আসন্ন পবিত্র ঈদুল আযহাকে সামনে রেখে দেশব্যাপী যাত্রীদের নিরাপদ, স্বস্তিদায়ক ও নির্বিঘœ যাতায়াত নিশ্চিত করতে সড়ক পরিবহন ও সেতু মন্ত্রণালয়ের ঘোষিত কর্মপরিকল্পনা নিঃসন্দেহে ইতিবাচক উদ্যোগ। ২৪ ঘণ্টার নিয়ন্ত্রণ কক্ষ চালু, ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনা, অতিরিক্ত ম্যাজিস্ট্রেট নিয়োগ, বাস টার্মিনালে বিশেষ নজরদারি, গুরুত্বপূর্ণ টোল প্লাজা ও যানজটপ্রবণ এলাকায় অতিরিক্ত নিরাপত্তা ব্যবস্থা, বিশেষ ঈদ সার্ভিস এবং সড়ক নিরাপত্তা জোরদারে নানা পদক্ষেপÑ কাগজে-কলমে এসব সিদ্ধান্ত আশাব্যঞ্জক বলেই মনে হয়।
প্রতি বছর ঈদকে কেন্দ্র করে দেশের সবচেয়ে বড় মানবস্রোত এক স্থান থেকে অন্য স্থানে যাতায়াত করে। রাজধানীসহ বড় শহরগুলো থেকে লাখো মানুষ পরিবারের সঙ্গে ঈদের আনন্দ ভাগাভাগি করতে গ্রামে ছুটে যান। এই যাত্রা শুধু আবেগের নয়, এটি দেশের পরিবহন ব্যবস্থাপনার সক্ষমতারও একটি বড় পরীক্ষা। দুর্ভাগ্যজনকভাবে, বহু বছর ধরেই এ পরীক্ষায় আমাদের প্রস্তুতির ঘাটতি স্পষ্ট হয়ে ওঠে।
বিশেষত সর্বশেষ ঈদুল ফিতরের অভিজ্ঞতা ছিল অত্যন্ত হতাশাজনক। সেটি ছিল নতুন সরকারের জন্য বড় ধরনের একটি পরীক্ষা, কিন্তু বাস্তবতা আশানুরূপ ছিল না। মহাসড়কের বিভিন্ন স্থানে কয়েক কিলোমিটার দীর্ঘ যানজট সৃষ্টি হয়েছিল। ঘণ্টার পর ঘণ্টা বাস, ব্যক্তিগত যানবাহন এবং পণ্যবাহী ট্রাক আটকে ছিল। যাত্রাপথে সড়ক দুর্ঘটনায় প্রাণহানির ঘটনা ঘটেছে, ফেরার পথেও সেই সংখ্যা কমেনি বরং বেড়েছে। অনেক স্থানে অতিরিক্ত ভাড়া আদায়ের অভিযোগ উঠেছে। যাত্রীদের কাছ থেকে জোরপূর্বক অর্থ আদায়ের ঘটনাও সামনে এসেছে। ট্রেন ও বাসে নির্ধারিত সময়সূচি ভেঙে পড়ায় সাধারণ মানুষকে চরম ভোগান্তি পোহাতে হয়েছে। প্রশ্ন হচ্ছে, এবার কি সে পুরোনো চিত্রের পুনরাবৃত্তি হবে, নাকি বাস্তব পরিবর্তন দেখা যাবে?
বাস্তবতা হলো, আমাদের দেশে ঈদকেন্দ্রিক যানজটের বড় কারণগুলোর মধ্যে রয়েছে অপরিকল্পিত সড়ক ব্যবস্থাপনা, ফিটনেসবিহীন যান চলাচল, মহাসড়কে অবৈধ থামা, অতিরিক্ত যাত্রী পরিবহন, দুর্বল ট্রাফিক নিয়ন্ত্রণ এবং সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোর মধ্যে সমন্বয়হীনতা। এর সঙ্গে যুক্ত হয় কিছু অসাধু পরিবহন মালিক-শ্রমিকের অতিরিক্ত ভাড়া আদায়ের প্রবণতা এবং পথে পথে চাঁদাবাজি। ফলে সরকারের ঘোষিত পরিকল্পনা তখনই কার্যকর হবে, যখন এসব অনিয়মের বিরুদ্ধে দৃশ্যমান ও কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
বিশেষ করে মহাসড়কে যানবাহনের চাপ ব্যবস্থাপনায় প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়াতে হবে। কোথায় যানজট তৈরি হচ্ছে, কোথায় দুর্ঘটনার ঝুঁকি বেশিÑএসব তথ্য তাৎক্ষণিকভাবে বিশ্লেষণ করে ব্যবস্থা নিতে হবে। টোল প্লাজাগুলোতে দ্রুত যান পারাপারের ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে হবে। ফেরিঘাট, বাস টার্মিনাল ও গুরুত্বপূর্ণ সংযোগস্থলে আলাদা নজরদারি প্রয়োজন। একই সঙ্গে সড়ক দুর্ঘটনা প্রতিরোধে চালকদের কর্মঘণ্টা, শারীরিক সক্ষমতা এবং মাদকাসক্তির বিষয়গুলো গুরুত্বের সঙ্গে দেখতে হবে। ঘোষিত ডোপ টেস্ট কার্যক্রম যেন শুধু আনুষ্ঠানিকতায় সীমাবদ্ধ না থাকে, সেটিও নিশ্চিত করতে হবে।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, সাধারণ মানুষ এখন আর কেবল প্রতিশ্রুতি শুনতে চায় না। তারা বাস্তবে স্বস্তিদায়ক যাত্রা চায়। সংবাদ সম্মেলন, সভা কিংবা কাগুজে পরিকল্পনা দিয়ে মানুষের দুর্ভোগ কমানো সম্ভব নয়, যদি মাঠপর্যায়ে তার কার্যকর বাস্তবায়ন না থাকে। ঈদ আনন্দের উৎসব। এ আনন্দ যেন মহাসড়কের দীর্ঘ যানজট, দুর্ঘটনা, অতিরিক্ত ভাড়া কিংবা হয়রানির কারণে বিষাদে পরিণত না হয়। সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের সামনে এখন বড় চ্যালেঞ্জ একটি-ঘোষিত পরিকল্পনাকে বাস্তবে সফল করে দেখানো। জনগণ এবার কথার চেয়ে কাজ দেখতে চায়।