যুদ্ধের তো কারণ থাকে, তবে সব কারণ সঙ্গত হয় না। অসঙ্গত কারণের মাত্রাও এক রকম হয় না। যেমন ইরান যুদ্ধ। ইসরাইলের প্রধানমন্ত্রী নেতানিয়াহুর ফাঁদে পা দিয়ে এখন ট্রাম্প কী করছেন? দ্বিতীয় দফায় প্রেসিডেন্ট হয়ে ট্রাম্প যেসব কর্মকাণ্ড চালিয়ে যাচ্ছেন, তা স্বাভাবিক বলে ভাবা যায় না। তাই নিউইয়র্ক টাইমস-এর মতো পত্রিকাও প্রথম পাতায় প্রশ্ন তুলেছে, লোকটা কি ‘ইনসেইন’-মানে পাগাল? এটা শুধু নিউইয়র্ক টাইমসের প্রশ্ন নয়, বিশ্ববাসীরও প্রশ্ন, লোকটা কি পাগল? এমন পাগল তো যুদ্ধটা সহজেই বাধাতে পারেন, কিন্তু যুদ্ধ বন্ধের পথ তার জানা আছে কী? আর নেতানিয়াহুর পরামর্শে চললে তো যুদ্ধ বন্ধের বিষয়টা অনিশ্চিত হয়ে পড়বে, কারণ ইসরাইলি প্রধানমন্ত্রীর ‘গ্রেটার ইসরাইল’ পরিকল্পনা তো যুদ্ধ বন্ধ হতে দেবে না।

যুদ্ধ বন্ধে ইরানের দেওয়া প্রস্তাব নিয়ে অসন্তোষ প্রকাশ করেছেন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। শিগগিরই ইরানের সঙ্গে যুদ্ধ শেষ করবেন না, এমন হুমকিও দিয়েছেন তিনি। এমন পরিস্থিতিতে আবার যুদ্ধ শুরুর আশংকা করছে তেহরান। ইরানে নতুন করে যে কোনো হামলার কড়া জবাব দিতে প্রস্তুত রয়েছে বলে জানিয়েছেন দেশটির সামরিক বাহিনী। এর আগেই এক্সিওসের খবরে বলা হয়েছিল, ইরানে ‘স্বল্পমেয়াদি ও শক্তিশালী’ হামলা চালানোর প্রস্তুতি নিচ্ছে মার্কিন বাহিনী। এরই মধ্যে শুক্রবার মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তর জানিয়েছে, মধ্যপ্রাচ্যে মিত্র দেশ ইসরাইল, কুয়েত, কাতার ও আরব আমিরাতে ৮৬০ কোটি ডলারের অস্ত্র বিক্রির অনুমোদন দিয়েছে তারা। এদিকে আবার যুদ্ধ শুরুর আশঙ্কার মধ্যে শান্তি ফেরাতে দৌড়ঝাঁপ শুরু করেছে মধ্যস্থতাকারী পাকিস্তানসহ বিভিন্ন দেশ। আঞ্চলিক পরিস্থিতি নিয়ে শনিবার ফোনালাপ করেছেন পাকিস্তান ও কুয়েতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী। এ যুদ্ধ শেষ করতে রাশিয়া যে কোনো সহায়তা করতে প্রস্তুত বলে জানিয়েছেন দেশটির পররাষ্ট্রমন্ত্রী সের্গেই লাভরভ। আর যুদ্ধবিরতি জারি রাখার আহ্বান জানিয়েছে বেইজিং। এসব সদিচ্ছার কোনো প্রভাব এই যুদ্ধে পড়ে কিনা সেটাই এখন দেখার বিষয়।

