মাহবুবুল হক

কোনো একজন মনীষী বলেছেন, দুনিয়াতে এখন সবচেয়ে বড় কাজ হলো, দুনিয়ার প্রতি ইঞ্চি থেকে আবর্জনা দূর করা। তাঁর মতে, দুনিয়া গত হাজার বছরে আবর্জনায় ভরে গেছে। এ হাজার বছরে কত যুদ্ধ-বিগ্রহ হয়েছে, যত অস্ত্র তৈরি হয়েছে, যত প্রোডাকশন হয়েছে, যত প্যাকেজিং-এর বাক্স-পেটরা তৈরী হয়েছে, যত কার্বন তৈরী হয়েছে, যত ডাইং ক্যামিক্যাল তৈরী হয়েছে, যত ট্যানারী বর্জ্য তৈরী হয়েছে, যত যানবাহন-লোকমোটিভ তৈরী হয়েছে, যত জাহাজ-উড়োজাহাজ তৈরী হয়েছে, যত ঘর-বাড়ি-ব্যবসা-প্রতিষ্ঠান তৈরী হয়েছে, যত মিল-কারখানা-ইন্ডাস্ট্রি তৈরী হয়েছে, যত ব্যবহারিক পণ্য তৈরী হয়েছে অর্থাৎ বাড়ি, ঘর, দুয়ার, অফিস, আদালত, রাস্তা-ঘাট, নদী-খাল-বিল সমুদ্র, আকাশ-মহাকাশ অর্থাৎ জানা ও অজানা সব জায়গায় এখন মানুষ বর্জ্যের স্তূপে পরিণত করেছে।

কোস্ট টু কোস্ট-এর এক আলোচনা থেকে পাশ্চাত্যের অন্য অনেক বিজ্ঞানী বলেছেন, বর্জ্যের সমস্যা যেভাবে উদ্ভাসিত করা হলো, আসলে সমস্যাটা অত গভীরে নয়। প্রাকৃতিকভাবে বেশীরভাগ বর্জ্য মাটির সাথে মিশে যায়। উন্নত বিশ্বে যে বর্জ্য ব্যবস্থাপনা রয়েছে তা থেকেও এর ক্ষতি অনেকটা মিনিমাইজ হয়ে যায়। যেমন- সাইকিলিং, রি-সাইকিলিং, মাটিতে পুঁতে রাখাসহ বৈজ্ঞানিক উপায়ে বর্জ্যকে নিয়ন্ত্রণ করা । উন্নত বিশ্ব এ বিষয়ে দারুণভাবে সচেতন। সেখানে বাসা-বাড়ি, কল-কারখানা, অফিস-আদালত, হাসপাতাল-ক্লিনিক, রেস্টুরেন্ট-হোটেল-মল, স্কুল-কলেজ-ইউনিভার্সিটি অর্থাৎ জাগতিক যত স্থাপনা আছে, সমস্ত স্থাপনা থেকে বর্জ্য একিমুলেটভাবে সংগ্রহ করা হয় না। খুব ছোট স্থাপনা -ইউনিট থেকেও একীভূতভাবে বর্জ্য সংগ্রহ করা হয় না। সেখানে খাদ্যজনিত বর্জ্য, কাগজ জাতীয় বর্জ্য, প্লাস্টিক জাতীয় বর্জ্য, কাঠ জাতীয় বর্জ্য, তামা-লোহা-শীশা জাতীয় বর্জ্য, কাচ জাতীয় বর্জ্য, আলাদা-আলাদা করে সংগ্রহ করা হয় এবং প্রত্যেকের শ্রেণী অনুযায়ী তা রি-সাইকিলিং করে নতুন পণ্য সৃষ্টি করা হয়। যেটা দরিদ্র, অনুন্নত ও উন্নয়নশীল দেশে যত্রতত্র ফেলা দেয়া হয় অথবা সবশ্রেণীর বর্জ্য একসাথে ডাম্পিং করা হয়।

আমাদের নগর-বন্দর শহরে যদিও মিউনিসিপালিটি, সিটি কর্পোরেশন, পৌরসভা এখন একটু উদ্যোগ নিয়ে যথেষ্ট না হলেও যে ব্যবস্থাপনা করে থাকে, তা তারা করে দিনের বেলা। শহর-বন্দর-নগরের রাস্তাঘাটের পাশেই প্রকাশ্যে গড়ে তোলে আবর্জনার ভাগাঢ়। যা কোথাও উন্মুক্ত, কোথাও ঘরের মধ্যে অস্বাস্থ্যকর ও অবৈজ্ঞানিকভাবে ব্যবস্থা করা হয়। যা দিনমান প্রচণ্ড দুর্গন্ধ ছড়ায়। পূর্বে অনুন্নত দেশেও রাস্তা-ঘাট থেকে বড়-ছোট ডাস্টবিনগুলো অবমুক্ত করা হতো গভীর রাতে। রাস্তা-ঘাট পরিষ্কার করা হতো সূর্য ওঠার পূর্বে। এখন প্রায়ই সর্বোত্রই তা করা হয় দিনের বেলা।

