দেশে হামের সাম্প্রতিক প্রাদুর্ভাব একটি গুরুতর জনস্বাস্থ্য সংকেত হিসেবে সামনে এসেছে। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, গত ২৪ ঘণ্টায় দেশে হামে আক্রান্ত হয়ে নিশ্চিত ও উপসর্গ মিলিয়ে ১১ জন শিশুর মৃত্যু হয়েছে। একই সময়ে নতুন করে ১ হাজার ৩৩৭ জন শিশু আক্রান্ত হয়েছে। গত ৬৫ দিনের কন্ট্রোল রুম তথ্য বিশ্লেষণে দেখা যায়, সারা দেশে সন্দেহভাজন হামে আক্রান্তের সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ৫৪ হাজার ৯১১ জনে। এর মধ্যে ৪২ হাজার ৮৬৮ জন রোগীকে হাসপাতালে ভর্তি হতে হয়েছে। ল্যাব পরীক্ষায় নিশ্চিতভাবে হামে আক্রান্ত রোগীর সংখ্যা ৭ হাজার ৮৫৬ জনে পৌঁছেছে। একই সময়ে চিকিৎসা শেষে সুস্থ হয়ে বাড়ি ফিরেছেন ৩৮ হাজার ৯৮০ জন রোগী, যা একদিকে চিকিৎসা ব্যবস্থার সক্ষমতা নির্দেশ করে, অন্যদিকে রোগটির বিস্তৃত প্রভাবকেও তুলে ধরে।

এ পরিসংখ্যানগুলো বিশ্লেষণ করলে একটি স্পষ্ট চিত্র পাওয়া যায়Ñসংক্রমণ দ্রুত ছড়িয়ে পড়ছে এবং শিশুদের মধ্যে এর প্রভাব সবচেয়ে বেশি। বিশেষ করে স্বল্প সময়ের মধ্যে আক্রান্তের উচ্চ সংখ্যা এবং হাসপাতালে ভর্তি রোগীর চাপ স্বাস্থ্য ব্যবস্থার ওপর উল্লেখযোগ্য চাপ সৃষ্টি করছে। একই সঙ্গে মৃত্যু সংখ্যাও জনস্বাস্থ্যগত উদ্বেগকে আরও গভীর করছে। হাম মূলত একটি প্রতিরোধযোগ্য রোগ। কার্যকর টিকাদান কর্মসূচি থাকলে এ ধরনের ব্যাপক প্রাদুর্ভাব সাধারণত নিয়ন্ত্রণে রাখা সম্ভব হয়। ফলে বর্তমান পরিস্থিতি অনেকাংশে প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থার কার্যকারিতা, কাভারেজ এবং মাঠপর্যায়ের বাস্তব বাস্তবায়ন সক্ষমতা নিয়ে প্রশ্ন তোলে। বিশেষ করে প্রত্যন্ত ও গ্রামীণ অঞ্চলে রোগীর সংখ্যা বেশি হওয়ার প্রবণতা দেখা গেলে তা স্বাস্থ্যসেবার অসম বণ্টন ও পৌঁছের সীমাবদ্ধতাকে আরও স্পষ্ট করে।

একই সঙ্গে মাঠপর্যায়ের নজরদারি, রোগ শনাক্তকরণ এবং দ্রুত প্রতিক্রিয়া ব্যবস্থার ঘাটতিও এ ধরনের পরিস্থিতিকে দীর্ঘায়িত করতে পারে। প্রাথমিক পর্যায়ে রোগী শনাক্ত করে আলাদা করা, সংক্রমণের উৎস নিয়ন্ত্রণ করা এবং দ্রুত চিকিৎসা নিশ্চিত করা গেলে প্রাদুর্ভাব অনেকাংশে সীমিত রাখা সম্ভব হয়। অন্যদিকে, সুস্থ হয়ে ওঠার হারও কিছু কিছু এলাকায় স্বস্তিদায়ক। এতে বোঝা যায় যে, রোগটি চিকিৎসাযোগ্য এবং সঠিক সময়ে চিকিৎসা পাওয়া গেলে অধিকাংশ রোগী সুস্থ হয়ে ওঠছে। তবে এই সাফল্য তখনই পূর্ণতা পায়, যখন প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা রোগের বিস্তার কমিয়ে রাখতে সক্ষম হয়।

