জুলাই, ২০২৪-এর জুলাইয়ের কথা বলছি। দিন আসে, মাস আসে, আসে বছরও। সবই হারিয়ে যায় মহকালের আবর্তে। তবে কোনো কোনো দিন, কোনো কোনো মাস হারিয়ে যায় না, ইতিহাসের পাতায় জ¦লজ¦ল করে জ¦লতে থাকে। তেমনি এক উজ্জ্বল মাস জুলাই। ২০২৪-এর জুলাইয়ে পুরো জাতি এক মোহনায় এসে দাঁড়িয়েছিল। কালান্তরের সেই মোহনায় সবার কণ্ঠে এক আওয়াজ, সবার চোখে একই স্বপ্ন। জাতি যখন এভাবে দৃঢ় অঙ্গীকারে আবদ্ধ হয়, তখন বিজয় হয়ে ওঠে অবশ্যম্ভাবী। বিজয় তো হলো, তবে ট্র্যাজেডি হলো রাজনৈতিক ও সাংগঠনিক দুর্বলতার কারণে ‘বিপ্লব’ ‘গণঅভ্যুত্থানে’ সীমাবদ্ধ হয়ে পড়লো। আর এখন তো গণঅভ্যুত্থানের লক্ষ্য এবং অঙ্গীকার বাস্তবায়নের ক্ষেত্রেও সৃষ্টি করা হচ্ছে কুজ্ঝটিকা। জুলাই বিপ্লবের মোহনায় যারা ঐক্যবদ্ধ ছিলেন, তারা আজ সরকার ও বিরোধী দলে বিভক্ত হয়ে পড়েছেন। জুলাই বিপ্লব, সংস্কার ও গণভোটের ব্যাপারেও তাদের বয়ান আজ একরকম নয়। ফলে এক দ্বান্দ্বিক পরিবেশ লক্ষ্য করা যাচ্ছে সংসদে, যার কিছুটা উত্তাপ ছড়িয়ে পড়েছে রাজপথেও। তবে গণতান্ত্রিক সংস্কৃতির একটা সৌন্দর্য হলো, দ্বন্দ্ব ও বিতর্ক অব্যাহত থাকলেও তা কখনো সীমালংঘন করে না, বরং একটি যৌক্তিক পরিণতি লাভ করে। ফলে বলা চলে, বিএনপি সরকার এবং বিরোধী জোট এক ঐতিহাসিক পরীক্ষার মধ্যে অবস্থান করছে। এই পরীক্ষায় কার ভূমিকা কেমন তা জাতি গভীর দৃষ্টিতে অবলোকন করছে।

জুলাই বিপ্লবে হাসিনার পতন ঘটেছে। ফ্যাসিবাদের শীর্ষে অবস্থান করায় তার এই পতন। এখানে লক্ষ্য কিন্তু ব্যক্তি নয়, বরং ব্যক্তির আদর্শ ‘ফ্যাসিবাদ’। ফ্যাসিবাদের কারণেই কিন্তু শেখ হাসিনাকে দেশ থেকে পালাতে হয়েছে, এই পলায়ন কাহিনীর পর আবার যদি প্রিয় স্বদেশে ফ্যাসিবাদ পত্র-পল্লবে বিকশিত হতে থাকে, তাহলে কি আমরা বলবোÑজুলাই বিপ্লব সফল হয়েছে? কিংবা বলবো, শহীদদের রক্ত বৃথা যায়নি? বরং শহীদদের রক্তের সাথে গাদ্দারি না করলে আমাদের আবার ডাক দিতে হবে গণআন্দোলনের, গণবিপ্লবের। দেশের রাজনীতিবিদরা সময়ের দাবি পূরণে কতটা সফল হন, সেটা এখন দেখার বিষয়। আর সরকার আত্মসমালোচনায় নিজের গতিপথ শুদ্ধ করে নিতে সমর্থ হয় কিনা , সেটি আর একটি দেখার বিষয়। তবে এখানে বলার মত বিষয় হলো, কোন পক্ষই যেন সময় ও সামর্থ্যরে অপচয় না করেন এবং মেলোড্রামায় অবতীর্ণ না হন। কারণ মেলোড্রামায় চমক থাকলেও তাতে বিরক্ত হন দেশের জনগণ। এখানে বলে রাখা ভালো যে, মেলোড্রামার সামর্থ্য কিন্তু সরকারেরই বেশি থাকে।

শেখ হাসিনা মেলোড্রামা কম করেননি, তবে তাতে তার শেষ রক্ষা হয়নি। সরকার ও সরকারি দলের সুযোগ-সুবিধা বেশি। তারা সংবিধানের চর্চা বেশি করে থাকেন, আইন-আদালতও তাদের বেশ সমীহ করেন। সরকারি ঘরানার ব্যাখ্যার প্রতাপ বেশি। এসব বুঝতে গিয়ে সাধারণ মানুষ অনেক সময় খেই হারিয়ে ফেলেন। তবে জনতা ঠিকই বোঝেনÑকোন ব্যাখ্যা তাদের আশা-আকাক্সক্ষা ও দাবির অনুকূলে, আর কোনটা প্রতিকূলে। প্রতারিত হলে ছাত্র-জনতা ক্ষুব্ধ হয় এবং সৃষ্টি হয় ৫২, ৭১ এবং চব্বিশের জুলাইয়ের মত মহাবিপ্লবের। এই ধারা থেমে থাকে না, এটাই ইতিহাসের শিক্ষা।