অনুন্নত বা উন্নয়নশীল দেশে রাতে কাজ করার সমস্যা অনেক। এসব বিষয়ে জাতিসংঘের আহ্বান ছিলো, উন্নত দেশগুলো অনুন্নত দেশসমূহকে এ বিষয়ে এওয়ার্নেসসহ জাগতিক সকল ধরনের সাহায্য-সহযোগিতা করবে। জাতিসংঘ এ বিষয়ে নিজেরাও অনেক কাজ করার চেষ্টা করেছে। ইউরোপীয় ইউনিয়ন নিজেরা যেমন নিজেদেরকে এ বিষয়ে শাসন-প্রশাসনে আবদ্ধ করেছে, সেভাবে অন্যদেরকেও তাদের দূতাবাসের মাধ্যমে যথেষ্ট সতর্ক ও সহযোগিতা করেছে। কিন্তু গোটা বিশ্ব বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্রের নাগপাশে আবদ্ধ হওয়ার পর সবকিছু যেন তছনছ হয়ে গেছে। যুক্তরাষ্ট্র তৃতীয় বিশ্বের এসব সমস্যা সমাধানের জন্য যে দায়ভার নিয়মিতভাবে প্রদান করতো, এখন তা আর সেভাবে নেই। ট্রাম্প তো তার দু’আমলেই আবহাওয়া-জলবায়ু-পরিবেশ ইত্যাদি থেকে যুক্তরাষ্ট্রের দায়ভার বারবার প্রত্যাখ্যান করেছে। অথচ গ্রীণ হাউজ ইফেক্ট উন্নত বিশ্বই বেশী করছে, অহরহ। সবচেয়ে বড়কথা অনুন্নত ও উন্নয়নশীল দেশের পাশে যে খাল-বিল-নদী-নালা-সাগর-উপসাগর রয়েছে, এমন কি পুকুর-ডোবা-নালা-নর্দমা সবকিছু আবর্জনা দ্বারা ভর্তি হয়ে থাকে। কালেভদ্রে সেসব পরিষ্কার করা হয়। আবার কালক্রমে তা ভরাট হয়ে যায়। এ সমস্যাটি সৃষ্টি হয় অনুন্নত দেশে বিভিন্ন কারণে। প্রথমটি হলো এ বিষয়ে জ্ঞান-শিক্ষা-চিন্তা-ভাবনা-গবেষণা-উদ্যোগ-আয়োজন সব কিছুর অভাব রয়েছে, তীব্রতর। দুই নাম্বার হলো রাজনৈতিক, সামাজিক ও পারিবারিক অসচেতনতা, বিশেষ করে শিক্ষার কোনো কাঠামোতে এ বিষয়ে কোনো সঠিক শিক্ষা ও প্রশিক্ষণ দান করা হয় না।

ইসলামপন্থীরা ‘পরিচ্ছন্নতা ঈমানের অঙ্গ’ বলে মাঝে মাঝে বিভিন্ন স্থাপনায় ছোট ছোট বিলবোর্ড, সাইন বোর্ড, পোস্টার বা লিফলেট বিতরণের উদ্যোগ নেয়। কিন্তু মুসলিম প্রধান হলেও বাংলাদেশের শক্তিশালী সেক্যুলার সমাজ বিষয়টিকে ধর্মীয় বিষয় বলে নাক সিটকায়। তারা বলে, আবর্জনার বা বর্জ্যের সংগে ধর্মকে কেন টানাটানি করা হচ্ছে। বিষয়টি বড় কিছু না হলেও প্রণিধানযোগ্য। একটা জাতির মধ্যে প্রায় প্রতিটি বিষয়ে মানসিকভাবে দৃষ্টিভংগীর ভিন্নতা থাকলে সে জাতিকে এগিয়ে নেয়া মানুষের পক্ষে দুঃসাধ্য‌। এদিকে আবার ওলামাদের একদল বলেন, ‘পরিচ্ছন্নতা ঈমানের অঙ্গ’- এ কথাটি ঠিক নয়। তাদের মতামত হলো- ‘পবিত্রতা ঈমানের অঙ্গ’। ইসলাম পবিত্রতার কথা বলেছে। পরিচ্ছন্নতার কথা বলে নি। এখন দেখেন, আপনি কি করবেন? যে দেশে পরিচ্ছন্নতাই মুমিন-মুসলিমরা বোঝে না, সেদেশের বুঝমান পণ্ডিত আলেমগণ পবিত্রতার কথা উদ্ভাসিত করছেন। আরে ভাই, আগেতো পরিচ্ছন্নতা বোঝান, পরিচ্ছন্নতার বিষয়ে মসজিদে নামাজান্তে এবং জুমারদিন খুতবায় মুসল্লিদেরকে সচেতন করুন। খালি কুরআনে এটা আছে, হাদিসে ওটা আছে (যা একদম সহিহ)-এসব কথাইতো সারাজীবন ধরে বলে আসছেন। বাস্তবজীবনে অর্থাৎ ব্যক্তি, পরিবার, সমাজ ও রাষ্ট্রীয় জীবনের ছোট-বড় সমস্যাগুলো নিয়মিত আলোচনা করুন না। দেখবেন জীবন অনেক সহজ হয়ে যাচ্ছে। মানুষ বোঝে না, মানে না, লক্ষ্য করে না, উপলব্ধি করে না, মূল্য দেয় না- গড়ে এসব কথা ঠিক না। আপনারা যারা ‘সচেতনকারী’ ‘চেতনা উদ্রেককারী’, উদ্বুদ্ধকারী, উদ্যম সৃষ্টিকারী’- মাফ করবেন, তাঁরা স্থান-কাল-পাত্রভেদে সঠিক কথাটি যুক্তিযুক্তভাবে উপস্থাপন করতে পারেন না। সমস্যাটা এখানেই বেশি।

