॥ মনসুর আহমদ ॥
মানুষ সৃষ্টি সম্পর্কে আল্লাহ বলেন, “মানুষ কি স্মরণ করে না যে, আমি তাকে একসময় সৃষ্টি করেছিলাম, অথচ সে তখন কিছুই ছিল না?” (সুরা মারইয়াম, আয়াত- ৬৭)
এ আয়াতটিকে বৈজ্ঞানিক দৃষ্টিকোণ থেকে ব্যাখ্যা করলে দেখা যায়, কুরআনের এই বাণী মানুষের সৃষ্টির উৎস ও অস্তিত্বের বিবর্তন সম্পর্কে গভীর সত্য তুলে ধরে, যা আধুনিক বিজ্ঞানও সমর্থন করে।
১. মানব সৃষ্টির সূচনা শূন্য থেকে : কুরআনের বক্তব্য - “সে তখন কিছুই ছিল না” জীবনের প্রাথমিক অবস্থাকে নির্দেশ করে, যখন মহাবিশ্বে মানুষ তো দূরের কথা, জীবনের কোনো রূপই ছিল না।
আধুনিক বিজ্ঞানের মতে, প্রায় ১৩.৮ বিলিয়ন বছর আগে মহাবিশ্ব বিগ ব্যাংয়ের মাধ্যমে সৃষ্টি হয়। শুরুতে কোনো জীব ছিল না; কেবলমাত্র শক্তি ও মৌলিক কণিকা ছিল।
২.জীবনের রাসায়নিক উৎপত্তি (Abiogenesis) : বিজ্ঞানীদের ধারণা, পৃথিবী গঠনের পর, আদিম সাগরে রাসায়নিক যৌগগুলির সংমিশ্রণ থেকে ধীরে ধীরে প্রথম কোষ (প্রোটোসেল) তৈরি হয়। অর্থাৎ, “কিছুই ছিল না” → “জীবন জন্ম নিল” -বিজ্ঞানের এই ধারণা কুরআনের বাণীর সঙ্গে মিল রাখে।
৩. মানুষের জেনেটিক উৎপত্তি : আধুনিক জেনেটিক বলে, মানুষের উৎপত্তি একক কোষ থেকে, যা বাবা-মায়ের শুক্রাণু ও ডিম্বাণুর মিলনে তৈরি হয়। একসময় মানুষ ছিল না, কিন্তু আল্লাহর নির্ধারিত প্রাকৃতিক প্রক্রিয়ার মাধ্যমে মানুষের অস্তিত্ব এসেছে -এটি কুরআনের কথার বাস্তব রূপ।
৪. প্রথম সৃষ্টি থেকে পুনরায় সৃষ্টি : আয়াতের মূল উদ্দেশ্য ছিল মানুষকে বোঝানো যে, যদি সৃষ্টিকর্তা প্রথমবার নির্জীব পদার্থ থেকে জীব সৃষ্টি করতে পারেন, তবে মৃত্যুর পর পুনরায় জীবিত করাও তাঁর জন্য কঠিন নয়।
বিজ্ঞানের দৃষ্টিতে, মানুষের শরীরের উপাদান (carbon, oxygen, hydrogen, nitrogen ইত্যাদি) মহাবিশ্বের মৌলিক উপাদান থেকেই এসেছে-আবার এই উপাদানগুলোই মৃত্যুর পর মাটিতে মিশে যায়। অর্থাৎ এ সব কিছু আল্লাহর হেফাজতে থাকে। আল্লাহর ঘোষণা-আমরা জানি পৃথিবী যা কিছু কমিয়ে দেয় তা তাদের থেকে গ্রহণ করে এবং আমাদের কাছে একটি সংরক্ষণকারী গ্রন্থ রয়েছে যার নাম সংরক্ষিত ফলক ‘আল-লাওহ আল-মাহফুজ’ যাতে আল্লাহর নির্ধারিত সবকিছুই রয়েছে। (সুরা কাফ, আয়াত : ৪ : তাফসির আল-জালালাইন)
এসব উপাদান থেকে, মৃত দেহের পুনর্গঠন বা পুনরায় সৃষ্টি তাত্ত্বিকভাবে অসম্ভব নয়, যদি যথাযথ শক্তি ও প্রক্রিয়া প্রয়োগ করা হয় - যা আল্লাহর পক্ষে অবশ্যই সম্ভব।
কুরআনের এই আয়াত একদিকে মানুষকে আখিরাত ও পুনরুত্থানের প্রতি চিন্তা করতে উদ্বুদ্ধ করে, অন্যদিকে আধুনিক বিজ্ঞান দ্বারা প্রমাণিত হয় যে , মানব সৃষ্টির শুরু ছিল ‘শূন্য’ বা অস্তিত্বহীন অবস্থা থেকে - যা কুরআন ১৪০০ বছর আগে ইঙ্গিত করেছে।