ইরানের নতুন প্রস্তাবে কী আছে, তা ইরান বা যুক্তরাষ্ট্র কেউই স্পষ্ট করে জানায়নি। তবে ইরানের এক জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা রয়টার্সকে বলেছেন, যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলে ইরান হামলা চালাবে না, হরমুজ প্রণালি খুলে দেওয়া হবে এবং যুক্তরাষ্ট্র ইরানের বন্দরে অবরোধ প্রত্যাহার করবে। এই তিন নিশ্চয়তার ভিত্তিতে প্রথমে যুদ্ধ বন্ধ হবে। পরবর্তী আলোচনা হবে ইরানের পরমাণু কার্যক্রম সীমিত করার বিষয়ে। এর বিনিময়ে তেহরানের ওপর থেকে পশ্চিমা নিষেধাজ্ঞা তুলে নিতে হবে। পরিচয় প্রকাশ না করার শর্তে ইরানের ওই কর্মকর্তা বলেন, নতুন প্রস্তাবের রূপরেখা অনুযায়ী পরমাণু কর্মসূচির মতো বেশি জটিল বিষয় চূড়ান্ত ধাপে আলোচনার জন্য রাখা হবে। এর উদ্দেশ্য হলো, ওই আলোচনার জন্য একটি অনুকূল পরিবেশ তৈরি করা। এ প্রস্তাব বিষয়ে হোয়াইট হাউসে সাংবাদিকদের ট্রাম্প বলেন, ‘তারা (ইরান) একটি চুক্তি করতে চায়, তবে আমি এটি নিয়ে সন্তুষ্ট নই। তারা এমন কিছু চাচ্ছে, যাতে আমি একমত হতে পারি না। পরে ফ্লোরিডায় দেওয়া এক ভাষণে মার্কিন প্রেসিডেন্ট বলেন, ‘আমরা তাড়াহুড়ো করে (ইরান) ছেড়ে যাবো না, যাতে করে তিন বছরের মধ্যে আবারও একই ধরনের সমস্যা দেখা দেয়।’ ট্রাম্প তো এখনই ইরান ছেড়ে যেতে চাইছেন না। কিন্তু ইরান কি চাইছে, তাদের মূল্যায়ন কী? চলমান পরিস্থিতিতে ইরানের মূল্যান হলো, যুদ্ধের আগের পরমাণু কর্মসূচি নিয়ে আলোচনা থেকে শুরু করে যুদ্ধবিরতি পর্যন্ত সর্বত্রই তারা যথেষ্ট নমনীয়তা দেখিয়েছে। তবে ওয়াশিংটনের পক্ষ থেকে তেমন কোনো ইতিবাচক সাড়া পাওয়া যায়নি। যুদ্ধ বন্ধের আলোচনায় ইরান যখনই নিজেদের দাবি কিছুটা শিথিল করেছে, তখনই যুক্তরষ্ট্র আরও বেশি আক্রমণাত্মক হয়ে উঠেছে। ইরানের সামরিক দপ্তরের একটি বিবৃতিতেও যুক্তরাষ্ট্রের প্রতি অবিশ্বাসই ফুটে উঠেছে। একে বলা হয়েছে, যুদ্ধ যে কেনো সময় আবার শুরু হয়ে যেতে পারে বলে আশংকা করছে তেহরান। কারণ, আন্তর্জাতিক আইনের প্রতি ওয়াশিংটনের শ্রদ্ধাশীল হওয়ার কোনো প্রমাণ পাওয়া যাচ্ছে না। যুক্তরাষ্ট্রের যে কোনো দুঃসাহসিক পদক্ষেপ বা বোকামির কড়া জবাব দিতে তারা পুরোপুরি প্রস্তুত। উপলব্ধি করা যায়, ইরান যুদ্ধ আসলে আগ্রাসন ও আত্মরক্ষার যুদ্ধ। আগ্রাসনের নায়ক হলেন নিউইয়ক টামইস-এর ভাষায় একজন ‘ইনসেইন’ বা পাগল। তার সুমতির জন্য আমরা স্রষ্টার কাছে প্রার্থনা করতে পারি।