ইয়াসিন মাহমুদ
বাংলাদেশের ছাত্ররাজনীতির একটি সোনালী ইতিহাস ছিল। সেই ইতিহাসের কথা আমরা বলি, শুনি। বক্তৃতায় বুলি আওড়াই। কিন্তু বর্তমান ছাত্রনেতাদের ভেতরে সেই বৈশিষ্ট্য খুব কম দেখা যাচ্ছে। বিগত কয়েক দশক ধরে ইউনিভার্সিটি ক্যাম্পাসসহ দেশের বিভিন্ন সরকারিÑবেসরকারি কলেজÑমাদরাসায় ক্ষমতাসীন ছাত্রসংগঠনগুলো তাদের আধিপত্য বিস্তারের রাজনীতি প্রথা চালু রেখেছে। ফলে ছাত্ররাজনীতির প্রতি সর্বস্তরের মানুষের মাঝে নেতিবাচক মনোভাব তৈরি হচ্ছে দিন দিন। বরাবর এই অবস্থার অবনতি ঘটছে। বিগত ১৭ বছর ছাত্রলীগের নেতা-কর্মীদের হাতে ছাত্রদল ও ছাত্রশিবিরের নেতা-কর্মীরা আহতÑনিহত হয়েছেন। ছাত্রলীগের সেই নির্মমÑনিষ্ঠুর বর্বরতার দৃষ্টান্ত সবার চোখেমুখে। সাধারণ মানুষ এই সব চিত্র দেখে এখনও মূর্ছা যায়Ñবিহ্বল হয়ে পড়ে। বিগত দেড় দশকে ছাত্রদল ও ছাত্রশিবিরের অসংখ্য নেতা-কর্মী তাদের শিক্ষাজীবন সমাপ্ত না করেই ক্যাম্পাস ছাড়তে বাধ্য হয়। সাম্প্রতিক সময়ে দেশের বিভিন্ন ক্যাম্পাসে সেই পুরনো সংস্কৃতির চর্চা আমরা দেখতে পেলাম। শুধু ছাত্রলীগের স্থলাভিষিক্ত হয়েছে ছাত্রদল। মাত্র তিন মাসও হয়নি সরকার গঠন করল বিএনপি। এত অল্প সময়ের ব্যবধানে দলীয় ছাত্রসংগঠনের লাগামহীনতা জনমনে বেশ ক্ষোভের সৃষ্টি করেছে। সম্প্রতি বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ঘটে যাওয়া উল্লেখযোগ্য দু’একটি ঘটনা উল্লেখ করলে বিষয়টি আরো স্পষ্ট হবে বলে মনে করি। এক. (‘গুপ্ত’ লেখা নিয়ে উত্তেজনা কেউ তেড়ে যাচ্ছেন কিরিচ হাতে, কারও হাতে লাঠিসোঁটা, ছাত্রদল-শিবির সংঘর্ষে আহত ২০, দৈনিক প্রথম আলো, ২১ এপ্রিল ২০২৬)
বিস্তারিত ঘটনা প্রবাহ হলোÑচট্টগ্রামের সরকারি সিটি কলেজে গ্রাফিতিতে ‘গুপ্ত’ শব্দ লেখা নিয়ে ছাত্রদল ও ইসলামী ছাত্রশিবিরের নেতা-কর্মীদের মধ্যে সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে। কলেজ সূত্রে জানা যায়, একটি গ্রাফিতির নিচে আগে লেখা ছিলÑ‘ছাত্ররাজনীতি ও ছাত্রলীগমুক্ত ক্যাম্পাস’। ২০ এপ্রিল সোমবার কলেজ শাখা ছাত্রদলের যুগ্ম আহ্বায়ক আবদুল্লাহ আল মামুনের নেতৃত্বে কয়েকজন নেতা-কর্মী গিয়ে ‘ছাত্র’ শব্দটি মুছে দেন। পরে সেখানে ‘গুপ্ত’ শব্দটি লিখে দেওয়া হয়।
ঘটনার একটি ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়লে দুই সংগঠনের নেতা-কর্মীদের মধ্যে উত্তেজনা ছড়ায়। সকাল থেকেই বাগ্বিতণ্ডা শুরু হয়। দুপুর ১২টার দিকে দুই পক্ষ মুখোমুখি অবস্থান নিয়ে পাল্টাপাল্টি স্লোগান দেয়। একপর্যায়ে সংঘর্ষে জড়িয়ে পড়ে তারা। দুপুরের পরে ছাত্রশিবির বিক্ষোভ মিছিল বের করলে আবার উত্তেজনা