নুরুল আমিন মিন্টু, চট্টগ্রাম ব্যুরো : চট্টগ্রামের প্রাণকেন্দ্র লালদীঘি মাঠ-যেখানে ইতিহাস, ঐতিহ্য আর লোকজ সংস্কৃতি মিলেমিশে তৈরি করেছে এক অনন্য আবহ। প্রতি বছর বাংলা নববর্ষকে ঘিরে এখানে বসে জমজমাট বৈশাখী মেলা, আর তার কেন্দ্রবিন্দুতে থাকে শতবর্ষী এক ক্রীড়া-ঐতিহ্য-জব্বারের বলীখেলা। এবারের ১১৭তম আসরেও সেই ঐতিহ্যের ধারাবাহিকতা বজায় রেখে চ্যাম্পিয়নের মুকুট উঠেছে কুমিল্লার বাঘা শরীফের মাথায়। টানা চতুর্থবার শিরোপা জিতে তিনি যেন এই মঞ্চে নিজের আধিপত্য আরও পোক্ত করলেন।
টানা চতুর্থ শিরোপা: এক বলীর উত্থানের গল্প : শনিবার বিকেলে লালদীঘি মাঠে হাজারো দর্শকের উপস্থিতিতে অনুষ্ঠিত ফাইনালে বাঘা শরীফ মুখোমুখি হন শক্তিশালী প্রতিদ্বন্দ্বী রাশেদ বলীর। দুজনই ছিলেন অভিজ্ঞ, কৌশলী এবং শক্তিমত্তায় ভরপুর। ফলে শুরু থেকেই লড়াই জমে ওঠে। দর্শকরা দম আটকে তাকিয়ে থাকেন প্রতিটি মুহূর্তে।
প্রায় ২৪ মিনিট ২৬ সেকেন্ড ধরে চলা হাড্ডাহাড্ডি লড়াই শেষে রাশেদকে পরাস্ত করে বিজয়ের হাসি হাসেন বাঘা শরীফ। এই জয় শুধু একটি ম্যাচ জেতা নয়-এটি ছিল ধারাবাহিকতা, অভিজ্ঞতা এবং মানসিক দৃঢ়তার এক অনন্য উদাহরণ। কারণ এর আগের তিন আসরেও তিনিই ছিলেন অপরাজিত চ্যাম্পিয়ন। বাঘা শরীফের এই সাফল্য তাকে শুধু একজন বলী নয়, বরং এই ঐতিহ্যবাহী খেলাটির এক প্রতীকী চরিত্রে পরিণত করেছে। কুমিল্লার হোমনা উপজেলার প্রত্যন্ত গ্রাম থেকে উঠে এসে দেশের অন্যতম বড় এই প্রতিযোগিতায় টানা চারবার চ্যাম্পিয়ন হওয়া নিঃসন্দেহে এক বিরল অর্জন।
ফাইনালের পথে উত্তেজনাপূর্ণ লড়াই : এবারের আসরে দেশের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে অংশ নেন ১০৮ জন বলী। প্রতিটি ম্যাচেই ছিল প্রতিদ্বন্দ্বিতার ছাপ। প্রথম সেমিফাইনালে মিঠু ও রাশেদের লড়াইয়ে শেষ পর্যন্ত জয় পান রাশেদ। অন্যদিকে দ্বিতীয় সেমিফাইনালে বাঘা শরীফ ও শাহ জালালের মধ্যে সমঝোতার ভিত্তিতে শরীফকে বিজয়ী ঘোষণা করা হয়। এর ফলে টানা তৃতীয়বারের মতো ফাইনালে মুখোমুখি হন বাঘা শরীফ ও রাশেদ-যা এই প্রতিদ্বন্দ্বিতাকে নতুন মাত্রা দেয়। দর্শকদের আগ্রহও ছিল তুঙ্গে, কারণ আগের দুই আসরের মতো এবারও কে জিতবেন, তা নিয়ে ছিল নানা জল্পনা।
শেষ পর্যন্ত অভিজ্ঞতার পাল্লা ভারী করে আবারও শিরোপা ঘরে তোলেন শরীফ। অন্যদিকে তৃতীয় স্থান নির্ধারণী ম্যাচে জয় পান মিঠু।
