তৌহিদুর রহমান

অধ্যাপক মুহম্মদ মতিউর রহমান ১৮ ডিসেম্বর, ১৯৩৭ (৩ পৌষ, সোমবার ১৩৪৪) সিরাজগঞ্জ জেলার শাহজাদপুর থানার চর নরিনা গ্রামে নানার বাড়িতে জন্মগ্রহণ করেন। পৈত্রিক নিবাস উক্ত থানার চরবেলতৈল গ্রামে। তাঁর পিতা আবু মুহম্মদ গোলাম রব্বানী, মাতা মোছাম্মৎ আসুদা খাতুন, দাদা মুনশী ওয়াহেদ আলী পণ্ডিত, দাদী মোছাম্মৎ রমিছা খাতুন। এক সময় বিদ্যাচর্চা ও শিক্ষাদানের কাজে সুখ্যাতি অর্জনের ফলে বনেদি মুনশী পরিবার ‘পন্ডিত বাড়ি’ হিসাবে পরিচিতি লাভ করে।

গ্রামের প্রাথমিক বিদ্যালয়ে শিক্ষা লাভের পর নরিনা নিম্ন মাধ্যমিক ইংরেজি স্কুলে পঞ্চম-অষ্টম শ্রেণি এবং ১৯৫৬ সালে পোতাজিয়া হাই স্কুল থেকে মেট্রিক, ১৯৫৮ সালে পাবনা এডওয়ার্ড কলেজ থেকে আইএ, ১৯৬০ সালে বিএ পাশ করেন। ১৯৬২ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বাংলায় এমএ পাশ করেন। ১৯৬২-৭৭ পর্যন্ত ঢাকা সিদ্ধেশ্বরী কলেজে যথাক্রমে অধ্যাপক, ভাইস-প্রিন্সিপাল ও ভারপ্রাপ্ত প্রিন্সিপালের দায়িত্ব পালন। সে সময়ে তিনি ঢাকার ফ্রাঙ্কলিন বুক প্রোগ্রামস-এ নিয়মিত বিভাগে সহকারী সম্পাদক ও প্রথম বাংলা বিশ্বকোষ প্রকল্পে অন্যতম সম্পাদক কাজ করেন। ১৯৭০-৭১ জাতীয় পত্রিকা দৈনিক সংগ্রাম-এর সাহিত্য সম্পাদক, ১৯৭৭-৯৬ দুবাই চেম্বার অব কমার্স এন্ড ইন্ডাস্ট্রিতে প্রকাশনা বিভাগে সম্পাদক এবং ২০০৩-০৯ তিনি এশিয়ান ইউনিভার্সিটি অব বাংলাদেশের বাংলা বিভাগের প্রফেসর ও বিভাগীয় প্রধানের দায়িত্ব পালন করেন।

প্রাথমিক বিদ্যালয়ে পঞ্চম শ্রেণিতে অধ্যয়নকালে তাঁর কবিতা লেখা শুরু। ১৯৫৮ সালে অমর কথাশিল্পী মোহাম্মদ নজিবর রহমান সাহিত্য রত্নের উপর লেখা তাঁর প্রথম গবেষণামূলক প্রবন্ধ ‘দৈনিক আজাদ’ পত্রিকায় প্রকাশিত। তিনি বাংলাদেশ ও দুবাই থেকে প্রকাশিত পত্র-পত্রিকায় নিয়মিত লেখালেখি করেন।

প্রকাশিত গ্রন্থ: সাহিত্য-বিষয়ক: ১. বাংল সাাহিত্যের ধারা, ২.সাহিত্য চিন্তা, ৩. বাংলাদেশের সাহিত্য, ৪. বাংলা সাহিত্যে মুসলিম ঐতিহ্য, ৫. হাজার বছরের বাংলা কবিতা, ৬. সমকালীন বাংলা সাহিত্য-১ম খন্ড, ৭. সমকালীন বাংলা সাহিত্য-২য় খন্ড, ৮. সমকালীন বাংলা সাহিত্য-৩য় খন্ড, ৯. বাংলা ভাষার উৎপত্তি, বিকাশ ও বিবর্তনের ধারায় ভাষা সংস্কার ও বানান রীতি ১০. রবীন্দ্রনাথ, ১১. রবীন্দ্রনাথ ও আমাদের সংস্কৃতি, ১২. জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম, ১৩. বিদ্রোহী ও জাতীয় কবি নজরুল : জীবন ও কাব্য, ১৪. গদ্য শিল্পী নজরুল, ১৫. ফররুখ প্রতিভা, ১৬. কবি ফররুখ আহমদ: জীবন ও সাহিত্য বিষয়ক তথ্যপঞ্জি, ১৭. ফররুখ আহমদের সাত সাগরের মাঝি, ১৮. বাঙালি মুসলিম নবজাগরণে সাহিত্য সংস্কৃতি সংগঠনের ভূমিকা, ১৯. বাংলা ভাষা ও ঐতিহাসিক ভাষা আন্দোলন, ২০. সাহিত্য কথা, ২১. ভাষা সাহিত্য সংস্কৃতি, ২২. Writer and other Essayes ২৩. অমর কথাশিল্পী মোহাম্মদ নজিবর রহমান সাহিত্যরত্ন : জীবন ও সাহিত্য, ২৪. মোহাম্মদ নজিবর রহমান সাহিত্যরত্নের আনোয়ারা উপন্যাস, ২৫. কবি মতিউর রহমান মল্লিক, ২৬. নানা প্রসঙ্গ, ২৭. আশির দশকের কবি ও কবিতা ইত্যাদি।

