তৌহিদুর রহমান
কৈশোরের অনেক ঘটনা এখনো মনকে দোলা দেয়। একদম ছোটবেলায় শুনেছিলাম, গ্রামের কোন এক মূর্খ পণ্ডিত লোক- সবাই তাকে ইমান আলী পণ্ডিত বলে ডাকত। তিনি আক্ষেপ করে বলেছিলেন, ‘শিক্ষিত লোকরা সব খারাপ! শিক্ষিত লোকরা সুদ খায়! শিক্ষিত লোকরা ঘুষ খায়! শিক্ষিত লোকরা মদ খায়! যা পায় তাই খায়!’ তার সে বক্তব্য আজ পুরোপুরি সত্য বটে। গ্রামের অধিকাংশ লোক আজ শিক্ষিত হয়েছে! তবে সুশিক্ষিত হয়েছে এ কথা বলবো না। প্রতি বাড়িতেই দু’একজন বিএ পাশ, এমএ পাশ আছে, আছে এমবিবিএস ডাক্তার, উকিল-মোক্তার, জজ-ব্যারিস্টার-বিচারক, পিএইচডিধারী গবেষক, স্কুল-কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক, আছে ব্যাংকার ইত্যাদি। শিক্ষিতের সাথে সাথে পাল্লা দিয়ে বেড়েছে সুদ, ঘুষ, অনাচার, দুরাচার। শহরের মতো এ গ্রামেরও প্রতিটি লোক কোন না কোনভাবে সুদ, ঘুষ, মিথ্যা বা অনৈতিকতার সাথে জড়িয়ে পড়েছে। আজ আর শিক্ষিত অশিক্ষিত বলে ভেদাভেদ নেই। ‘কানার পাও খাদে, কোতোর পাও খাদে!’ লক্ষ্য একটায় সবার চেয়ে আমার বেশি টাকা চাই, বেশি সুখ চাই। এ এক সর্বনাশা রাক্ষুসে ক্ষুধা মানুষকে আজ অক্টোপাশের মতো ঘিরে ধরেছে! এনজিওদের ক্ষুদ্র ঋণ থেকে শুরু করে একশো টাকায় মাসে দশ টাকা সুদের মতো ভয়াবহ অতি ক্ষুদ্র ঋণও চালু আছে এ গ্রামে! আছে মোটা অংকের ব্যাংক লোনধারী সুদী কারবারি। ‘সুদদাতা, গ্রহিতা, হিসাব রক্ষক, সাক্ষী সকলেই জাহান্নামী!’ মহান আল্লাহ সুবহানু তা’আলার এ কথায় আজ আর কেউ কর্ণপাত করছে না। পরকালকে সবাই বাকির খাতায় ধরে রেখেছে।
তাছাড়া গ্রামের প্রতিটি পাড়ার রাস্তার মোড়ে মোড়ে গড়ে উঠেছে টি স্টল। সেখানে রাত দিন দেদারছে চলছে অশ্লীল নৃত্য-গীত, সিনেমা। প্রতি ঘরে ঘরেই আছে ডিশ লাইন। আছে ইন্টারনেট। ছেড়ে-বুড়ো সবার হাতেই স্মার্টফোন। এ অশ্লীলতার প্রভাব ছড়িয়ে পড়েছে সমাজের সব শ্রেণির মানুষের মধ্যে।