কাজগুলো মূলত কেন্দ্রীয় সরকার ও স্থানীয় সরকারের। আমাদের মতো দরিদ্র, অনুন্নত এবং উন্নয়নশীল দেশে সরকারের একার পক্ষে জগৎ ও জীবনের সকল কাজ আনজাম দেয়া অসম্ভব। সরকারের ফান্ডে টাকা-পয়সা থাকতে হবে’তো! দরিদ্র মানুষের পকেটে কোথাও থেকে কোনো টাকা আসলে তিনি যদি মুমিন-মুসলিম হন, তাহলে প্রথমে ওয়াদা অনুযায়ী ঋণ পরিশোধ করবেন। তারপর বাবা-মা, ছেলে-মেয়ে, স্ত্রী, পরিবার-পরিজনদের জন্য খাবার সংগ্রহ করবেন। তারপর আসবে বাসস্থান, বস্ত্র, চিকিৎসা, শিক্ষা, বিয়ে-শাদী ইত্যাদির কথা। একটি দরিদ্র দেশেরও একই অবস্থা। দরিদ্র ব্যক্তি যদি সেক্যুলার হন এবং সেক্যুলার মুসলমান হন তাহলে প্রথমে তিনি ঋণ পরিশোধ করবেন না। তিনি অন্যান্য প্রসঙ্গে চলে যাবেন। কিছুটা আমোদ-স্ফূর্তির ব্যবস্থাও করবেন। তাহলে কী দাঁড়ালো! মুমিন হোক, আর সেক্যুলার হোক, কেউতো আর বর্জ্য বা আবর্জনা নিরসনের ব্যবস্থা করতে পারছেন না। কারণ জনগণ ও সরকারের সচেতনতা থাকলেও তা প্রয়োগ বা বাস্তবায়নের কোনো দুয়ার তাদের সামনে খোলা নেই।

এখন তাহলে কী করতে হবে সব সমাজের জন্য সব পরামর্শ বা উপদেশ যথাযোগ্য নয়। আমরা যদি আমাদের দেশের কথাই ধরি তাহলে আমাদের দেশকে অন্তত মোটা দাগে দুই দৃষ্টিভঙ্গিতে বিবেচনা করা যায়। গ্রামীণ জীবন ও নগর জীবন। গ্রামীণ জীবনের কথায় আসি। তাদের পরিচ্ছন্নতা অভিযান চলে মূলত ঋতুভিত্তিক। আমরা বলে থাকি আমাদের দেশে বিদ্যমান রয়েছে ৬টি ঋতু। কিন্তু বাস্তবে গ্রামীণ মানুষের কাছে বাস্তবে ঋতু হলো সামান্য ব্যতিক্রম ছাড়া মোটামুটিভাবে ৩টি। গ্রীষ্মকাল, বর্ষাকাল, শীতকাল।

