॥ ড. মো. নূরুল আমিন ॥
পাঠক শুভাকাক্সক্ষীদের অনেকেই সাংবাদিক কলামিস্ট হিসেবে আমার অভিজ্ঞতা শেয়ারের অনুরোধ করেছেন। তাদের অনুরোধ উপেক্ষা করার মতো নয়। বলাবাহুল্য, জুন মাস থেকে দৈনিক সংগ্রাম ও বিপিএল থেকে আমার আনুষ্ঠানিক পদত্যাগের প্রেক্ষাপটে এ অনুরোধ।
আসলে আমার জন্য লেখক সাংবাদিক হওয়া অনেকটা আশ্চর্যের বিষয়। বাল্যকালে আমার দুটি লক্ষ্য ছিল; ডাক্তার হওয়া এবং বিলেতে লেখাপড়া করে বিলাত ফেরত হওয়া। পাড়াগাঁয়ের নিম্ন মধ্যবিত্ত গৃহস্থ পরিবারের সন্তান হিসেবে আমার পক্ষে উভয়টাই ছিল স্বপ্নবিলাস। তবে লেখাপড়ার প্রতি আমার নিষ্ঠা ছিল প্রবল। পূর্ব পাকিস্তান মাধ্যমিক ও উচ্চমাধ্যমিক শিক্ষা বোর্ডের অধীনে ম্যাট্রিকুলেশান পরীক্ষায় মেধা তালিকায় আমি ৬ষ্ঠ স্থান অধিকার করি এবং এভাবে সরকারি বৃত্তি পাবার জন্য উপযুক্ত বলে গণ্য হই। বলাবাহুল্য, এর আগেও আমি পঞ্চম ও ষষ্ঠ শ্রেণিতে বৃত্তি পরীক্ষায় চট্টগ্রাম বিভাগে যথাক্রমে প্রথম ও তৃতীয় স্থান অধিকার করে বৃত্তি পেয়েছিলাম। ম্যাট্রিক পাস করার পর ভর্তি নিয়ে সমস্যা দেখা দিল। প্রেসিডেন্ট আইয়ুব খানের আমলে প্রতিষ্ঠিত ময়মনসিংহে কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ে ১৯৬২ সালে ভর্তি শুরু হয়েছিল। তখন ম্যাট্রিক পাস করেই ভর্তি হওয়া যেত। আমি সেখানে ভর্তি হওয়ার আগ্রহ প্রকাশ করলাম। কিন্তু আমার প্রাইমারী স্কুলের প্রধান শিক্ষক জনাব আবদুর রব, যিনি আমাকে অত্যন্ত স্নেহ করতেন এবং বলতে গেলে আমাকে নিজ হাতে গড়ে তুলতে সহায়তা করেছেন, তিনি রাজি হলেন না; তার যুক্তি : কৃষি শিক্ষার অর্থকরী মূল্য কম।
ডাক্তারি শিক্ষাকে মাথায় রেখে আমি ঢাকা এসে ঢাকা কলেজে ভর্তি হলাম। তখন ঢাকা কলেজের অধ্যক্ষ ছিলেন জনাব জালাল উদ্দিন আহমদ। তিনি একদিকে ছিলেন কোলকাতা আলিয়ার সর্বোচ্চ ডিগ্রিধারী, ফার্স্টক্লাস ফার্স্ট, গোল্ড মেডেলিস্ট এবং কোলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ইংরেজি সাহিত্যে প্রথম শ্রেণিতে স্নাতকোত্তর ডিগ্রিপ্রাপ্ত। আমি তখন পাজামা পাঞ্জাবী পরতাম এবং নিয়মিত নামাযী ছিলাম। অধ্যক্ষ সাহেব এটা পছন্দ করতেন না। পাজামা-পাঞ্জাবী পরা নামাযী ছাত্রদের তিনি মাদরাসা ছাত্র মনে করতেন। যদিও তিনি নিজেই আলিয়া মারাসার ছাত্র ছিলেন।
একদিন তিনি শ্রেণিকক্ষে আমাকে এবং আরেক সহপাঠী নূরুল ইসলাম ফারুকীকে পোশাকের জন্য ভর্ৎসনা করলেন। এ ফারুকী পরবর্তীকালে ঢাকা কলেজের অধ্যক্ষ হিসেবে অবসর নিয়ে ঢাকা কমার্স কলেজ প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। এখনো জীবিত আছেন। তবে খুবই অসুস্থ। আমি এটা সহ্য করতে পারিনি’ তিনদিনের মধ্যে ট্রান্সফার সার্টিফিকেট ছাড়াই ঢাকার অন্যতম প্রাচীনতম