সুরা মরিয়মের আয়াত ৬৭ এ বলা হয়েছে-“মানুষ কি স্মরণ করে না যে, আমি তাকে সৃষ্টি করেছি আগে, অথচ তখন সে কিছুই ছিল না?” (সূরা মরিয়ম : ৬৭)
এ সব আয়াতের মাধ্যমে আল্লাহ তায়াালা মানুষকে স্মরণ করিয়ে দিচ্ছেন যে, সে একসময় কিছুই ছিল না, কোনো অস্তিত্বই ছিল না। অথচ আল্লাহ তাকে মাটির উপাদান থেকে সৃষ্টি করেছেন, তারপর তার বংশধারা স্থির করেছেন শুক্রকণার মাধ্যমে।
অতএব, যে সত্তা কিছু না থেকেও সৃষ্টি হয়েছে, আল্লাহ তার পুনরুত্থানও করতে পারেন; এটা অস্বীকার করার কোনো যুক্তি নেই।
কুরআনে পুনরুত্থান (রিসারেকশন/কিয়ামত) একটি মৌলিক ও কেন্দ্রীয় বিশ্বাস। ইসলামি পরিভাষায় একে বলা হয় আখিরাতের জীবন বা পুনর্জীবন (বাআস)- যেখানে মানুষ মৃত্যুর পর আবার জীবিত হবে এবং তার কর্মের হিসাব দেবে।
নিচে কুরআনের দৃষ্টিতে পুনরুত্থানের বিষয়টি সহজভাবে ব্যাখ্যা করা হলো:
১. পুনরুত্থান নিশ্চিত সত্য : কুরআন স্পষ্টভাবে জানায় যে পুনরুত্থান অনিবার্য। এরশাদ হয়েছেÑ“মানুষ কি মনে করে যে, আমি তার অস্থিসমূহ একত্র করব না?” (সূরা আল-কিয়ামাহ ৭৫:৩)
এখানে বোঝানো হয়েছে, আল্লাহ মানুষের দেহ পুনরায় সৃষ্টি করতে সম্পূর্ণ সক্ষম।
২. সৃষ্টি থেকেই পুনরুত্থানের প্রমাণ : কুরআন যুক্তি দেয়-যিনি প্রথমবার সৃষ্টি করেছেন, তিনি আবারও সৃষ্টি করতে পারেন। আল্লাহর ঘোষণা-“তিনি প্রথম সৃষ্টি করেন, তারপর তিনি পুনরায় সৃষ্টি করবেন।” -(সুরা আর-রূম ৩০:২৭)
এটি একটি যৌক্তিক যুক্তি: প্রথম সৃষ্টি যদি সম্ভব হয়, তাহলে পুনঃসৃষ্টি আরও সহজ।
৩. প্রকৃতির উদাহরণ দ্বারা ব্যাখ্যা : কুরআন মৃত জমিকে বৃষ্টির মাধ্যমে জীবিত করার উদাহরণ দেয়। মানুষের চোখের সামনের প্রতিটি বস্তু পুনর্জীবনের সত্যতার ঘোষণা দেয়। যেমন এরশাদ হচ্ছেÑ“তুমি দেখো মৃত ভূমি, আমি যখন তাতে পানি বর্ষণ করি, তখন তা সজীব হয়ে ওঠে।” -(সুরা ফুসসিলাত ৪১ : ৩৯)
এটি পুনরুত্থানের একটি বাস্তব উদাহরণ-যা মানুষ প্রতিদিন দেখে।
৪. আত্মা ও দেহের পুনর্মিলন : পুনরুত্থানে শুধু আত্মা নয়, বরং দেহসহ মানুষ পুনরায় জীবিত হবে। এরপর বিচার হবে। “যে ব্যক্তি অণু পরিমাণ সৎকর্ম করবে, সে তা দেখবে; এবং যে ব্যক্তি অণু পরিমাণ অসৎকর্ম করবে, সে তাও দেখবে।” -(সুরা যিলযাল ৯৯ : ৭-৮)
৫. বিচার ও প্রতিফল : পুনরুত্থানের পর সবাইকে আল্লাহর সামনে উপস্থিত হতে হবে এবং তাদের কাজের বিচার হবে। আল্লাহ বলেন-“আর যেদিন আমি পাহাড়সমূহকে সরিয়ে দেব এবং আমি তাদের সবাইকে একত্র করব।” -(সুরা আল-কাহফ ১৮ : ৪৭)
সৎকর্মীদের জন্য জান্নাত এবং অসৎকর্মীদের জন্য জাহান্নাম নির্ধারিত হবে।
৬. অস্বীকারকারীদের জবাব-যারা পুনরুত্থান অস্বীকার করে, কুরআন তাদের যুক্তির জবাব দেয় এ ভাবে: “সে বলে, ‘কে জীবিত করবে এই হাড়গুলোকে, যখন তা পচে গেছে?’
