পবিত্র ঈদুল আযহা আসন্ন। ঈদ উপলক্ষে লাখ লাখ নগরবাসী গ্রামের বাড়িতে যাবেন। প্রতিটি জাতীয় ও ধর্মীয় উৎসবে মানুষ মাটির টানে উৎসে ফিরে যান, স্বজনদের সঙ্গে আনন্দ ভাগাভাগি করেন। গ্রামের সঙ্গে তাদের আত্মিক সম্পর্কটি এখনো অটুট রয়ে গেছে। এটি আমাদের সামাজিক সংহতিকেও সুদৃঢ় করে। বছরের অন্যান্য সময়ে ছুটিছাঁটা তেমন পাওয়া যায় না বলেই ঈদের সময় অনেক বেশি মানুষ শহর থেকে গ্রামে যান। আবার অনেকে আনন্দ ভ্রমণের জন্যও এ সময়টি বেছে নেন।

এ যে ঈদে মাটির টানে বাড়ি ফেরা নারী-পুরুষ ও শিশুর যাত্রাকে নিরাপদ করা সরকারসহ সংশ্লিষ্ট সবার দায়িত্ব। ঈদের সময় নৌ, সড়ক ও রেলপথে যানবাহনের সংখ্যা অনেক বাড়ানো হয়। কিস্তু তারপরও যাত্রীর সংখ্যার তুলনায় তা অপ্রতুল। ফলে এক ধরনের অসুস্থ প্রতিযোগিতা লক্ষ্য করা যায়, যা অনেক সময় প্রাণঘাতী দুর্ঘটনার কারণ হয়ে দাঁড়ায়। প্রতি বছর ঈদ যাত্রায় মানুষের দুর্ভোগের সীমা থাকে না। গুণতে হয় অতিরিক্ত ভাড়া। লক্কড় ঝক্কর বাসের কারণে ও অবহেলা জনিত সড়ক দুর্ঘটনা ও অতিরিক্ত যাত্রীর কারণে নৌ দুর্ঘটনায় বহু প্রাণহানি ঘটে।

পত্রিকান্তরে প্রকাশিত এক খবরে বলা হয়েছে, ঈদযাত্রা নিশ্চিত করতে ফিটনেসবিহীন যানবাহন চলাচল বন্ধের সুপারিশ জানানো হয়েছে। এতে বলা হয়, ২০২৫ সালের তুলনায় ২০২৬ সালের ঈদুল ফিতরের সময় যাত্রায় সড়ক দুর্ঘটনা ও প্রাণহানীর ঘটনা উদ্বেগজনকহারে বৃদ্ধি পেয়েছে। যা দেশের সড়ক নিরাপত্তা ব্যবস্থার দুর্বলতাকে আবারও সামনে নিয়ে এসেছে। বুধবার দুপুরে রাজধানীর শ্যামলীতে ঢাকা আহ্ছানিয়া মিশন স্বাস্থ্য সেক্টরের সভাকক্ষে “রোডক্র্যাশ রোধে নিরাপদ ঈদযাত্রায় করণীয়” শীর্ষক সাংবাদিকদের সাথে এক মতবিনিময় সভায় এ সুপারিশ জানানো হয়। পবিত্র ঈদুল ফিতরের আগে-পরে ১৫ দিনে দেশে ৩৭৩টি সড়ক দুর্ঘটনায় ২৯৮ জন নিহত হয়েছেন বলে জানিয়েছে রোড সেফটি ফাউন্ডেশন। প্রতিদিন গড়ে নিহত হয়েছেন ২০ জন।

মতবিনিময় সভায় সরকারের প্রতি জরুরি কিছু সুপারিশ তুলে ধরে বলা হয়েছে, ঈদযাত্রাকে নিরাপদ করতে এখনই কার্যকর উদ্যোগ গ্রহণ না করলে পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ হতে পারে। তাই মহাসড়কে যানবাহনের গতি নিয়ন্ত্রণ, ফিটনেসবিহীন যান চলাচল বন্ধ, চালকদের পর্যাপ্ত বিশ্রাম নিশ্চিত করা এবং গুরুত্বপূর্ণ পয়েন্টগুলোতে মোবাইল কোর্ট পরিচালনার ওপর জোর দিয়েছে ঢাকা আহ্ছানিয়া মিশন। এছাড়াও ঈদের আগে ও পরে মহাসড়কে পণ্যবাহী ট্রাক চলাচল সীমিত করা, স্পিডগানের মাধ্যমে অতিরিক্ত গতি নিয়ন্ত্রণ, টোল প্লাজায় দ্রুত ডিজিটাল বুথ চালু এবং অতিরিক্ত ভাড়া আদায় বন্ধে ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনার কথা বলা হয়।

সভায় বক্তারা বলেন, হাইওয়েতে রোডক্র্যাশ কমাতে পর্যাপ্ত সংখ্যাক হাইওয়ে পুলিশ মোতায়েন করা প্রয়োজন। বাসটার্মিনাল থেকে যাতে ফিটনেসবিহীন বাস বের হতে না পারে সেই ব্যবস্থা নিশ্চিত করা জরুরি। ঈদের সময় টোলপ্লাজায় বা ব্রিজের উপর গাড়ির লম্বা লাইনের জন্য যানজটের সৃষ্টি হয়। এ যানজট নিরসেন টোলপ্লাজায় বুথ বাড়ানো দরকার। তারা বলেন, দেশে অনেক আইন প্রণয়ন হলেও সেসব আইনের বিভিন্ন ফাঁকফোকড়ের সুযোগ নিয়ে অপরাধীরা সহজেই পার পেয়ে যায়। সড়ক পরিবহন আইনেও এমন কিছু দুর্বলতা ও সীমাবদ্ধতা রয়েছে, যার কারণে কার্যকর প্রয়োগ নিশ্চিত করা সম্ভব হচ্ছে না এবং রোডক্র্যাশ কমিয়ে আনা এখনও বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে রয়েছে।

আমরা মনে করি তারা যথার্থ সুপারিশই করেছেন। সরকার বিশেষ করে সংশ্লিষ্ট সকল মন্ত্রণালয় ও বিভাগের প্রতি আহ্বান জানাই বিষয়টিকে গুরুত্বের সাথে দেখার। ঈদে মাটির টানে যাওয়া এবং ঈদের পরে ফিরে আসা যাতে স্বস্তিদায়ক হয়, সে বিষয়ে সংশ্লিষ্ট সবাইকে সর্বোচ্চ সজাগ ও সতর্ক থাকতে হবে। এ ঈদযাত্রা নিরাপদ ও নির্বিঘ্ন করা খুবই জরুরি। প্রতি বছরই দেখা যায়, এসব দুর্ঘটনায় মানুষ মারা যাওয়ার পর তদন্ত করে বলা হয় যানবাহনের ফিটনেস কিংবা অদক্ষ চালকের কথা। তবে তাদের এ গতানুগতিক রিপোর্টে আর ফিরে আসে না হারিয়ে যাওয়া মানুষগুলো। এসব দুর্ঘটনা ঘটার আগেই কর্তৃপক্ষকে আরো বেশি দায়িত্বশীল ভূমিকা রাখতে হবে। ঈদযাত্রা নিরাপদ ও নির্বিঘ্ন করতে হবে ।