গাজায় যুদ্ধ থামার কথা ছিল, কিন্তু যুদ্ধের ছায়া এখনো সরে যায়নি। ইরান যুদ্ধ গাজার কথা গাজাবাসীর দুঃখের জীবন কথা টাইম লাইন থেকে আড়াল করে দিয়েছে যেন। কিন্তু সেখানে সংঘাতের অবসান হয়নি। ধ্বংসস্তূপের নিচে চাপা পড়ে আছে হাজারো পরিবারের স্বপ্ন, আর অস্থায়ী তাঁবুতে দিন কাটাচ্ছে লাখো মানুষ। একদিকে যুদ্ধবিরতি ও শান্তি পরিকল্পনা বাস্তবায়নের কূটনৈতিক তৎপরতা, অন্যদিকে গাজায় ইসরাইলী হামলা এই বৈপরীত্যই প্রমাণ করছে, রাজনৈতিক সদিচ্ছার ঘাটতিই এখন সবচেয়ে বড় সংকট।
মিসর আলোচনায় নতুন করে আশার আলো দেখা গেলেও ইসরাইলের বাধার মুখে তা আগাতে পারছে না বলে মনে করেন বিশ্লেষকরা। কী সে আশার আলো? গাজায় যুদ্ধবিরতি ও শান্তি ফেরানোর প্রচেষ্টায় নতুন করে কূটনৈতিক তৎপরতা শুরু হয়েছিল। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের জামাতা ও বিশেষ দূত জ্যারেড কুশনার মিসরে হামাসের শীর্ষ নেতা খলিল আল-হায়ার সঙ্গে বৈঠক করেছেন। ট্রাম্পের ১৫ দফা শান্তি পরিকল্পনা বাস্তবায়ন, হামাসের নিরস্ত্রীকরণ ও গাজা থেকে ইসরাইলী সেনা প্রত্যাহার নিয়ে এ বৈঠকে গুরুত্বপূর্ণ আলোচনা হয়েছে বলে জানা গেছে। বলা হচ্ছে, গত বছর গাজা উপত্যকার জন্য যুদ্ধবিরতি চুক্তির পর হায়ার সঙ্গে কুশনারের বৈঠকটিই এই পর্যায়ের প্রথম বৈঠক। বোর্ড অফ পিস-এর দূত নিকোলাই ম্লাদেনভ এবং যুক্তরাজ্যের প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রী টনি ব্লেয়ারও এ বৈঠকে উপস্থিত ছিলেন। তাঁদের পাশাপাশি শান্তি প্রচেষ্টায় মধ্যস্থতাকারী মিসর, কাতার এবং তুরস্কের প্রতিনিধিরাও উপস্থিত ছিলেন।
১৬ আগস্ট বৈঠকে হামাস মধ্যস্থতাকারী ও বোর্ড অব পিসের প্রতি আহ্বান জানিয়েছে, তারা যেন ইসরাইলকে পরিকল্পনাটি গ্রহণে বাধ্য করে। শান্তিচুক্তির প্রথম ধাপের অধীনে দেয়া সব প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়ন ও দ্বিতীয় ধাপের রূপরেখা অনুমোদন করার জন্যও ইসরাইলের ওপর চাপ প্রয়োগের কথা বলেছে হামাস। ১৭ আগস্ট ইসরাইলে প্রধানমন্ত্রী নেতানিয়াহুর সঙ্গে বৈঠক করেন কুশনার। কিন্তু তেমন একটা অগ্রগতি ছাড়াই আলোচনা শেষ হয়েছে। মূল সমস্যা এখনো একই জায়গায়। ইসরাইল বলছে, হামাস পুরোপুরি নিরস্ত্র না হওয়া পর্যন্ত গাজা থেকে তাদের সেনা প্রত্যাহার করা হবে না। অন্যদিকে হামাসের বক্তব্য, ইসরাইলী হামলা বন্ধ এবং সেনা প্রত্যাহারের মতো প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়ন না হলে তাদের পক্ষ থেকেও নিরস্ত্রীকরণসহ পরিকল্পনার পরবর্তী ধাপে যাওয়া কঠিন। এই অচলাবস্থা যত দীর্ঘ হবে, তার মূল্য দিতে হবে গাজার সাধারণ মানুষকেই। ফলে উদ্যোগটি সাফল্য অর্জন ছাড়াই শেষ হলো। এক মাত্র অর্জন হামাসের শীর্ষ নেতার সাথে মার্কিন পক্ষের নজিরবিহিন বৈঠক।