বলো, ‘যিনি প্রথমবার সৃষ্টি করেছেন, তিনিই তা জীবিত করবেন।’-(সুরা ইয়াসীন ৩৬ : ৭৮-৭৯)
উদ্দেশ্য : নৈতিক দায়বদ্ধতা : পুনরুত্থানের ধারণা মানুষের জীবনে নৈতিকতা, দায়িত্ববোধ ও ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা করে। এটি জানায়-এই পৃথিবীর জীবনই শেষ নয়, বরং একটি পরীক্ষাম
কুরআনে বর্ণিত পরকাল সম্পর্কিত দাবি কোন কাল্পনিক বা বুদ্ধিবৃত্তিক দাবি নয়। এ দাবি প্রকৃত সত্য ; যার পক্ষে আধুনিক বিজ্ঞানের তথ্য যথেষ্ট শক্তিশালী।
আধুনিক বিজ্ঞানের আলোকে “পুনরুত্থান” (resurrection) প্রশ্নটি সরাসরি ধর্মীয় বিশ্বাসের মতোভাবে প্রমাণিত নয়-এটা আগে পরিষ্কার করে নেওয়া জরুরি। তবে বিজ্ঞান এমন কিছু ধারণা ও গবেষণা দিয়েছে, যেগুলো এই বিষয়টিকে আংশিকভাবে বোঝার বা সম্ভাবনা নিয়ে চিন্তা করার সুযোগ দেয়।
১. জীবনের মৌলিক উপাদান ও পুনর্গঠন : মানবদেহ মূলত পরমাণু ও অণু দিয়ে গঠিত। বিজ্ঞান বলে, এই উপাদানগুলো ধ্বংস হয় না-শুধু রূপ পরিবর্তন করে (Law of Conservation of Matter)।
এ থেকে কেউ কেউ যুক্তি দেন-যদি ভবিষ্যতে এই উপাদানগুলো আবার একইভাবে সংগঠিত করা যায়, তাহলে “পুনরুত্থান” তাত্ত্বিকভাবে কল্পনা করা সম্ভব।
২. কোষ ও ডিএনএ তথ্য : মানুষের শরীরের প্রতিটি কোষে ডিএনএ থাকে, যেখানে জীবনের পূর্ণ নকশা সংরক্ষিত। আধুনিক Genetic Engineering Ges Cloning প্রযুক্তি দেখিয়েছে যে জীবের অনুরূপ প্রতিলিপি তৈরি করা সম্ভব। তবে ক্লোনিং “একই ব্যক্তি” ফিরিয়ে আনে না-শুধু জিনগতভাবে একই নতুন সত্তা তৈরি করে।
৩. চেতনা (Consciousness) ও মস্তিষ্ক : মানুষের “আমি” বা চেতনা মস্তিষ্কের জটিল কার্যকলাপের ফল। এই বিষয়টি নিয়ে গবেষণা চলে Neuroscience-এ।
এখনো বিজ্ঞান জানে না-চেতনা সম্পূর্ণভাবে সংরক্ষণ বা পুনরুদ্ধার করা সম্ভব কি না। তাই বিজ্ঞানীদের কাছে “একই ব্যক্তি” পুনরত্থিত হওয়া বড় প্রশ্ন।
৪. কোয়ান্টাম তত্ত্বের ভুল ব্যাখ্যা : কিছু মানুষ Quantum Physics ব্যবহার করে পুনরুত্থানের পক্ষে যুক্তি দিতে চান, কিন্তু মূলধারার বিজ্ঞান এ ধরনের দাবিকে সমর্থন করে না। এগুলো বেশি দার্শনিক কল্পনা।
উপসংহার : আধুনিক বিজ্ঞান এখনো “পুনরুত্থান”কে প্রমাণ করতে পারেনি।
তবে কিছু ধারণা (যেমন: জিনগত তথ্য, পদার্থের সংরক্ষণ, ভবিষ্যৎ প্রযুক্তি) এই প্রশ্নটিকে পুরোপুরি অসম্ভবও বলে না-বরং “অজানা” হিসেবে রেখে দেয়। বিজ্ঞানের মারফৎ পরিপূর্ণ জ্ঞান অর্জন করা সম্ভব নয়; তাই মহান স্রষ্টা মানুষের জন্য ঈমানের শাখা প্রশস্ত করে রেখেছেন।