সাধারণ জ্ঞানে এবং ধারণার ভিত্তিতে কথা বলাটা এখন যেন একটা রেওয়াজ হয়ে উঠেছে। অথচ আমরা জানি, কোনো বিষয়ে কথা বলতে হলে সে বিষয়ে বিশেষ জ্ঞান থাকা প্রয়োজন। এই বিষয়টিকে এখন তেমন মান্য করা হচ্ছে না। সাধারণ মানুষের কথা না হয় বাদ দিলাম, কিন্তু মাননীয় মন্ত্রী বাহাদুররাও যদি ধারণার ভিত্তিতে কথা বলেন, তাহলে জ্ঞানভিত্তিক সমাজ গড়ে উঠবে কেমন করে? এমন প্রশ্ন জাগার কারণ রয়েছে। ধর্ষকের সর্বোচ্চ শাস্তি প্রকাশ্যে মৃত্যুদণ্ড প্রদানকে মধ্যযুগীয় বিষয় বলে মন্তব্য করেছেন আমাদের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহ উদ্দিন আহমদ। তার এমন মন্তব্য গ্রহণ করতে পারেনি দেশের বিভিন্ন রাজনৈতক দল ও আলেম সমাজ। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর মন্তব্যের প্রতিবাদ জানিয়ে এক বিবৃতিতে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর সেক্রেটারি জেনারেল মিয়া গোলাম পরওয়ার বলেন, মাননীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ধর্ষকের সর্বোচ্চ শাস্তি প্রকাশ্যে মৃত্যুদণ্ড প্রদানকে মধ্যযুগীয় বিষয় বলে মূলত তিনি রাসূল (সা.)-এর বিচার ব্যবস্থাকে অবজ্ঞা করেছেন। দেশের মুসলিম জনগোষ্ঠী মনে করে, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর এই মন্তব্য রাসূল (সা.)-এর প্রতি চরম অবমাননার শামিল। গোলাম পরওয়ার আরো বলেন, সরকারি দলের নীতিনির্ধারকগণ প্রায়শই ‘মদিনা সনদের আলোকে রাষ্ট্র পরিচালনা’ এবং ‘শরীয়া বিরোধী কোন আইন প্রণয়ন না করার’ মৌখিক অঙ্গীকার ব্যক্ত করে থাকেন। অথচ বাস্তব ক্ষেত্রে ইসলামী শরীয়া আইনকে ‘মধ্যযুগীয়’ বলে হেয়প্রতিপন্ন করার মাধ্যমে তাদের আদর্শিক দেউলিয়াত্ব, সস্তা রাজনৈতিক অবস্থান এবং চরম দ্বিচারিতারই বহিঃপ্রকাশ ঘটলো।
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর মন্তব্য দেশের মুসলিম জনগোষ্ঠীর ধর্মীয় অনুভূতিতে চরম আঘাত হেনেছে এবং তাদের ক্ষুব্ধ করেছে। দেশের ধর্মপ্রাণ নাগরিক সমাজ মনে করে, এই মন্তব্যের মাধ্যমে স্বারাষ্ট্রমন্ত্রী ইসলামী শরিয়া আইনের প্রতি চরম অবমাননা প্রদর্শন করেছেন-এমন বিশ্লেষণের পর গোলাম পরওয়ার বলেন, অবমাননাকর মন্তব্য প্রত্যাহার করার জন্য আমরা স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর প্রতি আহ্বান জানাচ্ছি। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী তার মন্তব্য প্রত্যাহার করবেন কিনা তা আমরা জানি না। তবে ‘মধ্যযুগীয়’ শব্দটি নিয়ে কিঞ্চিৎ আলোচনা করা প্রয়োজন। ‘মধ্যযুগীয়’ শব্দটির বিবিধ ব্যবহার আমরা লক্ষ্য করেছি। এর একটি হলো এই শব্দটি দিয়ে ইসলামকে, মুসলমানদেরকে ‘পশ্চাৎপদও ‘বিজ্ঞান বিরোধী’ হিসেবে চিহ্নিত করা। মূর্খতাপূর্ণ এবং উদ্দেশ্যপ্রণোদিত এমন চিহ্নিতকরণকে আমরা অবজ্ঞা করি। কারণ এর সাথে ইতিহাস কিংবা সত্যের কোনো সম্পর্ক নেই। আসলে মধ্যযুগে ইউরোপ ছিল অন্ধকারে। বিজয়ী মুসলমানদের সংস্পর্শে এসে ইউরোপ বিজ্ঞানের সাথে প্রথমে পরিচিত হয়। তারপর ১৪০০ সালে ইউরোপে রেনেসাঁর সূত্রপাত হয়। সম্পাদকীয়ের ক্ষুদ্র পরিসরে এখানে ইতিহাসের বিস্তৃত বিবরণের সুযোগ নেই। শুধু এটুকু বলবো, মধ্যযুগে ইউরোপ অন্ধকারে থাকলেও মুসলিম বিশ্ব ছিল বিজ্ঞান চর্চায় প্রাগ্রসর ও সমুজ্জ্বল।
এখানে বলে রাখা ভালো যে, ‘ধর্ষকের সর্বোচ্চ শাস্তি প্রকাশ্যে মৃত্যুদণ্ড’ প্রদানকে কখনো ‘মধ্যযুগীয়’ বিধান বলে মন্তব্য করা যায় না। আল্লাহ ও রসূল প্রদত্ত বিধান ইতিহাসের কোনো এক পর্যায়ে অবতীর্ণ বা জারি হলেও তা শ্বাশত এবং মানবজাতির জন্য কল্যাণপ্রদ ও বাস্তবসম্মত। সেক্যুলার সভ্যতায় যারা পরিগঠিত ও পরিপুষ্ট তারা আসমানী বিধানের তাৎপর্য উপলব্ধি করবেন কেমন করে? এ জন্য তো কিছু পঠন-পাঠন প্রয়োজন এবং রাসূল (সা.)-এর সমাজ ও শাসন ব্যবস্থার তাৎপর্য উপলব্ধির প্রয়োজন। অথচ এসব ব্যাপারে সমুদ্রসম অজ্ঞতা নিয়ে বর্তমান সময়ে কেউ কেউ রাসুল (সা.) এর বিচার ব্যবস্থাকে ‘মধ্যযুগীয়’ বলে অবজ্ঞা করতে চাইছেন। এদের প্রতি এইটুকুই নসিহত, শুধু মুখে মদিনা সনদের কথা না বলে, ওই স্বর্ণালী সময়টাকে একটু জানুন।