রাজনীতির সাথে দেশের নাগরিকরা কমবেশি জড়িত থাকেন। কেউ তৎপরতায়, কেউ সমর্থনে, কেউবা ক্ষমতায় সক্রিয়। অস্তিত্বের প্রয়োজনেই মানুষ রাজনীতির সাথে জড়িয়ে যায়। রাজনীতি খুবই গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলেও, এর চালচিত্র সবসময় কাক্সিক্ষত পর্যায়ে থাকে না। রাজনীতি কখনো কখনো শুধু দুঃখজনক নয়, ভয়ংকর রূপও ধারণ করে। এ কারণেই হয়তো রাজনীতির স্বরূপ নিয়ে প্রশ্ন ওঠে। ফ্যাসিস্ট আমলে শেখ হাসিনার যে রাজনীতি ছিল, তা কি রাজনীতির সংজ্ঞার মধ্যে পড়ে? পড়ে না বলেই তো রাজনৈতিক দল ও ছাত্র-জনতা ফ্যাসিবাদী শাসনের বিরুদ্ধে লড়ে গেছে। সেই ঐক্যতো এখন নেই। বরং সরকার ও বিরোধী জোটে বিভক্ত হয়ে গেছে জুলাই গণঅভ্যুত্থানের ঐক্য। দেশে সরকার থাকবে, বিরোধী দল থাকবেÑ এটা অস্বাভাবিক কোন বিষয় নয়। কিন্তু রাজনৈতিক বা মতাদর্শগত বিরোধ যদি জাতির স্বার্থ ও অস্তিত্বকে সমীহ করতে সমর্থ না হয়, তখনতো চলমান রাজনীতি নিয়ে প্রশ্ন উঠবেই।
ফ্যাসিস্ট সরকারের পতনের পর নির্বাচন হলো, সরকারও গঠিত হলো। ত্রয়োদশ সংসদের প্রথম অধিবেশনের সমাপ্তিও জাতি লক্ষ্য করলো। দফায় দফায় উত্তাপ ছড়িয়েছে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের প্রথম অধিবেশন। স্পষ্ট হয়েছে সরকার ও বিরোধী দলের রাজনৈতিক মতাদর্শের বিষয়টিও। এ নিয়ে পত্রপত্রিকায় প্রতিবেদন হয়েছে, হয়েছে বিশ্লেষণও। তবে প্রথম অধিবেশনে বেশি ব্যবহার হয়েছে ‘একাত্তর কার্ড।’ জুলাই সনদ, মুক্তিযোদ্ধার সংজ্ঞা, জুলাই অভ্যুত্থান, সংবিধান সংস্কার পরিষদের বৈঠক, রাষ্ট্রপতির ভাষণ, জ¦ালানি সংকট এবং অন্তর্বর্তী সরকারের জারি করা অধ্যাদেশসহ নানা ইস্যুতে উত্তপ্ত ছিল পুরো অধিবেশন। বলা চলে প্রাণবন্ত ছিল জুলাই অভ্যুত্থান পরবর্তী নতুন বাংলাদেশের সংসদের প্রথম অধিবেশন। তবে লক্ষ্যণীয় বিষয় হলো, সংসদে ফ্যাসিস্ট আওয়ামী লীগ না থাকলেও ফ্যাসিবাদী বয়ানই প্রাধান্য পেয়েছে প্রথম অধিবেশনে। আগের মতই আওয়ামী কায়দায় ‘স্বাধীনতা বিরোধী’, ‘রাজাকার’ ও ‘যুদ্ধাপরাধী’ শব্দের বহুল ব্যবহার দেখা গেছে। তবে এবার তা হয়েছে ভিন্ন আঙ্গিকে। বিগত ১৫ বছর এ শব্দগুলো ব্যবহার করা হতো বিএনপি-জামায়াতের বিরুদ্ধে, আর এবার তা ব্যবহার করা হয়েছে শুধু জামায়াতের বিরুদ্ধে এবং কাজটি করেছে সরকারি দল বিএনপি। বিষয়টিকে অতীতের বিভাজনের রাজনীতির অনুসরণ বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা। তাঁরা জুলাই অভ্যুত্থান পরবর্তী নতুন বাংলাদেশে ৫৫ বরের পুরনো কৌশলের ব্যবহারকে সৃজনশীলতার পরিবর্তে স্থবিরতার প্রতীক হিসেবে বিবেচনা করছেন। বিশ্লেষকরা