দেশে এমন সব ঘটনা ঘটে চলেছে বিবেকবান মানুষমাত্রই এতে বিচলিত। এসব ঘটনার মধ্যে রয়েছে নিষ্ঠুর হত্যাকাণ্ড থেকে শুরু করে নৃশংসতার বিভিন্ন চিত্র। গাজীপুরের কাপাসিয়ার রাউৎকোনা গ্রামে ৫ জনের হত্যাকাণ্ড এবং গত মঙ্গলবার দিনাজপুরের চিড়িরবন্দরে জমি নিয়ে বিরোধে পিতাপুত্র খুনের ঘটনাটির উল্লেখ করা যায়। ৫ জনকে হত্যার ঘটনায় বলতে গেলে থমকে গেছে সর্বস্তরের মানুষ। প্রশ্ন হলো সমাজে এমন ঘটনা কি ঘটতে পারে? হত্যাকারী আর কেউ নয়. সংসারের কর্তা স্বয়ং। জানা যায়, গত ৯ মে শনিবার সকালে গাজীপুরের কাপাসিয়া উপজেলার রাউৎকোনা গ্রামে একটি বহুতল বাড়ি থেকে শারমিন আক্তার (৩০), তার তিন সন্তান মীম খানম (১৫), উম্মে হাবিবা (৮) ও ফারিয়া (২) এবং রসুল মিয়া (২২) সহ পাঁচজনের লাশ উদ্ধার করে পুলিশ। প্রাথমিকভাবে ধারণা করা হচ্ছে, আর্থিক লেনদেন, পরকীয়া এবং পারিবারিক কলহের জেরে শারমিনের স্বামী ফোরকান মিয়া এ হত্যাকাণ্ড ঘটায়।
আর গত মঙ্গলবার দিনাজপুরের চিরিরবন্দর উপজেলায় পৈত্রিক জমি ভাগাভাগিকে কেন্দ্র করে দুই স্ত্রীর পরিবারের মধ্যে বিরোধের জেরে দ্বিতীয় পক্ষের দুই ছেলের ধারালো অস্ত্রের আঘাতে তাদের বাবা ও সৎ বড় ভাই নিহত হয়েছেন। উপজেলার ফতেজংপুর ইউনিয়নের ৩নং ওয়ার্ডের উত্তরপাড়া গ্রামে এ ঘটনা ঘটে। নিহতরা হলেন: ওই গ্রামের বাসিন্দা মো: শহিদুল ইসলাম দুলু (৬০) এবং তার প্রথম পক্ষের বড় ছেলে মো: জয়নাল আবেদীন (৩৫)। পিতাকে হত্যা ভ্রাতাকে হত্যা সভ্যতাকে যেন ব্যদান করছে। প্রশ্ন হচ্ছে মানুষ এত নিষ্ঠুর হয় কি করে?
