ইউরেনিয়াম নিয়ে এত আলোচনা কেন? সঙ্গত কারণ আছে। বিজ্ঞানীরা বলছেন, ইউরেনিয়াম এমন একটি পদার্থ-যা একটি শহরকে আলোকিত করতে পারে, আবার ধ্বংসও করতে পারে! রহস্যটা কোথায়? স্বল্প ঘনত্বের ইউরেনিয়াম পারমাণবিক চুল্লি চালাতে পারে। সমৃদ্ধকরণ নামক একটি প্রক্রিয়ার মাধ্যমে উচ্চ ঘনত্বের ইউরেনিয়াম দিয়ে পারমাণবিক বোমা তৈরী করা যায়। ফলে উপলব্ধি করা যায়, কেন ইউরেনিয়াম আলোচনা গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হয়ে উঠেছে। আর এখন তো রাজনৈতিক তথা ভূরাজনীতির কারণেও ইউরেনিয়াম আলোচনা বিশেষ বিষয় হয়ে ওঠে।

আট বছর আগে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প তার প্রথম মেয়াদে ইরানের সঙ্গে পারমাণবিক চুক্তি থেকে সরে এসেছিলেন। এরপর ২২ হাজার পাউণ্ড বা ১১ টন সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম জমা করতে সমর্থ হয়েছে তেহরান। প্রশ্ন জেগেছে, ইরান কীভাবে এত পরিমাণ সৃমদ্ধ ইউরেনিয়াম মজুত করতে সমর্থ হলো? উল্লেখ্য, চুক্তি থেকে বেরিয়ে গেলেও আমেরিকা সব সময় চেষ্টা করেছে ইরানকে পারমাণবিক বোমা তৈরি থেকে বিরত রাখতে। আর এ উদ্দেশ্যেই তেহরানে হামলা চালায় ওয়াশিংটন। তবে যুদ্ধ শুরুর দুইমাস পরও ইরানের ইউরেনিয়াম মজুত কোন অবস্থায় আছে, সে ব্যাপারে এখনো কোনো স্পষ্ট ধারণা নেই আমেরিকার। এখানে প্রশ্ন জাগে, গণবিধ্বংসী পারমাণবিক বোমা আমেরিকার জন্য হালাল হলে অন্য কারো জন্য তা হারাম হবে কেন? অনাকাক্সিক্ষত এই বোমা সবার জন্য হারাম হলেই তো ভালো হয়। কিন্তু বর্তমান সভ্যতায় এটা কারো জন্য হালাল, আবার কারো জন্য হারাম। এমন ব্যবস্থা তো বৈষম্যমূলক। তাহলে কি বর্তমান সভ্যতা ও বিশ্বব্যবস্থা বৈষম্যকেই সঙ্গত বলে বিবেচনা করে? এমন বিবেচনা তো মানব ভাবনা ও প্রকৃতি ভাবনার সাথে সংগতিপূর্ণ নয়। অসঙ্গত এমন ভাবনায় পৃথিবীতে শান্তি আসবে কেমন করে? ফলে বলতে হয়, বর্তমান সভ্যতা তথা সভ্যতার শাসকরাই বিশ্বে অশান্তির কারিগর।

২০০৬ সালে শিল্প পর্যায়ে ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ শুরু করে ইরান এবং এর উদ্দেশ্যকে শান্তিপূর্ণ বলে বর্ণনা করে। তবে পরবর্তী কয়েক বছরে তেহরান এই মজুত বাড়িয়ে তোলে বলে এক প্রতিবেদনে উল্লেখ করে আন্তর্জাতিক পরমাণু শক্তিসংস্থা। ২০১০ সালে ইরান ঘোষণা করে, একটি গবেষণা চুল্লির জন্য জ¦ালানি তৈরি করার উদ্দেশ্যে তারা ২০ শতাংশ পর্যন্ত ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ শুরু করবে। এই স্তরটিই বেসামরিক ও সামরিক ব্যবহারের মধ্যে সরকারি বিভাজন রেখা। তবে এই ২০ শতাংশ স্তরটি উদ্বেগজনক। কারণ, একটি বোমা তৈরির উপযোগী জ¦ালানির প্রায় ৮০ শতাংশ। এভাবে মজুত বাড়াতে থাকায় ওবামা প্রশাসন এটি নিয়ন্ত্রণের জন্য আলোচনা শুরু করে। ২০১৫ সালে ইরান ও আমেরিকার নেতৃত্বে ছয়টি দেশ একটি চুক্তিতে পৌঁছায়।

এই চুক্তি ইরানের সমৃদ্ধ ইউরেনিয়ামের বিশুদ্ধতা তিন দশমিক ৬৭ শতাংশে এবং মজুতের পরিমাণ ১৫ বছরের জন্য সীমিত করে। এই চুক্তির আওতায় মজুতের পরিমাণ ৬৬০ পাউণ্ডের নিচে সীমাবদ্ধ করে তেহরান। ২০১৮ সালে ট্রাম্প যখন চুক্তি থেকে আমেরিকাকে সরিয়ে আনে, তখন ইরানের কাছে একটি বোমা তৈরির মতো ইউরেনিয়ামও ছিল না। তারপরও দেশটির ওপর পুনরায় একাধিক কঠোর অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেন তিনি। এরপর ইরান চুক্তির নির্ধারিত সীমার চেয়ে বেশি ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ শুরু করে; প্রথমে পশ্চিমা বিশ্বকে চাপে রাখার জন্য স্বল্পমাত্রায়, তারপর ২০২১ সালের শুরুতে ট্রাম্পের ক্ষমতা ছাড়ার ঠিক আগে এর পরিমাণ ২০ শতাংশ পর্যন্ত বৃদ্ধি করে।

ট্রাম্প, জো বাইডেন হয়ে আবার ট্রাম্প। ২০২৫ সালে ট্রাম্প দ্বিতীয় মেয়াদে ক্ষমতা নেওয়ার পর ইরানের সমৃদ্ধ ইউরেনিয়ামের মজুত দ্রুততম হারে বৃদ্ধি পায়। আন্তর্জাতিক পরমাণু শক্তিসংস্থার প্রতিবেদনে উঠে আসে বিষয়টি। ‘বাধা দিলে বাধবে লড়াই, সেই লড়াইয়ে জিততে হবে’-পুরানো এই কথাটি মানুষের স্বভাবসম্মত। আমাকে মারার জন্য আপনি পারমাণবিক বোমা বানাবেন, আর আমাকে বাধা দেবেন-এটা মানুষ মেনে নিতে পারে না। সেই লড়াইটাই করছে ইরান। ইরানের পারমাণবিক অস্ত্রের গবেষণা যদি খারাপ বিষয় হয়, তাহলে সেটা অন্যদের ক্ষেত্রে কেন নয়? বরং পারমাণবিক অস্ত্রমুক্ত’ একটা চুক্তি হোক বিশ্বে, কারণ সেটাই শান্তির পথ।