ছাত্র-অভিভাবকসহ অনেকেই কারণে অকারণে ধরে পিটাচ্ছে স্কুলের শিক্ষক-শিক্ষিকাকে। ছোট-বড় বাছ বিচার নেই ইভটিজিং চলছে অবাধে। ধর্ষণ ও শিশু নির্যাতন এখন তো নিত্য-নৈমিত্তিক ঘটনা। এসব নিয়ে কেচ কালামও চলছে। তবুও থামছে ভয়াবহতা। ভ্যানচালক থেকে দিনমজুর সবার হাতেই আছে টাচ মোবাইল। তাতে দেদারছে চলছে হিন্দি সিনেমার অশ্লীল নাচ-গান। ইন্টারনেট থেকে অবাধে নীল ছবি দেখা হচ্ছে। টিনএজাররা এর প্রধানতম শিকার। পঞ্চম বা নিম্ন শ্রেণির ছাত্র-ছাত্রী থেকে শুরু করে অনেকেই প্রায় দিন-রাত মেতে থাকে ফেসবুকে, ফ্রি-ফায়ারে এবং ইউটিউবে। অশ্লীলতা আজ সমাজের সর্বত্র ছড়িয়ে পড়েছে। পিতা-মাতা বা বড়দের অগোচরে মোবাইলে চলছে নীল ছবি। শেয়ার দেয়া হচ্ছে সময় সুযোগ মতো অন্যকে। পথে-প্রান্তরে, হাটে, ঘাটে, মাঠে, পাবলিক প্লেসে, যানবাহনে সময়ে অসময়ে ধুমছে বাজানো হচ্ছে অশ্লীল নাচ-গান। লাজ-শরম সব যেন ধুয়ে মুছে গেছে।
বাপÑমা, ছেলেÑমেয়ে কেউ কারো পরোয়া করছে না। ডিজিটাল সংস্কৃতির অপ্রতিরোধ্য গতি বেহায়াপনা ও মিথ্যার বেশাতি ছড়াচ্ছে সুনামীর বেগে। হাতে টাকা গুণছে অথচ মোবাইলে দেনাদারকে বলছে, না ভাই, হাতে একদম টাকা পয়সা নেই। এখন আপনার টাকা দিতে পারবো না। ঘরে বসে বলছে, এখন বাজারে আছি, পরে কথা হবে। প্রতিনিয়ত এভাবে শিশুদের সামনেই চলছে মিথ্যার বাহাদুরী। গণ্ডমূর্খ মোবাইলের ওপ্রান্তে কে আছে না ভেবেই শুধুমাত্র নারী কণ্ঠের আওয়াজ পেয়েই মায়ের বয়সের, নানীর বয়সের মহিলাকে দিচ্ছে অশ্লীল অফার। বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষিকাকে করছে ইভটিজিং। মাদক ব্যবসাও চলছে রমরমা। মাদকসেবীর সংখ্যাও বাড়ছে লাফিয়ে লাফিয়ে। আল্লাহ-রসূলকে বাদ দিয়ে ভণ্ড পীর-ফকিরের আস্তানা বাড়ছে দিনকে দিন। এগুলো হয়ে উঠছে মাদক সেবনের প্রধান আখড়া। এটা শুধু একটি গ্রাম নয়, আজ বাংলাদেশের শহর, বন্দর প্রতিটি গ্রামেরই একই চিত্র। শহরের ইটালিয়ান টি-স্টলের চিত্র আরও করুণ আরও ভয়াবহ।
বিভিন্ন সময় পত্র-পত্রিকায় ডিজিটাল সন্ত্রাসের অসংখ্য রিপোর্ট প্রকাশিত হয়েছে। কিন্তু ফল হচ্ছে উল্টো। শুধু গ্রাম নয়, সারা বাংলাদেশের আজ একই চিত্র। চট্টগ্রামের বায়েজিদ বোস্তামীর এলাকাবাসীর পক্ষে উৎপল বড়ুয়ার লেখা একটি দৈনিক পত্রিকার কয়েক বছর আগের সম্ভবত একটি রিপোর্ট ঠিক এরকম ছিল :
চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটন পুলিশের (সিএমপি) বায়েজিদ বোস্তামী থানাধীন মোহাম্মদনগর, শান্তিনগর, আলীনগর, নবীনগর, আমিন জুট মিলস কলোনিসহ থানার আশপাশের বিভিন্ন এলাকার বখাটে যুবকদের মোবাইলে অশ্লীল ভিডিও ছড়িয়ে দিচ্ছে পর্নোগ্রাফি ব্যবসায়ীরা। নীতিমালার তোয়াক্কা না করে যত্রতত্র, অলিগলিতে ব্যাঙের ছাতার মতো গজিয়ে উঠেছে কম্পিউটারের দোকান। এসব দোকানের বেশিরভাগের কাজই হচ্ছে মোবাইলে গান আর পর্নোগ্রাফি ডাউনলোড করা। প্রতিটি কম্পিউটারেই ইন্টারনেট সংযোগ রয়েছে। অতিরিক্ত মুনাফার লোভে এরা অশ্লীল ও কুরুচিপূর্ণ ভিডিও ক্লিপ কিশোর ও যুবসমাজের মাঝে ছড়িয়ে দিয়ে বিপথগামী করে তুলছে। এসব দোকানের গানবাজনায় কান ঝালাপালা হয়ে উঠছে। আমিন জুট মিলস কলোনি এলাকার একটি হোটেলের সামনে থেকে জামে মসজিদ হয়ে একেবারে আমিন টেক্সটাইল গেট পর্যন্ত ৫০টিরও বেশি কম্পিউটারের দোকান। এসব দোকানে ভোর ৭টা থেকে গভীর রাত পর্যন্ত গান বাজিয়ে এলাকায় মারাত্মক শব্দদূষণ সৃষ্টি করা হচ্ছে। গার্মেন্টকর্মীরা কর্মস্থলে যাওয়া-আসার পথে অতিরিক্ত ভলিউমে গান বাজিয়ে নানা অঙ্গভঙ্গি করে উত্ত্যক্ত ও অশ্লীল আচরণ করা হয়।
এছাড়া পার্শ্ববর্তী স্কুল চলাকালে এবং নামাযের সময়ও সজোরে গানবাজনা চলতে থাকে। কেউ প্রতিবাদ করলে দলবেঁধে লাঠিসোটা নিয়ে চড়াও হওয়ার ঘটনা ঘটছে। বখাটেরা মদ-গাঁজা সেবন করে, চুরি-ছিনতাইসহ নানা অপকর্মও করছে। আইন অনুযায়ী কুরুচিপূর্ণ তথ্য প্রকাশ এবং সব ধরনের পর্নোগ্রাফি শাস্তিযোগ্য অপরাধ হলেও বায়েজিদ থানার সামনে কোনো কোনো দোকানি বখাটে বন্ধু-যুবকদের নিয়ে আড্ডা বসিয়ে মোবাইলে পর্নোগ্রাফি ব্লুটুথের মাধ্যমে আদান-প্রদান করে প্রকাশ্যেই। কিছু পুলিশ কনস্টেবলও ওই দোকানে আড্ডা জমায়। বিভিন্ন স্টুডিওতেও কম্পিউটারের মাধ্যমে পর্নোগ্রাফি ডাউনলোড হয়। চট্টগ্রাম মহানগরীতে একটি চক্র আর্থিকভাবে লাভবান হতে এবং প্রতিহিংসা ও প্রতিশোধপরায়ণ হয়ে স্কুল-কলেজপড়ুয়া সুন্দরী মেয়েদের ছবি সংগ্রহ করে কাটপিস জুড়ে দিয়ে ভিডিও ক্লিপ তৈরির মাধ্যমে মোটা অঙ্কের অর্থ আদায়ের ঘটনাও ঘটেছে। বন্ধুত্বের নামে প্রতারণার মাধ্যমে কিংবা প্রেমের অভিনয় করেও বিশেষ মুহূর্তগুলো মোবাইলে ভিডিও ধারণ করে কিংবা মেয়েদের জিম্মি করে অশ্লীল ছবি তুলে বাজারে ছেড়ে দেয়ার অপকর্মও করেছে চক্রটি। এক্ষেত্রে অনেক স্টুডিও মালিক জড়িত থাকার প্রমাণ পেয়েছে আইন প্রয়োগকারী সংস্থা।
