ট্রাম্পের আমলকে অনেকেই ‘অন্ধকার যুগ’ হিসেবে চিহ্নিত করছেন। আবার এখান থেকেই বিশ্বরাজনীতির এক নতুন ধারার উদ্ভব লক্ষ্য করছেন কেউ কেউ। এ প্রসঙ্গে লন্ডনে নিযুক্ত ব্রাজিলের রাষ্ট্রদূত আন্তোনিও ডি আগুইয়ার প্যাট্রিওটার কথা উল্লেখ করা যেতে পারে। সাম্প্রতিক এক বক্তৃতায় তিনি আধুনিক বিশ্বের এক হতাশাজনক চিত্র তুলে ধরেছেন। তার মতে বর্তমান পৃথিবী বৈশ্বিক উষ্ণায়ন, পরিবেশের বিপর্যয়, একের পর এক যুদ্ধ এবং লাগামহীন সামরিক বাজেটের মতো সংকটে জর্জরিত। আন্তর্জাতিক আইন ও মানবিকতার চরম অবমাননা, বাণিজ্যে প্রতিবন্ধকতা, গণতান্ত্রিক শাসনের দুর্বলতা এবং একই সঙ্গে আশা ও ভীতি জাগানো প্রযুক্তির দ্রুত বিকাশ আমাদের এক অনিশ্চিত ভবিষ্যতের দিকে ঠেলে দিচ্ছে। তবে এ নৈরাজ্যের মধ্যেও তিনি আশার এক নতুন সুর শুনতে পাচ্ছেন। তার মতে, আপাতদৃষ্টিতে সবকিছু থমকে গেছে মনে হলেও ভেতরে ভেতরে এক বিশাল পরিবর্তন সূচিত হয়েছে। বিশেষ করে তথাকথিত ‘গ্লোবাল নর্থ’ বা উন্নত বিশ্বের দেশগুলোর মধ্যে একটি স্পষ্ট বিভাজন তৈরি হতে দেখা যাচ্ছে। একদিকে রয়েছে একক আধিপত্যবাদী পরাশক্তি এবং অন্যদিকে দাঁড়িয়ে আছে বহুপাক্ষিকবাদে বিশ্বাসী এক বিশাল সংখ্যাগরিষ্ঠীগোষ্ঠী।

আটলান্টিকের এপার ও ওপারের মধ্যে এই যে বিভাজন, তার বহু কারণ রয়েছে। এর মধ্যে যেমন রয়েছে আদর্শিক ও নৈতিক কারণ, তেমনি রয়েছে যুদ্ধ পরিস্থিতি। এখানে বড় কারণ হিসেবে ইরান যুদ্ধের কথা উল্লেখ করা যায়। ব্রাজিলের রাষ্ট্রদূতের মতে, ইরানে পরিচালিত অত্যন্ত অজনপ্রিয় এবং অবৈধ যুদ্ধটি একতরফা আধিপত্যবাদের কারণে তৈরি হওয়া বিশৃঙ্খলা ও অস্থিরতার এক জ¦লন্ত উদাহরণ হয়ে উঠেছে। এ সংঘাত স্পষ্ট করে দিচ্ছে যে, বিশ্বকে আর কোনো একক দেশের নিয়ন্ত্রণে বা একমুখী মেরুকরণে ফিরিয়ে নেয়া সম্ভব নয়। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের এ একতরফা নীতি এবং আইন অমান্য করে সামরিক শক্তি প্রদর্শনের অন্ধকার যুগটি এখন দ্রুত সমাপ্তির দিকে এগিয়ে যাচ্ছে। হরমুজ প্রণালির সংকটের মধ্যদিয়ে যেন আমেরিকার এ একক আধিপত্যের পতন ঘটছে।

উপলব্ধির বিষয় হলো, বর্তমান বাস্তবতাকে সামনে রেখে পাশ্চাত্যের অন্যান্য দেশগুলো এখন নতুন করে নিজেদের অবস্থান সাজিয়ে নিচ্ছে। তারা বুঝতে পেরেছে যে, নিরাপত্তার জন্য আমেরিকার ওপর সম্পূর্ণ নির্ভরশীল থাকার দিন শেষ। পারস্য উপসাগরীয় রাজতন্ত্রগুলোর ক্ষেত্রে আমেরিকার দেয়া নিরাপত্তা বলয় কতটা ভঙ্গুর ছিল, তা আজ সবার সামনে স্পষ্ট। এমনকি ইউক্রেন সংকটের ক্ষেত্রেও এ নিরাপত্তা নীতি ইউরোপের স্বার্থ রক্ষায় তেমন কোনো কাজে আসেনি। এ তিক্ত অভিজ্ঞতা থেকে শিক্ষা নিয়ে বিশ্বের অনেক দেশই এখন উপলব্ধি করতে পারছে যে, কোনো একটি নির্দিষ্ট শক্তির পেছনে না ছুটে বরং বিভিন্ন দেশের সাথে বহুমুখী ও বৈচিত্র্যময় বন্ধুত্বের সম্পর্ক গড়ে তোলাই তাদের দীর্ঘমেয়াদী ভবিষ্যতের জন্য সবচেয়ে নিরাপদ ও বুদ্ধিমানের কাজ। ইউরোপের এমন ভাবনা আজ বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে ট্রাম্পের জন্য। আর এ ভাবনাকে পছন্দ করছে বিশ্বের অন্যান্য দেশও।

আমাদের বিশ্বতো মানবের বিশ্ব, দানবীয় শাসনে বিশ্ব চলতে পারে না। মানবের বিশ্ব চলবে মানবিক দর্শনে। বিশ্বে বসবাস করছে নানা ধর্ম, বর্ণ ও মতের মানুষ, তাই প্রয়োজন বৈচিত্র্যের ঐক্য। সব রাষ্ট্রের অধিকার রয়েছে স্বাধীনভাবে নিজের মত করে চলার। কেউ কারো ওপর আগ্রাসন করার অধিকার রাখে না। কেউ আগ্রাসন চালালে আন্তর্জাতিক আইন তাকে নিয়ন্ত্রণ করবে। এ জন্যইতো জাতিসংঘ। কিন্তু দুঃখের বিষয় হলো, যারা জাতিসংঘ প্রতিষ্ঠা করেছিল, তারাই জাতিসংঘকে অকার্যকর করে রেখেছে। ট্রাম্প কি জাতিসংঘের কথা শুনছেন? এমন প্রশ্ন থেকেই এখন লক্ষ্য করা যাচ্ছে বিশ্বরাজনীতিতে নতুন ধারা। আর নয় একক আধিপত্যবাদের ধারা। সামনে অপেক্ষা করছে বহুমতের বহুপাক্ষিক ধারা। বৈচিত্র্যের ঐক্যই কাম্য মানবজাতির।