সংস্কৃতি বিষয়ক : ২৮. সংস্কৃতি, ২৯. সমাজ সাহিত্য সংস্কৃতি, ৩০. ঐতিহ্য বাংলা সন ও বাংলা নববর্ষ, ৩১. ঐতিহ্য সভ্যতা সংস্কৃতি, ৩২. আমাদের বিশ্বাস ও সংস্কৃতি, ৩৩. ইসলামী সংস্কৃতি (পাণ্ডুলিপি)।

শিশুসাহিত্য : ৩৪. মহৎ যাদের জীবনকথা, ৩৫. ছোটদের গল্প, ৩৬. কিশোর গল্প।

ইসলাম বিষয়ক : ৩৭. ইবাদত, ৩৮. ইবাদতের মূলভিত্তি ও তার তাৎপর্য, ৩৯. ইসলামের দৃষ্টিতে ভাষা সাহিত্য সংস্কৃতি, ৪০. মহানবী স., ৪১. মহানবী স.-এর আদর্শ সমাজ, ৪২. মানবতার সর্বোত্তম আদর্শ মহানবী স., ৪৩. রাসূলুল্লাহর স. জীবন চরিত ও ইসলামী সমাজের রূপরেখা, ৪৪. মানবাধিকার ও ইসলাম, ৪৫. ইসলামে নারীরমর্যাদা ও অধিকার, ৪৬. মাতা-পিতা ও সন্তানের হক, ৪৭. মুসলিম বীর ও মনীষী, ৪৮. হৃদয়ে কাবা, ৪৯. ইসলাম পরিচিতি, ৫০. পানাহার সম্পর্কিত ইসলামের বিধান, ৫১. আল-কুরআন পরিচিতি।

স্মৃতিকথা: ৫২. স্মৃতির সৈকতে, ৫৩. আরব উপসাগরের তীরে, ৫৪. আমার উপলব্ধি।

কবিতা: ৫৫. নিভৃতে অলিন্দে, ৫৬. সকল প্রশংসা তোমার, ৫৭. করোনাকালের কবিতা, ৫৮. স্মৃতি বিস্মৃতির অন্তরালে, ৫৯. ছোট মণিদের ছড়া-কবিতা, ৬০. গান, ৬১. শাশ্বতবাণী (আল-কুরআনের কতিপয় সূরার কাব্যানুবাদ)

ভ্রমণকাহিনী: ৬২. ইউরোপ আমেরিকার পথে জনপদে, ৬৩. অনিন্দ্য নগরী ইস্তাম্বুল, ৬৪. হজ্বের সফর, ৬৫. সমুদ্রবক্ষে আট দিন (দক্ষিণ ক্যারিবীয় দ্বীপপুঞ্জ সফর)।

অনুবাদ: ৬৬. ইরান, ৬৭. ইরাক, ৬৮. আমার সাক্ষ্য।

সম্পাদিত গ্রন্থ: ৬৯. ফররুখ আহমদের স্বাতন্ত্র্য ও বৈশিষ্ট্য, ১ম খণ্ড, ৭০. ফররুখ আহমদের স্বাতন্ত্র্য ও বৈশিষ্ট্য, ২য় খণ্ড, ৭১. ফররুখ আহমদের সাহিত্য বিচার, ৭২. মোহাম্মদ নজিবর রহমান সাহিত্যরত্ন রচনাবলী, ১ম খণ্ড, ৭৩. মোহাম্মদ নজিবর রহমান সাহিত্যরত্ন রচনাবলী, ২য় খণ্ড, ৭৪. প্রবাসী কবি কণ্ঠ, ৭৫. ভাষা সৈনিক সংবর্ধনা স্মারক, ৭৬. ব্যারিস্টার কোরবান আলী স্মারকগ্রন্থ, ৭৭. ভাষা সৈনিক আব্দুল গফুর স্মারকগ্রন্থ, ৭৮. বহুমাত্রিক (কথাশিল্পী শাহেদ আলী স্মারকগ্রন্থ) রচনা করেন।