শতবর্ষী ঐতিহ্যের ধারক এই বলীখেলা : প্রায় এক শতাব্দীরও বেশি সময় ধরে চট্টগ্রামের মানুষের জীবনে গুরুত্বপূর্ণ স্থান দখল করে আছে জব্বারের বলীখেলা। ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলনের সময় শারীরিক সক্ষমতা বাড়ানোর উদ্দেশ্যে এই খেলার সূচনা হয়েছিল বলে জানা যায়। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে এটি শুধু একটি ক্রীড়া প্রতিযোগিতা নয়, বরং একটি সাংস্কৃতিক উৎসবে পরিণত হয়েছে। প্রতি বছর বাংলা নববর্ষ উপলক্ষে এই আয়োজন চট্টগ্রামের মানুষের মধ্যে এক ধরনের আবেগ ও ঐতিহ্যের অনুভূতি জাগিয়ে তোলে। নতুন প্রজন্মও এই খেলাকে ঘিরে আগ্রহী হয়ে উঠছে, যা এর ভবিষ্যৎ টিকিয়ে রাখার জন্য গুরুত্বপূর্ণ।
বৈশাখী মেলায় উৎসবের আমেজ : বলীখেলাকে কেন্দ্র করে লালদীঘি মাঠ সংলগ্ন এলাকায় বসা বৈশাখী মেলাও ছিল সমান আকর্ষণের কেন্দ্রবিন্দু। দুই দিনব্যাপী এই মেলায় দূর-দূরান্ত থেকে আসা ব্যবসায়ীরা তাদের পসরা সাজান। শত শত দোকানে পাওয়া যায় নানা ধরনের পণ্য-গ্রামীণ জীবনের ঐতিহ্যবাহী সামগ্রী থেকে শুরু করে আধুনিক খেলনা পর্যন্ত। ফুলের ঝাড়ু, হাতপাখা, মাটির ব্যাংক, ফুলদানি, কলস, চায়ের কাপ, শাড়ি, চুড়ি, গহনা, গাছের চারা, মৌসুমি ফল-কী নেই সেখানে! এছাড়া লোহা, বাঁশ ও বেতের তৈরি বিভিন্ন জিনিসপত্র, কৃষি উপকরণ, মাছ ধরার জাল, শিশুদের খেলনা-সবকিছু মিলিয়ে মেলাটি হয়ে ওঠে এক বর্ণিল আয়োজন। বিশেষ করে শিশুদের জন্য টমটম গাড়ি ও বিভিন্ন খেলনার স্টলগুলো ছিল সবচেয়ে আকর্ষণীয়। বিক্রেতারা জানান, প্রতি বছরই এই মেলায় ভালো বিক্রি হয়, আর শেষ দিনে সেই বিক্রি আরও বাড়ে।
কারিগরদের ব্যস্ততা ও জীবিকার গল্প : মেলার একটি বড় আকর্ষণ ছিল মাটির তৈরি সামগ্রী। কারিগররা শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত রঙ তুলতে ব্যস্ত ছিলেন। মাটির ব্যাংক, কলস, টব, জগ বা চায়ের কাপ-এসব পণ্যের প্রতি মানুষের আগ্রহ এখনও কমেনি।অনেকেই ঘর সাজানোর জন্য এসব কিনছেন, আবার কেউ ব্যবহারিক প্রয়োজনেও নিচ্ছেন। এই মেলা শুধু বিনোদনের নয়, বরং গ্রামীণ কারিগরদের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ আয়ের উৎস।
শেষ দিনে বাড়তি ভিড় : শনিবার ছিল মেলার শেষ দিন। মূলত এসএসসি পরীক্ষার্থীদের কথা বিবেচনা করে নির্ধারিত সময়ের একদিন আগেই মেলার সমাপ্তি টানা হয়। রোববার পরীক্ষা থাকায় যাতে শিক্ষার্থীরা কোনো ভোগান্তিতে না পড়ে, সে বিষয়টি মাথায় রেখে এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। ফলে সকাল থেকেই মেলায় ছিল উপচে পড়া ভিড়। অনেকে শেষ মুহূর্তে কেনাকাটা সারতে ছুটে আসেন। কোতোয়ালী মোড়, আন্দরকিল্লা থেকে শুরু করে সিনেমা প্যালেস এলাকা পর্যন্ত পুরো অঞ্চল জুড়ে ছিল মানুষের ঢল।