আরো বলেছেন, ‘৭১ কার্ড’ কাদের স্বার্থে, কাদের প্ররোচনায় বাংলাদেশে ব্যবহার হয়েছে তা দেশের মানুষ জানে। এ কার্ডের লক্ষ্য ছিল জাতিকে বিভক্ত করে নিজেদের স্বার্থ উদ্ধার করা। বিগত ১৫ বছর সে কাজটি ভারত বেশ ভালোভাবেই সম্পন্ন করতে সমর্থ হয়েছে। এ কারণেই ফ্যাসিস্ট হাসিনা সরকার ভারতের কাছে এতটা প্রিয়। নতুন বাংলাদেশের সংসদে বিএনপির সংসদ সদস্যরা যেভাবে ‘একাত্তর কার্ড’ ব্যবহার করে জামায়াতকে আক্রমণ করার চেষ্টা করেছেন, তাতে মনে হয়েছে মাঝখানে আর কিছু ছিল না, ফ্যাসিবাদ ছিল না। ফ্যাসিবাদের দীর্ঘ শাসনের, দুর্ভোগের, যন্ত্রণার কাহিনী সম্যকভাবে তুলে ধরতে বিএনপির এমন অনীহা কেন? ’৭১ কার্ডের ব্যবহারে বিএনপির কিছু সদস্যের অতিউৎসাহ দেখে প্রশ্ন জাগে, এ কার্ডের জন্মদাতাদের সাথে বিএনপির বিশেষ মহলের কোনো বিশেষ সম্পর্ক গড়ে ওঠেনি তো? ‘৭১ কার্ড’ প্রসঙ্গে সংসদে জামায়াত নেতারাও কথা বলেন। তারা বলেন, ১৯৭৮ সালে জন্ম নেয়া বিএনপি কীভাবে মুক্তিযুদ্ধের দল হয়? তবে বিএনপিতে যেমন মুক্তিযোদ্ধারা আছেন, তেমনি মুক্তিযোদ্ধা আছেন জামায়াতে ইসলামীতেও।
উল্লেখ্য, ’৭১ কার্ড ও স্বাধীনতাবিরোধী ইস্যুতে ভিন্নধর্মী বক্তব্য দিয়েছেন জাতীয় সংসদের চিফ হুইপ নুরুল ইসলাম মনি। বিএনপির এ নেতা অধিবেশনের শেষ দিনে রাষ্ট্রপতির ভাষণের ওপর আনা ধন্যবাদ প্রস্তাবের আলোচনায় বর্তমান সংসদকে ‘মজলুমের সংসদ’ আখ্যায়িত করে বলেন, ‘এই সংসদে বলা হতো জামায়াত-বিএনপি, একথা বলেই আমাদের আক্রমণ করা হতো। শুরুই হতো জামায়াত-বিএনপি দিয়ে। তারপর আমাদের বিরুদ্ধে স্লোগান তৈরি করলো ‘৭১-এর রাজাকার, এ মুহূর্তে বাংলা ছাড়’। পত্রিকার হেডলাইন ছিল ‘তুই রাজাকার, তুই রাজাকার। আমরা দীর্ঘদিন এরকম পরিস্থিতি মোকাবিলা করেছি। তিনি আরো বলেন, ‘আমরা বিএনপি-জামায়াত জাতীয় সংসদে পিঁপড়ার বলের মতো (দলা পাকিয়ে) থাকতে চাই। আমরা সবাই মিলে দেশটাকে নিয়ে বাঁচতে চাই। সে দায়িত্ব নিয়ে এখানে বসেছি।’ চিফ হুইপ নুরুল ইসলাম মনিতো দায়িত্বের কথা বললেন। কিন্তু জাতীয় সংসদে এরকম দায়িত্ববোধ নিয়ে বিএনপির ক’জন সংসদ সদস্য কথা বলেছেন? বরং অনেককেই আমরা দেখেছি ‘৭১ কার্ডকে’ উসকে দিতে। এমন আওয়ামী বয়ান বিএনপির মুখে শোভা পায় কী? প্রশ্ন জাগে, ভারত প্রবর্তিত এই কার্ডে এমন কি মধু আছে, যার আকর্ষণ থেকে বিএনপি নেতারা মুক্ত হতে পারছেন না। প্রসঙ্গত এখানে দেশের বিশিষ্ট রাজনৈতিক বিশ্লেষক অধ্যাপক দিলারা চৌধুরীর বিশ্লেষণ উল্লেখ করা যায়। তিনি বলেছেন, ‘এই অধিবেশনে মনে হয়েছে আমরা ক্রমান্বয়ে দুই-তৃতীয়াংশ সংখ্যাগরিষ্ঠতার অতীত অভিজ্ঞতার দিকে যাচ্ছি। জুলাই সনদ ও গুরুত্বপূর্ণ অধ্যাদেশগুলোর বিষয়ে সরকারি দলের অবস্থান একটি ফ্যাসিস্ট স্বৈরাচারী সংসদের আলামত দেখা যাচ্ছে। সংসদে বিএনপির অবস্থান দেখে মনে হচ্ছে তারা এক সময়কার জোট সঙ্গীর সাথে প্রতারণা করছে।’ একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধ ও যুদ্ধাপরাধ ইস্যু প্রসঙ্গে এই রাজনৈতিক বিশ্লেষক বলেন, বিদেশি শক্তির প্ররোচণায় গত ৫৪ বছর দেশকে বিভক্ত করে রাখা হয়েছিল। চব্বিশের গণঅভ্যুত্থানে মনে হয়েছিল অতীতের বিভাজন ভুলে দেশ ঐক্যবদ্ধভাবে এগিয়ে যাবে। কিন্তু সংসদে দেখা গেল বিএনপি বিভাজনকেই জিইয়ে রাখতে চায়। ফ্যাসিস্ট আমলের সাড়ে ১৫ বছরের সংসদে মুক্তিযুদ্ধ ও একাত্তর ইস্যুতে যেভাবে বিএনপি ও জামায়াতকে আক্রমণ করা হতো, এখন দেখছি জামায়াতকে টার্গেট করে বিএনপি উদ্দেশ্যমূলকভাবে একই ধারায় চলছে। এটি কাম্য নয়।
বিশিষ্ট রাজনৈতিক বিশ্লেষক অধ্যাপক দিলারা চৌধুরী তো তাঁর কামনার কথা বললেন। কামনার কথা নানাজন নানাভাবে বলছেন। তাঁদের কেউ প্রতিবেশী, কেউ বা দূরদেশী। উপলব্ধি করা যায়, বর্তমান সময়ের ভূরাজনীতি কিংবা আঞ্চলিক রাজনীতিতে মহৎভাবনার মানুষ কম। এ কারণেই হয়তো গাজা যুদ্ধ, ইউক্রেন যুদ্ধ এবং ইরান যুদ্ধ হতে পারছে। প্রতিবেশীদের নিয়ে তো আমরা একটি ভালো উদাহরণ সৃষ্টি করতে পারতাম। কিন্তু তেমন লক্ষণ নেই। উদাহরণ সৃষ্টিতে এগিয়ে আসতে পারতেন প্রতিবেশী বড়দেশ ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী। অথচ তাঁর দলতো উগ্র হিন্দুত্ববাদের পতাকা বহন করে চলেছে।
এবার পশ্চিমবঙ্গের নির্বাচনে বিজেপি বিজয় লাভ করেছে। এ দলের নেতা শুভেন্দু অধিকারী পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী হতে পারেন। অথচ তাঁর চিন্তাভাবনা শুধু উগ্র নয়, ভয়ংকরও বটে। কিছুদিন আগে তিনি বলেছিলেন, ‘ইসরাইল যেভাবে গাজাবাসীকে শিক্ষা দিয়েছে, বাংলাদেশিদের সেভাবে শিক্ষা দেয়া উচিত।’ তাহলে বিজেপি নেতার আদর্শ কি ইসরাইল তথা নেতানিয়াহু। বিএনপি নেতারা কি ভেবে দেখবেন, কেমন পরিবেশে আমরা আছি। বিভাজন কিংবা ক্ষমতার রাজনীতি করার সুযোগ এখন আছে কী? তবে ফ্যাসিস্টরা আবার ফিরে আসার সুযোগ খুঁজছে। শুভেন্দুরাও হুংকার দিচ্ছেন। তাই রাজনীতির সঠিক ধারাপাত প্রয়োজন। মান্ধাতা আমলের স্বার্থান্ধ রাজনীতির দিন শেষ। এখন প্রয়োজন ত্যাগের ও সাহসের রাজনীতি। ৩৬ জুলাই তেমন উদাহরণ রেখে গেছে। এমন রাজনীতি করতে গেলে প্রয়োজন হবে মাটি ও মানুষের প্রতি গভীর ভালোবাসা। প্রয়োজন হবে উচ্চতর নৈতিকতা। এসব গুণাবলী অর্জনে স্রষ্টার কাছে জবাবদিহিতার চেতনা আমাদের বিশেষভাবে সাহায্য করতে পারে।