উগ্রতা আসলে একটা বিষবাষ্প। এটা কোনো দেশে সীমাবদ্ধ থাকে না, ভিন্ন দেশেও ছড়িয়ে পড়ে। ক্ষমতার লালসায় যারা উগ্রতাকে প্রশ্রয় দেন, তারা উপলব্ধি করতে পারেন না দেশ ও জাতির কতটা ক্ষতি করছে তাদের ভ্রষ্টদৃষ্টিভঙ্গি। ভারতের উগ্রপন্থীরা এখন শুধু স্বদেশেই দাঙ্গা-হাঙ্গামা চালাচ্ছে না, বিদেশেও ছড়িয়ে পড়েছে তারা। ভারতভিত্তিক তিনটি অপরাধ চক্রের সঙ্গে সংশ্লিষ্টতার অভিযোগে আমেরিকা, কানাডা ও ইউরোপ থেকে ২৪ জনকে গ্রেফতার করা হয়েছে। আমেরিকার ফেডারেল প্রসিকিউটররা এ কথা জানিয়েছেন। অভিযুক্ত অপরাধ চক্রগুলোর মধ্যে বিষ্ণোই গ্যাংও রয়েছে। মঙ্গলবার প্রকাশিত তিনটি অভিযোগপত্রে মোট ৩৭ জনের বিরুদ্ধে অভিযোগ আনা হয়েছে। গ্রেফতার হওয়া ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে বিভিন্ন অপরাধের অভিযোগ আনা হয়েছে। এরমধ্যে ২০২৩ সালে কানাডার ব্রিটিশ কলম্বিয়ার এক গুরুদুয়ারার বাইরে শিখ নেতা হরদীপ সিং নিজ্জারকে হত্যার ঘটনায় জড়িত থাকার অভিযোগেও গ্রেফতার হয়েছেন কয়েকজন। লস এঞ্জেলেসের ফেডারেল প্রসিকিউটররা বলেছেন, বিশ্বজুড়ে হত্যাকাণ্ড, চাঁদাবাজি এবং মাদক পাচারে জড়িত ভারতীয় অপরাধী সিণ্ডিকেটগুলোর বিরুদ্ধে বছরের পর বছর ধরে চলা একটি ফেডারেল তদন্তের পর এ অভিযান চালানো হয় এবং তাদের গ্রেফতারও করা হয়। আমেরিকা, কানাডা ও ইউরোপের আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর যৌথ উদ্যোগে এ অভিযান চালানো হয়। দীর্ঘদিনের তদন্তে তারা এমন অপরাধ চক্রগুলোর তথ্য সংগ্রহ করছিলেন।

উল্লেখ্য, মার্কিন ফার্স্ট অ্যাসিস্ট্যান্ট অ্যাটর্নি বিল এসাইলি এক বিবৃতিতে বলেছেন-সীমান্ত পেরিয়ে যারা ভয়, মাদক এবং সহিংসতা ছড়ায়, সেই অপরাধী চক্রকে বিচারের মুখোমুখি হতে হবে। এই দুর্বৃত্তদের জন্য কোনো নিরাপদ আশ্রয় নেই। ৪৫ বছর বয়সি নিজ্জারকে তিনবছর আগে কানাডার ভ্যাঙ্কুভারের প্রায় ৩০ কিলোমিটার পূর্বে অবস্থিত সারে শহরে গুরুনানক শিখ গুরুদ্ধারের পার্কিং এলাকায় গুলী করে হত্যা করে। তিনি ছিলেন একজন প্রভাবশালী শিখ বিচ্ছিন্নতাবাদী নেতা এবং ভারতের পাঞ্জাব অঞ্চলে স্বাধীন শিখ রাষ্ট্র ‘খালিস্তান’ প্রতিষ্ঠার প্রকাশ্য সমর্থক। ভারতের পাঞ্জাবের বাসিন্দা ৩৩ বছর বয়সি লরেন্স বিষ্ণোই এবং ৩২ বছর বয়সি সতিন্দরজিৎ ‘গোল্ডি ব্রার’ সিংয়ের বিরুদ্ধে নিজ্জারকে হত্যার নির্দেশ দেওয়ার অভিযোগ এনেছেন ফেডারেল প্রসিকিউটররা। তারা নিজ্জারকে অভিযোগপত্রে ‘এইচএসএন’ নামে উল্লেখ করেছেন। গোল্ডি ব্রার এখনো পলাতক। লরেন্স বিষ্ণোই কারাগারে রয়েছেন। গত বছর কানাডা বিষ্ণোই গ্যাংকে একটি সন্ত্রাসী সংগঠন হিসেবে তালিকাভুক্ত করে। এর ফলে দেশটিতে সংগঠনটির সম্পদ জব্দ ও অর্থনৈতিক কার্যক্রম স্থগিত করার আইনি সুযোগ তৈরি হয়।

নিজ্জার হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় ২০২৪ সালে চার ভারতীয় নাগরিককে গ্রেফতার ও অভিযুক্ত করা হয়। ওই হত্যাকাণ্ডকে কেন্দ্র করে কানাডা ও ভারতের মধ্যে বড় ধরনের কূটনৈতিক উত্তেজনা সৃষ্টি হয়েছিল। ওই চারজন বর্তমানে বিচারের অপেক্ষায় রয়েছেন। মঙ্গলবার প্রসিকিউটররা অভিযোগ করেন, বিষ্ণোই গ্যাংয়ের সদস্যরা বিশিষ্ট ধর্মীয় ও রাজনৈতিক নেতাদের সহিংসতার লক্ষ্যবস্তু বানাতেন এবং পরে ওই সম্পদায়ের সদস্যদের কাছ থেকে চাঁদা আদায়ের চেষ্টা করতেন। অভিযোগ করা হয়েছে বিষ্ণোই, ব্রার এবং অন্য অভিযুক্তরা ক্যালিফোর্নিয়ার ভুক্তভোগীদের কাছ থেকে চাঁদাবাজির চেষ্টা করেছিলেন এবং ডিসেম্বর ও জানুয়ারিতে এক ভুক্তভোগীর কাছে পাঁচ মিলিয়ন ডলার দাবি করেছিলেন। এছাড়া মঙ্গলবার আইন প্রয়োগকারী সংস্থা জানিয়েছে, এ তদন্তের অংশ হিসেবে তারা প্রায় এক হাজার কেজি কোকেন, এক কেজি হেরোইন, ৪০ হাজার ডলার এবং এক ডজন আগ্নেয়াস্ত্র জব্দ করেছে। বিষয়টি ভারতের ইমেজের জন্য বেশ ক্ষতিকর বলে বিবেচিত হচ্ছে। এতদিন ভারতের অভ্যন্তরে সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা-হাঙ্গামার জন্য দেশটি সমালোচিত হচ্ছিল। এখন আবার যুক্ত হয়েছে ভারতভিত্তিক অপরাধচক্রের বিরুদ্ধে আন্তর্জাতিক অভিযান। এ সবের বিরুদ্ধে মোদি সরকার কি ব্যবস্থা নেয়, সেটাই এখন দেখার বিষয়।