মাত্র দুই দিনেরও কম সময়ে শেষ হলো ম্যাকাই টেস্ট। অস্ট্রেলিয়ার কাছে ইনিংস ও ৫১ রানে হেরে দুই ম্যাচের টেস্ট সিরিজ ১-১ সমতায় শেষ করল বাংলাদেশ। অথচ বাংলাদেশের সামনে সুযোগ ছিল শেষ টেস্টে আরো ভালো কিছু করার। কিন্ত শেষ টেস্টে চরম হতাশ করেছে টাইগাররা। ডারউইনে ইতিহাস গড়া জয়ের পর ম্যাকাইয়ে যেন একেবারেই উল্টো চিত্র। প্রথম টেস্টে অস্ট্রেলিয়াকে নয় উইকেটে হারিয়ে যে দলটি চমকে দিয়েছিল ক্রিকেটবিশ্বকে, দ্বিতীয় টেস্টে সেই দলই ব্যাট-বলের কোনো বিভাগে প্রতিরোধ গড়তে পারল না। পুরো দুই দিনও খেলতে পারেনি বাংলাদেশ। আবার হেরেছে ইনিংস ব্যবধানেও। মাত্র ২১০ রান করেও ইনিংস ব্যবধানে জিতল অস্ট্রেলিয়া। টেস্ট ইতিহাসে এমন ঘটনা চতুর্থবার। গত ৮০ বছরে ২১০ বা তার কম রান করে ইনিংস ব্যবধানে জেতা প্রথম দলও অজিরা। এর আগে ১৮৮৮ সালে ইংল্যান্ড ১৭২, ১৯৩২ সালে অস্ট্রেলিয়া ১৫৩ এবং ১৯৪৬ সালে ১৯৯ রান করেও ইনিংস ব্যবধানে জিতেছিল। ২১০ বা তার কম রান করে ইনিংস ব্যবধানে জেতার চার ঘটনার তিনটিই অস্ট্রেলিয়ার।

অবশ্য ঘরের মাঠে প্রথম টেস্টে বাংলাদেশের কাছে হেরে শেষ টেস্টে অস্ট্রেলিয়া যে কঠিন আকার ধারন করবে তার ধারনা সবাই ছিল। হয়েছেও তাই। ম্যাকাইয়ে টেস্টে শুরু থেকেই ম্যাচের নিয়ন্ত্রণ ছিল অস্ট্রেলিয়ার হাতে। প্রথম ইনিংসে মিচেল স্টার্কের বিধ্বংসী বোলিংয়ে বাংলাদেশ গুটিয়ে যায় মাত্র ৬৪ রানে। একাই ছয় উইকেট নিয়ে বাংলাদেশের ব্যাটিংয়ের মেরুদণ্ড ভেঙে দেন স্টার্ক। জবাবে শরিফুলের দারুণ বোলিংয়ে অস্ট্রেলিয়াকেও বড় সংগ্রহ করতে দেয়নি বাংলাদেশ। ২১০ রানে অলআউট হয় স্বাগতিকরা, তবে তাতেও ১৪৬ রানের লিড পেয়ে যায় তারা। প্রথম ইনিংসের ব্যর্থতায় বাংলাদেশের জন্য অজিদের লিডটা কিন্তু কম ছিলনা। এই লিড টপকে অস্ট্রেলিয়াকে টার্গেট দিতে হলে দায়িত্বশীল ব্যাটিং করতে হতো বাংলাদেশকে। সেই জায়গাতেই মূলত ব্যর্থ হয়েছে পুরো ব্যাটিং বিভাগ। প্রবল চাপ নিয়ে দ্বিতীয় ইনিংসে ব্যাট করতে নেমে শুরু থেকেই একের পর এক উইকেট হারাতে থাকে সফরকারীরা। সাদমান ইসলাম ও মুমিনুল হককে পরপর দুই বলে ফিরিয়ে ধসের শুরু করেন স্টার্ক। অহেতুক শট খেলতে গিয়ে প্যাট কামিন্সের ফাঁদে পড়েন তানজিদ হাসান। এরপর নাজমুল হোসেন শান্ত ও লিটন দাসও বেশিক্ষণ টিকতে পারেননি। চলতি সিরিজে ব্যাট হাতে পুরোপুরি ব্যর্থ লিটনও ম্যাকাইয়ের দ্বিতীয় ইনিংসে শূন্য রানে ফেরেন। ডারউইনের এক ইনিংসের পর ম্যাকাইয়ের দুই ইনিংসেও ডাক পাওয়ায় অস্ট্রেলিয়া সফরে তিন ইনিংসে তার রান রইল শূন্য। লিটনের বিদায়ের আগে শান্ত কিছুটা লড়াইয়ের চেষ্টা করেছিলেন। মুশফিকুর রহিমের সঙ্গে ৮০ বলের জুটিতে ২৭ রান যোগ করেন বাংলাদেশ অধিনায়ক। কিন্তু ৪৬ বলে ৩১ রান করে স্টার্কের বলে লং অফে ক্যাচ দিয়ে ফিরলে ভেঙে যায় সেই জুটি। শান্তর আউটের আগে মনে হচ্ছিল, বাংলাদেশ হয়তো স্বাগতিকদের কিছুটা হলেও লক্ষ্য দিতে পারবে। কিন্তু বাংলাদেশের অধিনায়কের দায়িত্বহীন শটের খেসারত দিয়েছে বাংলাদেশ। তার বিদায়ের পরপরই হুড়মুড় করে ভেঙে পড়ে বাংলাদেশের ব্যাটিং লাইনআপ। লিটনের বিদায়ের পর মেহেদী হাসান মিরাজ, হাসান মাহমুদ ও তাইজুল ইসলামও ফিরে যান। তাইজুলকে বোল্ড করে টেস্টে চতুর্থবারের মতো এক ম্যাচে ১০ উইকেট পূর্ণ করেন স্টার্ক। প্রথম ইনিংসে ৬ উইকেটের পর দ্বিতীয় ইনিংসে আরও চারটি নিয়ে ম্যাচের সেরা বোলিংয়ের কীর্তি গড়েন তিনি। এক প্রান্তে পড়ে থাকেন মুশফিকুর রহিম। দলের শেষ স্বীকৃত ব্যাটার হিসেবে তাসকিন আহমেদকে নিয়ে যতটা সম্ভব ম্যাচটা টেনে নেওয়ার চেষ্টা করেন তিনি। চা-বিরতিতে যাওয়ার আগে ১৩ রানের জুটিও করেছিলেন দুজন। কিন্তু চা-বিরতি থেকে ফিরে মাত্র ৩ বলের ব্যবধানে তাসকিন ও শরিফুলকে হারিয়ে ৩৮.৩ ওভারে ৯৫ রানে অলআউট হয় বাংলাদেশ। ২৯ রানে অপরাজিত থাকেন মুশফিক। দুই ইনিংস মিলিয়ে বাংলাদেশের সর্বোচ্চ সংগ্রহও তিন অঙ্ক ছুঁতে পারেনি। প্রথম ইনিংসে ৬৪ রানের পর দ্বিতীয় ইনিংসে ৯৫ রান করে অলআউট হয় বাংলাদেশ। বাংলাদেশের বাজে ব্যাটিংয়ে শেষ পর্যন্ত অস্ট্রেলিয়া ইনিংস ও ৫১ রানের ব্যবধানে জয় নিশ্চিত করে।