জুলাই বিপ্লবে দেশের ছাত্র-জনতা তাদের আশা-আকাক্সক্ষার বিষয়গুলো স্পষ্ট করেছেন। তারা রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর সংস্কার চেয়েছেন। মানবাধিকারের প্রতিষ্ঠা চেয়েছেন। আরো চেয়েছেন, বিচারহীনতার সংস্কৃতি যেন দূর হয়। এসব বিষয়ে সরকারি দল বিএনপির ঐকমত্যও আমরা এক সময় লক্ষ্য করেছি। তবে কথা ও কাজে মিল থাকাটাই হলো বড় কথা। অনেকেই বলেন, সরকারের তো সবে শুরু। প্রবাদ বলে, সকালের সূর্যটাই বলে দেয় দিনটা কেমন যাবে। সংসদে সরকারি দলের আচরণে এবং কোনো কোনো মন্ত্রীর বক্তব্যে জনমনে প্রশ্নের সৃষ্টি হয়েছে, সরকার কি এখন আর সংস্কারের পক্ষে নয়? এমন প্রশ্ন দূর করার দায় সরকারের ওপরই বর্তায়। শুধু ছাত্র-জনতা নয়, বাংলাদেশের পরিস্থিতি লক্ষ্য করছে আন্তর্জাতিক মহলও। এর বড় কারণ, বাংলাদেশের জুলাই বিপ্লব জাতিসংঘসহ পুরো বিশে^র দৃষ্টি আকর্ষণে সক্ষম হয়েছিল। বিপ্লবের পরিণতি কেমন হয়, তা জানার একটা প্রবণতা সবার মধ্যেই বিরাজ করছে।

বাংলাদেশ নতুন সরকার গঠনের পর এক তাৎপর্যপূর্ণ সময়ে অবস্থান করছে। রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর সংস্কার, মানবাধিকার প্রতিষ্ঠা এখন বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হয়ে উঠেছে। এমন সময়ে ঢাকা সফরে এসেছেন জাতিসংঘের নির্যাতনবিরোধী বিশেষ দূত ড. অ্যালিস জিল এডওয়ার্ডস। জুলাই অভ্যুত্থান পরবর্তী পরিবর্তিত রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে পুলিশী হেফাজতে নির্যাতন বন্ধ, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কাঠামোগত আমূল পরিবর্তন এবং গত দেড় দশকের বিচারহীনতার সংস্কৃতি দূর করতে আন্তর্জাতিক মানদ- অনুযায়ী করণীয় কী, তা নিয়ে দেশের একটি জাতীয় দৈনিকের সাথে কথা বলেছেন ড. অ্যালিস। র‌্যাবের ভবিষ্যৎ থেকে শুরু করে জুলাই গণহত্যার বিচার এবং নির্যাতিতদের ক্ষতিপূরণ নিশ্চিতের মতো সংবেদনশীল ইস্যুগুলো উঠে এসেছে ওই সাক্ষাৎকারে। উল্লেখ্য, ড. অ্যালিস জিল এডওয়ার্ডস অস্ট্রেলীয় বংশোদ্ভুত, তিনি প্রখ্যাত আন্তর্জাতিক মানবাধিকার আইনজীবী ও বিশেষজ্ঞ। বতর্মানে তিনি জাতিসংঘের ‘নির্যাতন এবং অন্যান্য নিষ্ঠুর, অমানবিক বা অবমাননাকর আচরণ’ বিষয়ক সপ্তম স্পেশাল র‌্যাপোর্টার এবং এ পদে নিযুক্ত প্রথম নারী। দীর্ঘ ২৫ বছরের কর্মজীবনে তিনি পুলিশিং, ফৌজদারি বিচার ব্যবস্থা এবং কারাগার সংস্কার নিয়ে কাজ করেছেন। সাক্ষাৎকারের শুরুতেই ড. অ্যালিস বাংলাদেশের বর্তমান পরিস্থিতি নিয়ে তাঁর পর্যবেক্ষণ তুলে ধরেন। তিনি বলেন, ‘আমি বাংলাদেশে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বা কনসিকুয়েন্সিয়াল মুহূর্তে উপস্থিত হয়েছি। এখানে সাধারণ মানুষের যেমন উচ্চ প্রত্যাশা রয়েছে, তেমনি আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়েরও গভীর আগ্রহ আছে। তবে গত কয়েকদিনে আমি যা পর্যবেক্ষণ করেছিÑ তাতে স্পষ্ট যে, বাংলাদেশে সহিংসতার শিকড় অনেক গভীরে। এটি কেবল বিচ্ছিন্ন কোনো ঘটনা নয়; বরং দীর্ঘদিনের