কলেজ, কায়েদে আজম কলেজে ভর্তি হই এবং সেখানেই আনুষ্ঠাকিভাবে আমার ইসলামী ছাত্রসংঘ ও জামায়াতে ইসলামীর সাথে পরিচয় হয়। এ পরিচয় সূত্র ধরে তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তান প্রাদেশিক জামায়াতের প্রধান কার্যালয় ১৩, কারকুনবাড়ী লেনে আসা-যাওয়া শুরু হয়। তখন মাওলানা আবদুর রহীম প্রাদেশিক জামায়াতের আমীর এবং অধ্যাপক গোলাম আযম সেক্রেটারি জেনারেল।
কারকুনবাড়ী লেনের এ ভবনের নীচতলায় ছিল প্রেস, দোতলার একাংশে সাপ্তাহিক জাহানে নও অফিস ও আরেকাংশে জামায়াতের প্রাদেশিক অফিস। জাহানে নও পত্রিকার সম্পাদক ছিলেন প্রাদেশিক আমীর মাওলানা আবদুর রহীম স্বয়ং। জাহানে নও-এর তখনকার নিয়মিত লেখকদের মধ্যে মাওলানা আব্দুর রহীম, অধ্যাপক গোলাম আযম, মাওলানা আবদুল মান্নান তালিব, আবদুল খালেক, রম্য লেখক সিলেটের বুরহান উদ্দিন খান, শাহ আবদুল হান্নান, ব্যারিস্টার কুরবান আলী প্রমুখ। ১৯৬৪ সালের আগস্ট মাসের প্রথম সপ্তাহে সাপ্তাহিক জাহানে নওতে আমার প্রথম লেখা জার্মান দার্শনিক হেসেলের দ্বান্দ্বিক পদ্ধতি বিশেষ করে থিসিস, এন্টি থিসিস ও সিন্থেসিসের ওপর একটি বিশ্লেষণাত্মক প্রবন্ধ ছাপা হয়। আমীরে জামায়াত ও সেক্রেটারি জেনারেল উভয়েই আমার এ লেখার প্রতি সন্তুষ্টি প্রকাশ করেন এবং তথ্য ও আদর্শ বিশ্লেষণের বেলায় ইসলামী আদব সম্পর্কে মূল্যবান কিছু পরামর্শ দেন। প্রথম লেখা পত্রিকায় প্রকাশিত হওয়ার যে শিহরণ তা আমি এখনো স্মরণ করি। পরবর্তীকালে আবদুল মান্নান তালিব জাহানে নও-এর সম্পাদকের দায়িত্ব গ্রহণ করেন এবং তারপর মাওলানা আবদুর রহীম সাহেবের জামাতা হাফেজ হাবিবুর রহমান সম্পাদক হন। তাদের সকলের কাছ থেকেই আমি লেখার মানোন্নয়নে প্রচুর সহযোগিতা পেয়েছি।
আমি বাণিজ্য বিভাগের ছাত্র ছিলাম। স্নাতক ডিগ্রি নেয়ার পর আমি ঠিক করলাম চার্টারড একাউন্ট্যান্সি পড়ব এবং তৎকালীন সময়ের একটি সিএ ফার্ম আকবর জি মার্চেন্টস এন্ড কোম্পানিতে আর্টিকেলশিপ নিয়ে ভর্তি হলাম। এই ফার্মের প্রধান ছিলেন আকবর গোলাম আলী মার্চেন্ট। তিনি ছিলেন অবাঙালি, খুবই চমৎকার লোক। তার পার্টনার ছিলেন আরেক সিএ জনাব জয়নাল আবেদীন- বর্তমানে জয়নাল আবেদীন এন্ড কোং-এর মালিক। জয়নাল সাব ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে আমাদের ইনকাম ট্যাক্স পড়াতেন। তার সাথে আরেকজন সিএ ছিলেন, জনাব আতাউদ্দিন খান, তিনিও আমার শিক্ষক ছিলেন। ইনি পরে প্রেসিডেন্ট জিয়ার মন্ত্রিসভার একজন সদস্য হয়েছিলেন। তখনকার সময়ে পূর্ব পাকিস্তান অঞ্চলে চার্টারড একাউন্টেন্সি বা কষ্ট একাউন্টেন্সি পড়ার সুযোগ খুবই সীমিত ছিল। পূর্ব পাকিস্তানের কোথাও অডিট ক্লার্ক বা আর্টিকেল ক্লার্কদের Advance Accounting , Revenue