কলকাতায় যা শুরু হয়েছিল, তা কলকাতাতেই ফিরে এসেছে। ইতিহাস কখনো সরলরেখা নয়। বৃত্ত। ঘুরে ফিরে আসে। হিন্দুত্ববাদও তেমনই এক বৃত্তের রাজনীতি। শুরুতে ছিল সাংস্কৃতিক আধিপত্য। পরে তা রাজনৈতিক। এখন তা রাষ্ট্রীয়।

১৭৯৩ সালের চিরস্থায়ী বন্দোবস্ত ছিল শুধু একটি অর্থনৈতিক নীতি নয়। এটি ছিল মানস গঠনের প্রকল্প। এক নতুন শ্রেণী তৈরি হয়েছিল। মুন্সী, পেশকার, সেরেস্তাদার-হঠাৎ জমিদার। ক্ষমতা পেল। কিন্তু সেই ক্ষমতা ছিল ধার করা। উপর থেকে দেয়া। জনগণের সঙ্গে সম্পর্কহীন। এই শ্রেণীর মানসিকতা ছিল প্রাধিকারভিত্তিক। তারা নিজেদের স্বাভাবিক শাসক ভাবতে শিখেছিল। এই মানসিকতাই পরে নীতিতে রূপ নেয়। রাষ্ট্রে রূপ নেয়। প্রতিবেশী সম্পর্কে দৃষ্টিভঙ্গিতে রূপ নেয়।

ভারতের বাংলাদেশনীতি এই মানসের বাইরে কখনো যায়নি-এমন অভিযোগ নতুন নয়। ক্ষমতায় কে আছে-তা গৌণ। কাঠামো একই থাকে। কংগ্রেস হোক বা বিজেপি-নীতির ধারাবাহিকতা চোখে পড়ে। ২০১৪ সালে ভারতে উগ্র হিন্দুত্ববাদ কেন্দ্রীয় ক্ষমতায় আসে। সময় লাগে। কিন্তু প্রক্রিয়া থামে না। পশ্চিমবঙ্গ দীর্ঘদিন ব্যতিক্রম ছিল। এখন আর নয়। ত্রিপুরা, আসাম, পশ্চিমবঙ্গ-বাংলাদেশকে ঘিরে থাকা তিনটি গুরুত্বপূর্ণ রাজ্যেই এখন একই মতাদর্শের আধিপত্য। এতে আতঙ্কিত হওয়ার দরকার আছে কি? আবেগ দিয়ে উত্তর দিলে ভুল হবে। বিশ্লেষণ দরকার। ঠান্ডা মাথা দরকার। কারণ, ভারতের রাষ্ট্রীয় নীতি অনেকাংশে ধারাবাহিক। শুধু ভাষা বদলায়। উপস্থাপন বদলায়। অভিপ্রায় প্রায় একই থাকে।

এই প্রাধিকারবোধের ইতিহাস পুরনো। কেবল রাজনীতিতে নয়। সংস্কৃতিতেও। কলকাতার বেঙ্গল রেনেসাঁকে আমরা ‘আলোকিত অধ্যায়’ হিসেবে পড়ি। কিন্তু তার ভেতরেও ছিল এক ধরনের শ্রেণীচেতনা। এক ধরনের সাংস্কৃতিক শ্রেষ্ঠত্ববোধ। বঙ্কিমচন্দ্রের লেখায় পূর্ববঙ্গের প্রতি যে দৃষ্টিভঙ্গি দেখা যায়-তা নিছক সাহিত্যিক কল্পনা ছিল না। সেটি ছিল একটি মানসিকতার প্রতিফলন। পূর্ববঙ্গকে ‘অন্য’ হিসেবে দেখা। পিছিয়ে পড়া হিসেবে দেখা। এই দৃষ্টিভঙ্গি পরে রাজনীতিতেও প্রভাব ফেলেছে।