কাঠামোগত সমস্যা। তিনি সরকারের ‘সংসদীয় মানবাধিকার কমিশন’ গঠনের চিন্তাকে স্বাগত জানিয়ে বলেন, ‘মানবাধিকারকে কখনো রাজনীতির চশমা দিয়ে দেখা উচিত নয়। এটি সর্বজনীন অধিকার। যদি সব রাজনৈতিক দলের সমন্বয়ে একটি ক্রস-পার্টি কমিটি গঠন করা যায়, তাহলে মানবাধিকার নিয়ে রাজনীতিকরণের সংস্কৃতি বন্ধ হবে। এছাড়া পুলিশি জিজ্ঞাসাবাদের ধরন এবং প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কার নিয়ে দীর্ঘ বক্তব্য রাখেন ড. অ্যালিস। পুলিশী জিজ্ঞাসাবাদের ধরন এবং প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কার নিয়ে তিনি বলেন, ‘জিজ্ঞাসাবাদের সময় যখন আপনি বলপ্রয়োগ বা সহিংসতা করেন, তখন তা মস্তিষ্কের ওপর প্রচ- চাপ সৃষ্টি করে। এতে সাক্ষী বা অভিযুক্ত ব্যক্তি সঠিকভাবে তথ্য মনে করতে পারেন না। ভয়ের মুখে তারা এমন নথিতে সই করতে বাধ্য হন, যা তারা আসলে করেননি। এটি সরাসরি ন্যায়বিচারের পরিপন্থী।’ তিনি বাংলাদেশ পুলিশকে আন্তর্জাতিক ‘মেন্ডেস প্রিন্সিপালস’ অনুসরণের পরামর্শ দেন। ড. অ্যালিস বলেন, “আমি চাই বাংলাদেশের পুলিশ সেক্টরে একটি ‘রুটস এন্ড ব্রাঞ্চ রিফর্ম’ বা আমূল সংস্কার আসুক। এটি কেবল উপরে উপরে পরিবর্তন নয়; বরং প্রাতিষ্ঠানিক জঞ্জাল পরিষ্কার করার একটি প্রক্রিয়া। জিজ্ঞাসাবাদের সময় অডিও বা ভিডিও রেকডিং করা উচিত, যা পুলিশ বা তদন্তকারী কর্মকর্তারা কোনো জবরদস্তি করছেন না, তা নিশ্চিত করবে। এটি পরে আদালতেও প্রমাণ হিসেবে ব্যবহার করা যাবে।” তিনি আরো বলেন, ‘পুলিশকে জনগণের সেবক হতে হবে, জনগণের বিরুদ্ধে কোনো শক্তি নয়। আমাদের মৌলিক তদন্ত কৌশলগুলোয় ফিরে যেতে হবে, যেমন সঠিক পরিচয় যাচাই বা অ্যালিবাই চেক করা। এর জন্য খুব উচ্চতর প্রযুক্তির প্রয়োজন নেই, শুধু আন্তর্জাতিক আইন এবং সংবিধান মেনে চলাই যথেষ্ট।’ তিনি আরো বলেন, ‘পুরো আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় বাংলাদেশের পাশে আছে, যাতে এখানকার প্রতিষ্ঠানগুলো নতুন করে গড়ে তোলা যায় এবং জনগণের আস্থা ফিরে আসে। আর এ আস্থার ভিত্তি হবে শক্তিশালী মানবাধিকারের সংস্কৃতি।’ তিনি জুলাই গণহত্যার বিচার নিশ্চিতের আহ্বানও জানান। ড. অ্যালিসের বক্তব্য শুনে আমাদের জুলাই আন্দোলনের কথা মনে পড়ে যায়। সেখানেও সংস্কার ও বিচারের কথা উচ্চকণ্ঠে উচ্চারিত হয়েছিল। নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়েছে, সংসদ গঠিত হয়েছে, কিন্তু সেখানে সংস্কার ও বিচারের কথা সেভাবে উচ্চারিত হয় না। কোথায় যেন একটা ‘কিন্তু’ রয়ে গেছে। এখানে বলার মতো বিষয় হলোÑ ছাত্রজনতা ‘যদি’ বা ‘কিন্তুতে’ আটকে থাকতে চায় না। তারা জুলাই অভ্যুত্থানের আকাক্সক্ষা ও অঙ্গীকারের পূর্ণ বাস্তবায়ন চায়। বিষয়গুলো সংরক্ষিত হয়ে আছে। দেশের জনগণ এবং আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় জুলাইকে জানে, এখানে ফাঁকির কোনো সুযোগ নেই। জুলাইকে যারা অবজ্ঞা করবেন, তাঁরা অবাঞ্ছিত হয়ে পড়বেন দেশে এবং আন্তর্জাতিক অঙ্গনে। বিষয়টি সবার বোধে এবং বিবেচনায় থাকা উচিত।