চলতি মৌসুমে বাংলাদেশ থেকে হজ¦ পালনের উদ্দেশে ইতোমধ্যে ৬৫ হাজারের বেশি হজ¦যাত্রী সৌদি আরবে পৌঁছেছেন। ধর্মবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, এবার হজ¦যাত্রী পরিবহনে ১৬৯টি ফ্লাইট পরিচালিত হয়েছে এবং সামগ্রিক ব্যবস্থাপনায় অতীতের তুলনায় শৃঙ্খলা ও সমন্বয়ের ইতিবাচক চিত্র দেখা গেছে। বিশেষ করে বিমান বিলম্ব, টিকিট জটিলতা, আবাসন বিশৃঙ্খলা কিংবা ফ্লাইট ব্যবস্থাপনায় বড় ধরনের ভোগান্তির অভিযোগ এবার তুলনামূলকভাবে কম শোনা গেছে। এটি নিঃসন্দেহে স্বস্তিদায়ক এবং সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের জন্য একটি ইতিবাচক অর্জন।
গত কয়েক বছর ধরে হজ¦ ব্যবস্থাপনা নিয়ে যে সমালোচনা ছিল, বিশেষত ফ্লাইট সংকট, অতিরিক্ত ভাড়া, এজেন্সির অব্যবস্থাপনা ও বিমানবন্দরে দীর্ঘ দুর্ভোগ, তার তুলনায় এবারের পরিস্থিতি অনেক বেশি নিয়ন্ত্রিত ও সুশৃঙ্খল বলে প্রতীয়মান হচ্ছে। অন্তর্বর্তী সরকারের সময় থেকে যে প্রশাসনিক সমন্বয় ও তদারকির উন্নতি শুরু হয়েছিল, তার ধারাবাহিকতা এবারও বজায় রয়েছে। একটি বৃহৎ ধর্মীয় আয়োজনকে নির্বিঘ্ন রাখার ক্ষেত্রে এটি গুরুত্বপূর্ণ দৃষ্টান্ত। তবে এই স্বস্তির মধ্যেও একটি বেদনাদায়ক বাস্তবতা আমাদের গভীরভাবে ভাবিয়ে তোলে। হজে¦র আনুষ্ঠানিক কার্যক্রম পুরোপুরি শুরু হওয়ার আগেই ১৮ জন বাংলাদেশি হজ¦যাত্রীর মৃত্যু হয়েছে। তাঁদের মধ্যে অধিকাংশই বয়স্ক। মক্কা ও মদিনার আবহাওয়া, দীর্ঘ ভ্রমণ, শারীরিক ক্লান্তি এবং পূর্ববর্তী নানা রোগ জটিলতা অনেক সময় বয়স্ক হাজীদের জন্য বড় ঝুঁকি তৈরি করে। ফলে এ মৃত্যুগুলো কেবল ব্যক্তিগত ট্র্যাজেডি নয়, বরং আমাদের সামগ্রিক স্বাস্থ্য প্রস্তুতি ও সচেতনতার প্রশ্নও সামনে নিয়ে আসে।
বাংলাদেশ থেকে হজে¦ যাওয়া মানুষের বড় একটি অংশ এখনো প্রবীণ। অনেকে বহু বছর সঞ্চয় করে জীবনের শেষপ্রান্তে এসে হজ¦ পালনের সুযোগ পান। আবেগ, ধর্মীয় আকাক্সক্ষা ও সামাজিক বাস্তবতার কারণে অনেকেই শারীরিক সক্ষমতার সীমাবদ্ধতা সত্ত্বেও হজ¦যাত্রায় অংশ নেন। যদিও সাম্প্রতিক বছরগুলোতে তরুণ ও মধ্যবয়সি মানুষের অংশগ্রহণ বেড়েছে, তারপরও বয়স্ক হাজীর সংখ্যাই বেশি। তাই তাঁদের জন্য বিশেষ স্বাস্থ্যসেবা, পূর্বপ্রস্তুতি ও স্বাস্থ্যঝুঁকি ব্যবস্থাপনা আরও জোরদার করা সময়ের দাবি।
এক্ষেত্রে শুধু আনুষ্ঠানিক স্বাস্থ্য পরীক্ষা করলেই দায়িত্ব শেষ হয়ে যায় না। প্রয়োজন কার্যকর স্বাস্থ্যসচেতনতা কর্মসূচি। হজে¦র আগে হাজীদের জন্য বাধ্যতামূলক স্বাস্থ্য প্রশিক্ষণ, তীব্র গরমে চলাফেরা, পানিশূন্যতা প্রতিরোধ, ডায়াবেটিস ও হৃদরোগ নিয়ন্ত্রণ, নিয়মিত ওষুধ সেবন এবং জরুরি পরিস্থিতিতে করণীয় বিষয়ে বাস্তবভিত্তিক নির্দেশনা থাকা জরুরি। একইসঙ্গে পরিবার ও হজ¦ এজেন্সিগুলোকেও এ বিষয়ে দায়িত্বশীল হতে হবে। সৌদি আরবে স্থাপিত বাংলাদেশি চিকিৎসা কেন্দ্রগুলো থেকে ইতোমধ্যে বিপুলসংখ্যক চিকিৎসাসেবা ও ব্যবস্থাপত্র প্রদান করা হয়েছে। এটি ইতিবাচক উদ্যোগ। তবে প্রশ্ন হলো, এ সেবা কতটা সহজপ্রাপ্য, বিশেষত বয়স্ক ও অসুস্থ হাজীদের জন্য? ভাষাগত সমস্যা, অতিরিক্ত ভিড় কিংবা চলাচলের সীমাবদ্ধতার কারণে অনেকে সময়মতো চিকিৎসা পান না। তাই মেডিকেল টিমের সংখ্যা বৃদ্ধি, মোবাইল মেডিকেল ইউনিট চালু এবং উচ্চঝুঁকিপূর্ণ হাজীদের জন্য বিশেষ পর্যবেক্ষণ ব্যবস্থা গড়ে তোলা প্রয়োজন।
হজ¦ কেবল একটি ধর্মীয় ইবাদত নয়; এটি বিশাল মানবসমাগমের একটি জটিল ব্যবস্থাপনাও। এখানে প্রশাসনিক দক্ষতার পাশাপাশি মানবিক সংবেদনশীলতাও সমান গুরুত্বপূর্ণ। একজন হাজীর মৃত্যু শুধু একটি পরিসংখ্যান নয়, একটি পরিবারের স্বপ্নভঙ্গ, একটি জীবনের সমাপ্তি। তাই হজ¦ ব্যবস্থাপনায় সাফল্যের মূল্যায়ন করতে হলে শুধু কতজন যাত্রী পৌঁছেছেন বা কতটি ফ্লাইট পরিচালিত হয়েছে তা নয়, বরং হাজীদের নিরাপত্তা, স্বাস্থ্য ও মর্যাদাপূর্ণ সেবাপ্রাপ্তিও সমান গুরুত্ব দিয়ে দেখতে হবে। আমরা আশা করব, এবারের অভিজ্ঞতা থেকে শিক্ষা নিয়ে আগামী বছরগুলোতে হজ¦ ব্যবস্থাপনায় স্বাস্থ্যসুরক্ষা ও বয়স্কবান্ধব উদ্যোগ আরও শক্তিশালী করা হবে। হজ¦যাত্রা যেন শুধু নির্বিঘ্নই না হয়, বরং নিরাপদ ও মানবিকও হয়, সেটিই হওয়া উচিত সংশ্লিষ্ট সকল পক্ষের প্রধান অঙ্গীকার।