Management, Budgetary Control, Financial Administration, Fainancial Audit ও Managment Audit, Costing Methods প্রভৃতি পড়ানোর প্রাতিষ্ঠানিক সুযোগ ছিল না। দেশের একমাত্র Institute of Chartered Accountants ছিল করাচীতে এবং সেখানে গিয়ে পড়াশোনা ও ক্লাসে যোগদানও ছিল ব্যয়বহুল। ফলে ফাইনাল পরীক্ষায় পাসের হার ছিল ৩% থেকে ৫%। প্রতিষ্ঠিত সিএ সাহেবদের অনেকেই পেশাদার প্রতিযোগীর সংখ্যা বৃদ্ধির ভয়ে তাদের ছাত্র-ছাত্রীদের খুব একটা সহযোগিতা করতেন না। এতে করে সিএ ডিগ্রি প্রত্যাশীদের সিএ হতে ৭/৮ বছর সময় লেগে যেত। এ বাস্তবতার আলোকে আমি দুবছর আর্টিকেলশীপ চালিয়ে ক্ষ্যান্ত দেই। বিশ^বিদ্যালয়ে আমাদের সময় সকাল সাড়ে আটটা থেকে বেলা দেড়টা পর্যন্ত ক্লাস চলত। বাকি সময়টা কাজে লাগানো আমি শ্রেয় মনে কফর এবং ১৯৬৭ সালে ঢাকা বিশ^বিদ্যালয়ের সাংবাদিকতা বিভাগের সান্ধ্যকালীন ডিপ্লোমা কোর্সে ভর্তি হই। আমার সাথে আমার আরো দুজন ঘনিষ্ঠ সহযোগী ছিলেন, একজন কারার মাহমুদুল হাসান আরেকজন শামছুল হক আলী নূর।
লেখার জগত থেকে আমি কখনো হারিয়ে যাইনি। জাহানে নও-এর পাশাপাশি সাপ্তাহিক ইয়ং পাকিস্তান ও ঢাকা প্রেস সিন্ডিকেট নামক সংস্থার সঙ্গে আমি জড়িয়ে পড়ি। ভারতের ডেইলি স্টার পত্রিকার সাবেক সম্পাদক আজিজ আহমদ বিলিয়ামিনি ইয়ং পাকিস্তান ও ডিপিএসএর সম্পাদক ছিলেন। এ দুটি সংস্থার সাথে আমার ওস্তাদ শাহ আবদুল হান্নান ও শেরেবাংলা একে ফজলুল হকের কন্যা রইসী বেগমের স্বামী খলিলুর রহমানও জড়িত ছিলেন। হান্নান ভাই ইয়ং পাকিস্তানে নিয়মিত সম্পাদকীয় ও উপসম্পাদকীয় লিখতেন। ইয়ং পাকিস্তানে আমি প্রুফ রিডিং শিখেছি। অফিস ছিল কারকুনবাড়ী লেনের শেষ মাথায় ১০১ নাসিরুদ্দিন সর্দার লেনে। কারকুনবাড়ী লেন ছিল অনেকটা মিডিয়া পাড়ার মতো। এখানে অবজারভার সম্পাদক আবদুস সালাম, আজাদ সম্পাদক মুজিবর রহমান, প্রখ্যাত সাংবাদিক ও লেখক নাসিরুদ্দীন এবং তার কন্যা বেগম সম্পাদক নূর জাহানের বাসা ছিল, জামায়াত ও জাহানে নও এবং ইয়ং পাকিস্তানের সৌজন্যে আমি তাদের স্নেহ ভালোবাসা কখনো ভুলবো না।
মতিঝিলের অবজার্ভার হাউজ থেকে তখন তিনটি দৈনিক ও দুটি সাপ্তাহিক সিনেমা পত্রিকা প্রকাশিত হতো। দৈনিকগুলোর মধ্যে ছিল পাকিস্তান অবজার্ভার, পূর্বদেশ এবং উর্দু দৈনিক ওয়াতন। অবজার্ভার গ্রুপের মালিক ছিলেন এক সময়ের জাঁদরেল আইনজীবী, রাজনীতিবিদ ও পাকিস্তানের অর্থ ও পররাষ্ট্রমন্ত্রী হামিদুল হক চৌধুরী। জনাব চৌধুরী পাকিস্তান ডেমোক্রেটিক পার্টিল (পিডিপি) চেয়ারম্যান ছিলেন। তিনি তার পত্রিকাগুলোতে মেধাবী সাংবাদিক ও লেখকদের সমাবেশ ঘটিয়েছিলেন। সাংবাদিকতার ছাত্র এবং বাংলা ও ইংরেজি ভাষার নবীন লেখক হিসেবে তিনি খবর দিয়ে আমাকে