মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প কি খুব ভয় পেয়ে গেছেন? আগের কোনো প্রেসিডেন্টকে তো আমরা এভাবে কথা বলতে দেখিনি। অনেকেই বিশে^র একনম্বর সমরশক্তির দেশ হিসেবে যুক্তরাষ্ট্রকে বিবেচনা করে থাকেন। কিছুদিন আগে ট্রাম্প নিজেও বলেছেন, পৃথিবীকে বহুবার ধ্বংস করার মতো মারণাস্ত্র তাদের কাছে মজুত আছে। তিনি কেবল ধ্বংসের কথা বলেন, গড়ার বিষয়টা কি তার রুচিতে নেই? প্রশ্ন হলো, এতো দম্ভের পর তিনি আবার মৃত্যুর কথা ভাবছেন কেন? ট্রাম্পেরও কি মৃত্যুর ভয় আছে? মার্কিন প্রেসিডেন্ট হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেছেন, তাকে হত্যার চেষ্টা করলে ইরানের বিরুদ্ধে হাজার হাজার ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপ করা হবে। ইরানকে সম্পূর্ণ নিশ্চিহ্ন করে দেওয়ার জন্য মার্কিন সামরিক বাহিনী আপাতত এক বছরের সময়সীমা ধরে এগুচ্ছে। প্রয়োজনে তা আরো বাড়ানো হবে। গত শুক্রবার নিজের মালিকানাধীন সামাজিক মাধ্যম ‘ট্রুথ সোশ্যাল’-এ দেওয়া এক পোস্টে ট্রাম্প এসব কথা বলেন। এমন বক্তব্য আসলে অনেক প্রশ্নের সৃষ্টি করে। একটি দেশকে কি ইচ্ছে হলেই নিশ্চিহ্ন করা যায়? আর সভ্যতার সেরা দেশের প্রেসিডেন্ট কি প্রকাশ্যে সে কথা এভাবে ঘোষণা করতে পারেন? ট্রাম্প আসলে বাড়াবাড়ি করছেন। অনেক সময় ভয় পেয়েও মানুষ বাড়াবাড়ি করে থাকে। ট্রাম্প কি সে রকম ভয় পেয়ে এখন ইরানকে বড় রকমের ভয় দেখাচ্ছেন? তর্জন-গর্জন করছেন?

বর্তমান সময়ে ডোনাল্ড ট্রাম্পের কর্মকা- দেখে আমাদের ‘গ্রীক ট্র্যাজেডির’ কথা মনে পড়ছে। এই ট্র্যাজেডির অনেক বৈশিষ্ট্য আছে। যেমন-এখানে মানুষের করণীয় তেমন কিছু থাকে না, নিয়তিই পরিণতির দিকে ধাবিত করে। পরাজয় বা পরিণতির জন্য একটা নির্দিষ্ট সময় পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হয় শুধু। আর এখানে বড় বিষয় হলো, মনোজগতের পরাজয়; শত্রুর বা বাইরের আঘাতের বিষয়টা এখানে গৌণ। ট্রাম্পের মনোজগতে কি পরাজয়ের সুর বেজে উঠেছে? এখানে বড় বিষয় হয়ে উঠতে পারে পরিবার-পরিজনসহ ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলি খামেনির নির্মম হত্যার ঘটনা। মুখে যা-ই বলা হোক না কেন, এমন শোকাবহ ঘটনা মানুষের মধ্যে এক ধরনের অপরাধবোধ সৃষ্টি করে থাকে। এই বোধ ভিতরে ভিতরে মানুষকে দুর্বল করে ফেলে। লড়াই করার, চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করার নৈতিক শক্তি মানুষ হারিয়ে ফেলে। তখন বাইরের সামান্য আঘাতেই ঘটে যায় পরাজয়। বাইরের চাপ তো লক্ষ্য করা যাচ্ছে।

আয়াতুল্লাহ আলি খামেনির মৃত্যুর পর ইরানের ট্রাম্পবিরোধী বিক্ষোভ জোরদার হয়েছে। খামেনির জানাযায় অনেকেই প্রকাশ্যে ট্রাম্পর্কে হত্যার দাবি জানিয়েছেন। ইতিমধ্যে ইসরাইলের একটি গোয়েন্দা রিপোর্টে দাবি করা হয়, ইরান ট্রাম্পকে হত্যার পরিকল্পনা করছে। সে রিপোর্টের ভিত্তিতে তুরস্ক সফর শেষে দেশে ফেরার সময় বিমান বদল করেন ট্রাম্প। হোয়াইট হাউসও পরে প্রেসিডেন্টের নিরাপত্তার স্বার্থে বিমান পরিবর্তনের বিষয়টি স্বীকার করে। পরপর ঘটনাপ্রবাহ থেকে একটি বিষয় স্পষ্ট যে ট্রাম্পর্কে হত্যার আশঙ্কা জোরালো হয়েছে। প্রেসিডেন্ট নিজেও তাই হুঁশিয়ারি দিতে শুরু করেছেন। এমনকি হত্যার পরবর্তী পদক্ষেপ নিয়েও নির্দেশ দিয়ে রেখেছেন তিনি। ট্রুথ সোশ্যালে দেওয়া পোস্টে ডোনাল্ড ট্রাম্প লিখেছেন, যদি ইরান সরকার বিশে^র যে কোনো প্রান্ত থেকে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের বর্তমান প্রেসিডেন্টকে (আমাকে) হত্যা বা হত্যার চেষ্টা করে, তবে তাৎক্ষণিকভাবে হাজার হাজার ক্ষেপণাস্ত্র আঘাত হানবে ইরানে। হত্যা ও ধ্বংসের এমন পরিস্থিতি থেকে দূরে থাকার জন্য তো কিছু কাজ হয়েছিল। গত জুনে পাকিস্তানের মধ্যস্থতায় ইরান ও যুক্তরাষ্ট্র একটি সমঝোতা স্মারকে সই করেছিল। এর লক্ষ্য ছিল ফেব্রুয়ারি শেষদিকে শুরু হওয়া দু’দেশের যুদ্ধের অবসান ঘটানো এবং দীর্ঘমেয়াদি একটি শান্তি চুক্তির পথে এগিয়ে যাওয়া। সমঝোতা স্মারকে সব যুদ্ধক্ষেত্রে অবিলম্বে লড়াই বন্ধ, ইরানের ওপর যুক্তরাষ্ট্রের নৌ-অবরোধ পত্যাহার এবং হরমুজ প্রণালি পুনরায় উন্মুক্ত করার কথা বলা হয়। কিন্তু চলতি সপ্তাহে হরমুজ প্রণালি দিয়ে বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচলকে কেন্দ্র করে উভয়পক্ষ আবার পাল্টাপাল্টি হামলায় জড়িয়ে পড়ে। যুক্তরাষ্ট্র ইরানের বিভিন্ন লক্ষ্যবস্তুতে হামলা চালায়। এর জবাবে ইরানও মধ্যপ্রাচ্যজুড়ে যুক্তরাষ্ট্রের বিভিন্ন স্থাপনায় হামলা চালায়।

তবে ট্রাম্পের ‘হাজারো ক্ষেপণাস্ত্র’ হামলার হুমকির বিষয়ে ইরান সরকারের পক্ষ থেকে এখন পর্যন্ত (১২ জুলাই) আনুষ্ঠানিক কোনো প্রতিক্রিয়া জানানো হয়নি। এদিকে যুক্তরাষ্ট্র, ইরান এবং সংশ্লিষ্ট সব পক্ষকে ‘ইসলামাবাদ সমঝোতা স্মারক’ মেনে চলার আহ্বান জানিয়েছে পাকিস্তান। ইসলামাবাদের মতে, কূটনৈতিক প্রক্রিয়ায় যে কোনো ধরনের বিঘœ ঘটলে তা ইরানের পারমাণবিক ইস্যুসহ অন্যান্য অমীমাংসিত বিষয় আলোচনার মাধ্যমে সমাধানের প্রচেষ্টাকে আরো জটিল করে তুলবে। উল্লেখ্য, জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদের ২২৩১ নম্বর প্রস্তাব বাস্তবায়নবিষয়ক এক ব্রিফিংয়ে জাতিসংঘে পাকিস্তানের স্থায়ী প্রতিনিধি রাষ্ট্রদূত আসিম ইফতিখার আহমদ সর্বশেষ আঞ্চলিক উত্তেজনায় গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করে বলেন, এ পরিস্থিতি ‘কারো স্বার্থেই নয়।’

ইরান যুদ্ধ পরিস্থিতি যদি কারো স্বার্থেই না হয়, তাহলে এই যুদ্ধ চলছে কেমন করে? যুদ্ধে একবার যতি টেনে আবার শুরু করা হয় কিসের তাড়নায়? পর্যবেক্ষকরা বলছেন, সামনে তো নির্বাচন, বাঁচা-মরার প্রশ্নÑ এ বিষয়টি হয়তো ট্রাম্পকে যুদ্ধের যতি টানতে বাধ্য করছে। নির্বাচন তো নেতানিয়াহুর সামনেও, এখানে বিজয় লাভের জন্য যুদ্ধ চালিয়ে যাওয়াটাই হয়তো কৌশলগত দিক থেকে সঠিক মনে হচ্ছে তার। আর একটি বিষয় হলো, মধ্যপ্রাচ্যে ‘গ্রেটার ইসরাইল’-এর যে স্বপ্ন লালন করেন নেতানিয়াহু, তার জন্যও যুদ্ধকে সহায়ক মনে করেন তিনি। আসলে স্বার্থের দ্বন্দ্বে যুদ্ধে কখনো যতি টানা হয়, কখনো আবার চালু হয়। নেতানিয়াহুকে যে ‘বদ্ধ উন্মাদ’ বললেন ট্রাম্প, সেই রহস্যটা কিন্তু এখানেই নিহিত। তবে চরিত্রের দিক থেকে কিন্তু দুজনই যুদ্ধবাজ। নীতিহীন দাম্ভিক মানুষ কি কখনো মানবমুক্তি ও বিশ্বশান্তির সড়কে হাঁটতে পারেন? তারা এ পথের পথিক নন; বরং আগ্রাসন, লুণ্ঠন ও জুলুমেই তাদের যত আনন্দ।

