আসিফ আরসালান
কিশোরগঞ্জের এমপি ফজলুর রহমানকে আমি কোনো দিন ধর্তব্যের মধ্যে আনিনি। কারণ তিনি বাংলাদেশের রাজনীতিতে কেউকেটা নন। গিরগিটির মতো তিনি দল বদল করেছেন। তবে এবার বিএনপি প্রধান তারেক রহমান কোন বিবেচনায় তাকে নমিনেশন দিয়েছিলেন সেটি তিনিই ভালো জানেন। বিএনপির নমিনেশন না পেলে জীবনেও তিনি জাতীয় সংসদ সদস্যের মুখ দেখতেন না। তিনি যে এখনো অস্থিমজ্জায় মুজিববাদী সেটিই তিনি তার সেদিনের সংসদ বক্তৃতায় প্রমাণ করেছেন।
তিনি নিজেকে মুক্তিযোদ্ধা বলে দাবি করেছেন। কিন্তু আমরা যারা মুক্তিযুদ্ধের আতাপাতা জানি, তারা বিলক্ষণ জানি যে, ভারতে তিনি কোনো দিন জেনারেল এমএজি ওসমানীর মুক্তিবাহিনীতে ছিলেন না। তিনি সেখানে বাংলাদেশে ভারতীয়দের স্বার্থ সংরক্ষণের জন্য সৃষ্ট বিশেষ বাহিনীতে হয়তো ট্রেনিং নিয়ে থাকতে পারেন। এ বিশেষ বাহিনীর নাম হলো বিএলএফ বা বাংলাদেশ লিবারেশন ফোর্স। সাধারণ মানুষের কাছে এটি মুজিব বাহিনী হিসাবে পরিচিত। মুজিব বাহিনীর কাজ ছিলো পাকিস্তান আর্মির মোকাবেলা করা নয়, বরং ভারতের মাটিতে যারা মুক্তিবাহিনী ছিলো ঠিকই কিন্তু ছিলো কট্টর বাংলাদেশী তাদেরকে নির্মূল করা। এ মুজিব বাহিনী তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধীর অনুমোদনক্রমে জেনারেল উবানের তত্বাবধানে গঠিত হয়েছিলো। তাদেরকে সংগোপনে ট্রেনিং দেওয়া হয়েছিলো ভারতের দেরাদুনে।
বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পর এরা দেশে ফিরে আসে। শেখ মুজিবুর রহমান কোনো দিন বাংলাদেশে একটি শক্তিশালী সেনাবাহিনী চাননি। তিনি সেনাবাহিনীকে বিশ্বাসও করতেন না। তাই তিনি সেনাবাহিনীর প্যারালাল একটি বাহিনী গঠন করেন। নাম দেওয়া হয়, ‘রক্ষী বাহিনী’। এ রক্ষী বাহিনীতে নিয়োগ পায় প্রধানত মুজিব বাহিনীর সদস্যরা। সকলেই জানেন যে এরা অর্থাৎ রক্ষী বাহিনী বাংলাদেশে প্রথম বিচার বহির্ভূত হত্যাকান্ডে লিপ্ত হয়। মুজিব আমলে মওলানা ভাসানীসহ বামপন্থীরা বার বার অভিযোগ করেছেন যে, রক্ষী বাহিনীর হাতে অন্তত ২৭ হাজার ভারত বিরোধী রাজনৈতিক কর্মী নিহত হয়েছেন।
ফজলুর রহমান এমপি আওয়ামী লীগে পাত্তা না পেয়ে কাদের সিদ্দিকীর দলে যোগ দেন। কাদের সিদ্দিকীর দলের পরিচিতি ছিলো গামছা পার্টি হিসাবে। শেখ মুজিবের মর্মান্তিক পতনের পর কাদের সিদ্দিকী তার কয়েকজন অনুসারীকে নিয়ে ভারত যান। তখন ক্ষমতায় ছিলেন জেনারেল জিয়াউর রহমান। আর ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ছিলেন প্রণব মুখার্জী। কাদের