এ ছাড়াও প্রতিদিনই এ ধরনের খুনখারাবির ঘটনা সংবাদপত্রে প্রকাশিত হচ্ছে। সাম্প্রতিক কয়েকটি ঘটনা পর্যালোচনা করে দেখা গেছে, এর সঙ্গে জড়িত বিভিন্ন কারণ। দেশে সামাজিক অবক্ষয় হওয়ায় নৃশংসতা চরম আকার ধারণ করছে। যেসব কারণে তা ঘটছে সমাজ বিজ্ঞানীদের মতে তার মধ্যে রয়েছে মাদক, পারিবারিক কলহ ও পরকীয়া ইত্যাদি।
মনোবিজ্ঞানে সামাজিক অবক্ষয়ের বিভিন্ন ব্যাখ্যা রয়েছে। এসব ব্যাখ্যায় দেখা যায়, যখন কোনো ব্যক্তি দীর্ঘদিনের হতাশা, দাম্পত্য সংকট, দমন করে রাখা ক্ষোভ পুষে রাখেন বা মানসিক চাপে থাকেন, তখন তাঁর নিজেকে নিয়ন্ত্রণের ব্যবস্থা দুর্বল হয়ে যেতে থাকে। তখন আবেগ, রাগ বা প্রবল কোনো বাসনা আচরণের ওপর প্রভাব বিস্তার করতে শুরু করে। সামাজিক অবক্ষয়ের অন্যতম কারণ হচ্ছে, মোবাইলে অশ্লীলতার ছড়াছড়ি। এতে এক দিকে যেমন নৈতিকতার অধঃপতন ঘটছে দেশের তরুণ সমাজের। এ অবক্ষয়ের কারণ অপসংস্কৃতির আরো রয়েছে পারিবারিক দ্বন্দ্ব-কলহকে উপজীব্য করে নির্মিত বিদেশী মিডিয়ার বিভিন্ন নাটক, ওটিটি প্ল্যাটফর্মে নির্মিত বিভিন্ন ধরনের সিরিয়াল, মুভি ও শো। সমাজবিজ্ঞানীরা বলছেন, দেশে সামাজিক মূল্যবোধকে জাগ্রত করতে হবে। যেসব ঘটনা বা কাজ সমাজে অধঃপতন ডেকে আনছে, সেগুলো দূর করার কঠোর আইনি পদক্ষেপ নেওয়া জরুরি। বিচারের সংস্কৃতি গড়ে তুলতে হবে।
সমাজবিজ্ঞানীরা মনে করেন, সামাজিক অবক্ষয়ের অন্যতম কারণ হিন্দি সিরিয়ালের প্রভাব। এসব সিরিয়ালে পরিবারের অন্য সদস্যদের সঙ্গে অনৈতিক সম্পর্কের চিত্র দেখে দেশের মানুষের মনোজগতে প্রভাব পড়ছে। এর কারণে দেশে বাড়ছে পরকীয়া। ‘দেশের সামাজিক মূল্যবোধের অভাব দেখা দিয়েছে। মাদকাসক্ত, অভাব-অনটন, দীর্ঘদিন কর্মহীন থাকা, বিবাহবহির্ভূত সম্পর্ক গড়ার বিষয়টি ক্রমেই ছড়িয়ে পড়ছে। স্ত্রী-সন্তানকে হত্যা করে আরেকটি নতুন পরিবার গঠনের মতো জঘন্য কাজ করার মতো সামাজিক অপরাধ বাড়ছে।
আমরা মনে করি সামাজিক অবক্ষয়ের যে ধস নেমেছে তা থেকে মুক্তির পথ নির্ধারণ করতে হবে। ধর্মীয় মূল্যবোধ সমাজ থেকে হারিয়ে যাচ্ছে। ধর্মের মহান বাণী কাজে আসতে পারে। ইসলাম মানুষকে যে সুমহান শিক্ষা দেয় তা অনুসরণ জরুরি। যে যে ধর্মের অনুসারী হোন না কেন ধার্মিক মানুষ মাত্রই বিবেকবান না হয়ে পারেন না। সামাজিক অবক্ষয় রোধে ধর্মের মহান বাণী অনুসরণ করতে হবে।
অপরাধের বিচার হওয়া জরুরি। অপরাধী যেন অপরাধ করে পার পেয়ে না যায়। বিচারের শক্ত বার্তা না যাওয়ার কারণে এসব অপরাধ বাড়ছে। বিচারহীনতার সংস্কৃতি মানুষের মনকে অন্যভাবে প্রভাবিত করে। অপরাধী মনে করে যে, অপরাধ করলে পার পাওয়া যাবে। অতীতে স্বৈরাচারী আমলে এ্ সংস্কৃতি অবাধে চলেছে। গণতান্ত্রিক সরকারের কাছে প্রত্যাশা থাকবে অপারাধীর বিচার যেন হয়। সামাজিক অবক্ষয় থেকে আমাদের ফিরে আসার পথ দেখাতেই হবে।