ক্রমবর্ধমান বেকারত্ব আমাদের জাতীয় জীবনের অন্যতম প্রধান সমস্যাগুলোর একটি। তবে এ বিশাল জনসংখ্যাকে মানবসম্পদে পরিণত করা গেলে এ সমস্যার সমাধান করা খুবই সম্ভব। কিন্তু উপযুক্ত পরিকল্পনা ও কর্মপন্থার অভাবে আমরা এ অশুভ বৃত্ত থেকে কোনোভাবেই বেরিয়ে আসতে পারছি না। ফলে ম্লান হয়ে যাচ্ছে আমাদের জাতীয় জীবনের সকল ইতিবাচক অর্জন। কারণ, আমাদের দেশের বেকারত্ব এখনো নেতিবাচক বৃত্তেই রয়ে গেছে।

মূলত, আমাদের দেশের বেকারত্ব রীতিমত প্রান্তিক পর্যায়ে পৌঁছেছে, ২০২৪-২৫ সালের তথ্য অনুযায়ী, দেশে বর্তমানে বেকারত্বের হার ৪ দশমিক ৪% থেকে ৪ দশমিক ৬৩%। বিবিএস-এর জরিপ অনুযায়ী, বেকার লোকের সংখ্যা প্রায় ২৬-২৭ লাখ, যার মধ্যে উল্লেখযোগ্য সংখ্যক শিক্ষিত বা স্নাতক পাস তরুণ। তবে বেসরকারি বা আন্তর্জাতিক সংস্থার মতে প্রকৃত বেকারের সংখ্যা আরও অনেক বেশি এবং তরুণ জনগোষ্ঠীর মধ্যে বেকারত্ব ও আধা-বেকারত্বের হার উচ্চ। যা রীতিমত উদ্বেগজনক।

মূলত, আমাদের মোট জনসংখ্যা প্রায় ১৭ কোটি ৫৭ লাখ। জনসংখ্যায় বিশ্বে সপ্তম হলেও আয়তনে ৯১তম অবস্থানে থাকা বাংলাদেশ বিশ্বের সবচেয়ে ঘনবসতিপূর্ণ। ১৯৪৭ সালে পূর্ব পাকিস্তানের জনসংখ্যা ছিল প্রায় চার কোটি ৪০ লাখ; ১৯৭১ সালে তা বেড়ে দাঁড়ায় সাত কোটিতে। স্বাধীনতার পর গত পাঁচ দশকে জনসংখ্যা বেড়ে প্রায় ১৮ কোটিতে পৌঁছেছে। কিন্তু এ বিপুল জনসংখ্যার সাথে সঙ্গতিপূর্ণ কর্মসংস্থান তৈরি না হওয়ায় বেকারত্ব এখন উদ্বেগজনক পর্যায়ে এসে ঠেকেছে। ফলে আমরা বৈশ্বিক প্রতিযোগিতায় খুব একটা সুবিধা করতে পরছি না বরং দিনের পর দিন পিছিয়ে পড়ছি। যা আমাদের জাতীয় জীবনের বড় ব্যর্থতা।

বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) সর্বশেষ ত্রৈমাসিক শ্রমশক্তি জরিপ অনুযায়ী, ২০২৪-২৫ অর্থবছরের দ্বিতীয় প্রান্তিকে দেশে বেকারত্বের হার বেড়ে ৪.৬৩ শতাংশে দাঁড়িয়েছে, যা আগের বছরের একই সময়ে ছিল ৩.৯৫ শতাংশ। একই অর্থবছরের প্রথম প্রান্তিকে (জুলাই-সেপ্টেম্বর) এই হার ছিল ৪.৪৯ শতাংশ। রাজনৈতিক অস্থিরতা, গণ-অভ্যুত্থান-পরবর্তী পরিস্থিতি এবং শিল্পাঞ্চলে শ্রমিক অসন্তোষের কারণে অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে স্থবিরতা তৈরি হওয়াও এ বৃদ্ধির একটি কারণ হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।

২০২৪ সালের শেষ প্রান্তিকে মোট পাঁচ কোটি ৮৯ লাখ ৩০ হাজার শ্রমশক্তির মধ্যে কর্মসংস্থানে ছিল পাঁচ কোটি ৬২ লাখ মানুষ-যা আগের বছরের তুলনায় কম। বিশেষভাবে উদ্বেগজনক হলো যুব বেকারত্ব। বিবিএসের তথ্যানুযায়ী, ২০২৩ সালে প্রায় ১৯.৪ লাখ যুবক বেকার ছিল, যা যুব শ্রমশক্তির ৭.২ শতাংশ। এর মধ্যে ৩১.৫ শতাংশই উচ্চশিক্ষিত। ২০২৪ সালে স্নাতক পর্যায়ের বেকারত্বের হার দাঁড়িয়েছে প্রায় ১৩.৫ শতাংশ- যা প্রমাণ করে, উচ্চশিক্ষা অর্জন করেও কর্মসংস্থান নিশ্চিত হচ্ছে না। বাস্তবতা হলো-শিক্ষার স্তর যত বাড়ছে, বেকার থাকার ঝুঁকিও তত বাড়ছে।

জাতিসংঘ জনসংখ্যা তহবিলের (ইউএনএফপিএ) স্টেট অব ওয়ার্ল্ড পপুলেশন ২০২৫ প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বাংলাদেশে প্রায় ১১ কোটি ৫০ লাখ কর্মক্ষম মানুষ রয়েছে, যা মোট জনসংখ্যার প্রায় দুই-তৃতীয়াংশ। অর্থনীতির ভাষায় এটি ‘জনমিতিক মুনাফা’-যা সঠিকভাবে কাজে লাগাতে পারলে দ্রুত অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি অর্জন সম্ভব। চীন, জাপান, দক্ষিণ কোরিয়া, সিঙ্গাপুর ও ভিয়েতনামের মতো দেশগুলো দক্ষতা উন্নয়ন ও উৎপাদনশীল কর্মসংস্থানের মাধ্যমে এই সুযোগকে কাজে লাগিয়ে উন্নয়নের নতুন দিগন্ত উন্মোচন করেছে। বাংলাদেশও বর্তমানে একই সম্ভাবনার মুখোমুখি দাঁড়িয়ে আছে। তবে যথাযথ পরিকল্পনা ও বাস্তবায়ন না হলে এ সম্ভাবনা বেকারত্বের চাপেই নষ্ট হয়ে যেতে পারে।

উদ্ভূত পরিস্থিতিতে সরকার মানবশক্তিকে মানবসম্পদে রূপান্তরের লক্ষ্য নিয়ে বিভিন্ন উদ্যোগ নিয়েছে। সরকারি শূন্য পদে নিয়োগ, বেসরকারি চাকরিজীবীদের জন্য সার্ভিস রুল, পেনশন ব্যবস্থা এবং বেকারভাতা চালুর পরিকল্পনা রয়েছে। তথ্যপ্রযুক্তি খাতে ১০ লাখ কর্মসংস্থান সৃষ্টির লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে, পাশাপাশি হাইটেক পার্ক ও আইসিটি অবকাঠামো সম্প্রসারণ করা হচ্ছে। এছাড়া আগামী পাঁচ বছরে দু’লাখ ফ্রিল্যান্সারকে আইডি কার্ড প্রদান, হাজার হাজার তরুণকে আইটি প্রশিক্ষণ, এআই, ডাটা অ্যানালাইটিক্স ও সাইবার সিকিউরিটি বিষয়ে দক্ষতা উন্নয়নের উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। অনলাইন পেমেন্ট গেটওয়ে ‘পেপ্যাল’ চালুর উদ্যোগও ফ্রিল্যান্সিং খাতে নতুন সম্ভাবনা তৈরি করতে পারে। স্বাস্থ্যখাতে এক লাখ কর্মী নিয়োগ, কৃষিতে ভর্তুকি, সহজ ঋণ ও কৃষি বীমা চালু, কৃষিভিত্তিক শিল্পায়ন এবং উত্তরাঞ্চলে শিল্প স্থাপনের উদ্যোগ কর্মসংস্থান বৃদ্ধিতে সহায়ক হতে পারে। পাশাপাশি ক্রীড়া ও উদ্যোক্তা উন্নয়নকেও কর্মসংস্থানের বিকল্প খাত হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে। কিন্তু এসব বিষয়ে সরকারের তেমন কার্যকর পদক্ষেপ ও যুৎসই পরিকল্পনা দৃশ্যমান নয়। ফলে আমরা বেকারত্বের অভিশাপ থেকে কোনোভাবেই বেরিয়ে আসতে পারছি না।

সার্বিক দিক বিবেচনায় বেকারত্ব আমাদের জন্য বড় সমস্যা। ফলে আমাদের কোনো অর্জন ফলবতী ও টেকসই হতে পারছে না। এজন্য আমাদের ক্রমবর্ধমান জনসংখ্যাকে দায়ী করা হলেও তা পুরোপুরি বাস্তবসম্মত নয়। কারণ, বিপুল জনসংখ্যাকে কর্মের হাতিয়ারে পরিণত করা গেলে তা অবশ্যই মানবসম্পদে রূপান্তর করা সম্ভব। আর বিশাল জনসংখ্যাকে কর্মক্ষম করা গেলে মুক্তি মিলবে বেকারত্বের অভিশাপ থেকে।