সিদ্দিকী প্রণব মুখার্জির শরনাপন্ন হলে প্রণব মুখার্জি তাদেরকে ট্রেনিং দেওয়া ও কিছুটা অস্ত্রশস্ত্র দেওয়ার ব্যবস্থা করেন। অতঃপর কাদের সিদ্দিকী বাংলাদেশের বিভিন্ন সীমান্তে এ্যাম্বুশ করেন। এসবে এ্যাম্বুশে কাদের সিদ্দিকীর বেশ কয়েকজন অনুসারী বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর হাতে নিহত হন। স্বাধীন বাংলাদেশে আর ভারতীয় আগ্রাসন চলবে না, এটা বুঝতে পেরে ৯০ এর নির্বাচনের আগে কাদের সিদ্দিকী দেশে ফেরত আসেন।
কাদের সিদ্দিকী সম্পর্কে এত কথা বলার উদ্দেশ্য হলো এটা বোঝানো যে, ফজলুর রহমান আসলে কী? তিনি একজন হার্ডকোর ইন্ডিয়ান। তার ভারত প্রেম সেদিন ধরা পড়েছে জাতীয় সংসদে প্রদত্ত তার অসংলগ্ন বক্তৃতায়। যেহেতু তিনি জাতীয় সংসদে ১৫ মিনিট ধরে বক্তৃতা করেছেন, যেহেতু সে বক্তৃতা টেলিভিশনের মাধ্যমে সারা দেশে সম্প্রচারিত হয়েছে, এবং যেহেতু তার বক্তৃতার সময় বিএনপির একশ্রেণীর সদস্যকে টেবিল চাপড়াতে দেখা গেছে এবং যেহেতু তার আপত্তিকর বক্তব্যের সময় প্রধানমন্ত্রী সম্পূর্ণ নীরব ছিলেন তাই তার বক্তৃতা নিয়ে দুটো কথা বলতে বাধ্য হচ্ছি।
তিনি বলেছেন যে, কোনো মুক্তিযোদ্ধা বা শহীদ পরিবারের কেউ জামায়াতে ইসলামী করতে পারবে না। করলে সেটা নাকি ডাবল অপরাধ হবে। এ বক্তব্যের জবাবে আমীরে জামায়াত ড. শফিকুর রহমান বলেছেন যে, কে কোন দল করবে সেটি কি বিএনপির এমপি ডিক্টেশন দেবেন? ফজলুর রহমান বলেন যে, তাকে নাকি ফজা পাগলা বলে সম্বোধন করা হয়। এ পর্যায়ে সংসদের স্পীকার মেজর হাফিজ উদ্দিন বলেন, সংসদের কেউ তো আপনাকে ফজা পাগলা বলেনি। তাহলে আপনি খামাখা কেনো ঐ টিটকারিটি নিজের ঘাড়ে তুলে নিচ্ছেন?
ফজলুর রহমান এমপির বক্তব্যের মধ্যে সবচেয়ে বড় আপত্তিকর বিষয়টি ছিলো মুক্তিযুদ্ধের সাথে জুলাই বিপ্লবের তুলনা করা। তার বিষোদগার এতদূর যায় যে, তিনি বলেন, প্রশান্ত মহাসাগরের ( মুক্তিযুদ্ধ) সাথে কুয়ার (জুলাই বিপ্লব) তুলনা করা হয়। কই, কেউ তো কোনো দিন মুক্তিযুদ্ধের সাথে জুলাই বিপ্লবের তুলনা করেনি। এটি বরং আওয়ামী লীগাররাই করে থাকে। মুক্তিযুদ্ধের সাথে জুলাই বিপ্লবের তুলনা করে ওরা জুলাই বিপ্লবকে তুচ্ছ তাচ্ছিল্য করে। মুক্তিযুদ্ধ প্রশান্ত মহাসাগরের মতো হতে পারে। তাই বলে তার পাশে জুলাই বিপ্লব কি কুয়ার সমতুল্য? দুঃখের বিষয়, জুলাই বিপ্লবকে এত ছোট করার পরেও বিএনপির দু’শতাধিক সদস্যের মধ্যে কেউই বিন্দুমাত্র প্রতিবাদ করেননি। তাহলে বিএনপিও কি ফজলুর রহমানের মতের সাথে সহমত?
