আপিল বিভাগে মামলার চূড়ান্ত নিষ্পত্তির আগেই সুপ্রিম কোর্ট সচিবালয়ের কার্যক্রম বিলুপ্ত করেছে সরকার। গত মঙ্গলবার সুপ্রিম কোর্ট সচিবালয়ের কার্যক্রম আনুষ্ঠানিকভাবে বিলুপ্ত করে সেখানে কর্মরত ১৫ জন বিচারককে আইন মন্ত্রণালয়ে সংযুক্ত করে প্রজ্ঞাপন জারি করা হয়। এরও আগে নির্বাহী বিভাগ থেকে বিচার বিভাগকে পৃথক করে ‘সুপ্রিম কোর্ট সচিবালয় অধ্যাদেশ, ২০২৫’ জারি করেছিল অন্তর্বর্তী সরকার। পরে অধ্যাদেশটি বাতিল করে বিএনপি সরকার।

তবে সুপ্রিম কোর্ট সচিবালয়ের কার্যক্রম বিলুপ্ত করার বিষয়টি খুবই দুঃখজনক। এ ঘটনায় মারাত্মক প্রতিক্রিয়া হয়েছে বলে পত্রিকান্তরে প্রকাশিত খবরে বলা হয়েছে। এ খবরে বিস্ময় প্রকাশ করেছেন হাইকোর্ট। খবরে বলা হয়, বুধবার সকালে বিচারপতি আহমেদ সোহেলের নেতৃত্বাধীন বেঞ্চে বিলুপ্তির প্রজ্ঞাপন উপস্থাপন করা হলে আদালত রাষ্ট্রপক্ষের কাছে জানতে চান, ‘এটি কীভাবে সম্ভব?’ পরে রিটকারী আইনজীবী শিশির মনির জানান, মামলার চূড়ান্ত নিষ্পত্তির আগেই সচিবালয়ের কার্যক্রম বিলুপ্ত করায় হাইকোর্ট বিস্ময় প্রকাশ করেছেন। একই সঙ্গে তিনি বলেন, এ পদক্ষেপ আদালত অবমাননার শামিল। সুপ্রিম কোর্ট সচিবালয় বিলুপ্ত করায় বিদেশিদের কাছেও বাংলাদেশের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন হয়েছে।

এর আগে বিচার বিভাগ পৃথককরণ সংক্রান্ত রায়ে হাইকোর্ট তিন মাসের মধ্যে সচিবালয় প্রতিষ্ঠার নির্দেশ দেন। পরে ওই রায়ের বিরুদ্ধে আপিল করার সিদ্ধান্ত নেয় রাষ্ট্রপক্ষ। যদিও এখনো আপিল করা হয়নি। একই সঙ্গে হাইকোর্ট রাষ্ট্রপক্ষের কাছে আশা প্রকাশ করেন, চূড়ান্ত নিষ্পত্তির আগে যেন সচিবালয়ের কার্যক্রম বন্ধ না করা হয়। সুপ্রিম কোর্ট সচিবালয় বিলুপ্ত করে বিচারকদের আইন মন্ত্রণালয়ে ফিরিয়ে নেয়ার ঘটনায় প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন আইনজীবীরা। আইনজীবীদের দাবি, বিচারকদের আইন মন্ত্রণালয়ে ফিরিয়ে নেয়ায় ‘মারাত্মক আদালত অবমাননা’ হয়েছে।

অন্যদিকে রাজনৈতিক দলগুলো এ ঘটনায় তীব্র প্রতিক্রিয়া জানিয়ে এর নিন্দা করেছে। বিচার বিভাগীয় সচিবালয়কে বিলুপ্ত করা বিচার বিভাগের ওপর চপেটাঘাত হিসেবে বর্ণনা করেছে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী। বৃহস্পতিবার দুপুরে বিচারবিভাগীয় সচিবালয় বিলুপ্ত করার প্রতিবাদে রাজধানীতে জামায়াতের কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে এক সংবাদ সম্মেলনে একথা বলা হয়। সংবাদ সম্মেলনে বক্তব্য রাখেন সিনিয়র আইনজীবী অ্যাডভোকেট শিশির মোহাম্মদ মনির। অ্যাডভোকেট শিশির মনির বলেন, ‘বিগত সময়ে বিচার বিভাগীয় সচিবালয়কে বিলুপ্ত করার মাধ্যমে বিচার বিভাগের ওপর মূলত একটি চপেটাঘাত করা হয়েছে। এর মাধ্যমে জাতীয়ভাবে যে ট্রাস্ট ও কনফিডেন্স তৈরি হয়েছিল, তা ধ্বংস করে দেয়া হয়েছে। জনগণের আস্থার জায়গাটি ধ্বংস করা হয়েছে। একইসাথে এ কাজের মাধ্যমে বিচার বিভাগের স্বাধীনতার পথ রুদ্ধ করা হয়েছে।