সম্পাদিত পত্রিকা : মাসিক ‘আমার দেশ’ (পাবনা), ফজলুল হক হল বার্ষিকী ১৯৬১-৬২ (ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়), প্রবাসকণ্ঠ, স্বদেশ সংস্কৃতি (সাময়িক পত্রিকা), ফররুখ একাডেমি পত্রিকা (১৯৯৮ থেকে ২০১৯ পর্যন্ত), মোহাম্মদ নজিবর রহমান সাহিত্যরত্ন পত্রিকা সফলতার সাথে সম্পাদনা করেন।

পুরস্কার: শিক্ষা-সাহিত্য-সংস্কৃতি ক্ষেত্রে অবদানের জন্য ‘বাংলাদেশ ইসলামিক ইংলিশ স্কুল’, দুবাই কর্তৃক স্বর্ণপদক (১৯৯৬), ‘বাংলাদেশ আধ্যাত্মিক কবিতা পরিষদ’, ঢাকা প্রদত্ত পদক (২০০৪), অনলাইন-২৪ কর্তৃক প্রদত্ত পদক (২০১৫), Centre for National Culture কর্তৃক প্রদত্ত ‘ফররুখ পদক’ (২০১৫), ফররুখ চর্চা পরিষদ, বগুড়া কর্তৃক প্রদত্ত ‘ফররুখ সম্মাননা পদক’ (২০১৫), সুধী সাহিত্য সংঘ কর্তৃক প্রদত্ত ‘নবাব আব্দুল লতিফ পদক’ (২০১৫), ‘নতুন গতি’ সাহিত্য পুরস্কার (কলকাতা ২০১৬), কিশোরকণ্ঠ সাহিত্য পুরস্কার (২০১৮), নর্থ আমেরিকা রাইটার্স ফোরাম পদক (নিউইয়র্ক ২০১৯) এবং ফররুখ গবেষণা ফাউন্ডেশন পুরস্কার (২০২২, মরোণোত্তর) পুরস্কার লাভ করেন।

সফর: পবিত্র হজ্জ ও ওমরাপালন উপলক্ষে চার বার সৌদি আরব গমনসহ এশিয়া, ইউরোপ ও আমেরিকার আটাশটি দেশ সফর করেন।

মৃত্যু: অধ্যাপক মুহাম্মদ মতিউর রহমান ৮ এপ্রিল ২০২১ দুপুর ১২টায় ঢাকার সম্মিলিত সামরিক হাসপাতালে (সিএমএইচ) চিকিৎসাধীন অবস্থায় ইন্তিকাল করেন [ইন্না লিল্লাহ ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজিউন] । মৃত্যুকালে তাঁর বয়স হয়েছিল ৮৪ বছর। তিনি স্ত্রী, দুই ছেলে, দুই মেয়ে, নাতি-নাতনিসহ অসংখ্য ভক্ত-অনুরক্ত ও গুণগ্রাহী রেখে গেছেন।

স্মৃতির পাতায় অধ্যাপক মুহম্মদ মতিউর রহমান : স্মৃতির পাতা যতই উল্টাই আজ আর কিছুতেই মনে করতে পারিনে অধ্যাপক মুহম্মদ মতিউর রহমানের সাথে কবে কখন কোথায় আমার প্রথম দেখা হয়েছিল। সাধারণত গবেষকেরা মহীরুহ বা অতি নগণ্যদের সাথে হলেও প্রথম সাক্ষাতের স্মৃতিটুকু ধরে রাখার জন্যে সন তারিখ টুকে রাখেন, ছবি তুলে রাখেন ইত্যাদি। এ ক্ষেত্রে অধ্যাপক মুহম্মদ মতিউর রহমান ছিলেন একজন অনুসরণীয়, অনুকরণীয় ব্যক্তিত্ব। আমি তো অবাক হয়ে যাই যখন দেখি কোন্কালে সম্ভবত আশির দশকে ওনাকে নিয়ে প্রথম লিখেছি। যা সেই সময় সংগ্রামের সাহিত্য পাতায় ছাপা হয়েছিলÑ তা তিনি সংগ্রহ করে রেখেছেন। তখন তিনি দুবাই থাকতেন। সে লেখার কথা আমার তো মনেও ছিল না। পরবর্তীতে দেখলাম তাঁর জীবনী গ্রন্থে সেটা সযতনে স্থান পেয়েছে।

