জুলাই বিপ্লবের ২ বছর পূর্তি না হতেই আমরা নতুন করে আত্মঘাতী খেলায় মেতে উঠেছি। যে সোপান ধরে আমরা অসাধ্যকে সাধন করতে সক্ষম হয়েছিলাম; নেতিবাচক রাজনীতির অশুভ বৃত্তে তা-ই আমাদের কাছে এখন অপাঙ্কতেয় ও অপ্রয়োজনীয় হয়ে গেছে। এ ইস্যুতে জাতিকে আবারো দ্বিধাবিভক্ত করার চেষ্টা করা হচ্ছে। রাজনীতিতে এমন বিকারগ্রস্ততা ও অবিমৃশ্রকারীতা অতীতে আর কখনো দেখা যায়নি। বিপ্লবোত্তর দেশে গণতন্ত্র, গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ ও যুৎসই এবং সময়োপযোগী রাজনৈতিক সংস্কৃতি চর্চা ও লালন করার কথা থাকলেও সে আশায় ইতোমধ্যেই গুঁড়ে বালি পড়তে শুরু করেছে। এর পেছনে রয়েছে পৌণপৌনিক রাজনৈতিক ব্যর্থতা, ক্ষমতালিপ্সা ও পশ্চাদপদ নেতিবাচক রাজনীতি। আশা করা হয়েছিলো, ফ্যাসিবাদ পরবর্তী সময়ে দেশের রাজনৈতিক পক্ষগুলো সংবিধান, গণতন্ত্র ও গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ অনুসরণ করেই ইতিবাচক রাজনীতির সূচনা করবে। দেশে চালু হবে গণমুখী ও ইতিবাচক রাজনীতি। শাসনকাজে জনগণের অংশ গ্রহণ নিশ্চিত হবে। রাষ্ট্রে সকল পর্যায়ে জনগণের প্রতিনিধিত্ব থাকবে। জুলাই বিপ্লবের চেতনা ও জুলাই সনদ পুরোপুরি আলোর মুখ দেখবে। কিন্তু এক্ষেত্রে এখন প্রধান প্রতিপক্ষ হয়ে দাঁড়িয়েছে ক্ষমতাসীদের নেতিবাচক মনোবৃত্তি। সে ধারাবাহিকতায় ক্ষমতায় যাওয়ার পর তারা এখন জাতির সামনে নতুন নতুন বয়ান নিয়ে হাজির হয়ে জাতিকে বিভ্রান্ত করছেন। যা অদূর ভবিষ্যতে তাদের জন্যই আত্মঘাতী ও বুমেরাং হবে বলে মনে করছেন রাজনৈতিক বোদ্ধামহাল। কিন্তু দূর্ভাগ্যজনক হলেও সত্য যে, সংশ্লিষ্টরা তা উপলব্ধি করতে পারছে না। ফলে জাতি হিসাবে আমাদের গন্তব্য অনিশ্চিত হয়ে পড়েছে।

উদ্ভূত পরিস্থিতি ও সার্বিক দিক বিবেচনায় মনে হচ্ছে, ক্ষমতার উষ্ণ পরশে ক্ষমতাসীনদের এখন রীতিমত মতিভ্রম ঘটেছে। এখন চলছে মধুচন্দ্রিমা। ফলে সবকিছুই রঙিন চশমায় অবলোকন করেছেন; বাস্তবতা উপলব্ধি করছেন না বা করার চেষ্টাও করা হচ্ছে না। তাদের এমন মতিভ্রম ও নৈতিবাচক মানসিকতা যে আগামী দিনে তাদের জন্য আত্মঘাতী ও মর্মপীড়াদায়ক হবে তা নিশ্চিত করে বলা যায়। ক্ষমতার দম্ভে পতিত ফ্যাসিবাদী শক্তি আওয়ামী লীগও এমনটা করেছিলো। ধরাকে সরা জ্ঞান করা তাদের জন্য মজ্জাগত হয়ে গিয়েছিলো। তারা ধরেই নিয়েছিলো যে, ক্ষমতা তাদের জন্য একেবারে চিরস্থায়ী বন্দোবস্ত হয়ে গেছে। এমন নেতিবাচক ও অরাজনৈতিক মনোবৃত্তির জন্যই তাদেরকে চরম মূল্য দিতে হয়েছে।

এক অনিবার্য বাস্তবতায় স্বাধীনতা যুদ্ধে নেতৃত্বদানকারী রাজনৈতিক দলের নেতাকর্মীরা এখন দেশ থেকে দেশান্তরে ফেরারী জীবন যাপন করছেন। যারা দেশে আছেন তাদের ঠিকানা হয়েছে কারাগারের লৌহ গারদে; নয়তো আত্মগোপনে। নিজেদের অস্তিত্ব জানান দিতে মাঝে মাঝে রাজপথে দেখা গেলেও তা রাজনীতিতে প্রভাব ফেলতে পারছে না। অদূর ভবিষ্যতে সে সম্ভাবনা খুবই ক্ষীণ। একটি প্রাচীন ও ঐতিহ্যবাদী রাজনৈতিক দলের এমন বেহাল দশার নজীর বিশ্ব রাজনীতির ইতিহাসে অভাবিত। তবে এসব যে তাদের কর্মফল ও পাপের প্রায়শ্চিত্ত তা নিশ্চিত করেই বলা যায়। আর বর্তমান ক্ষমতাসীনরা ইতিহাস থেকে শিক্ষা না নিয়ে অতীতের অশুভ বৃত্তেই আটকা পড়েছে বলেই মনে হচ্ছে। তবে ক্ষমতার দম্ভে মদমত্ত ক্ষমতাসীনদের মনে রাখা উচিত কর্মফল কাউকেই ছাড় দেয় না বরং তা অনিবার্য পরিণতি হয়ে ফেরৎ আসে বারবার।

ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের মাধ্যমে বিএনপি জোট ক্ষমতায় আসায় মনে করা হয়েছিলো দেশে সুস্থধারার রাজনৈতিক সংস্কৃতি চালু হবে। দেশে নতুন করে চর্চা শুরু হবে গণতন্ত্র ও গণতান্ত্রিক মূল্যবোধের। রাষ্ট্রের সকল ক্ষেত্রে সংবিধান ও আইনের শাসন প্রতিষ্ঠিত হবে। কারণ, এক সময়ের দলটির জোট সঙ্গীরাই এখন বিরোধী দলে। তাই রাজনৈতিক মতভিন্নতা থাকলেও দেশ ও জাতির বৃহত্তর স্বার্থেই সরকার ও বিরোধী দল ঐক্যবদ্ধ হয়ে কাজ করবে। বিরোধী দল সরকারকে এ বিষয়ে আশ্বস্ত করেছিলো। কিন্তু সরকার অজ্ঞাত কারণেই সে সুযোগটা কাজে লাগাতে ব্যর্থ হয়েছে। তারা সংখ্যাগরিষ্ঠতার জোরে বিরোধী দলকে আস্থায় না নিয়ে বা রাজনৈতিক প্রতিপক্ষ না মনে করে ইতোমধ্যেই শত্রু বানিয়ে ফেলেছে। যে দলটির সাথে তাদের দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক সখ্য ছিলো, অতীতে একসাথে নির্বাচন ও সরকার গঠন করেছে, ফ্যাসিবাদী শাসনামলে যুগপৎভাবেই জুলুম-নির্যাতনের শিকার হয়েছে। কিন্তু রাজনৈতিক হীনমন্যতার কারণেই তাদেরকেই এখন রীতিমত প্রতিপক্ষ বানানো হয়েছে। এসব মোটেই মেঠো বক্তব্য নয় বরং সরকারের শীর্ষ পর্যায় থেকে বিরোধী দলের সম্পূর্ণ অযৌক্তিক সমালোচনা করা হচ্ছে। বিষয়টি আত্মসচেতন মানুষের মধ্যে রীতিমত কৌতুহল ও বিরক্তির সৃষ্টি করছে। যা ক্ষমতাসীনদের আদর্শিক দেউলিয়াত্বকেই স্পষ্ট করে তোলে।

দেশ ও জাতির বৃহত্তর স্বার্থে রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা সৃষ্টি যাদের দায়িত্ব তারাই এখন বিভেদ ও জাতীয় অনৈক্যকে উষ্কে দিয়ে নতুন করে সঙ্কট সৃষ্টি করছেন। এতে রাজনীতিতে নতুন করে সংঘাতের আশঙ্কা করছেন সংশ্লিষ্টরা। এতে জুলাই বিপ্লবের চেতনা অনেকটা হাতছাড়া হতে বসেছে। সংসদ জাতীর যেকোন সমস্যা সমাধানের কেন্দ্রবিন্দু হলেও সরকারি দল বিরোধী দলের সাথে সঙ্গত আচরণ করছে না। এমনকি সরকারের শীর্ষ পর্যায় থেকে বিরোধী দল নির্মূল ও কেউ কেউ আবার উৎখাতের পরিকল্পনা ঘোষণা করেছে। বিরোধী দলের বিরুদ্ধে বয়ান তৈরি করা হচ্ছে ফ্যাসিবাদী ভাষায় ও আদলে। যা কোন গণতান্ত্রিক ও সভ্য সমাজে কোন ভাবেই কাক্সিক্ষত ও গ্রহণযোগ্য নয়। এমনকি জাতীয় সংসদে বিরোধী দলের কোন বক্তব্যের অসারতা প্রমাণে ব্যর্থ হয়ে পরিকল্পিতভাবে উত্তেজনাকর পরিস্থিতি সৃষ্টি করা হচ্ছে। প্রতিপক্ষে কথামালার ফুলঝুড়িতে কাবু করার জন্য হাজির করা হচ্ছে ফ্যাসিবাদী বয়ান। মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে ঘাটাঘাটি করে সে পুরনো কাসুন্দীর অশুভচর্চা শুরু হয়েছে। কখনো বিরোধী দল দমন, নির্মূল ও উৎখাতের ঘোষণা দেয়া হচ্ছে। পরিকল্পিতভাবে উস্কানী সৃষ্টি করা হচ্ছে জাতীয় সংসদে। দেশ ও জাতীয় স্বার্থ নিয়ে জাতীয় সংসদকে অনেক কিছু বলা বা করার সুযোগ থাকলেও বিরোধী দলের প্রতি বিষোদগার করে অহেতুক সময় নষ্ট করা হচ্ছে। আর বিরোধীদেরকে আত্মপক্ষ সমর্থনের জন্য প্রয়োজনীয় ও পর্যাপ্ত সময় দেয়া হচ্ছে না। ফলে রাজনৈতিক শিষ্টাচারের পরিবর্তে সরকার ও বিরোধী দলের তিক্ততা ও ব্যবধান বেড়েই চলেছে। যা ইতিবাচক ও গণমুখী রাজনীতির জন্য বড় ধরনের প্রতিবন্ধক।

জুলাই বিপ্লবকে ভিত্তি ধরেই যারা রাজনীতিতে নতুন করে পুনর্বাসিত হয়েছেন, নিজেরা ক্ষমতার স্বাদ গ্রহণ করেছেন, ক্ষমতা পাওয়ার দু’মাসের মধ্যেই তারা রীতিমত বেপরোয়া হয়ে উঠেছেন। তারাও পতিতদের মত ধরাকে সরা জ্ঞান করতে শুরু করেছেন ইতোমধ্যেই। এমনকি ক্ষমতাসীনরা এখন জুলাই চেতনাকে অসম্মান ও উপেক্ষা করতে কসুর করছে না বরং ক্ষেত্র বিশেষে অপ্রয়োজনীয়ও বলা হচ্ছে। একই সাথে সরকারের বিভিন্ন পর্যায়ের নেতারা জুলাই সনদ বাস্তবায়ন নিয়ে একেক সময় একেক কথা বলে জাতিকে বিভ্রান্ত করছেন। নতুন সরকার ইতোমধ্যেই অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে জনগণ ও সুশাসনের জন্য জারি করা বেশ কিছু অধ্যাদেশ বাতিল করে দেশকে ফ্যাসিবাদী বৃত্তে আটকানোর প্রায় সকল আয়োজনই সম্পন্ন করেছে। এমনকি তারা জুলাই সনদ বাস্তবায়নে জারিকৃত গণভোট অধ্যাদেশ আইনি ও সাংবিধানিক ভিত্তি দিতে জাতীয় সংসদের উত্থাপন করেনি। ফলে এ অধ্যাদেশের অপমৃত্যু হয়েছে বলেই মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। আর বিষয়টি নিয়ে সরকার ও বিরোধী দল এখন রীতিমত মুখোমুখি অবস্থানে। যা জুলাই আন্দোলন ও চেতনার সাথে সরাসরি সাংঘর্ষিক।

সরকার পক্ষ এখন জুলাই সনদকে অপ্রয়োজনীয় বলছে। এমনকি গণভোট অধ্যাদেশ সংবিধান সম্মত নয় এবং জনগণের সাথে প্রতারণা বলতেও কসুর করছে না। অথচ জুলাই বিপ্লব রাজনীতিতে তাদেরকে পুনর্জন্ম দিয়েছিলো। বর্তমান প্রধানমন্ত্রী সহ দণ্ডিত অনেক নেতাই খালাস পেয়েছিলেন। কারো কারো নির্বাসিত জীবনেরও অবসান ঘটেছে জুলাই বিপ্লবের মাধ্যমে। কিন্তু জুলাই চেতনা ও জুলাই সনদের প্রতি মায়াকান্না দেখিয়ে নির্বাচনী বৈতরণী পার হওয়ার পর তারা এখন সবকিছু বিস্মৃত হয়ে ‘মুই কী হনুরে’ ভাব ধরেছে। তারা এখন বিভ্রান্তিকর অপযুক্তি দিতে শুরু করেছেন। নির্বাচন আদায়ের জন্যই নাকি তারা জুলাই সনদ সহ সবকিছুতেই অবোধ বালকের মত স্বাক্ষর করেছেন। যা রাজনৈতিক অঙ্গনে রীতিমত হাস্যরসের সৃষ্টি করেছে। হাজারো প্রাণের বিনিময়ে আমরা যে নতুন এক বাংলাদেশ পেয়েছিলাম নেতিবাচক রাজনীতি, ক্ষমতালিপ্সা ও সরকারের উরণচণ্ডী মনোভাবে তা এখন গোল্লায় যেতে বসেছে।

স্বৈরাচার ও ফ্যাসিবাদ ফিরে আসার সব ছিদ্রপথ রুদ্ধ করতেই জুলাই বিপ্লব পরবর্তী জাতীয় ঐকমত্য কমিশন কতিপয় সংস্কার কমিশন গঠন করেছিলো। সকল রাজনৈতিক ও অংশীজনের মতামতের ভিত্তিতে গৃহীত হয়েছিলো সংস্কার প্রস্তাবনা। সেসব প্রস্তাবানার ভিত্তিতে জুলাই ঘোষণা ও জুলাই সনদ প্রণীত হয়েছিলো। আর সে জুলাই সনদকে সাংবিধানিক ও আইনগত ভিত্তি দেওয়ার জন্যই রাষ্ট্রপতি গণভোট অধ্যাদেশ জারি করেছিলেন। একই সাথে অন্যান্য সংস্কার কার্যক্রম সহ রাষ্ট্র পরিচালনায় সহায়তার জন্য ১৩৩ অধ্যাদেশ জারি করা হয়েছিলো। কিন্তু বিএনপি ক্ষমতায় আসার পর তাদের জন্য সহায়ক অধ্যাদেশগুলোকেই আইনে পরিণত করেছে। উপেক্ষিত হয়েছে বিচার বিভাগ সংস্কার, ব্যাংক রেজুলেশন, সুপ্রীম কোর্টের পৃথক সচিবালয়, গুম বিষয়ক অধ্যাদেশ সহ বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ অধ্যাদেশ। যেসব অধ্যাদেশের সাথে সুশাসন ও নাগরিক অধিকারের সম্পর্ক জড়িত সেসব পরিকল্পিতভাবেই অকার্যকর করে ফেলা হয়েছে। দেশ ও জাতির জন্য এসব বিষয় সরকার বিবেচনায় না নিয়ে রাষ্ট্রকে আবারো নতুন করে ফ্যাসিবাদী বৃত্তেই ঠেলে দিয়েছে। হাজারো প্রাণের বিনিময়ে অর্জিত জুলাই বিপ্লবের চেতনা হারিয়ে যেতে বসেছে। ফলে জুলাই যোদ্ধা, বিরোধী দল ও দেশপ্রেমী শক্তি এখন মুখোমুখী অবস্থানে এসে দাঁড়িয়েছে। জাতীয় সংসদের ভেতর ও বাইরে সরকারি দল যে ভাষায় কথা বলছেন তাতে অনাকাক্সিক্ষত রাজনৈতিক সংঘাত অনিবার্য হয়ে উঠেছে। সংসদে জুলাই বিষয়ক সমস্যাগুলোর শান্তিপূর্ণ সমাধান না হওয়ায় তা ইতোমধ্যে রাজপথ পর্যন্ত গড়িয়েছে। দেশের রাজনীতি আবারো নতুন করে পুরনো বৃত্তেই বৃত্তাবদ্ধ হয়ে পড়েছে।

মূলত, সরকার অবাধ ক্ষমতাচর্চা অবারিত ও নির্বিঘ্ন করার জন্য জুলাই চেতনার বিরুদ্ধে অবস্থান গ্রহণ করেছে। যখন কোনো জাতির মধ্যে সাধারণ স্বার্থের চেয়ে ব্যক্তিগত বা গোষ্ঠীগত স্বার্থ বড় হয়ে দেখা দেয় এবং সহমর্মিতা বিলুপ্ত হয়, তখনই সে জাতি পতনের দিকে ধাবিত হয়। ইতিহাস এবং বিভিন্ন ধর্মীয় ও সামাজিক প্রেক্ষাপট অনুযায়ী, জাতীয় অনৈক্য, অভ্যন্তরীণ কোন্দল, মূল্যবোধের বিচ্যুতি, লাগামহীন পাপাচার এবং পারস্পরিক বিভেদের কারণে বহু শক্তিশালী জাতি ও সভ্যতার পতন হয়েছে।

আদ জাতি: আল্লাহর প্রতি অকৃতজ্ঞতা, অহংকার এবং অনৈক্যের কারণে আদ জাতি ধ্বংস হয়ে গিয়েছিল।

সামুদ জাতি: আল্লাহর নিদর্শন অমান্য করে নিজেদের মধ্যে বিভেদ, হানাহানী ও পাপাচারের কারণে সামুদ জাতিকে ধ্বংসকারী ঝড় ও দুর্যোগের মাধ্যমে নিশ্চিহ্ন করা হয়েছিল।

লুত (আ.)-এর জাতি: সমকামিতা ও পাপাচারের কারণে এ জাতিকে অভিশপ্ত পাথর বৃষ্টির মাধ্যমে ধ্বংস করা হয়েছিল।