ছড়ায়। বিকেল চারটার দিকে নগরের নিউমার্কেট মোড় থেকে শিবিরের মিছিল কলেজের দিকে এলে সিটি কলেজের সামনে অবস্থান নেওয়া ছাত্রদলের নেতা-কর্মীরা তাদের ধাওয়া দেন। এতে আবার সংঘর্ষ শুরু হয়। সংঘর্ষের সময় আশপাশের দোকানপাট বন্ধ হয়ে যায়। কলেজের সামনে ছাত্রদল এবং নিউমার্কেট এলাকায় শিবিরের নেতা-কর্মীরা অবস্থান নেন। দুই পক্ষই একে অপরকে লক্ষ্য করে ইটপাটকেল নিক্ষেপ করে। কয়েকজনের হাতে ধারালো অস্ত্র এবং অনেকের হাতে লাঠিসোঁটা দেখা যায়। অবশ্য ধারালো অস্ত্রধারীরা ছাত্রদলের সাথে সম্পৃক্ত তা ইতোমধ্যে গণমাধ্যমে প্রকাশ পেয়েছে। ছাত্রদলের অস্ত্রধারীদের আঘাতে শিবির কর্মী আশরাফ হোসেনের পায়ের গোড়ালি বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়। আশরাফকে প্রথমে চট্টগ্রাম শহরের একটি বেসরকারি হাসপাতালে চিকিৎসা করানো হয়। অবস্থার অবনতি ঘটায় এখন ঢাকাতে চিকিৎসাধীন। তবে আশরাফ আদৌ স্বাভাবিক জীবনে ফিরতে পারবে কিনা তা নিশ্চিত করে বলা যাচ্ছে না। দুই. রাজধানীর শাহবাগ থানার ভেতরে ঢাবি কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদের (ডাকসু) সমাজসেবা সম্পাদক এবি জুবায়ের এবং সাহিত্য সম্পাদক মোসাদ্দেক আলী ইবনে মোহাম্মদের ওপর হামলা করেছে ছাত্রদল। সংবাদ সংগ্রহ করতে গেলে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের (ঢাবি) সাংবাদিক সমিতির সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদকসহ অন্তত ১০ সাংবাদিকের ওপর হামলা করে তারা। ২৩ এপ্রিল ২০২৬, বৃহস্পতিবার রাত ৮ টার দিকে এ ঘটনা ঘটে। এ ঘটনায় ভুক্তভোগীদের অভিযোগ, পুরো ঘটনায় শাহবাগ থানাপুলিশ নীরব দর্শকের ভূমিকা পালন করে। এ ঘটনার উৎপত্তি সম্পর্কে জানা গেছেÑ ডাকসু নির্বাচনে অংশ নেওয়া আবদুল্লাহ আল মাহমুদের নামে একটি বিতর্কিত পোস্ট ছড়িয়ে পড়াকে কেন্দ্র করে উত্তেজনা তৈরি হয়। নিরাপত্তা চেয়ে আবদুল্লাহ আল মাহমুদ, উবায়দুর রহমান হাসিব, জাবির আল হাইয়্যান এবং মোল্লা আবিদ হাসান জিডি করতে থানায় গেলে ছাত্রদল নেতাকর্মীরা থানা ঘেরাও করে। সে পরিস্থিতিতে সংবাদ সংগ্রহ করতে গিয়ে সাংবাদিকরাও হামলার শিকার হন। তিন. ‘হয় ফাঁসির কাষ্ঠে ঝুলব, নয়তো গুপ্ত শিবিরদের হত্যা করব’Ñ ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয় (ইবি) শাখা ছাত্রদলের সাবেক সভাপতি ওমর ফারুক। (দেশ রূপান্তর অনলাইন, ২৫ এপ্রিল ২০২৬।) ২৪ এপ্রিল ২০২৬, শুক্রবার বিকেলে ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ে শাখা ছাত্রদল আয়োজিত এক বিক্ষোভ মিছিলে তিনি এসব কথা বলেন। সহিংসতায় উন্মাতাল না হলে শীর্ষস্থানীয় নেতার