শত্রু ও মিত্রের আলোচনা বেশ পুরানো। তবে শত্রু মিত্র নির্ধারণের দৃষ্টিভঙ্গিতে তারতম্য লক্ষ্য করা গেছে। শত্রুর শত্রু, মিত্র হয়ে যায়, এ কথা আমরা জানি। শত্রু মিত্র নির্ধারণের দৃষ্টিভঙ্গি সবসময় সঠিক হয় না, অনেক সময় সঠিক ভিত্তিও খুঁজে পাওয়া যায় না। আর রকমফের তো আছেই। বর্তমান সময়ে শুধু স্বার্থ চিন্তা শত্রু মিত্র নির্ধারণের মুখ্য বিষয় হয়ে উঠেছে। ন্যায় ও আদর্শ এখন তেমন কাজ করে না। এমন বাতাবরণেও কিছুটা ব্যতিক্রমী চিত্র লক্ষ্য করা গেল পশ্চিম তীরে ইসরাইলের অবৈধ বসতিকে কেন্দ্র করে। তেল আবিব থেকে রয়টার্স জানায়, ফিলিস্তিনের অধিকৃত পশ্চিম তীরে অবৈধ ইসরাইলি বসতি থেকে পণ্য আমদানিতে যুক্তরাজ্য, ফ্রান্স ও কানাডার নিষেধাজ্ঞা পরিকল্পনার জবাবে পূর্ব জেরুসালেমে বৃটিশ কনস্যুলেট বন্ধ করার ঘোষণা দিয়েছে ইসরাইল। তবে নিজেদের আবস্থানের পক্ষে দৃঢ়তা পুনর্ব্যক্ত করেছেন বৃটিশ প্রধানমন্ত্রী অ্যান্ডি বার্নহ্যাম। ইসরাইলের কর্মকর্তারা বুধবার বলেন, বৃটেনকে কনস্যুলেট বন্ধ করতে ৩০ দিন সময় দেওয়া হয়েছে। কনসুলেটটি জেরুসালেম, পশ্চিম তীর ও গাজায় ফিলিস্তিনি-সংক্রান্ত বিষয়ে বৃটেনের প্রতিনিধিত্ব করে। ইসরাইল আরো ১২ জন বৃটিশ রাজনীতিবিদকে দেশটিতে প্রবেশে নিষেধাজ্ঞা দিয়েছে। পশ্চিম তীর ও ইসরাইলে থাকা বৃটিশ কর্মকর্তা ও কূটনীতিকদের এবং গাজা সমরকেন্দ্রের কর্মকর্তাদের চলে যেতে বলা হয়েছে। এছাড়া পশ্চিম তীরে ফিলিস্তিনি নিরাপত্তা বাহিনীকে বৃটেনের প্রশিক্ষণের কার্যক্রমও বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে।
ইসরাইলের আচরণের বিপরীতে বৃটেনের বক্তব্যও লক্ষ্য করার মতো। বুধবার বৃটিশ পার্লামেন্টে সরকারের সিদ্ধান্তের পক্ষে অবস্থান তুলে ধরে প্রধানমন্ত্রী অ্যান্ডি বার্নহ্যাম বলেন, বৃটেনকে কোনো একটি বিষয়ে অবস্থান নিতে হবে। তার ভাষায়, অন্যায় হলে এবং মানুষকে বাড়িঘর থেকে উচ্ছেদ করা হলে তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া নেতৃত্বের অংশ। বার্নহ্যাম বলেন, বৃটেন দীর্ঘদিন ধরে মধ্যপ্রাচ্যে দ্বিরাষ্ট্রীয় সমাধানকে সমর্থন করে আসছে। তবে শুধু কথা বললে হবে না, এর পক্ষে পদক্ষেপও নিতে হবে। এদিকে মঙ্গলবার পার্লামেন্টে বৃটিশ পররাষ্ট্রমন্ত্রী এড মিলিব্যন্ড বলেন, ইসরাইলি বসতি থেকে পণ্য আমদানি বন্ধের পাশাপাশি বসতি সংশ্লিষ্ট নির্মাণ, অবকাঠামো, অর্থায়ন ও আবাসন খাতের কোম্পানি ও ব্যক্তিদের বিরুদ্ধেও ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
বৃটেনের সঙ্গে ফ্রান্স ও কানাডাও পশ্চিম তীরের ইসরাইলি বসতি থেকে পণ্য আমদানি নিষিদ্ধ করার কথা জানিয়েছে। আরও নয়টি দেশ এই তিন দেশের পদক্ষেপকে সমর্থন করেছে। ডেনমার্ক, পর্তুগালসহ এসব দেশ ইসরাইলি বসতি সম্প্রসারণকে দ্বিরাষ্ট্রীয় সমাধানের ব্যাপারে হুমিক বলে মনে করে। বৃটিশ প্রধানমন্ত্রী বার্নহ্যাম, ফ্রান্সের প্রেসিডেন্ট এমানুয়েল মাখোঁ ও কানাডার প্রধানমন্ত্রী মার্ক কার্নি মঙ্গলবার এক যৌথ বিবৃতিতে জানান, দ্বিরাষ্ট্রীয় সমাধান রক্ষার প্রচেষ্টায় এটি গুরুত্বপূর্ণ একটি মোড়। চলতি সেপ্টেম্বরের শেষ দিকে জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদে তারা এ উদ্যোগের পক্ষে প্রচার চালাবেন। ইসরাইলের পররাষ্ট্রমন্ত্রী গিদিয়ন সার বৃটেনের পদক্ষেপকে ‘নৈতিকভাবে বিকৃত’ বলে সমালোচনা করেছেন। তিনি এটিকে ইসরাইলের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে ‘নির্লজ্জ হস্তক্ষেপ’ বলেও মন্তব্য করেন। ভাবতে অবাক লাগে, ইসরাইলের মত একটি নৃশংস ও যুদ্ধাপরাধী রাষ্ট্রের পররাষ্ট্রমন্ত্রীর মুখে ‘নৈতিক’ ও ‘হস্তক্ষেপ’-এর মত শব্দ কী করে উচ্চারিত হলো? ওদের মুখে এসব শব্দ শোভা পায় না। তবে যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষ থেকে এ বিষয়ে এ পর্যন্ত তুলনামূলকভাবে সংযত প্রতিক্রিয়া জানানো হয়েছে। মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও বলেন, পশ্চিম তীরে এমন কিছু তারা দেখতে চান না, যা পরিস্থিতিকে অস্থিতিশীল করে তুলতে পারে। উপলব্ধি করা যায়, ইসরাইলের আগ্রাসন ও অবৈধ বসতির ব্যাপারে বিশ্বব্যাপী নিন্দার মাত্রা বাড়ছে। আর তিন মিত্রদেশের নিষেধাজ্ঞায় নেতানিয়াহু সরকার মেজাজের ভারসাম্য হারিয়ে রীতিমত ক্ষিপ্ত হয়ে উঠেছে। তবে এতে পরিস্থিতি বদলাবে না। আপরাধীকে তার ফল ভোগ করতেই হবে।