আমার মতো অতি ক্ষুদ্র একজন মানুষের কথা তিনি জীবনের শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত স্মরণে রেখেছিলেন। সিএমএইচ থেকে জীবনের অন্তিম লগ্নেও তিনি আমাকে কয়েকবার ফোন দিয়েছিলেন। দোয়া করতে বলেছিলেন। অসম্ভব আশাবাদী এই মানুষটি তখনও আশা করছিলেন সেরে উঠবেন। আমার পরম সৌভাগ্য সব সময়ের মতো জীবনের শেষ লগ্নেও আমি এই মহৎপ্রাণ মানুষটির পাশে ছিলাম। আমার মতো তিনিও কিডনি রোগে আক্রান্ত ছিলেন। হোমিওপ্যাথিতে আমার কিছুটা উপকার হওয়াতে তিনি আমাকে সেই ডাক্তারের কাছে নিয়ে যেতে বললেন। কয়েকবার আমি তাঁকে খিলগাঁওয়ে ডাক্তার আলী আহমদের চেম্বারে নিয়ে গিয়েছি। কিডনিও প্লান্ট হোমিও ওষুধ সারা ঢাকার হোমিও চেম্বার ধুড়ে শেষ পর্যন্ত কমলাপুর হোমিও জোন থেকে সংগ্রহ করে রাতে তাঁর বাসায় পৌঁছে দিয়ে এসেছি। জীবনের এতো ঘটনাবহুল স্মৃতি আমার আর তাঁর মধ্যে সংঘটিত হয়েছে যা এখন আর লিখে কুলানো যাবে না। কি বলবো অধ্যাপক মুহম্মদ মতিউর রহমানের প্রায় অধিকাংশ সাহিত্যকর্মই পুস্তক আকারে প্রথম আমার হাত দিয়ে মুদ্রিত হয়েছে। তাহলে কি পরিমাণ সময় আমার সাথে তাঁর কেটেছে ভাবতেও বিস্ময় লাগে।

তিনি ছিলেন জীবন যুদ্ধের ময়দানে পোড় খাওয়া একজন মানুষ। সে কারণেই হয়তো অসম্ভব সাশ্রয়ী মানুষ ছিলেন তিনি। একবার বাংলা সাহিত্য পরিষদের এজিএম-এর পূর্বপ্রস্তুতির মিটিং-এ তিনি উপস্থিত ছিলেন। বার্ষিক খরচের স্টেটমেন্টে আপ্যায়ন বাবদ সম্ভবত তিন’শ তিরিশ টাকার উল্লেখ ছিল। এই টাকার জন্য খাতা-পত্র তলব করা হলো। ভাউচারে দেখা গেল আমি আর নাসির হেলাল সারারাত আরামবাগে প্রেসে বসে অফিসের কাজ করার সময় রাতে হোটেলে খেয়েছি তার জন্য খরচ হয়েছে তিন দিনে পঁয়ত্রিশ টাকা। গোলাম মোহাম্মদ ভাই কাজ করার সময় খেয়েছেন দশ টাকা। একুনে সারা বছরে আপ্যায়ন বাবদ খরচ হয়েছে তিন’শ তিরিশ টাকা মাত্র। অধ্যাপক মুহম্মদ মতিউর রহমান ও ডা. জামেদ আলীর প্রবল আপত্তির মুখে সেই ভাউচার পাশ হলো না। নাসির হেলাল ভাই আর আমি বললাম তাহলে আমরা অফিস টাইমের বাইরে কাজ করতে পারবো না। এটা বলা আমাদের জন্য বিরাট অপরাধ হয়ে গেল। শেষ পর্যন্ত কোনো সমাধান ছাড়াই মিটিং বাতিল হয়ে গেল। পরবর্তীতে মাহবুবুল হক ভাই, মল্লিক ভাই ও সোলায়মান আহসান ভাইয়ের নরম সুরের কারণে ভাউচার পাশ হলো। তবে আনুগত্যের খেলাপের কারণে আমাদেরকে ক্ষমা চাইতে হলো। সেই দিন থেকে বাংলা সাহিত্য পরিষদে আপ্যায়ন খরচের রীতি চালু হলো। এর আগে অবশ্য প্রতিটা মিটিং-এর আপ্যায়ন খরচ কোনো একজন সদস্য নিজ পকেট থেকে অথবা উপস্থিত সবাই সম্মিলিতভাবে দিয়ে দিতেন, ফলে অফিসে কোনো আপ্যায়ন খরচের ভাইচার হতো না। বিশেষ করে মাহবুবুল হক ভাই, অধ্যাপক ফজলে আজিম ভাই, হাসান আবদুল কাইউম সেলিম ভাইসহ অনেকেই এই খরচ বহন করতেন। মূলত অধ্যাপক মুহম্মদ মতিউর রহমান সাহেবের বক্তব্য ছিল যেখানে আমরা ডোনেশন দিয়ে প্রতিষ্ঠান চালাই সেখানে আপ্যায়ন খরচ আমরা কোথা থেকে দেবো। ওনার বক্তব্যও সঠিক ছিল। তাঁর সাথে ঘনিষ্ঠতার এই চল্লিশ বিয়াল্লিশ বছরের জীবনে এমন অসংখ্য ঘটনা রয়েছে। সব কিছু কী আর লেখা যায়? যায় না।