মুখে এমন বক্তব্য শুনতে হত না। সর্বত্রই খুনের নেশা পেয়ে বসেছে সরকারি দলের নেতাÑকর্মীদের। ক্ষমতার বড়ায়ত্বের বহিঃপ্রকাশ ঘটাতে কিংবা ব্যক্তিগত খায়েশ মেটাতে এমন পথ বেছে নেয়াটা একটি গণতান্ত্রিক দেশে, গণতান্ত্রিক পরিচয় বহনকারী একটি দলের জন্য বড়ই বেমানান। এভাবে যদি মারমুখী আচরণ চলতে থাকে তাহলে সামাজিক শৃঙ্খলার বালাই থাকবে না কোথাও।
এখন যদি কোনো সচেতন নাগরিক জিজ্ঞেস করেনÑবিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে সাবেক সভাপতি ওমর ফারুকের বক্তব্য দেবার নৈতিক অধিকার কতটুকু? কারণ, তিনি বহু আগে ছাত্রজীবন শেষ করেছেন। এমনকি বর্তমান ইবি শাখা ছাত্রদলের আহ্বায়ক সাহেদ আহম্মেদেরও ছাত্রত্ব নেই। সাহেদ ২০০৭-০৮ শিক্ষাবর্ষের ছাত্র। কোন সিস্টেমে সাহেদ ইবি ক্যাম্পাসে ছাত্ররাজনীতি করেন তার সদুত্তর বিশ্ববিদ্যালয়টির কোনো শিক্ষক কিংবা ঊর্ধ্বতন মহলের কাছে আছে বলে আমার মনে হয় না। বিভিন্ন ক্যাম্পাসে এমন অছাত্রÑবহিরাগতদের দৌরাত্ম্যে সাধারণ শিক্ষার্থীরা নানাভাবে হয়রানির শিকার হচ্ছে।
এভাবেই প্রতিদিন কোথাও না কোথাও ছাত্রসংগঠনগুলোর মাঝে সংঘর্ষ, উত্তেজনা বিরাজ করছে। গত কয়েক দিনে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় (ঢাবি) এলাকার শাহবাগ, চট্টগ্রামের সরকারি সিটি কলেজ, পাবনার ঈশ্বরদী সরকারি কলেজ এবং কুমিল্লা পলিটেকনিক ইনস্টিটিউটে ছাত্রদল ও ছাত্রশিবিরের নেতাকর্মীদের মধ্যে দফায় দফায় সংঘর্ষ, ধাওয়া-পাল্টা ধাওয়ার ঘটনা ঘটেছে। এই ঘটনাগুলো সামনে আরো বেশি ঘটার আশঙ্কা করছেন বিশিষ্টজনেরা। এসব ঘটনা আমাদের ছাত্ররাজনীতিতে কোনো কল্যাণ বয়ে আনবে না। বরং বিভেদ তৈরি করবে। সামাজিক বিশৃঙ্খলা দেখা দিবে সর্বত্র। বিগত দেড় দশক এই ছাত্রসংগঠন দুটি একই সাথে আওয়ামী সরকার বিরোধী নানা কর্মসূচি পালন করেছে। অথচ খুব অল্প সময়ের ব্যবধানে পারস্পরিক বিরোধ, মতানৈক্য ও আধিপত্য বিস্তারের লড়াইয়ে অবতীর্ণ হয়েছে। যা কারো জন্য সুখবর নয়। একটু অতীতের দিকে তাকালেই দেখবোÑএই নষ্ট রাজনীতি আমাদেরকে নানাভাবে কুরে কুরে খেয়েছে। আর সেই ইতিহাস কেবলই আমাদের সামনে জ¦লজ¦ল করছে। ভালো কিংবা আলোর কোনো দৃষ্টান্ত খুবই কম। এর মূল কারণ, ক্ষমতাসীন সরকারের ছত্রছায়ায়, পৃষ্ঠপোষকতায় সরকারি দলের ছাত্রসংগঠনগুলো বরাবরই বেপরোয়া হয়ে ওঠে এমন নজির ভূরিভূরি। বিরোধী দলে থাকলে সবাই সহনশীল হবার নসিহত করলেও পাওয়ারে আসলে বেমালুম ভুলে যান। সরকার যদি ছাত্রসংগঠনগুলোর বেপরোয়া চলাফেরা ও কার্যক্রমকে কন্ট্রোল করতো তাহলে ছাত্ররাজনীতি পথ ফিরে পেত। জাতির কল্যাণে ইতিবাচক ছাত্ররাজনীতির