তবে বড় ব্যবধানে হারের পরও বাংলাদেশের জন্য দারুণ প্রাপ্তির জায়গাও আছে ম্যাকাই টেস্টে। একদিকে দলের ব্যাটিংয়ের চরম ব্যর্থতা, অন্যদিকে শরিফুল ইসলামের ঐতিহাসিক বোলিং। ৪৮ রানে ৭ উইকেট নিয়ে দেশের বাইরে এক ইনিংসে বাংলাদেশের সেরা বোলিং করা পেসার তিনি। অস্ট্রেলিয়ার মাটিতে ৩৩ বছর পর কোনো সফরকারী বোলার হিসেবে সাত উইকেট নেওয়ার কীর্তিও গড়েছেন তিনি। কিন্তু সেই দুর্দান্ত বোলিংয়েও দলের পরাজয় ঠেকানো যায়নি। পাশাপাশি সিরিজের ফলাফলে বাংলাদেশের জন্য ইতিবাচক দিকও কম নয়। ২৩ বছর পর অস্ট্রেলিয়ার মাটিতে টেস্ট খেলতে গিয়ে প্রথম ম্যাচেই নয় উইকেটের ঐতিহাসিক জয় পেয়েছে বাংলাদেশ। দুই ম্যাচের সিরিজ শেষ হয়েছে ১-১ সমতায়। অস্ট্রেলিয়ার মাটিতে সিরিজ ড্র করে ফেরা বাংলাদেশের টেস্ট ইতিহাসে আলাদা জায়গা করে নেবে।

সংক্ষিপ্ত স্কোর:

বাংলাদেশ ১ম ইনিংস: ৬৪

অস্ট্রেলিয়া ১ম ইনিংস: ৫২.৩ ওভারে (আগের দিন ১৬৫/৮) ২১০ (গ্রিন ৬৭, লায়ন ৩২*, হেইজেলউড ৬; তাসকিন ১২-১-৫৮-১, হাসান ১৪-৩-৬৭-০, শরিফুল ১৫-৩-৪৮-৭, তাইজুল ৯.৩-১-১৭-১, মিরাজ ২-১-৪-১)।

বাংলাদেশ ২য় ইনিংস: ৩৮.৩ ওভারে ৯৫ (তানজিদ ৯, সাদমান ১, মুমিনুল ০, শান্ত ৩১, মুশফিক ২৯*, লিটন ০, মিরাজ ১, হাসান ২, তাইজুল ৭, তাসকিন ৮, শরিফুল ০; স্টার্ক ১০-৩-৩৯-৪, হেইজেলউড ৭-১-১৬-০, কামিন্স ১০-৪-১০-৩, লায়ন ১১.৩-৪-২৫-৩)।

ফল: অস্ট্রেলিয়া ইনিংস ও ৫১ রানে জয়ী।