দেশে গত ২৪ ঘণ্টায় হাম ও হামের উপসর্গ নিয়ে ১৭ শিশুর মৃত্যুর খবর নিঃসন্দেহে গভীর উদ্বেগ, বেদনা এবং জাতীয় লজ্জার বিষয়। এটি কেবল একটি পরিসংখ্যান নয়; এর প্রতিটি সংখ্যা একটি পরিবারের স্বপ্নভঙ্গ, এক একটি মায়ের বুক খালি হয়ে যাওয়ার গল্প। আরও উদ্বেগজনক বিষয় হলো, এটাই এখন পর্যন্ত ২৪ ঘণ্টায় সর্বোচ্চ মৃত্যুর ঘটনা। একই সময়ে নতুন করে আক্রান্ত হয়েছে আরও ১ হাজার ৪৫৬ শিশু। পরিস্থিতি স্পষ্টভাবে জানিয়ে দিচ্ছে, এটি আর বিচ্ছিন্ন স্বাস্থ্য সংকট নয়; বরং দ্রুত বিস্তারমান একটি জাতীয় জনস্বাস্থ্য জরুরি অবস্থা।

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, গত ১৫ মার্চ থেকে এখন পর্যন্ত হাম ও হামের উপসর্গ নিয়ে মোট ৩১১ শিশুর মৃত্যু হয়েছে। এর মধ্যে ৫২ শিশুর মৃত্যু নিশ্চিতভাবে হামে এবং ২৫৯ শিশুর মৃত্যু হামের উপসর্গজনিত কারণে হয়েছে। প্রায় ৫০ দিনের ব্যবধানে এত বিপুল সংখ্যক শিশুমৃত্যু শুধু স্বাস্থ্য ব্যবস্থার সীমাবদ্ধতাই নয়, প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থার দুর্বলতাও সামনে নিয়ে এসেছে। প্রশ্ন হলো, এমন পরিস্থিতি কেন তৈরি হলো? বাংলাদেশ দীর্ঘদিন ধরেই টিকাদান কর্মসূচিতে দক্ষিণ এশিয়ার একটি সফল উদাহরণ হিসেবে পরিচিত ছিল। হাম প্রতিরোধে এমআর টিকা বহু বছর ধরে জাতীয় টিকাদান কর্মসূচির অংশ। তাহলে কী কারণে এত সংখ্যক শিশু সংক্রমিত হচ্ছে? বিশেষজ্ঞদের মতে, টিকাদানের আওতার ঘাটতি, কিছু এলাকায় নিয়মিত টিকাদান কার্যক্রমে বিঘ্ন, অভিভাবকদের অসচেতনতা, স্বাস্থ্যসেবার অসম বণ্টন এবং রোগ শনাক্তকরণে বিলম্ব এই সংকটকে আরও তীব্র করেছে। শহরের বস্তি এলাকা, প্রত্যন্ত অঞ্চল এবং দরিদ্র জনগোষ্ঠী বিশেষভাবে ঝুঁকির মধ্যে রয়েছে।

ঢাকা ও চট্টগ্রাম বিভাগে সর্বাধিক মৃত্যু এবং আক্রান্তের সংখ্যা প্রমাণ করে যে জনঘনত্বপূর্ণ অঞ্চলগুলোতে পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ। রাজধানীসহ বড় শহরগুলোতে যদি এ অবস্থা হয়, তাহলে গ্রামীণ ও দুর্গম অঞ্চলের প্রকৃত চিত্র আরও উদ্বেগজনক হতে পারে। সবচেয়ে বড় প্রশ্ন হলোÑআমরা কি সময়মতো সতর্ক হয়েছিলাম? যখন সংক্রমণের সংখ্যা বাড়ছিল, তখন কি জরুরি ভিত্তিতে গণটিকাদান কর্মসূচি, স্কুলভিত্তিক সচেতনতা কার্যক্রম এবং স্থানীয় প্রশাসনের সমন্বিত উদ্যোগ যথেষ্ট ছিল? বাস্তবতা বলছে, প্রতিক্রিয়া এসেছে, কিন্তু তা পরিস্থিতির তুলনায় যথেষ্ট দ্রুত ও কার্যকর ছিল না।

এখন আর দায় এড়ানোর সুযোগ নেই। সরকারকে অবিলম্বে জরুরি জাতীয় কর্মপরিকল্পনা গ্রহণ করতে হবে। ঝুঁকিপূর্ণ এলাকাগুলো চিহ্নিত করে বিশেষ টিকাদান অভিযান পরিচালনা, হাসপাতালগুলোতে শিশু চিকিৎসা সক্ষমতা বৃদ্ধি, পর্যাপ্ত ওষুধ সরবরাহ নিশ্চিত করা এবং গণমাধ্যমের মাধ্যমে ব্যাপক সচেতনতা তৈরি করা জরুরি। একই সঙ্গে প্রতিটি শিশুর টিকাদান নিশ্চিত করতে স্থানীয় সরকার, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, ধর্মীয় নেতৃবৃন্দ এবং সামাজিক সংগঠনগুলোকে সম্পৃক্ত করতে হবে।

একটি সভ্য রাষ্ট্রে প্রতিরোধযোগ্য রোগে শত শত শিশুর মৃত্যু কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য হতে পারে না। হাম এমন একটি রোগ, যার কার্যকর টিকা বহুদিন ধরেই বিদ্যমান। সুতরাং এই মৃত্যুগুলো কেবল রোগের কারণে নয়, বরং অব্যবস্থাপনা, উদাসীনতা এবং সমন্বয়হীনতারও নির্মম প্রতিফলন। আর একটি শিশুর মৃত্যুর খবর যেন আগামীকালের শিরোনাম না হয়Ñএ দায়িত্ব সরকার, স্বাস্থ্যখাত এবং সমাজের সবার। এখনই কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া না হলে এই সংকট আরও ভয়াবহ মানবিক বিপর্যয়ে রূপ নিতে পারে। শিশুর জীবন রক্ষায় অবিলম্বে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিতে হবে। কারণ আজকের শিশুই আগামী দিনের ভবিষ্যৎ। শিশুদের প্রতি অবহেলার পরিণতি জাতিকে খুব নির্মমভাবেই দিতে হবে। তাই যেটুকু সময় নষ্ট হয়েছে, যেটুকু অবহেলা হয়েছে, আর যেন তা না হয়।