পলাশীর যুদ্ধ শুধু শাসক বদল করেনি। অর্থনৈতিক শক্তির কেন্দ্র বদল করেছে। পূর্ববঙ্গের অর্থনৈতিক সক্ষমতা ভেঙে পড়েছে। নতুন শ্রেণী উঠে এসেছে। যারা ব্রিটিশের আশ্রয়ে বড় হয়েছে। তাদের সংস্কৃতি ছিল অনুকরণভিত্তিক। আত্মবিশ্বাসহীন। কিন্তু আত্মগর্বে ভরা। এই বৈপরীত্য থেকেই জন্ম নেয় এক ধরনের কৃত্রিম আধুনিকতা। এই আধুনিকতা ইউরোপীয় এনলাইটেনমেন্টের মতো নয়। সেখানে ছিল যুক্তি। ব্যক্তি স্বাধীনতা। সাম্য। এখানে ছিল আচার। রীতি। জাত-পাতের পুনর্বিন্যাস। পুরনো কাঠামোর নতুন রূপ। আজও সেই ছাপ দেখা যায়। জাতপাতের ধারণা এখনও বেঁচে আছে। সামাজিক স্তরবিন্যাস এখনও দৃশ্যমান। কসমোপলিটান হওয়ার দাবি থাকলেও বাস্তবে তা হয়নি।

বাংলাদেশের একটি অংশ এই কলকাতাকেন্দ্রিক আধুনিকতাকে অনুকরণ করেছে। কিন্তু তারা অনেক সময় বুঝতে পারেনি-এটি আসলে ধর্মনিরপেক্ষতার নামে ধর্মীয় সংস্কৃতির পুনরুৎপাদন। হিন্দু রিচুয়ালকে ‘কালচার’ হিসেবে গ্রহণ করা হয়েছে। সমালোচনা ছাড়া। বিশ্লেষণ ছাড়া। অন্যদিকে, যারা ইংরেজি শিক্ষার মাধ্যমে সরাসরি ইউরোপীয় চিন্তার সংস্পর্শে এসেছে-তারা ভিন্ন পথ দেখেছে। তারা এনলাইটেনমেন্টের ধারণা পেয়েছে। ব্যক্তি স্বাধীনতা, আইনের শাসন, সমতার ধারণা পেয়েছে। এই দুই ধারার দ্বন্দ্ব এখনও আছে।

ঢাকার তথাকথিত ‘আলোকিত’ সমাজ অনেক সময় এই বিভ্রান্তি ছড়িয়েছে। অসাম্প্রদায়িকতার নামে এক ধরনের সাংস্কৃতিক পক্ষপাত তৈরি হয়েছে। যার ফলাফল রাজনৈতিক। এই প্রেক্ষাপটে আওয়ামী লীগকে একটি নির্দিষ্ট কাঠামোর মধ্যে দেখা হয়েছে-এমন বিশ্লেষণও আছে। বলা হয়, এটি একটি বৃহত্তর আঞ্চলিক কৌশলের অংশ। কেউ একে ‘প্রক্সি’ রাজনীতি বলে। কেউ বলে বাস্তববাদ।

প্রশ্ন হচ্ছে-বাংলাদেশের স্বার্থ কোথায়? ইতিহাস আমাদের স্পষ্ট করে দিয়েছে-১৯৪৭ একটি মোড়। ১৯৭১ আরেকটি। এই দুই ঘটনার মাধ্যমে রাজনৈতিক স্বার্থ আলাদা হয়েছে। পরিচয় স্পষ্ট হয়েছে। চব্বিশের বর্ষা বিপ্লবের মধ্য দিয়ে তরুণরা নতুন বার্তা দিয়েছে। তারা ভারতের আধিপত্য মানতে নারাজ। তারা নিজস্ব পরিচয় গড়ে তুলতে চায়। দায় ও দরদের রাজনীতি প্রতিষ্ঠা করতে চায়। তারা ন্যায্যতা-সম্মান-মর্যাদাকে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ মনে করে। নতুন বাংলাদেশকে নিয়ে ভাবতে হলে জুলাই বিপ্লবকে সামনে রাখতেই হবে।

পশ্চিমবঙ্গের বাঙালি হিন্দু এবং বাংলাদেশের বাঙালি মুসলমান-দুই সম্প্রদায়ের রাজনৈতিক বাস্তবতা ভিন্ন। আবেগ দিয়ে এক করা যায় না। তবু বাংলাদেশের একাংশ এই বাস্তবতা মানতে চায় না। তারা ‘বাঙালি’ পরিচয়ের ওপর জোর দেয়। ধর্মীয় পার্থক্যকে গৌণ করে। ভারতের সঙ্গে ঘনিষ্ঠতাকে রাজনৈতিক কৌশল হিসেবে দেখে। কিন্তু বাস্তবতা বদলাচ্ছে।