জাতীয় নাগরিক পাটি (এনসিপি) সমর্থিত ন্যাশনাল লয়ার্স অ্যালায়েন্সও এ ঘটনার প্রতিবাদে সুপ্রিম কোর্টে ব্রিফিং দেয়। এনসিপির আইনজীবী ফোরামের নেতা জহিরুল ইসলাম মুসা বলেন, স্বাধীন ও পৃথক সচিবালয় প্রতিষ্ঠার জন্য মানুষের, বিচারকদের যে আকাক্সক্ষা, সেটিতে বিএনপি সরকার খুবই বাজে একটি হস্তক্ষেপ করেছে। সচিবালয় প্রতিষ্ঠার সময় উচ্ছ্বাস প্রকাশ করা বর্তমান আইনমন্ত্রী ও অ্যাটর্নি জেনারেলের নীরবতা নিয়েও কড়া সমালোচনা করেন তারা। অন্যান্য দল ও সংগঠনও প্রতিবাদ জানিয়েছে।

গত মঙ্গলবার আইন মন্ত্রণালয় প্রজ্ঞাপনের মাধ্যমে সুপ্রিম কোর্ট সচিবালয়ের কার্যক্রম আনুষ্ঠানিকভাবে বিলুপ্ত ঘোষণা করার পর থেকেই এই প্রতিবাদ চলছে। একই সঙ্গে সেখানে কর্মরত ১৫ বিচারককে আইন মন্ত্রণালয়ে সংযুক্ত করার সমালোচনা করা হচ্ছে।

আমরা মনে করি উক্ত সচিবালয় বিলুপ্ত করার ঘটনা ২০২৪ সালে ৫ আগস্টের ছাত্রজনতার অভ্যুত্থানের চেতনার সঙ্গে সাংঘর্ষিক। স্বৈরাচার পতনের পর রাষ্ট্র সংস্কারের যে গণদাবি এসেছিল তার সাথে এই কর্মকাণ্ডের মিল খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না।

বিচার বিভাগ নির্বাহী বিভাগ থেকে আলাদা করার দাবি ছিল দীর্ঘ দিনের। আদালতের রায়ও ছিল। অন্তর্বর্তী সরকার ‘সুপ্রিম কোর্ট সচিবালয় অধ্যাদেশ, ২০২৫’ জারি করেছিল। বিএনপি সরকার সে অধ্যাদেশ বাতিল করে দিয়ে সেই চেতনায় আঘাত হেনেছে। এর আগে দেয়া বিচার বিভাগ পৃথককরণ-সংক্রান্ত হাইকোর্টের রায়ে তিন মাসের মধ্যে পৃথক সচিবালয় গঠনের নির্দেশনা ছিল। একই সঙ্গে হাইকোর্ট আশা প্রকাশ করেছিল, মামলার চূড়ান্ত নিষ্পত্তির আগে সচিবালয়ের কার্যক্রম বন্ধ করা হবে না। আমরা মনে করি, তা করার মধ্য দিয়ে বিচার বিভাগের স্বাধীনতার পথটি কঠিন করে তোলা হয়েছে। এর পরেও বলবো বিচার বিভাগ পৃথক করা ও আলাদা সচিবালয় প্রতিষ্ঠার বিষয়টি গুরুত্বের সাথে ভাবা উচিত। আমরা আহ্বান জানাই বিচার বিভাগকে সমুন্নত রাখার ব্যাপারে সরকার প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেবে।