আইনের শাসন কেবল একটি সাংবিধানিক আদর্শ নয়; এটি একটি রাষ্ট্রের অস্তিত্বের মৌলিক শর্ত। যেখানে অপরাধের বিচার হয় আদালতে, শাস্তি নির্ধারিত হয় আইনের বিধানে, নাগরিকের নিরাপত্তা নিশ্চিত হয় রাষ্ট্রের কর্তৃত্বে, সেখানেই সভ্যতা তার মর্যাদা পায়। কিন্তু যখন বিচার প্রক্রিয়াকে বৃদ্ধাঙ্গুলী দেখিয়ে উত্তেজিত জনতা আইন নিজের হাতে তুলে নেয়, ‘‘যখন ধর, ধর, মার, মার’’ স্লোগান আদালতের বিচারকে ছাপিয়ে যায় তখন শুধু আইনের শাসনই বিপন্ন হয় না- রাষ্ট্রের নৈতিক ভিত্তিও প্রশ্নবিদ্ধ হয়ে পড়ে। কারণ জনতার হাতে বিচার কখনো ন্যায়বিচার হতে পারে না। বাংলাদেশে ‘মব কালচার’ বা মব জাস্টিস এর যে সংস্কৃতি গড়ে উঠেছে তা কেবল কিছু উচ্ছৃঙ্খল মানুষের আচরণ নয়। এটি সমাজের ভেতরে জমে থাকা অসহিষ্ণুতা, অস্থিরতা ও ন্যায়বিচারের প্রতি অনাস্থার ভয়াবহ বহিঃপ্রকাশ। মব কালচারের এই সংস্কৃতি কেবল ব্যক্তি-নিরাপত্তার জন্য হুমকি নয়। এটি রাষ্ট্রের আইনি কাঠামো, মানবাধিকার ও ন্যায়বিচারের ধারণার ওপর সরাসরি আঘাত। কারণ যেখানে জনতা বিচারক হয়ে ওঠে সেখানে রাষ্ট্র ধীরে ধীরে দুর্বল হয়, আর যেখানে রাষ্ট্র দুর্বল হয় সেখানে আইনের শাসন ও গণতান্ত্রিক ধারা টিকে থাকে না। এই ভয়াবহ প্রবণতা এখনই নিয়ন্ত্রণ করা প্রয়োজন।
২০২৪ সালের ৫ আগস্ট ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থান ছিল অন্যায় ও ফ্যাসিবাদী শাসনের বিরুদে প্রতিবাদ। We
Want Justice এর দাবিতে তরুণরা বুক পেতে দিয়েছিল। ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠার স্বপ্ন দেখেছিল। কিন্তু সবই আজ গুড়েবালি। পাড়া-মহল্লা, অলিগলি সবখানে বিচারহীনতার উন্মুক্ত মব কালচার আমাদের গণতান্ত্রিক মূল্যবোধকে ধ্বংস করে দিয়েছে। ফ্যাসিবাদ বিতাড়িত হওয়ার পর মানুষ আশা করেছিল- এবার হয়তো আইনের শাসন শক্তিশালী হবে, বিচারহীনতার সংস্কৃতি শেষ হবে। কিন্তু শুধু শাসকের পরিবর্তন হলেই সব বদলায় না; যদি শাসনের চরিত্র না বদলায় তাহলে সংকট অন্য রূপে ফিরে আসে। আজ মব কালচারের বিস্তুার সেই উদ্বেগই সামনে আনছে। একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে মব সন্ত্রাস হঠাৎ করে তৈরি হয় না। এটি কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনাও নয়; বরং দীর্ঘদিনের রাষ্ট্রীয় ব্যর্থতা, বিচারহীনতা ও সামাজিক অস্থিরতার ফসল। যখন একটি রাষ্ট্র আইন দিয়ে নয়, ক্ষমতার দাপটে চলতে শুরু করে, যখন জবাবদিহি দুর্বল হয়ে পড়ে, আর রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলো নিরপেক্ষতার বদলে পক্ষপাতদুষ্ট হয়ে যায় তখন মানুষের মধ্যে ধীরে ধীরে ক্ষোভ ও প্রতিশোধস্পৃহা জমতে থাকে। সেই অনাস্থা একসময় আইনকে পাশ কাটিয়ে জনতার বিচারের প্রবণতা তৈরি করে যা পরে মব কালচারে রূপ নেয়। মানুষ যখন দেখে আইনের মাধ্যমে ন্যায়বিচার পাওয়া কঠিন তখন কিছু মানুষের মধ্যে ধারণা জম্মায়, নিজের বিচার নিজে করে ফেলাই সহজ পথ। এই মানসিকতার সংস্কৃতি সমাজে সহিংসতাকে অনেকটা স্বাভাবিক করে তুলেছে। ফলে আইনের প্রতি আস্থা যত কমেছে, জনতার বিচারের প্রবণতা তত বেড়েছে। মব জাস্টিস কখনো ন্যায়বিচার নয়। এটি আইনের শাসনের বিকল্প নয়; বরং তার জন্য হুমকি। কারণ আদালতের বদলে রাস্তায় বিচার শুরু হলে সেখানে সত্য নয়, আবেগ ও উন্মত্ততাই প্রাধান্য পায়। তাই মব কালচারকে শুধু বিচ্ছিন্ন ঘটনা হিসেবে দেখলে চলবে না। এটি রাষ্ট্র ও সমাজ উভয়ের জন্য বিপজ্জনক। সুতরাং আইনের শাসন ও ন্যায়বিচারের প্রতি আস্থা ফিরিয়ে আনতে না পারলে এই প্রবণতা আরও ভয়ংকর রূপ নিতে পারে।
দেশের নাগরিকের জীবন, সম্পদ, সম্মান ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করা রাষ্ট্রের মৌলিক দায়িত্ব। রাষ্ট্র এ দায় অস্বীকার করতে পারে না। সংবিধানের ৩১ অনুচ্ছেদ অনুসারে প্রত্যেক নাগরিক আইনের সুরক্ষা ও আইনানুযায়ী আচরণ পাওয়ার অধিকার রাখে; রাষ্ট্র আইন ছাড়া কারও জীবন, স্বাধীনতা বা সম্পত্তি থেকে বঞ্চিত করতে পারে না। অনুচ্ছেদ ৩২ অনুসারে আইন ব্যতীত কোনো ব্যক্তিকে তার জীবন বা ব্যক্তিস্বাধীনতা থেকে বঞ্চিত করা যাবে না। অথচ রাজধানী থেকে শুরু করে প্রান্তিক জনপদ পর্যন্ত - চুরি, ডাকাতি, ছিনতাই, চাঁদাবাজি, ধর্ষণ, খুন, অপহরণ, কিশোর গ্যাংয়ের তৎপরতা মব সহিংসতায় সাধারণ মানুষের নিরাপত্তা আজ প্রশ্নবিদ্ধ। একের পর এক গণপিটুনি ও মব হামলা, এমনকি থানার ভেতরেও সহিংসতার ঘটনা প্রমাণ করে, আইনশৃঙ্খলার সংকট শুধু রাস্তায় নয়, রাষ্ট্রীয় কর্তৃত্বের ভেতরেও। হাসিনার ১৫ বছরের শাসনামলে (২০০৯-২০২৪) মব ভালোলেন্স বা গণপিটুনি একটি নিয়মিত ঘটনা ছিল। মানবাধিকার সংস্থাগুলোর তথ্যমতে ২০১৫ থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত গণপিটুনিতে অন্তত ৭৯২ জন নিহত হয়েছে। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে এই প্রবণতা আরও ভয়াবহরূপে বেড়েছে। এসব সংখ্যা কেবল পরিসংখ্যান নয়; প্রতিটি সংখ্যার পেছনে আছে একটি পরিবার, কিছু স্বপ্ন, কিছু অসমাপ্ত জীবন। ১৬ এপ্রিল মানিকগঞ্জের বনপারাইল গ্রামের ঘটনা সেই নির্মম বাস্তবতার প্রতীক। শিশু আতিকা আক্তার হত্যার অভিযোগে অভিযুক্ত কিশোরকে না পেয়ে উত্তেজিত জনতা তার বাবা ও চাচাকে পিটিয়ে হত্যা করেছে। কী ভয়াবহ বাস্তবতা-অভিযুক্ত পলাতক। অথচ প্রাণ গেল দুইজনের। তারা অপরাধী হলে আদালত শাস্তি নিশ্চিত করবে। কিন্তু অপরাধ প্রমাণিত হওয়ার আগেই মব সৃষ্টি করে নিষ্ঠুরভাবে দু’জন মানুষকে পৃথিবী থেকে সরিয়ে দেয়া হল। এটা কোন সভ্যতা। ২০১৯ সালের ২০ জুলাই উত্তর বাড্ডা সরকারি প্রাথমিক স্কুলে নিজের সন্তানের ভর্তির বিষয়ে খোঁজ নিতে গিয়েছিলেন তাসলিমা বেগম রেনু। সেখানে তাকে ‘ছেলেধরা’ সন্দেহ করে গুপিটুনি দিয়ে নির্মমভাবে হত্যা করা হয়। এই ঘটনাগুলো আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে, মব বিচার কখনো ন্যায়বিচার নয়; তা প্রায়ই আরেকটি অন্যায়ের জন্ম দেয়। ফৌজদারি বিচারব্যবস্থার মূলনীতি হলো-কোনো ব্যক্তি অপরাধী কি না, তা নির্ধারণ করবে আদালত। জনতা নয়। একজন অভিযুক্তও আইনের চোখে আত্মপক্ষ সমর্থনের অধিকার রাখে। এটাই আইনের গোড়ার কথা। কিন্তু যখন উত্তেজিত জনতা বিচারকের ভূমিকা নেয় তখন আইন হারায়, ন্যায় হারায়, সভ্যতাও হারিয়ে যায়। রাষ্ট্র যদি এই প্রবণতা রোধে কঠোর না হয় তবে আজ যে উন্মত্ততা বিচ্ছিন্ন মনে হচ্ছে কাল সেটাই সামাজিক নৈরাজ্যে রূপ নিতে পারে।
পৃথিবীর কোনো সভ্য সমাজেই আইন নিজের হাতে তুলে নেওয়ার স্বীকৃতি নেই। সভ্য রাষ্ট্রে বিচার হয় আদালতে প্রমাণের ভিত্তিতে এবং নিরপেক্ষ প্রক্রিয়ার মাধ্যমে। কিন্তু আমাদের বাস্তবতায় প্রায়ই দেখা যাচ্ছে, জনতাই যেন বিচারক, জল্লাদ এবং শাস্তি কার্যকরকারী হয়ে উঠছে। কখনো চোর সন্দেহে, কখনো ধর্ম অবমাননার গুজবে, কখনো রাজনৈতিক বিদ্বেষে, আবার কখনো নিছক উসকানিতে মানুষ পিটিয়ে হত্যা করা হচ্ছে। সবচেয়ে উদ্বেগের বিষয় হলো অনেক সময় এসব নিষ্ঠুর নৃশংসতাকে জনরোষ বলে চালিয়ে দেয়া হয়। অথচ জনরোষ আর জনতার উন্মত্ততা এক নয়। বাংলাদেশের ইতিহাসে এমন বহু ঘটনা রয়েছে, যা আমাদের বিবেককে নাড়া দেয়। ২০১১ সালে জুলাইয়ে ঢাকার আমিনবাজারে ডাকাত সন্দেহে ৬ নিরীহ ছাত্রকে পিটিয়ে হত্যা করা হয়েছিল। সেখানে অপরাধ প্রমাণিত হয়নি। কিন্তু সন্দেহই হয়ে উঠেছিল রায়। আর জনতা হয়ে উঠেছিল জল্লাদ। জনতা কোন কিছুর তোয়াক্কা না করেই হয়ে উঠেছিল জল্লাদ। সভ্য সমাজের জন্য এটি ছিল এক কলঙ্কজনক অধ্যায়। একইভাবে ২০০৬ সালের ২৮ অক্টোবর পল্টন ময়দানে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর নেতাকর্মীদের ওপর সংঘটিত নৃশংসতা-প্রকাশ্যে হত্যা, এমনকি লাশের উপর উঠে নৃত্য করা শুধু রাজনৈতিক সংঘাত ছিল না; তা ছিল মানবতা, ন্যায়বোধ এবং আইনের শাসনের ওপর সরাসরি আঘাত। আইনের দৃষ্টিতেও বিষয়টি একেবারে স্পষ্ট। দণ্ডবিধির ৩৪ ধারা অনুযায়ী অভিন্ন অভিপ্রায়ে সংঘটিত অপরাধে প্রত্যেক অংশগ্রহণকারী সমানভাবে দায়ী। একইভাবে দণ্ডবিধির ১৪৯ ধারা অনুযায়ী কোনো বেআইনি সমাবেশের সদস্যরা যদি সাধারণ উদ্দেশ্য বাস্তবায়নে অপরাধ সংঘটন করে, তবে সেই সমাবেশের প্রত্যেক সদস্যই অপরাধের জন্য দায়ী হবে-সে সরাসরি আঘাত করুক বা না করুক। অর্থাৎ গণপিটুনি বা মব হামলায় শুধু হাত তোলা নয়; উসকানি দেওয়া, সহযোগিতা করা, এমনকি নীরবে দাঁড়িয়ে উৎসাহ দেওয়াও আইনের চোখে সমান অপরাধ। সুতরাং সমাজ ও রাষ্ট্রকে আজ গভীরভাবে ভাবতে হবে। কারণ প্রতিটি মব হামলার পেছনে শুধু একজন ভুক্তভোগী থাকে না-থাকে ভেঙে যাওয়া এক আস্থা, ক্ষতবিক্ষত মানবিকতা এবং আইনের শাসনের প্রতি ক্রমশ ক্ষয়িষ্ণু বিশ্বাস। যেখানে আইন তার কার্যকারিতা হারায়, সেখানে কেবল ব্যক্তি নয়- ক্ষতিগ্রস্ত হয় পুরো রাষ্ট্রীয় শৃঙ্খলা ও সভ্যতার ভিত্তি। মব সন্ত্রাস দমন শুধু আইন-শৃঙ্খলার প্রশ্ন নয়। এটি রাষ্ট্রের নৈতিক অবস্থান, ন্যায়বিচারের কার্যকারিতা এবং গণতান্ত্রিক শাসনব্যবস্থার অস্তিত্ব রক্ষার প্রশ্ন। আইন যদি বইয়ের পাতায় সীমাবদ্ধ থাকে, আর আদালতের বিচার যদি মানুষের আস্থার বাইরে চলে যায়, তবে জনতার উন্মত্ততা সমাজকে আরও ভয়াবহ অস্থিরতার দিকে ঠেলে দেবে। মনে রাখতে হবে-অপরাধীর বিচার আদালতের। জনতার নয়। কারণ যেখানে মব বিচার প্রতিষ্ঠিত হয়, সেখানে আইনের শাসন নয়, বর্বরতাই শেষ কথা হয়ে দাঁড়ায়।
লেখক : প্রাবন্ধিক।