এসব কিসের যেন অসনি সংকেত দিচ্ছে! এসব সামাজিক অবক্ষয় নিয়ে এখনই ভাবতে হবে আমাদের। সেদিন বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকদের এক মত বিনিময় অনুষ্ঠানে শিক্ষকরা আক্ষেপ করে বলছিলেন, তাদের জন্য শিক্ষকতা করা এখন দায় হয়ে পড়েছে। তাদেরকে বলা হচ্ছে, নম্বর দিতে। কিন্তু ছাত্ররাতো খাতায় কিছুই লিখে না। কোথায় নম্বর দেব! শুধু মোবাইল টেপাটিপি করে। এমনকি ক্লাসে বসেও টেপাটিপি করে। এ এক মরণ নেশায় পেয়েছে জাতিকে! এটা সর্বনাশা এক নেশা! এক শিক্ষক রাগত কণ্ঠে বললেন, তার বাড়িতে অনেকেই কাঁথা মুড়ি দিয়ে টেপাটিপি করে। এটা হচ্ছে, ডিজিটাল কালচার! এর কারণেই আজ ঢাবিতে ইংরেজিতে দু’জন পাশ করে। এ সর্বনাশা নেশা জাতিকে মেধাহীন করে ছাড়বে!
সবশেষে বলতে চাই, শ্রেষ্ঠ মানুষের সংজ্ঞা কী? দেখতে ফর্সা হওয়া? দামি ব্রান্ডের শার্ট-প্যান্ট পরা? দামি পারফিউম, ওয়ালেট, কাফলিং ঘড়ি ব্যবহার করা? দামি মোবাইল, আইপ্যাড, আইফোন, ল্যাপটপ ব্যবহার? ফেসবুক, ইন্টারনেট, ব্লগে পড়ে থাকা? আমারা মনে করি, এসব কখনোই একটা মানুষের শ্রেষ্ঠত্বের মানদণ্ড যাচাই করে না। আমরা যারা নিজেদের মুসলমান বলে পরিচয় দেই তাদের জন্য বলছি, ‘তোমাদের মধ্যে সেই ব্যক্তি শ্রেষ্ঠ, যার তাকওয়া সবচেয়ে বেশি (সূরা হুজুরাত, আয়াত : ১৩)’। অর্থাৎ যিনি আল্লাহকে সবচেয়ে বেশি ভয় করে চলেন তাকে মহান আল্লাহ শ্রেষ্ঠ মানুষ বলে সংজ্ঞায়িত করেছেন। আজ আমরা তাকওয়া অর্জনের জন্য কেউ প্রতিযোগিতা করছি না! এখন অনেকেই ধর্মের কথা শুনলে বিরক্ত হন, তাদের উদ্দেশে বলছিÑ আল্লাহভীতি মানে এই নয় যে, সারাদিন নামায আর তাজবিহ-তাহলিল, জিকির-আযকার নিয়ে পড়ে থাকতে হবে। বরং শ্রেষ্ঠ মানুষ সেই ব্যক্তি, যিনি তার স্রষ্টাকে ভয় করেন, তাঁর দেওয়া আদেশ-নিষেধ মেনে চলেন। নিজে ভালো কাজ করেন ভালো কাজের আদেশ দেন, মন্দ কাজ থেকে বিরত থাকেন অন্যকে মন্দ কাজ করা থেকে নিষেধ করেন অর্থাৎ যিনি তার জীবনের প্রতিটি কাজে আল্লাহর সন্তুষ্টি চান এবং আল্লাহর নির্দেশিত পথে চলার চেষ্টা করেন তিনিই শ্রেষ্ঠ। আসুন নিজেকে ইসলামের আলোকে ডিজিটাল হিসেবে গড়ে তুলি।