিরোধীদের মধ্যেও অনেক চৌকস ও শিক্ষিত সদস্য আছেন। তাদের গঠনমূলক অংশগ্রহণ এবং জুলাই সনদের আলোকে কমিশন ও সংসদীয় কমিটির মাধ্যমে আমরা রাষ্ট্রীয় সংস্কারের কাজ এগিয়ে নেব।

চিফ হুইপ বর্তমান সরকারের কর্মতৎপরতা তুলে ধরে বলেন, মাত্র দুই মাস ১২ দিন বয়সে সরকার প্রতিটি সেক্টরে পরিবর্তনের ছোঁয়া দিয়েছে। ১০ হাজার শিক্ষক নিয়োগ, কৃষি কার্ড ও ফ্যামিলি কার্ডের মতো যুগান্তকারী পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে। মাত্র ৫ দিনে ১৩৩টি অর্ডিন্যান্সের ওপর কাজ করা একটি অসম্ভব কাজ ছিল, যা এই সরকার করে দেখিয়েছে। সরকার প্রধান সকাল ৯টা থেকে রাত ১২টা পর্যন্ত একটানা কাজ করে রাষ্ট্রকে একটি কাঠামোর ওপর দাঁড় করানোর চেষ্টা চলছে।

সাংবাদিকদের জীবনমান উন্নয়নে দশম ওয়েজ বোর্ড হওয়া দরকার: হুইপ রুহুল কুদ্দুস

সাংবাদিকদের জীবনমান উন্নয়নের ওপর বিশেষ গুরুত্বারোপ করে জাতীয় সংসদের হুইপ এডভোকেট রুহুল কুদ্দুস তালুকদার দুলু বলেছেন, সাংবাদিকদের কল্যাণে এবং জীবনযাত্রার মান বৃদ্ধিতে দ্রুত দশম ওয়েজ বোর্ড গঠন করা প্রয়োজন। বর্তমানে নবম ওয়েজ বোর্ড চলমান থাকলেও মালিক পক্ষের মামলার কারণে এটি এখনো পুরোপুরি বাস্তবায়িত হতে পারছে না। সাংবাদিকরা ভালো থাকলে দেশ ও গণতন্ত্র ভালো থাকবে বলেও জানান তিনি।

জাতীয় সংসদ এলডি হলে সাংবাদিকদের সাথে মতবিনিময়ে এ কথা বলেন তিনি।

রুহুল কুদ্দুস তালুকদার দুলু বলেন, গণমাধ্যমকে ইতিপূর্বেই শিল্প হিসেবে ঘোষণা করে সরকারি গেজেট প্রকাশ করা হয়েছে, কিন্তু বাস্তবে এটি এখনও পূর্ণাঙ্গ শিল্পের মর্যাদা পায়নি। শিল্পের যথাযথ মর্যাদা না পাওয়ার কারণে অনেক গণমাধ্যমে কর্মরত সাংবাদিকরা নিয়মিত বেতন-ভাতা পাচ্ছেন না, যা অত্যন্ত দুঃখজনক।

তিনি জানান, সরকারি কর্মকর্তারা যেভাবে নিয়মিত বেতন ও সুযোগ-সুবিধা পান, সাংবাদিকদের জন্যও সেই মানের বেতন কাঠামো এবং সরকারি সুযোগ-সুবিধার ব্যবস্থা করা উচিত।

হুইপ বলেন, আমি সবসময় সাংবাদিকদের আপন মানুষ হিসেবে বিবেচনা করি। কোনো সাংবাদিক শেষ জীবনে অর্থকষ্টে বা বিনাচিকিৎসায় মানবেতর জীবন যাপন করে মৃত্যুবরণ করুক এটা আমরা চাই না। এ সময় তিনি পেশাদার সাংবাদিকতার দীর্ঘ ঐতিহ্যের কথা স্মরণ করেন এবং নবীন সাংবাদিকদের অভিজ্ঞ অগ্রজদের অনুসরণ করে সংসদীয় গণতন্ত্রকে আরও প্রাণবন্ত করতে অগ্রণী ভূমিকা পালনের আহ্বান জানান।

তিনি বলেন, সাম্প্রতিক সময়ে দেশে একটি সুষ্ঠু ও সহিংসতামুক্ত নির্বাচনের পরিবেশ তৈরি হয়েছে, যা মাইলফলক হয়ে থাকবে। গণতন্ত্রের এই ধারা অব্যাহত রাখতে সাংবাদিকদের জোরালো ভূমিকা রাখতে হবে। এছাড়া সাংবাদিকদের কার্যালয় সংক্রান্ত যে সমস্যাগুলো রয়েছে, তা সমাধানে যথাযথ ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলেও তিনি আশ্বস্ত করেন।