বর্তমান পরিস্থিতিতে কিছু জরুরি ও অগ্রাধিকারভিত্তিক পদক্ষেপ স্পষ্টভাবে সামনে আসে। প্রথমত, ঝুঁকিপূর্ণ এলাকাগুলো চিহ্নিত করে জরুরি ভিত্তিতে বিশেষ টিকাদান ক্যাম্পেইন পরিচালনা করা প্রয়োজন, যাতে শতভাগ কাভারেজ নিশ্চিত করা যায়। দ্বিতীয়ত, আক্রান্ত অঞ্চলগুলোতে দ্রুত মেডিকেল টিম পাঠিয়ে রোগী ব্যবস্থাপনা, জরুরি চিকিৎসা এবং প্রয়োজনীয় পুষ্টি সহায়তা নিশ্চিত করতে হবে। তৃতীয়ত, উপজেলা ও জেলা পর্যায়ের স্বাস্থ্যকেন্দ্রগুলোতে আলাদা ওয়ার্ড, পর্যাপ্ত চিকিৎসা সরঞ্জাম এবং পর্যাপ্ত জনবল নিশ্চিত করা জরুরি, যাতে রোগীর চাপ সামাল দেওয়া যায়। চতুর্থত, জনসচেতনতা কার্যক্রম জোরদার করা প্রয়োজন, বিশেষ করে অভিভাবকদের মধ্যে রোগের লক্ষণ, প্রতিরোধ এবং দ্রুত চিকিৎসা গ্রহণের বিষয়ে স্পষ্ট বার্তা পৌঁছে দেওয়া জরুরি।

এছাড়া দীর্ঘমেয়াদে টিকাদান ব্যবস্থার ধারাবাহিকতা, মাঠপর্যায়ের স্বাস্থ্যকর্মীদের সক্ষমতা বৃদ্ধি এবং নিয়মিত নজরদারি ব্যবস্থাকে আরও শক্তিশালী করা জরুরি হয়ে উঠেছে। কারণ সংক্রামক রোগ নিয়ন্ত্রণে শুধুমাত্র চিকিৎসা নয়, বরং শক্তিশালী প্রতিরোধমূলক কাঠামোই সবচেয়ে কার্যকর ভূমিকা রাখে। সব মিলিয়ে বলা যায়, হামের বর্তমান প্রাদুর্ভাব শুধু একটি রোগ নিয়ন্ত্রণের বিষয় নয়, বরং দেশের জনস্বাস্থ্য ব্যবস্থার প্রস্তুতি, সমন্বয় এবং মাঠপর্যায়ের বাস্তবায়ন সক্ষমতার একটি বড় পরীক্ষা। দ্রুত, সমন্বিত এবং দীর্ঘমেয়াদি পদক্ষেপ ছাড়া এ পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ করা কঠিন হয়ে পড়তে পারে, যা বিশেষভাবে শিশুদের জন্য আরও বড় ঝুঁকি তৈরি করবে। সরকার বিগত অন্তর্বর্তী সরকারের ওপর দায় চাপিয়ে বিষয়টির দায়ভার এড়াতে চাইছে। তবে নির্বাচিত ও দায়িত্বশীল একটি প্রশাসনের কাছে এমন দায়সাড়া মনোভাব প্রত্যাশিত নয়। আমরা আশা করবো, সরকার আগের চেয়েও আরো বেশি দায়িত্বশীল ও তৎপর হবে এবং হাম নিয়ন্ত্রণে সর্বোচ্চ পরিমাণ গুরুত্ব দিয়ে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণ করবে।