সাধারণত বই ছাপার খরচ নিয়ে ওনার সাথে আমার অনেকবার মতবিরোধ হয়েছে। তিনি চাইতেন সবচেয়ে কম দামের কাগজে সাশ্রয়ী মূল্যে বই ছাপতে। মূলত এসব নিয়েই মতবিরোধ হতো। কিন্তু আমাদের ভালোবাসার ভিত্তি তো ছিল আল্লাহর জন্যে ভালোবাসা। তাই জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত সম্পর্ক কখনো তিক্ততার পর্যায়ে গাড়ায়নি। তিনি আমাকে আপন ভাইয়ের মতো আগলে রেখেছিলেন আমৃত্যু। বাংলা সাহিত্য পরিষদের উপর দিয়ে অনেক সময় প্রবল ঝড় বয়ে গেছে, কিন্তু তিনি সব সময় আমার পাশে ছিলেন। যখনই কোনো সমস্যায় পড়েছি ছুটে গিয়েছি ওনার কাছে। তিনি পাখির মতো ডানা দিয়ে আগলে রাখতেন আমাদেরকে বিশেষ করে আমাকে।

একদম জীবনের শেষ দিকে ফররুখ একাডেমি সাহিত্য পত্রিকা, নজিবুর রহমান সাহিত্যরত্ন পত্রিকা ও ওনার লেখা বেশ কয়েকটা বই ছাপার জন্য দীর্ঘ সময় ধরে ওনার বাসায় এক কাপ চা আর ঝালমুড়ি খেয়ে রাত দশটা এগারোটা পর্যন্ত কাজ করেছি। এর জন্য কখনো রাহা খরচ নেইনি। তাঁর মৃত্যুর পরে নজিবুর রহমান সাহিত্য পত্রিকাটা ছাপিয়ে দিয়েছি। তবে ফররুখ একাডেমি সাহিত্য পত্রিকাটা আর ছাপা হয়নি। ফররুখ একাডেমি সাহিত্য পত্রিকাটাও ছাপার জন্য রেডি ছিল। এ ছাড়া আরো সাত আটটা বই রেডি ছিল। এর মধ্যে শাহজাদপুর ও ওনার গ্রাম নিয়ে লেখা একটা বই, রবীন্দ্রনাথ, ছোটদের নিয়ে লেখা গল্পের বই, ফররুখ আহমদকে নিয়ে লেখা একটা বই, একটি কবিতার বই ইত্যাদি। হাসপাতাল থেকে ফিরে এসে সেগুলো বাংলা সাহিত্য পরিষদ থেকে ছাপার কথা ছিল।

অধ্যাপক মুহম্মদ মতিউর রহমান সাহেবের ব্যক্তিগত কম্পিউটারে কাজের খবরা-খবর আমি রাখতাম। কত লেখা তিনি মুখে বলেছেন আর আমি তা কম্পোজ করে দিয়েছি। কোনো প্রকার পারিশ্রমিক ছাড়াই শুধুমাত্র আন্তরিক সম্পর্কের কারণেই আমি এসব কম্পোজ করে দিয়েছি। আমার সাথে কাজ করতে তিনি খুব স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করতেন। কারণ আমি কম্পোজ করলে কোনো প্রকার বানান ভুল হতো না। ওনার অধিকাংশ বইয়ের প্রুফও আমি দেখেছি। আমি ওনার প্রথম বই প্রকাশ করেছি ‘ফররুখ প্রতিভা’ নামের একটি বই। তখন সেটা নিউজ প্রিন্ট কাগজে ছাপা হয়েছিল। টিপু সুলতান রোডে অবস্থিত ব্যারিস্টার কোরবান আলী সাহেবের প্রেস থেকে ওটা ছাপা হয়েছিল।

লেখক : কবি ও প্রাবন্ধিক।