তার অফিসে সাক্ষাৎ করার অনুরোধ করেন এবং ১৯৬৮ সালের মে মাসে সাব এডিটর হিসেবে পাকিস্তান অবজার্ভারে যোগদানের অনুরোধ করেন। সময়ে অবজার্ভার গ্রুপের ম্যানেজিং এডিটর ছিলেন পাকিস্তান ন্যাশনাল এসেম্বির খ্যাতনামা সদস্য ও রেলওয়ে এমপ্লয়ীজ লীগের সভাপতি জনাব মাহবুবুল হক, জেনারেল ম্যানেজার আবদুল গনি হাজারী, বার্তা সম্পাদক এবিএম মুসা, অর্থনৈতিক সম্পাদক মুজিবল হক ও এইচকে জাভেদ, শিফট ইনচার্জ এএম মোজাম্মেল, রিপোর্টার আবদুল মান্নান লাবু ভাই, আবদুল রহীম, সম্পাদক ছিলেন জনাব আবদুস সালাম, ডেপুটি এডিটর জনাব ওবায়দুল হক, সহকারী সম্পাদক নাসিম আহমদ, নাসিম আখতার এবং নজরুল ইসলাম প্রমুখ। রিয়াজউদ্দিন এবং আমি দুজনকেই অর্থনৈতিক রিপোর্টের দায়িত্ব দেয়া হয়। তখন এ অঞ্চলে স্টক এক্সচেঞ্জ তত প্রসার লাভ করেনি। অর্থনীতি ছিল পাটকেন্দ্রিক। ঢাকার নারায়ণগঞ্জ এবং চট্টগ্রাম ছিল পাট ব্যবসা, বিশেষ করে পাটের কেনাবেচা ও রফতানির মূল কেন্দ্র। এ দুটি স্থানেই গড়ে উঠেছিল জুট একচেঞ্জ।
জুট একচেঞ্জে পাটের শ্রেণী ও ক্রমবিন্যাসের ভিত্তিতে মূল্য নির্ধারিত হতো। এখানে অন দি স্পট ও ফরওয়ার্ড ভিত্তিতে ক্রয় বিক্রয় চলতো। পাটের শ্রেণী ছিল তিন প্রকার, হোয়াইট, তোষা ও মেশতা। এই তিন শ্রেণীর পাটকে আবার চার ভাগে বিভক্ত করা হতো। এ বটম, বি বটম, সি বটম এবং ক্রস বটম। এ বটমগুলো নির্ণয় হতো পাটের গায়ে বিশেষ করে গোড়া ও মাঝখানে স্পট বা দাগ থাকার ওপর ভিত্তি করে। যে পাট কোন শ্রেণীতেই পড়তো না তাকে বলা হতো হাবিজাবি। বিভিন্ন শ্রেণীর পাট বিভিন্ন কাজে ব্যবহৃত হতো। যেমন কার্পেট তৈরি হতো তোষা পাট দিয়ে, হোয়াইট ভেরাইটি দিয়ে পাটকলসমূহ চটের কাপড় তৈরি করতো যা দিয়ে শপিং ব্যাগ ও বস্তা বানানো হতো। মেশতা জাতের পাট দিয়ে রশি বা দড়ি তৈরি হতো। পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার পূর্বে পূর্ব বাংলায় প্রায় ৯০% পার্ট উৎপাদিত হলেও এ অঞ্চলে কোনও পাটকল ছিল না, পাটকল ছিল পশ্চিম বাংলার হুগলী নদীর পাড়ে, পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার পর ভারতের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে হিজরত করে আসা মুসলিম শিল্পপতিরা (যেমন-আদমজি, ইস্পাহানী, লতিফ বাওয়ানী ও সারোগী পরিবার) এ অঞ্চলে প্রায় ৭০টি পাটকল স্থাপন করেন। এক্ষেত্রে তৎকালীন পিআইডিসিরও বিরাট ভূমিকা ছিল। আমাদের জুট এক্সচেঞ্জের রিপোর্ট ছাড়াও নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্যের মূল্যের ওপর রিপোর্ট করতে হতো এবং ম্যাক্রো ও মাইক্রো লেভেলে জাতীয় ও আঞ্চলিক অর্থনীতির সামগ্রিক হালচাল ও সমস্যাবলী চিহ্নিত করে সরকারকে পরামর্শ প্রদান করা ছিল আমাদের কাজ। (চলবে)