আবারও গ্রীক ট্র্যাজেডির প্রসঙ্গ টানতে হয়। পৃথিবীতে বড় বড় সা¤্রাজ্য ছিল, ছিলেন স¤্রাটও; আজ তারা কোথায়? আগ্রাসন ও জুলুমের সাথে জড়িয়ে থাকে ট্র্যাজেডি। নিয়তির সামনে যুদ্ধবাজ জালেমদের কিছুই করার থাকে না, তাদের শুধু অপেক্ষা করতে হয় পতনের এক নির্দিষ্ট সময়ের জন্য। অবশ্য তার আগেই মনোজগতে পরাজয় ঘটে যায় যুদ্ধবাজ জালেমদের। বাইরের একটি ধাক্কার জন্য শুধু তাদের অপেক্ষা করতে হয়। আসলে যে কোনো যুদ্ধ বা চ্যালেঞ্জে বিজয়ের জন্য প্রয়োজন হয় নৈতিক শক্তি ও সঙ্গত কারণ; সমরশক্তি এখানে গৌণ বিষয়। ডোনাল্ড ট্রাম্প কোন পথে হাঁটছেন সেটা তার জন্য ভেবে দেখার মতো একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় বটে। তবে বর্তমান সময়ে আর একটি বিষয়ও বেশ গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। সেটি হলো, হোয়াইট হাউসকে কেন দুর্গে পরিণত করা হচ্ছে? এর কি কোনো প্রয়োজন ছিল? মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের নিরাপত্তা জোরদারে হোয়াইট হাউসের প্রধান প্রবেশপথে নিরাপত্তা ব্যবস্থা আধুনিকায়ন ও শক্তিশালী করা হচ্ছে। এর অংশ হিসেবে সেখানে অস্থায়ী ব্যারিকেড সরিয়ে তৈরি হচ্ছে স্থায়ী প্রাচীর। শুক্রবার হোয়াইট হাউসের এক কর্মকর্তার বরাত দিয়ে প্রকাশিত প্রতিবেদনে এ তথ্য জানায় মার্কিন সংবাদমাধ্যম সিএনএন। খবরে জানানো হয়, পুরো কাজ শেষ হতে কয়েক মাস সময় লাগতে পারে। আমেরিকার সিক্রেট সার্ভিস দীর্ঘদিন থেকেই হোয়াইট হাউসের প্রধান প্রবেশপথে নিরাপত্তা জোরদারের দাবি জানিয়ে আসছিল। হোয়াইট হাউসের উত্তর দিকে অবস্থিত ‘নর্থ পোর্টিকো’ নামে পরিচিত এ প্রবেশ পথের ফটক বর্তমানে মাচান ও ত্রিপল দিয়ে ঢেকে রাখা হয়েছে। ট্রাম্পের অনুরোধে কর্মীরা সেখানে বাইরের স্তম্ভগুলো মেরামতের কাজ করছেন। ট্রাম্পকে লক্ষ্য করে একাধিকবার হত্যাচেষ্টার পর নিরাপত্তা ব্যবস্থা জোরদার করা হচ্ছে। এর মধ্যে গত এপ্রিলে ওয়াশিংটন হিলটনে একটি অনুষ্ঠানে এবং গত মাসে হোয়াইট হাউসের সাউথ লনে ইউএফসি লড়াইয়ের সময় হামলার চক্রান্তের ঘটনা অন্যতম। এসব ঘটনার কারণেই মূলত সেখানে ৯০ হাজার বর্গফুটের বিশাল একটি বলরুম তৈরির সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। কর্মকর্তারা এ প্রকল্পের যৌক্তিকতা তুলে ধরেছেন, বর্ণনাও দিয়েছেন। বলরুমটিতে অত্যাধুনিক ড্রোন পোর্ট থাকবে, থাকবে ¯œাইপার পোস্ট এবং একটি নিরাপদ ভূগর্ভস্থ বাঙ্কার। এমন বাতাবরণ এবং ব্যবস্থাপনা আমাদের কি বার্তা দিচ্ছে? কেন এত নিরাপত্তা ব্যবস্থা, কেন হোয়াইট হাউসকে আজ দুর্গে পরিণত করা হচ্ছে? বর্তমান সভ্যতা শান্তি ও মৈত্রীর বদলে কি যুদ্ধ ও হিংসার বার্তা ছড়িয়ে দিলো?