ফজলুর রহমানও তার বক্তৃতায় বলেন, “রাজাকারের বাচ্চারা”। এ দুটি শব্দ শেখ হাসিনা তার ২০২৪ সালের জুলাই মাসের রেডিও ও টেলিভিশন ভাষণে ব্যবহার করেছিলেন। শেখ হাসিনার সে ভাষণের কয়েক ঘণ্টা পর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমস্ত হলের ছাত্রছাত্রীরা গর্জে উঠেছিলেন। তাদের কন্ঠে সেদিন বেরিয়ে ছিলো সেই গগন বিদারী স্লোগান, “তুমি কে আমি কে/ রাজাকার রাজাকার”। “কে বলেছে কে বলেছে/ স্বৈরাচার স্বৈরাচার”। হাসিনার সে ভৌতিক কন্ঠ শোনা গেলো সেদিন বিএনপির এমপি ফজলুর রহমানের কন্ঠে। কি আশ্চর্য্য , টেলিভিশনে দেখলাম, ফজলুর রহমানের এই চরম আপত্তিকর শব্দ ব্যবহারে একশ্রেণীর বিএনপি এমপির টেবিল চাপড়িয়ে সে কি উল্লাস।
বক্তৃতার এক পর্যায়ে ফজলুর রহমান বলেন, মুক্তিযুদ্ধ হয়েছে, ৩০ লক্ষ মানুষ জীবন দিয়েছে। এটাই চরম সত্য। এ বিষয়টি নিয়ে আমাদের নিজস্ব কোনো মন্তব্য নাই। কিন্তু বিএনপিকে স্মরণ করিয়ে দেওয়া দরকার যে বেগম জিয়া যখন প্রধানমন্ত্রী ছিলেন তখন তিনি বলেছিলেন যে মুক্তিযুদ্ধে ৩০ লক্ষ মানুষ মারা গেছেন, এ বক্তব্যে বিতর্ক রয়েছে। তিনি শুধুমাত্র বলেছিলেন যে, মুক্তিযুদ্ধে নিহতের সংখ্যা ৩০ লক্ষ কিনা সেটি নিয়ে বিতর্ক রয়েছে। তার এই বক্তব্যের কারণে তার বিরুদ্ধে শেখ হাসিনা মামলা দেন। সে মামলা জুলাই বিপ্লবের পর প্রত্যাহার করা হয়। মানুষের প্রশ্ন, ৩০ লক্ষ শহীদ সম্পর্কে বিএনপির অবিসংবাদিত নেতা বেগম খালেদা জিয়া যে বক্তব্য দিয়েছেন সেটার বিপরীতে আওয়ামী লীগ বিগত ১৫ বছর যে প্রচারণা চালিয়েছে সেই প্রচারণায় ফজলুর রহমান এমপি কন্ঠ মিলিয়েছেন। এখন মানুষ বিশ্বাস করবে কার কথা? বেগম জিয়ার কথা? নাকি ফজলুর রহমানের কথা? ফজলুর রহমান কি এই বক্তব্য দিয়ে বেগম খালেদা জিয়াকে পরোক্ষভাবে চ্যালেঞ্জ করলেন না?
সকলেই জানেন যে, জাতীয় সংসদের প্রথম অধিবেশনেই অনেক বিশিষ্ট ব্যক্তির ইন্তিকালে শোক প্রস্তাব গ্রহণ করা হয়। ঐ সব বিশিষ্ট ব্যক্তির মধ্যে মওলানা মতিউর রহমান নিজামী থেকে শুরু করে জামায়াতের ৫ নেতা এবং বিএনপির সালাহ উদ্দিন কাদের চৌধুরী সহ ৬ নেতার নাম অন্তর্ভূক্ত ছিলো। অর্থাৎ জাতীয় সংসদ ঐ শোক প্রস্তাবের মাধ্যমে ঐ ৬ জাতীয় নেতাকে ফাঁসিতে ঝুলিয়ে হত্যাকে অনুমোদন দেয়নি। বরং সে শোক প্রস্তাব গ্রহনের মাধ্যমে এটি পরোক্ষভাবে বলা হলো যে, তাদের মৃত্যু ছিলো একটি বিচারিক হত্যাকান্ড।
জাতীয় সংসদে এ শোক প্রস্তাব গৃহীত হয়েছে সর্ব সম্মত ভাবে। অর্থাৎ বিএনপি, জামায়াত নেতৃত্বাধীন ৭৭ জন সদস্য এবং সকল স্বতন্ত্র সদস্য। জাতীয় সংসদে যেখানে এ শোক প্রস্তাব সর্ব সম্মতভাবে গৃহীত হয়েছে, যেখানে বিএনপিও ঐ শোক প্রস্তাব সমর্থন করেছে, সেখানে বিএনপি সদস্য ফজলুর রহমান তার তীব্র বিরোধীতা করেন কিভাবে? আর তার এই বিরোধীতা বিএনপির নেতা তারেক রহমান সহ অন্য সকলে নীরবে হজম করেন কিভাবে? যেখানে দলীয় সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে বক্তব্য রাখায় তাকে বহিস্কার করা উচিত ছিলো সেখানে কয়েক জন সদস্যকে টেবিল চাপড়াতে দেখা যায়। এটি দেখে অনেকে বলছেন, বিএনপিকে ঠিক চেনা যাচ্ছে না। এটি কি শহীদ জিয়ার বিএনপি? এটি কি বেগম খালেদা জিয়ার বিএনপি?