ভারতের রাজনীতিতে এখন সর্বভারতীয় হিন্দু জাতীয়তাবাদ শক্তিশালী। আঞ্চলিক বাঙালি পরিচয় সেখানে দুর্বল হচ্ছে। পশ্চিমবঙ্গেও একই প্রবণতা। ফলে যে ‘কমন গ্রাউন্ড’ খোঁজা হচ্ছিল-তা সরে যাচ্ছে। এই পরিস্থিতিতে পুরনো বাঙালি জাতীয়তাবাদ দিয়ে বাংলাদেশের স্বার্থ রক্ষা করা কঠিন।

আরেকটি বড় প্রশ্ন-ভারতের হিন্দুত্ববাদের প্রতিক্রিয়ায় বাংলাদেশ কী করবে? পাল্টা সাম্প্রদায়িকতা? না। সেটি আত্মঘাতী। হিন্দু বিরোধিতা? না। সেটিও ভুল। রাষ্ট্রীয় নীতির বিরোধিতা করা যায়। কিন্তু জনগণের বিরুদ্ধে অবস্থান নেয়া যায় না। এটি নৈতিকভাবে ভুল। কৌশলগতভাবেও ক্ষতিকর।

ইসলামকে যদি পরিচয়ের কেন্দ্র ধরা হয়-তবে তার মূল শিক্ষা কী? ন্যায়। সহাবস্থান। চুক্তিভিত্তিক সমাজ। ধর্মীয় স্বাধীনতা। মানবিকতা। এই জায়গা থেকেই রাজনীতি গড়ে উঠতে পারে। রাসুল (সা.)-এর মদিনা সনদ একটি উদাহরণ। ভিন্ন ধর্মের মানুষ একসাথে ছিল। অধিকার নির্ধারিত ছিল। দায়িত্ব নির্ধারিত ছিল। এটি সাম্প্রদায়িক রাজনীতি নয়। এটি ন্যায়ভিত্তিক রাজনীতি।

বাংলাদেশের জন্য এই পথটাই বাস্তবসম্মত। একদিকে ভারতীয় আধিপত্যের বিরোধিতা। অন্যদিকে দেশের ভেতরে সংখ্যালঘুদের পূর্ণ অধিকার নিশ্চিত করা। এই ভারসাম্য রক্ষা কঠিন। কিন্তু সম্ভব।

ভারতের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে যে পরিবর্তন এসেছে-তা অস্বীকার করার উপায় নেই। বাবরি মসজিদ ইস্যু থেকে শুরু করে আজ পর্যন্ত একটি ধারাবাহিকতা আছে। ইতিহাস পুনর্লিখন। প্রতীকী স্থাপনা দখল। সাংস্কৃতিক পুনর্গঠন। চলচ্চিত্র, গণমাধ্যম, পাঠ্যপুস্তক-সবখানে এর প্রভাব। গুজরাট, কাশ্মির, আসাম-বিভিন্ন জায়গায় নীতি প্রয়োগের উদাহরণ আছে। নাগরিকত্ব প্রশ্নে বিতর্ক হয়েছে। ডেমোগ্রাফিক ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের অভিযোগ উঠেছে। পশ্চিমবঙ্গেও সেই প্রভাব পড়েছে-এমন দাবি উঠছে।

এই পুরো প্রক্রিয়াকে কেউ কেউ ‘মেটামরফসিস’বা রূপান্তর কাহিনী বলে। কিন্তু এটি হঠাৎ নয়। দীর্ঘমেয়াদি। নেহেরু একসময় একটি ভিন্ন কাঠামো দাঁড় করিয়েছিলেন। ধর্মনিরপেক্ষতা। প্রতিষ্ঠানভিত্তিক রাষ্ট্র। কিন্তু ভেতরের অসুখ রয়ে গিয়েছিল। চিকিৎসা হয়নি। ঢাকা ছিল। সময় এসেছে। তা প্রকাশ পেয়েছে।

বিশ্বে আমরা দেখেছি-নাজিবাদ, জায়নবাদ-চরম মতাদর্শ কীভাবে রাষ্ট্রকে বদলে দেয়। বেশ কিছুদিন ধরেই ভারতের ক্ষেত্রেও সেই আশঙ্কা কেউ কেউ করছেন। কেউ তা অতিরঞ্জন মনে করেন। কিন্তু একটি বিষয় স্পষ্ট-ধর্মীয় পরিচয়ভিত্তিক রাজনীতি শক্তিশালী হয়েছে। হচ্ছে। নাজিবাদ, জায়নবাদের মতো মোদির হিন্দুত্ববাদ ফনা তুলেছে। কামড়ও দিচ্ছে। বিষ ছড়িয়ে দিচ্ছে।

