মুহাম্মদ খায়রুল বাশার
যুক্তরাজ্যের ৮০তম প্রধানমন্ত্রী কিয়ার স্টারমার পদত্যাগ করেছেন। দশ বছর আগে ব্রিটিশ ভোটাররা ব্রেক্সিট তথা ইউরোপীয় ইউনিয়নে (ইইউ) থাকার ধারণা প্রত্যাখ্যান করার পরের দিন, কনজারভেটিভ প্রধানমন্ত্রী ডেভিড ক্যামেরন পদত্যাগ করেছিলেন। তারপর থেকে তার পাঁচজন উত্তরসূরি একই পথ অনুসরণ করেছেন। তাদের মধ্যে কেবল একজন, ঋষি সুনাক নির্বাচনে পরাজয়ের পর পদত্যাগ করেছিলেন।
ব্রিটেনের প্রধানমন্ত্রী লর্ড কিয়ার স্টারমার তার বিদায় ভাষণে বলেন, ‘আমি আমার দলের সংশয় শুনেছি এবং তা আমি বিনয়ের সাথে মেনে নিচ্ছি।’ ‘প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালন করা আমার জীবনের সর্বশ্রেষ্ঠ সম্মান।’ ‘আমি আমার উত্তরসূরিকে আমার পূর্ণ এবং দ্ব্যর্থহীন সমর্থন দেব।’
যুক্তরাজ্যের প্রধানমন্ত্রী স্টারমার তার পদত্যাগ ভাষণে এমন কথাই বলেছিলেন। তিনটি মাত্র বাক্যে ব্রিটিশ গণতন্ত্রের সবচেয়ে শক্তিশালী পদ থেকে ভদ্রোচিতভাবে বিদায়ের বার্তা দিলেন তিনি। গত ১০ বছরের মধ্যে পদত্যাগকারী ষষ্ঠ প্রধানমন্ত্রী হলেন তিনি। ছয়জনের তিনজন প্রধানমন্ত্রী হয়েছিলেন জাতীয় নির্বাচনের মাধ্যমে এবং অপর তিনজন এসেছিলেন ক্ষমতাসীন দলের মধ্য থেকে। স্টারমারের পদত্যাগের মাধ্যমে ব্রেক্সিট পরবর্তী এক দশকে ছয় প্রধানমন্ত্রীকে দায়িত্ব ছাড়তে হয়েছে। এর মধ্যে ডেভিড ক্যামরুন ২০১০ থেকে ২০১৬ সাল পর্যন্ত প্রধানমন্ত্রী ছিলেন। ব্রিটিশ জনগণ ইউরোপীয় ইউনিয়নে থাকার পক্ষেই ভোট দেবে বলে আশা করে তিনি ব্রেক্সিট গণভোটের আয়োজন করেছিলেন। কিন্তু গণভোটে ইউরোপীয় ইউনিয়ন ছাড়ার পক্ষে রায় আসলে ক্যামরুন পদত্যাগ করেন। এরপর ক্ষমতায় আসেন থেরেসা মে। দলে কট্টর ব্রেক্সিট পন্থিদের বিরোধিতার মুখে ২০১৯ সালে তিনি পদত্যাগে বাধ্য হন। এরপর ক্ষমতায় আসেন বরিস জনসন।
কোভিড-১৯ মহামারী নিয়ে বিতর্কের জেরে ২০২২ সালে তিনি পদত্যাগ করেন। এরপর ক্ষমতায় আসেন লিজ ট্রাস। তার ক্ষমতার মেয়াদ মাত্র ছয় সপ্তাহ। অর্থনৈতিক সঙ্কট ও রাজনৈতিক চাপের মুখে তিনি পদত্যাগ করেন। তারপর ২০২২ সালের অক্টোবরে ব্রিটেনের প্রথম ভারতীয় বংশোদ্ভূত প্রধানমন্ত্রী হিসেবে ক্ষমতায় আসেন ঋষি সুনাক। কিন্তু তিনি কনজারভেটিভ সরকারের দীর্ঘ দিনের অস্থিরতা ও জন অসন্তোষ কাটিয়ে উঠতে পারেননি। ২০২৪ সালের সাধারণ নির্বাচনে বড় পরাজয়ের মাধ্যমে তার সরকারের পতন ঘটে। প্রধানমন্ত্রী হন কিয়ার স্টারমার। চলতি বছরের মে মাসের স্থানীয় নির্বাচনে বিপর্যয়ের জেরে স্টারমার পদত্যাগের ঘোষণা দেন।
মিউজিক্যাল চেয়ারের এই খেলা গণতন্ত্রের কার্যকারিতা নিয়ে তীব্র বিতর্কের জন্ম দিয়েছে। একটি সমীক্ষায় দেখা গেছে, ব্রিটিশ শাসন মডেলের মধ্যে ২০২৪ সালে অনুষ্ঠিত নির্বাচনের ব্যাপারে সাধারণ মানুষের আস্থা ও বিশ্বাস উল্লেখযোগ্যভাবে হ্রাস পেয়েছে। গণতন্ত্র যেভাবে কাজ করে তা নিয়ে ব্রিটেনের ৫০ শতাংশেরও বেশি মানুষ অসন্তুষ্ট। এর মাধ্যমে গণতন্ত্রের কার্যকারিতা, ভুল তথ্য এবং জবাবদিহিতার ব্যাপারে মানুষের মধ্যে যে হতাশা বৃদ্ধি পাচ্ছে সেটাই উঠে এসেছে। তবে গণতন্ত্র পরিত্যাগের পক্ষে তেমন কোনো সমর্থন পাওয়া যায়নি। জনগণের উদ্বেগ গণতন্ত্রের কার্যকারিতা নিয়ে ব্রিটিশ নির্বাচন সমীক্ষার ওপর ভিত্তি করে করা একটি গবেষণায় দেখা গেছে যে, মাত্র ২২ শতাংশ ব্রিটিশ নাগরিক ‘এমন একজন শক্তিশালী নেতা, যাকে সংসদ বা নির্বাচন নিয়ে মাথা ঘামাতে হয় না, এই ধারণাকে সমর্থন করেন। যখন সরাসরি এমন একজন নেতাকে বেছে নিতে বলা হয়, তখন মাত্র ১০ শতাংশের মতো মানুষ ইতিবাচক উত্তর দেন।