পথ সুগম হত। বিগত আওয়ামী সরকার যেটা করতে ব্যর্থ হয়েছিল। যার পরিণাম সবার সামনে ঘটে গেল। বিগত আওয়ামী শাসনামলে পত্রিকাগুলো প্রতিনিয়ত শিরোনাম করতোÑমাননীয় প্রধানমন্ত্রী ছাত্রলীগকে সামলান। বর্তমান সরকার যদি ছাত্রদলের লাগাম টেনে ধরতে না পারে তাহলে ক্যাম্পাসগুলোতে অস্ত্রের ঝনঝনানি চলতে থাকবে। রক্ত ঝরবে। লাশের মিছিল দীর্ঘ হবে। বাবাÑমায়ের স্বপ্ন চুরমার হয়ে যাবে। পত্রিকায় বড় বড় শিরোনাম হবে, টকশোতে গরম আলাপ জমবে, চায়ের কাপে ঝড় উঠবে...। তবে আদতে দেশের জন্য কোনো ভালো খবর আসবে না। ছাত্ররাজনীতিতে ছাত্রবান্ধব কর্মসূচি থাকবে, গবেষণা ও উন্নয়ন বিষয়ক মোটিভেশন থাকবে। দেশের কল্যাণে ভূমিকা রাখার প্রয়াসে নিজেদেরকে তৈরি করবে আগামীদিনের জন্য। অথচ তারা আজ আধিপত্য বিস্তার, টেন্ডারবাজি, চাঁদাবাজি, ধর্ষণের সাথে সম্পৃক্ত। লজ্জা এ জাতির জন্য। ছাত্ররাজনীতিকে কলুষতামুক্ত করতে হলে আগে লেজুড়বৃত্তিমুক্ত করতে হবে। প্রতিটি সরকার তাদের দলীয় ছাত্রসংগঠনকে ঢাল হিসেবে ব্যবহার করে থাকে। যার ফলে সেই ছাত্রসংগঠনের নেতাÑকর্মীদের বিরুদ্ধে নানা অপকর্মের অভিযোগ থাকলেও কোনো অ্যাকশনে যেতে দেখা যায় না। ফলে ক্ষমতাসীন ছাত্রসংগঠনের নেতাÑকর্মীরা আরো আস্কারা পেয়ে থাকে। পরবর্তীতে ছোট থেকে বড় ধরনের অপরাধে জড়িত হয়। একটুখানি আয়নাতে মুখ রাখলেই স্পষ্ট দেখতে পাবো ৩৬ জুলাইয়ে কি ঘটনা ঘটেছিল। তৎকালীন আওয়ামী সরকারের মদদপুষ্ট ছাত্রলীগ ফ্যাসিস্ট হাসিনা সরকারকে বাঁচাতে পারেনি। শেষমেষ রক্ষা পায়নি।
সুতরাং সরকারের উদ্যোগ ছাড়া ক্যাম্পাসগুলোতে শিক্ষার সুষ্ঠু পরিবেশ ফিরিয়ে আনা সম্ভব নয়। ইতোমধ্যে সরকার প্রত্যেকটি ইউনিভার্সিটি, মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়, বিভিন্ন সরকারি কলেজগুলোতে দলীয় ভিসি নিয়োগের মাধ্যমে এই পথ অনেকটাই রুদ্ধ করে দিয়েছেন। দলীয় সংগঠনের ছাত্রনেতারা নানা অপকর্ম করলে কর্তব্যরত প্রতিষ্ঠান প্রধানেরা কোনো নৈতিক ভূমিকা রাখতে সক্ষম হবেন না। কারণ, তখন ঐ ছাত্রনেতারা নানা অজুহাতে ছাত্রÑআন্দোলন করে তাকে পদত্যাগে বাধ্য করবে। এই ইতিহাস কিন্তু এই সব প্রতিষ্ঠান প্রধানদের অজানা নয়। সুতরাং তারা বরাবরের মতো নীরব দর্শকের ভূমিকায় থাকবেন এটা অনেকখানি অনুমেয়। তারপরেও প্রত্যাশা ক্যাম্পাসগুলোতে ছাত্ররাজনীতি সহাবস্থান নিশ্চিত জরুরি। তাহলে ছাত্রসংগঠনগুলো মুক্তবুদ্ধি চর্চা ও বিকাশে অগ্রণী ভূমিকা পালন করতে পারবে। হানাহানির রাজনীতি বন্ধ হোক। আগামীর ক্যাম্পাস রাজনীতি হোক নিরাপদ জীবনের হাতছানি। সুশিক্ষায় আলোকিত হোক সবার মন ও মনন।
লেখক: কলামিস্ট ও গবেষক।