আলজাজিরার এক বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, সরকারিভাবে, যুক্তরাষ্ট্র হামাসকে একটি নিষিদ্ধ, “সন্ত্রাসী” সংগঠন হিসেবে বর্ণনা করে। বেসরকারিভাবে যুক্তরাষ্ট্র দীর্ঘদিন ধরে এ ফিলিস্তিনী দলটির সাথে মূলত মধ্যস্থতাকারীদের মাধ্যমে যোগাযোগ রক্ষা করে আসছে। রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা মার্কিন দূত এবং হামাস নেতৃত্বের মধ্যে এ সরাসরি যোগাযোগকে মাঠপর্যায়ের রাজনৈতিক বাস্তবতার একটি গুরুত্বপূর্ণ স্বীকৃতি হিসেবে দেখছেন। দোহা ইনস্টিটিউট ফর গ্র্যাজুয়েট স্টাডিজের প্রভাষক এবং মধ্যপ্রাচ্যের রাজনীতি বিশেষজ্ঞ মাহজুব জুইরি আল জাজিরাকে বলেন যে, এ বৈঠকটি “এ বাস্তবতার প্রতি এক ধরনের আমেরিকান আত্মসমর্পণের প্রতিনিধিত্ব করে যে, হামাস ফিলিস্তিনী সমাজে এমন একটি রাজনৈতিক শক্তি যাকে উপেক্ষা করা যায় না”।
গত বছরের ১০ অক্টোবর কার্যকর হওয়া যুদ্ধবিরতিটি এখনও বহাল রয়েছে। তবে, ইসরাইলী বাহিনী গাজায় হামলা অব্যাহত রেখেছে, যার সর্বশেষটি ছিল গাজার খান ইউনিস এবং নুসেইরাত এলাকার ওপর। ২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর দক্ষিণ ইসরাইলে হামাসের নেতৃত্বে চালানো এক হামলার মাধ্যমে এ যুদ্ধের সূত্রপাত হয়, যেখানে প্রায় ১,২০০ ইসরাইলী নিহত এবং আরও ২৫১ জনকে ধরে নিয়ে আসা হয়। এ হামলার জবাবে ইসরাইল গাজায় পাল্টা অভিযান শুরু করে, যার ফলে এ দুই বছরের বেশি সময় ধরে এ পর্যন্ত ৭৫ হাজারের বেশি মানুষ নিহত হয়েছে। আর জাতিসংঘের অনুমান প্রায় ১৯ লক্ষ মানুষ, যা গাজার জনসংখ্যার ৯০ শতাংশ, বাস্তুচ্যুত হয়েছেন।
গাজা যুদ্ধের সবচেয়ে ভয়াবহ দিক হলো এটি কেবল একটি সামরিক সংঘাত নয়; এটি একটি গভীর মানবিক বিপর্যয়। দু’বছর ধরে চলা ব্যাপক সামরিক অভিযানে গাজার অবকাঠামো, আবাসন, হাসপাতাল, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, যোগাযোগব্যবস্থা ও জীবিকার ভিত্তি বিপর্যস্ত হয়েছে। যুদ্ধবিরতির পরও হামলা পুরোপুরি বন্ধ হয়নি। রয়টার্সের সাম্প্রতিক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০২৫ সালের অক্টোবরের যুদ্ধবিরতির পরও ইসরাইলী হামলায় গাজায় ১ হাজার ২৫০ জনের বেশি ফিলিস্তিনী নিহত হয়েছেন; নিহতদের বেশির ভাগই বেসামরিক। একই সময়ে গাজায় হামাসের হামলায় চারজন ইসরাইলী সেনা নিহত হওয়ার কথা জানিয়েছে ইসরাইল। যুদ্ধবিরতির পর ইসরাইল গাজার অর্ধেকের বেশি এলাকা নিয়ন্ত্রণে রাখলেও পরে সেই নিয়ন্ত্রণ প্রায় দুই-তৃতীয়াংশ এলাকায় বিস্তৃত হয়েছে। সেখানে বহু স্থাপনা ধ্বংস, সুড়ঙ্গ গুঁড়িয়ে দেওয়া এবং মানুষকে এলাকা ছাড়ার নির্দেশ দেওয়ার ঘটনাও ঘটেছে। গাজার প্রায় ২০ লাখ মানুষকে উপকূলের তুলনামূলক ছোট একটি এলাকায় ঠেলে দেওয়া হয়েছে; তাদের বড় অংশ তাঁবু বা ক্ষতিগ্রস্ত ভবনে বসবাস করছে। এ অবস্থায় কোনো রাজনৈতিক পরিকল্পনার সাফল্য কেবল কূটনৈতিক বৈঠকের সংখ্যা দিয়ে বিচার করা যায় না। দেখতে হবে গাজার একজন মা তার সন্তানকে নিরাপদে ঘুম পাড়াতে পারছেন কি না, একজন আহত মানুষ চিকিৎসা পাচ্ছেন কি না, একটি পরিবার আবার ঘরে ফিরতে পারছে কি না এবং শিশুরা স্কুলে যাওয়ার সুযোগ পাচ্ছে কি না।
হামাস এখন মধ্যস্থতাকারীদের বলছে, তারা যেন ইসরাইলকে শান্তি পরিকল্পনা মেনে নিতে বাধ্য করে। এ দাবি বর্তমান পরিস্থিতিতে গুরুত্বপূর্ণ। কারণ যুদ্ধবিরতি কোনো পক্ষের একতরফা রাজনৈতিক সুবিধা অর্জনের হাতিয়ার হতে পারে না। যুদ্ধবিরতির অর্থ হলো গুলি থামবে, মানুষ বাঁচবে, মানবিক সহায়তা পৌঁছাবে এবং রাজনৈতিক সমাধানের দরজা খুলবে। এখানে যুক্তরাষ্ট্রের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ওয়াশিংটন যদি সত্যিই যুদ্ধের অবসান চায়, তাহলে শুধু হামাসের ওপর শর্ত চাপিয়ে দিলেই হবে না; ইসরাইলের ওপরও সমান কার্যকর চাপ প্রয়োগ করতে হবে। কারণ সামরিক ও কূটনৈতিক বাস্তবতায় ইসরাইলের ওপর যুক্তরাষ্ট্রের প্রভাব যথেষ্ট। শান্তি পরিকল্পনা বাস্তবায়নে সেই প্রভাব ব্যবহার না করলে পরিকল্পনাটি কাগজেই সীমাবদ্ধ থাকবে।
১৬ আগস্টও গাজায় হামলার খবর এসেছে। খান ইউনিস ও নুসেইরাতে ইসরাইলী বিমান হামলায় কয়েকজন আহত হন; খান ইউনিসের একটি তাঁবুতে হামলার পর আহতদের একজন মারা যান। নুসেইরাতে একটি অ্যাপার্টমেন্টেও হামলা হয়। ইসরাইল বলেছে, এসব হামলার লক্ষ্য ছিল হামাস ও ইসলামিক জিহাদের সদস্যরা। এ বাস্তবতাই সবচেয়ে বড় প্রশ্ন তৈরি করছে একদিকে যখন শান্তি পরিকল্পনা নিয়ে আলোচনা হচ্ছে, তখন অন্যদিকে কেন হামলা চলবে? যদি কোনো পক্ষ মনে করে, নিরাপত্তার স্বার্থে সীমিত সামরিক অভিযান প্রয়োজন, তাহলে তার জন্যও আন্তর্জাতিকভাবে গ্রহণযোগ্য যাচাই ও নজরদারি ব্যবস্থা থাকতে হবে। কারণ ‘নিরাপত্তা’ শব্দটি যেন অনির্দিষ্ট সামরিক অভিযানের স্থায়ী অজুহাতে পরিণত না হয়।
বিশ্লেষকরা মনে করেন, গাজার সংকট আজ শুধু ইসরাইল ও হামাসের সমস্যা নয়। এটি আন্তর্জাতিক ব্যবস্থার নৈতিকতারও পরীক্ষা। জাতিসংঘ, যুক্তরাষ্ট্র, ইউরোপীয় দেশগুলো, আরব রাষ্ট্র এবং মুসলিম বিশ্বের সামনে এখন একটি স্পষ্ট প্রশ্ন আর কত মৃত্যু হলে যুদ্ধ থামবে? সৌদি আরব, সংযুক্ত আরব আমিরাতসহ কয়েকটি আরব ও মুসলিম-অধ্যুষিত দেশ ইতিমধ্যে ইসরাইলের শান্তি পরিকল্পনা প্রত্যাখ্যানের সমালোচনা করেছে। ১৭ আগস্টের তথ্য অনুযায়ী, মিসর, জর্ডান, কাতার, ইন্দোনেশিয়া, সৌদি আরব, তুরস্ক, সংযুক্ত আরব আমিরাত ও পাকিস্তান যৌথভাবে ইসরাইলের অবস্থানের নিন্দা জানিয়েছে। এখন শুধু বিবৃতি নয়, কার্যকর কূটনৈতিক উদ্যোগ দরকার। গাজা পুনর্গঠন কোনো দাতব্য প্রকল্প নয়; এটি একটি ধ্বংসপ্রাপ্ত সমাজের প্রতি আন্তর্জাতিক দায়িত্ব। হাসপাতাল, স্কুল, পানি ও পয়োনিষ্কাশন ব্যবস্থা, বিদ্যুৎ, আবাসন ও কর্মসংস্থান পুনর্গঠন ছাড়া সেখানে স্থায়ী শান্তি প্রতিষ্ঠা সম্ভব নয়। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, গাজায় শান্তি প্রতিষ্ঠাকে কেবল ‘হামাসকে নিরস্ত্র করার’ প্রকল্পে পরিণত করা যাবে না। হামাসের সামরিক সক্ষমতা নিয়ে প্রশ্ন থাকবেই। কিন্তু তার পাশাপাশি ফিলিস্তিনী জনগণের রাজনৈতিক অধিকার, রাষ্ট্রীয় আকাক্সক্ষা, নিরাপত্তা ও মর্যাদার প্রশ্নও সমান গুরুত্বপূর্ণ।
একটি জনগোষ্ঠীকে শুধু ধ্বংসস্তূপ পরিষ্কার করে আবার তাঁবুতে ফিরিয়ে দিলে শান্তি প্রতিষ্ঠিত হবে না। তাদের ভবিষ্যৎ সম্পর্কে রাজনৈতিক নিশ্চয়তা দিতে হবে। গাজার প্রশাসন যদি সত্যিই একটি ফিলিস্তিনী বেসামরিক কাঠামোর হাতে যায়, তাহলে সেই প্রশাসনকে বিশ্বাসযোগ্য, প্রতিনিধিত্বশীল এবং আন্তর্জাতিকভাবে গ্রহণযোগ্য হতে হবে। অন্যদিকে ইসরাইলেরও বুঝতে হবে সামরিক শক্তি দিয়ে হামাসকে দুর্বল করা সম্ভব হলেও ফিলিস্তিনী জনগণের রাষ্ট্রীয় আকাক্সক্ষাকে নিশ্চিহ্ন করা সম্ভব নয়। ইতিহাসের শিক্ষা হলো, রাজনৈতিক সমস্যার সামরিক সমাধান দীর্ঘস্থায়ী হয় না।
গাজা আজ শুধু একটি ভূখণ্ডের নাম নয়; এটি বিশ্ব বিবেকের সামনে দাঁড়ানো এক কঠিন প্রশ্ন। শিশুদের কান্না, ধ্বংস হওয়া ঘরবাড়ি, আহত মানুষের দীর্ঘ সারি এবং বাস্তুচ্যুত পরিবারের অনিশ্চিত জীবন আমাদের মনে করিয়ে দেয় যুদ্ধের কোনো প্রকৃত বিজয়ী নেই। হামাসের আহ্বান অনুযায়ী ইসরাইলকে শান্তি পরিকল্পনা মেনে নিতে চাপ দেওয়া হোক। গাজায় এখন আর নতুন কোনো যুদ্ধের প্রয়োজন নেই। সবচেয়ে বড় কথা, গাজার মানুষকে আর মৃত্যুর অপেক্ষায় রাখা যাবে না। ১০ অক্টোবর দ্বিতীয় দফা যুদ্ধবিরতি চুক্তির আওতায় হামাস সকল বন্দীকে মুক্তি দেয় ও মৃতদের লাশ হস্তান্তর করে। যুদ্ধবিরতি চুক্তিকে অনেক কিছুই ছিল। কিন্তু ইসরাইলী প্রধানমন্ত্রী নেতানিয়াহু কোন কিছুকেই তোয়াক্কা করছেন না।
বিশ্লেষকরা মনে করেন, যুদ্ধ থামাতে হবে, মানবিক সহায়তার দরজা খুলতে হবে এবং যুদ্ধ বিরতি চুক্তির দ্বিতীয় ধাপে যেতে হবে। গাজা পুনর্গঠনের দিকটি ভাবতে হবে। আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের সামনে এর চেয়ে জরুরি দায়িত্ব আর হতে পারে না।
লেখক : সিনিয়র সাংবাদিক।