মধ্যপ্রাচ্যের চলমান সংঘাত ধীরে ধীরে একটি বহুমাত্রিক বৈশ্বিক সংকটে রূপ নিচ্ছে। যুদ্ধক্ষেত্রের ভৌগোলিক সীমা পেরিয়ে এর প্রভাব এখন বিশ্বব্যাপী খাদ্য ও ওষুধ সরবরাহ ব্যবস্থায় গভীরভাবে অনুভূত হচ্ছে। আন্তর্জাতিক মানবিক সহায়তা সংস্থাগুলোর সাম্প্রতিক সতর্কবার্তা স্পষ্ট করে দিচ্ছেÑপরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে না এলে কোটি মানুষের জীবন ঝুঁকির মুখে পড়তে পারে। বিশ্ব অর্থনীতি ও সরবরাহ ব্যবস্থার একটি বড় অংশ নির্ভর করে মধ্যপ্রাচ্যের গুরুত্বপূর্ণ নৌপথ ও পরিবহন কেন্দ্রগুলোর ওপর। কিন্তু চলমান সংঘাতের কারণে এসব পথ ক্রমেই অকার্যকর হয়ে উঠছে। বিশেষ করে কৌশলগতভাবে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হরমুজ প্রণালীর কার্যক্রম ব্যাহত হওয়ায় জ্বালানি ও পণ্য পরিবহনে বড় ধরনের অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে। একই সঙ্গে আঞ্চলিক ট্রানজিট কেন্দ্রগুলো থেকেও সরবরাহ বিঘ্নিত হওয়ায় বিকল্প পথ ব্যবহার করতে হচ্ছে, যা সময়সাপেক্ষ ও ব্যয়বহুল।

এর সরাসরি প্রভাব পড়ছে মানবিক সহায়তা কার্যক্রমে। খাদ্য ও ওষুধ পরিবহনের খরচ বেড়ে যাওয়ায় একই অর্থে আগের তুলনায় কম সহায়তা পৌঁছানো সম্ভব হচ্ছে। ফলে যেসব দেশ আগে থেকেই দারিদ্র্য, অপুষ্টি ও স্বাস্থ্যসেবার সংকটে ভুগছিল, তারা এখন আরও বড় বিপদের সম্মুখীন হচ্ছে। পথে আটকে থাকা খাদ্য ও ওষুধের চালানগুলো এ সংকটের বাস্তব চিত্র তুলে ধরেÑযেখানে জরুরি সহায়তা সময়মতো পৌঁছাতে পারছে না।

জাতিসংঘের বিভিন্ন সংস্থা ইতোমধ্যে সতর্ক করেছে যে, কোভিড-১৯ মহামারির পর এটি সবচেয়ে বড় বৈশ্বিক সরবরাহ শৃঙ্খল বিপর্যয়। পরিবহন ব্যয় বৃদ্ধি, বিমা খরচের ঊর্ধ্বগতি এবং রুট পরিবর্তনের কারণে বিলম্বÑসব মিলিয়ে পরিস্থিতি দ্রুত জটিল হয়ে উঠছে। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে আন্তর্জাতিক সহায়তা কমে যাওয়ার প্রবণতা, যা সংকট মোকাবিলাকে আরও কঠিন করে তুলছে। এই যুদ্ধ নতুন করে মানবিক বিপর্যয়ও সৃষ্টি করছে। মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশে বাস্তুচ্যুত মানুষের সংখ্যা বাড়ছে, যা খাদ্য, পানি ও চিকিৎসাসেবার ওপর অতিরিক্ত চাপ সৃষ্টি করছে। এমন পরিস্থিতিতে বৈশ্বিক সহায়তা ব্যবস্থা যদি দুর্বল হয়ে পড়ে, তবে এর পরিণতি হবে ভয়াবহ।

সবচেয়ে উদ্বেগজনক বিষয় হলো-এ সংকটের প্রভাব তাৎক্ষণিকভাবে শেষ হওয়ার সম্ভাবনা কম। বিশেষজ্ঞরা আশঙ্কা করছেন, যুদ্ধ বন্ধ হলেও সরবরাহ ব্যবস্থার এই অস্থিরতা দীর্ঘদিন ধরে বজায় থাকতে পারে। ফলে জীবনরক্ষাকারী সহায়তা পৌঁছাতে বিলম্ব অব্যাহত থাকতে পারে, যা বহু অঞ্চলে দুর্ভিক্ষ ও স্বাস্থ্যঝুঁকি বাড়িয়ে দেবে। এমন বাস্তবতায় আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের সমন্বিত ও দ্রুত পদক্ষেপ অপরিহার্য। সংঘাত নিরসনে কূটনৈতিক উদ্যোগ জোরদার করার পাশাপাশি মানবিক সহায়তা সরবরাহের বিকল্প ও নিরাপদ পথ নিশ্চিত করতে হবে। একই সঙ্গে দরিদ্র ও ঝুঁকিপূর্ণ দেশগুলোর জন্য সহায়তা বৃদ্ধি করা জরুরি।

খাদ্য ও ওষুধ কেবল পণ্য নয়-এগুলো মানুষের বেঁচে থাকার মৌলিক উপাদান। সুতরাং এই সরবরাহ ব্যবস্থার বিঘ্ন কেবল অর্থনৈতিক সমস্যা নয়, এটি একটি গভীর মানবিক সংকট। এখনই কার্যকর উদ্যোগ নেয়া না হলে, এর মূল্য দিতে হবে কোটি কোটি মানুষকেÑযাদের অনেকেই ইতোমধ্যে বেঁচে থাকার লড়াইয়ে পরাজয়ের দ্বারপ্রান্তে। পাশাপাশি বৈশ্বিক নীতি নির্ধারকদের মনে রাখতে হবে, মানবিক সহায়তা কোনো দয়া নয়; এটি একটি নৈতিক দায়বদ্ধতা, যা অবহেলা করার সুযোগ নেই। সংকট যত দীর্ঘায়িত হবে, ততই এর অভিঘাত গভীর হবেÑআর তার সবচেয়ে বড় শিকার হবে বিশ্বের সবচেয়ে অসহায় মানুষগুলো।