নাগরিকদের আতঙ্কিত করা কোনো দেশের সরকারের কাজ হতে পারে না। বরং নাগরিকদের আতঙ্কমুক্ত রাখতে তৎপর হওয়াই সরকারের কর্তব্য। অথচ পশ্চিমবঙ্গ সরকারের অবস্থান এখন বিপরীত মেরুতে। একটি জাতীয় দৈনিকের কলকাতাস্থ বিশেষ প্রতিনিধির প্রতিবেদনে বলা হয়, পশ্চিমবঙ্গে সরকারের সাম্প্রতিক নির্দেশনায় রাজ্যজুড়ে তীব্র বিতর্ক ও আতঙ্ক সৃষ্টি হয়েছে। পবিত্র ঈদুল আজহার প্রাক্কালে প্রকাশিত এক নির্দেশিকায় ধর্মীয় কারণে পশু কুরবানির ক্ষেত্রে যে একগুচ্ছ কঠোর বিধি-নিষেধ আরোপ করা হয়েছে, তা নিয়ে মুসলিম জনগোষ্ঠীর মধ্যে প্রবল উৎকণ্ঠা ছড়িয়ে পড়েছে। রাজ্যের স্বরাষ্ট্র দপ্তরের বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়েছে, গরু-মহিষ বা বলদ জবাই করতে হলে সংশ্লিষ্ট পুরসভার চেয়ারম্যান বা পঞ্চায়েত সমিতির সভাপতি এবং একজন সরকারি পশু চিকিৎসকের কাছ থেকে যৌথভাবে ফিটনেস সার্টিফিকেট নিতে হবে। এ ছাড়াও নির্দেশ দেওয়া হয়েছে যে, ওই পশুর বয়স ১৪ বছরের বেশি হতে হবে অথবা বার্ধক্য বা অসুস্থতার কারণে পশুটি চিরতরে কর্মক্ষমতা হারালে তবেই তা জবাই করা যাবে। এ নিয়ম লঙ্ঘন করলে বা প্রকাশ্যস্থানে জবাই করলে ছয় মাসের কারাদণ্ড ও জরিমানার বিধান রাখা হয়েছে।

সরকারের নির্দেশিকা জারির পর থেকেই রাজ্যের বিভিন্ন প্রান্তে স্বঘোষিত গোরক্ষক ও গেরুয়া মৌলবাদী গোষ্ঠীগুলোর তৎপরতা বহুগুণ বৃদ্ধি পেয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে। বিশেষ করে মুসলিম অধ্যুষিত এলাকাগুলোতে বহিরাগতদের প্রবেশ এবং সরাসরি হুমকি প্রদানের ঘটনায় থমথমে পরিবেশ সৃষ্টি হয়েছে। উত্তর প্রদেশের মতো ‘ভয়াবহ পরিস্থিতি’ এখন পশ্চিমবঙ্গেও দৃশ্যমান হচ্ছে। সাধারণ মুসলিম নাগরিকরা মনে করছেন, আইনি কড়াকড়ি আসলে একটি বিশেষ সম্প্রদায়কে ধর্মীয় বিধান পালনে বাধা দেওয়া এবং তাদের সামাজিক ও অর্থনৈতিকভাবে কোনঠাসা করার পরিকল্পিতা কৌশল। স্থানীয় অধিবাসীরা বলছেন, সরকারি অনুমোদন পাওয়া এবং ১৪ বছরের বুড়ো গরু খুঁজে বের করে কুরবানি দেওয়া কার্যত অসম্ভব। সাদারণ মানুষের মধ্যে এমন আতংক কাজ করছে যে, বৈধভাবে গরু নিয়ে যাওয়ার পথেও তাদের হিন্দু মৌলবাদী হেনস্তার শিকার হতে হবে এবং হচ্ছেও। প্রশাসনের এই পদক্ষেপকে অনেকে মুসলিম সমাজকে দ্বিতীয় শ্রেণীর নাগরিকে পরিণত করার অপচেষ্টা হিসেবে দেখছেন।

পর্যবেক্ষকরা বলছেন, মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারীর নেতৃত্বাধীন বিজেপি সরকার এ ধরনের নির্দেশিকা জারি করে রাজ্যে সাম্প্রদায়িক মেরুকরণকে চূড়ান্ত পর্যায়ে নিয়ে যাচ্ছে। সমালোচকরা বলছেন, আইনের আড়ালে হিন্দুত্ববাদী এজেণ্ডা বাস্তবায়ন করাই এ সরকারের প্রধান লক্ষ্য। রাজনৈতি বিশ্লেষক সুমন কল্যাণের মতে, যখন একটি নির্দিষ্ট সম্প্রদায়ের খাদ্যাভ্যাস ও ধর্মীয় রীতিকে টার্গেট করা হয়, তখন তা কেবল আইনগত বিষয় থাকে না বরং তা রাষ্ট্রের সাম্প্রদায়িক চরিত্রকে প্রকাশ করে দেয়। এটি পরিষ্কারভাবে মেরুকরণের রাজনীতি, যা গণতান্ত্রিক কাঠামোর জন্য অন্যন্ত বিপজ্জনক। বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, সরকার পরিকল্পিতভাবে এমন পরিস্থিতি তৈরি করছে, যেন মুসলমানদের জন্য তাদের প্রধান উৎসব পালন করা দুরূহ হয়ে পড়ে। এদিকে সরকারের ভ্রান্ত সিদ্ধান্তের ফলে রাজ্যের অর্থনীতিতে বড় ধস নামার আশঙ্কা করছেন অর্থনীতিবিদরা। উল্লেখ্য, গবাধিপশু কেনাবেচা এবং মাংস ব্যবসার সঙ্গে এ রাজ্যের হাজার হাজার মানুষের রুটি রুজি জড়িয়ে রয়েছে। এ ধরনের বিধিনিষেধ সরবরাহ চেইনকে সম্পূর্ণ ধ্বংস করে দেবে বলে মনে করছেন অর্থনীতিবিদরা। বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করে বলেছেন, সাম্প্রদায়িক বিদ্বেষের বশবর্তী হয়ে নেওয়া এ ধরনের সিদ্ধান্ত শেষ পর্যন্ত রাজ্যের রাজস্ব এবং সাধারণ মানুষের কর্মসংস্থানের অপূরণীয় ক্ষতি করবে। উপলব্ধি করা যায়, পশ্চিমবঙ্গ সরকারের সাম্প্রদায়িক বিদ্বেষপ্রসূত সিদ্ধান্ত সবদিক থেকেই ক্ষতিকর। আলোচনা-সমালোচনার পর তাদের মধ্যে কোনো বোধোদয় ঘটে কিনা সেটাই দেখার বিষয়।