১৯৭১ সালের ১৪ ডিসেম্বর কয়েকজন বুদ্ধিজীবীকে উঠিয়ে নিয়ে যাওয়া হয়। তারপর আর তাদের দেখা মেলেনি। তাদেরকে হত্যা করা হয়েছে বলেই মনে করা হয়। কিন্তু তাদেরকে উঠিয়ে নিয়েছিলো কারা? ফজলুর রহমান এ ব্যাপারে আল বদরের নাম করে জামায়াতকে ইঙ্গিত করেছেন। বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পর ৫৪ বছর অতিক্রান্ত হয়েছে। এর মধ্যে আওয়ামী লীগ ৪ বার ক্ষমতায় এসেছে। তারা সাকূল্যে ২৩ বছর (শেখ হাসিনার ২০ বছর এবং শেখ মুজিবের সাড়ে ৩ বছর) ক্ষমতায় ছিলো। বুদ্ধিজীবী হত্যার জন্য কারা দায়ী সেব্যাপারে কি কোনো তদন্ত অনুষ্ঠিত হয়েছে? হয়নি। স্বাধীনতার পর বিশিষ্ট সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব জহির রায়হান মীরপুরে যেয়ে আর ফিরে আসেননি। তার নিখোঁজ হওয়ার রহস্য উদ্ঘাটনে কোনো তদন্ত অনুষ্ঠিত হয়নি। অথচ বিগত ৫৪ বছর ধরে কোনো রূপ তদন্ত ছাড়াই অনবরত বলা হচ্ছে যে, বুদ্ধিজীবী এবং জহির রায়হান হত্যাকান্ড- সবকিছু নাকি ঘটিয়েছে জামায়াত অনুগত আলবদর বাহিনী। এভাবে হিটলারের গোয়েবলসীয় প্রোপাগান্ডার আদলে জামায়াত বিরোধী অপপ্রচার কি তারেক রহমানের আমলেও চলবে?
আরো অনেক কিছুই বলার ছিলো। জুলাই বিপ্লব কালে পুলিশ হত্যা সহ যেসব সহিংসতা ঘটেছে সেগুলোর সবগুলিকে তারেক রহমানের সরকার দায়মুক্তি দিয়েছেন। অথচ ফজলুর রহমান সেদিনের বক্তৃতায় জুলাই বিপ্লব কালে পুলিশ হত্যা ও থানা লুটের বিচার দাবি করেছেন। যখন তিনি এ দাবি করেন তখন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান এবং স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহ উদ্দিন আহমেদ তাদের আসনে উপবিষ্ট ছিলেন। তাদের উপস্থিতিতে যে বিষয়ে সংসদ সর্বসম্মতিক্রমে একটি সিদ্ধান্ত নিয়েছে সেই সিদ্ধান্তকে চ্যালেঞ্জ করা হয় কিভাবে? আমার মনে আছে, আওয়ামী আমলে বলা হয়েছিলো যে, আদালত অবমাননা যেমন একটি শাস্তিযোগ্য অপরাধ তেমনি সংসদকে অবমাননা করাও একটি শাস্তিযোগ্য অপরাধ।
বাংলাদেশের স্বাধীনতার ইতিহাস বলতে গিয়ে তিনি ক্ষুদিরামের ফাঁসি এবং প্রফুল্লচন্দ্র চাকির আত্মবলিদানের কথা উল্লেখ করেন। ক্ষুদিরাম এবং প্রফুল্লচন্দ্র চাকী কি বাংলাদেশের জন্য ‘যুগান্তরের’ মতো সন্ত্রাসী দলের সদস্য হয়েছিলেন? না কি তাদের ভাষায় ‘ভারত মাতার’ জন্য আত্মবলিদান করেছেন?
জাতীয় সংসদের মতো দেশের সর্বোচ্চ সংস্থায় বক্তৃতার আগে কিছু লেখাপড়া করে আসতে হয়। ফজলুর রহমানের মূর্খতা সেদিন প্রকট হয়েছে তার বক্তৃতায়।
Email:[email protected]