গরমকালে এক ধরনের পরিচ্ছন্নতার প্রয়োজন হয়। যেমন- ঝড়, ধূলাবালি, অতিষ্ঠ গরম, ঘাম-এর সাথে যুক্ত হয় নানা অসুখ বিসুখ। বিশেষ করে কলেরা-বসন্ত-হাম-ডায়রিয়া-পেটের নানা ধরনের অসুখ, জ্বর- এসব কারণে ঘর-দুয়ারকে পরিচ্ছন রাখতে হয়। বিশেষ করে ঘরের বাইরের বারান্দা ও উঠানটি। কারণ তীব্র গরম নিবারণের জন্য গ্রামীণ জীবনে তেমন কোনো উন্নত ব্যবস্থা নেই। খোলা বারান্দা ও খোলা উঠানে আমাদের ঘুমাতে হয়। সুতরাং এরসাথে সংশ্লিষ্ট হচ্ছে অবিভাজ্যভাবে আশপাশের জঙ্গল, গুল্মলতা ও ছোট ছোট বৃক্ষের জায়গাগুলো পরিচ্ছন্ন রাখা, আবর্জনা মুক্ত রাখা, পরিষ্কার ও বিপদমুক্ত পানি ও পানীয়-এর ব্যবস্থা রাখা এবং মহামারীর জন্য ঘরে যে ওষুধ-পত্র জমা হয় তার প্যাকেজগুলো মাটির নীচে পুঁতে রাখা।

এবার আসি বর্ষাকালে। বর্ষাকালে তো আমাদের গ্রামীণ জীবন পানিতে ডুবে থাকে। যথাযোগ্য নর্দমা না থাকায় জলাবদ্ধতায় নানারকম সমস্যার সৃষ্টি করে। এ প্রেক্ষাপটে মূলত যে কাজটা আমাদের করতে হবে তা হলো, বর্ষার পানি প্রবাহ যেন আটকে না যায়। একারণে পাকা ব্যবস্থা না হোক, সাময়িকভাবে হলেও স্থানীয় উদ্যোগে পানি নিষ্কাশনের ব্যবস্থা গড়ে তোলা একান্তভাবে বাঞ্ছনীয়। কাজটি স্বেচ্ছা-সেবায়, খাদ্যের জন্য কর্মসূচী বা শিক্ষার্থী ও তরুণদের উদ্যোগে খাল পুনঃখনন, ভরাট থাকা নালা-ডোবা-নর্দমা আবর্জনা মুক্ত করার জন্য বিশেষ ব্যবস্থা গ্রহণ করা সার্বিকভাবে বাস্তবায়ন করা জরুরী।

শীতকালে আসলে ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা প্লাস্টিকের পণ্য, প্যাকেজিংয়ের নানা ধরনের ছোট-বড় ব্যাগ-বোতল-কন্টেইনার-কৌটা স্বেচ্ছা-সেবার ভিত্তিতে অথবা সামাজিক কোনো স্কিমে প্রকৃতি বিধ্বংসকারী বর্জ্য সংগ্রহ করা বিশেষভাবে প্রয়োজন। বছরের অন্য সময় বর্জ্য সংগ্রহে তেমন সুযোগ আর থাকে না।

এ ক্ষুদ্র আলোচনা থেকে দেখা গেল, দেশ ও মানুষ দরিদ্র হলেও নিজেদের মধ্যে সচেতনতার বীজ উপ্ত করতে পারলে গ্রামীণ জীবন থেকে বর্জ্য বা আবর্জনা দূর করার কাজটি অসম্ভব কিছু নয়। ঘুরে আসুন ভারতের মেঘালয়ের মাওলিন্নং গ্রাম, যা এশিয়ার অন্যতম পরিচ্ছন্ন গ্রাম বলে পরিচিত। আর বাংলা দেশে আছে নারায়ণগঞ্জের পানাম এলাকা ও নওগাঁর রক্তদহ এলাকার গ্রামাঞ্চল।

নগর জীবনের কথা বলে শেষ করা যাবে না। এখানে তো অনৈক্যই বেশি। ঐক্যের লেশমাত্র নেই। সামাজিক উদ্যোগ বলতে কোনো কিছু নেই। এখানে কেউ কারো ছায়া মাড়ায় না। স্বেচ্ছা-সেবায় কোনো কাজ করার সামান্য কোনো উদ্যোগ নিলেও গোষ্ঠী বা সমিতির মাথায় পাহাড় ভাঙা হয়। সিটি কর্পোরেশনের ওয়ার্ড কমিশনারদের ওপরে উপর মহলের চাঁদা তোলার দায়িত্ব প্রত্যাহার করে বর্জ্য বা আবর্জনার মূল দায়িত্ব অর্পণ করলে এবং এর ওপর পুরস্কার ও শাস্তির ব্যবস্থা কঠোরভাবে বাস্তবায়ন করলে মনের আবর্জনাসহ সব আবর্জনা দূর হয়ে যাবে। তবে এখানেও প্রধান কথা হলো- দেশকে প্রথমে রাষ্ট্রে পরিণত করতে হবে।

লেখক : সাহিত্যিক, সাংবাদিক ও সংগঠক