এই প্রেক্ষাপটে আরেকটি জটিল বিষয় সামনে আসে। কিছু মুসলিম রাজনৈতিক শক্তি এই হিন্দুত্ববাদী রাজনীতির সাথে পরোক্ষভাবে সহাবস্থান করছে-এমন অভিযোগও আছে। কেউ বলে কৌশল। কেউ বলে বিভ্রান্তি। বাংলাদেশেও এর প্রতিফলন দেখা যায়-এমন দাবি করা হয়। দাড়ি-টুপি পরে ধর্মের কথা বলে, কিন্তু বাস্তবে এমন কাজ করে যা উল্টো ফল দেয়। সমাজে বিভাজন বাড়ায়। প্রতিক্রিয়াশীলতা উসকে দেয়। এটি বিপজ্জনক। কারণ, এটি মূল সমস্যাকে আড়াল করে। আসল লড়াই থেকে দৃষ্টি সরিয়ে দেয়।

আরেকটি প্রবণতা-উস্কানি। সামাজিক মাধ্যমে। মিডিয়ায়। ছোট ঘটনাকে বড় করা। আবেগ উসকে দেওয়া। প্রতিক্রিয়া আদায় করা। এখানে একটি সহজ উদাহরণ প্রযোজ্য। ফুটবলের মাঠে উস্কানি। একজন খেলোয়াড় অপমান করে। অন্যজন উত্তেজিত হয়। প্রতিক্রিয়া দেয়। শাস্তি পায় সেই প্রতিক্রিয়াকারী। রাজনীতিতেও একই। যারা উস্কানি দেয়-তারা চায় প্রতিক্রিয়া। কারণ সেটিই তাদের শক্তি বাড়ায়। বাংলাদেশের জন্য সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ এখানেই। কীভাবে এই উস্কানি এড়িয়ে চলা যায়। শান্ত থাকা দুর্বলতা নয়। কৌশল। সমাজকে উত্তপ্ত করা সহজ। ঠান্ডা রাখা কঠিন। এই কঠিন কাজটাই করতে হবে।

বাংলাদেশ একটি বৈচিত্র্যময় সমাজ। এখানে বিভিন্ন ধর্ম, সংস্কৃতি, পরিচয় আছে। এই বাস্তবতাকে অস্বীকার করে কোনো রাজনীতি টিকবে না। একই সাথে, জাতীয় স্বার্থকে স্পষ্টভাবে সংজ্ঞায়িত করতে হবে। আবেগ দিয়ে নয়। বাস্তবতা দিয়ে। ভারতের সঙ্গে সম্পর্ক থাকবে। ভৌগোলিক বাস্তবতা, অর্থনীতি, নিরাপত্তা-সব কারণে। কিন্তু সম্পর্ক মানেই আত্মসমর্পণ নয়। সম্মানজনক সম্পর্ক দরকার। সমতার ভিত্তিতে।

এই অবস্থান নিতে হলে অভ্যন্তরীণ শক্তি দরকার। রাজনৈতিক ঐক্য দরকার। নৈতিক স্পষ্টতা দরকার। সবচেয়ে বড় কথা-আত্মপরিচয়ের স্বচ্ছতা দরকার। আমরা কে? আমাদের রাষ্ট্রের ভিত্তি কী? আমাদের রাজনীতির লক্ষ্য কী? এই প্রশ্নগুলোর পরিষ্কার উত্তর ছাড়া কোনো কৌশল টিকবে না।

কলকাতার ইতিহাস আমাদের শিক্ষা দেয়-অনুকরণ বিপজ্জনক। আত্মপরিচয় হারানো আরও বিপজ্জনক। আবার, আত্মপরিচয়ের নামে সংকীর্ণতা আরও বড় বিপদ। দুই চরমের মাঝখানে পথ খুঁজতে হবে।

হিন্দুত্ববাদ কলকাতায় শুরু হয়েছিল-এমন দাবি করা হয়। আজ তা সেখানে ফিরে এসেছে-এমনও বলা হচ্ছে। এতে অবাক হওয়ার কিছু নেই। ইতিহাস বৃত্তাকার। কিন্তু বাংলাদেশের জন্য আসল প্রশ্ন-আমরা কোন বৃত্তে হাঁটব? প্রতিক্রিয়ার বৃত্তে? নাকি ন্যায়ের পথে? উত্তরটা ভবিষ্যৎ নির্ধারণ করবে।

লেখক: সাবেক সাধারণ সম্পাদক, ঢাকা সাংবাদিক ইউনিয়ন।