সুতরাং এটা বলা ন্যায্য হবে যে, ব্রিটেন গণতন্ত্রের প্রত্যাখ্যান করছে না। বরং গণতন্ত্র যেভাবে ব্যবহৃত হচ্ছে, তা নিয়ে এটি একটি আস্থার সংকটের সম্মুখীন হচ্ছে। জনগণ গণতান্ত্রিক সঙ্কটের সম্মুখীন হচ্ছে। জনগণ গণতান্ত্রিক মূল্যবোধের প্রতি প্রতিশ্রুতিবদ্ধ, যা তাদের মধ্যে শৈশব থেকেই প্রোথিত।
ব্রিটেনে গণতন্ত্রের সূচনা হয়েছিল ১২১৫ সালে। ম্যাগনাকাটা ছিল রাজাকে আনুষ্ঠানিকভাবে স্বীকৃতি দেয়া প্রথম দলিল। এখান থেকে আরো ৪০০ বছর ধরে ওয়েস্ট মিনিস্টার ধারার গণতন্ত্রের বিকাশ ঘটে, যখন ব্রিটিশ গৃহযুদ্ধের (১৬৪২-১৬৫১) পর এটা প্রতিষ্ঠত হয়েছিল যে, সংসদ ছাড়া রাজা শাসন করতে পারতেন না।
১৬৮৮ সালের গৌরবময় বিপ্লবের মাধ্যমে রাজতন্ত্রের উপরে পার্লামেন্টের প্রাধান্য প্রতিষ্ঠিত হয়। এরপর, ১৮৩২ সালে সংস্কার আইন পাস হয়, যা আধুনিক প্রতিনিধিত্বমূলক সরকারের সূচনা করে। কিন্তু আরো এক শতাব্দী লেগেছিল, যখন ১৯১৮ সালে সব প্রাপ্ত বয়স্ক পুরুষ ও অনেক নারীর ভোটাধিকার অর্জিত হয় এবং অবশেষে, ১৯২৮ সালের আইনের মাধ্যমে প্রাপ্ত বয়স্কদের ভোটাধিকার প্রতিষ্ঠিত হয়। এভাবে, প্রায় ৮০০ বছরের সংগ্রামের পর যুক্তরাজ্যের আজকের শাসনব্যবস্থা বর্তমান রূপ লাভ করেছে।
দুই বছর আগে বিশাল জয়ের মাধ্যমে লেবার পার্টির নেতা কিয়ার স্টারমার ক্ষমতায় এসেছিলেন। ব্রিটিশ অর্থনীতিকে চাঙ্গা করে আগের অবস্থায় ফিরিয়ে নেবেন বলে দুই বছর আগে তিনি যে প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন, তা পূরণ করতে পারেননি। এই ব্যর্থতার অন্যতম বড় কারণ হিসেবে উঠে এসেছে ইউরোপীয় ইউনিয়ন থেকে ব্রিটেনের বেরিয়ে আসা।
স্টারমারের ক্ষমতায় থাকাকালীন সময়ে নীতিগত নানা পরিবর্তন, অভ্যন্তরীণ কোন্দল এবং বিতর্কিত সিদ্ধান্তের কারণে তিনি তীব্র সমালোচনার মুখে পড়েন। এর মধ্যে যৌন অপরাধী জেফ্রি এপস্টিনের বন্ধু পিটার ম্যান্ডেলসনকে যুক্তরাষ্ট্রে ব্রিটেনের রাষ্ট্রদূত নিয়োগ দেয়ায় আরো বিতর্কিত হয়ে পড়েন।
সম্প্রতি প্রকাশিত একটি গবেষণায় দেখা গেছে, ব্রেক্সিটের ফলে গত এক দশকে যুক্তরাজ্যের মোট দেশজ উৎপাদনের ৬ থেকে ৮ শতাংশ ক্ষতি হয়েছে। এই ক্ষতির পর ব্রিটিশ জনমনে ইউরোপের সাথে সম্পর্ক নিয়ে নতুন ভাবনা শুরু হয়েছে বলেও অনেকে মনে করেন।
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ট ট্রাম্প দ্বিতীয় মেয়াদে ক্ষমতায় আসার পর সবকিছু ওলটপালট হয়ে গেছে। ব্রিটেন এখন যুক্তরাষ্ট্রের ওপরও আগের মতো বিশ্বাস রাখতে পারছে না। তাই মনে হয় জনমত আবার ইইউর দিকে ফিরে যাচ্ছে। প্রশ্ন হল ব্রিটেনের মানুষ কি তাহলে ব্রেক্সিটের রাজনৈতিক ফাটল দূর করতে চায়?
লেখক : সহ-সভাপতি, বাংলাদেশ ফেডারেল সাংবাদিক ইউনিয়ন (বিএফইউজে)।