মাদায়েনবাসী: অন্যায়, অবিচার ও পারস্পরিক অনৈক্যের ফলে তারা ধ্বংসপ্রাপ্ত হয়।

আধুনিক রাষ্ট্র ব্যবস্থার প্রেক্ষাপটে, জাতীয় ঐক্য ও জনস্বার্থ উপেক্ষা করে ফ্যাসিবাদী কায়দায় শাসন করা সরকারগুলো জনগণের অনৈক্য ও ক্ষোভের কারণে ক্ষমতাচ্যুত হয়।

১. রাজনৈতিক অস্থিরতা ও ভেদাভেদ: ক্ষমতার মোহে অভ্যন্তরীণ কোন্দল ও পারস্পরিক সমালোচনা।

২. অবিচার ও দুর্নীতি: জাতীয় স্বার্থের পরিবর্তে ব্যক্তিগত বা দলীয় স্বার্থকে প্রাধান্য দেওয়া।

৩. আদর্শিক বিরোধ: দেশের মূল ঐক্য বা আদর্শের জায়গা থেকে সরে গিয়ে দলাদলিতে লিপ্ত হওয়া।

একথা অনস্বীকার্য যে, ঐক্যবদ্ধ জাতিই টিকে থাকে, আর অনৈক্যের কারণে শক্তিশালী জাতিও ধ্বংস হয়ে যায়। ইতিহাস পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, অভ্যন্তরীণ কোন্দল এবং জাতীয় অনৈক্যের কারণে অনেক শক্তিশালী জাতি বা সাম্রাজ্যের পতন ঘটেছে।

১. মুসলিম উম্মাহ ও আব্বাসীয় খিলাফত: বাগদাদের কেন্দ্রীয় শাসনব্যবস্থায় অনৈক্য এবং শিয়া-সুন্নি বা বিভিন্ন গোত্রীয় বিভেদের সুযোগ নিয়ে হালাকু খান ১২৫৮ সালে বাগদাদ ধ্বংস করেন। এটি মুসলিম বিশ্বের এক অপূরণীয় ক্ষতি ছিল।

২. মুঘল সাম্রাজ্য: সম্রাট আওরঙ্গজেবের পর উত্তরসূরিদের মধ্যে সিংহাসন নিয়ে লড়াই এবং বিভিন্ন আঞ্চলিক শক্তির (মারাঠা, শিখ) উত্থানে অনৈক্য সৃষ্টি হয়। এ অনৈক্যের সুযোগেই ব্রিটিশরা একে একে রাজ্যগুলো দখল করে নেয়।

৩. স্পেনের মুসলিম শাসন (আন্দালুস): ছোট ছোট অসংখ্য রাজ্যে (তাইফা) বিভক্ত হয়ে পড়ার কারণে খ্রিস্টান বাহিনীগুলোর কাছে স্পেনের মুসলিম শাসনের পতন ঘটে। নিজেদের মধ্যে লড়াই করার সময় তারা অনেক ক্ষেত্রে বহিঃশত্রুর সাহায্যও নিয়েছিল।

৪. অটোমান সাম্রাজ্য (উসমানীয় খিলাফত): বিংশ শতাব্দীর শুরুতে জাতীয়তাবাদের দোহাই দিয়ে বিভিন্ন জাতিগোষ্ঠী (যেমন- আরব বিদ্রোহ) আলাদা হয়ে যাওয়ায় বিশাল এই সাম্রাজ্য ভেঙে যায় এবং প্রথম বিশ্বযুদ্ধের পর এর চূড়ান্ত পতন ঘটে।

৫. সোভিয়েত ইউনিয়ন: যদিও এটি আধুনিক ইতিহাস, কিন্তু রাজনৈতিক অস্থিরতা এবং বিভিন্ন প্রজাতন্ত্রের মধ্যে অনৈক্য ও স্বাধীনতার আকাক্সক্ষা ১৯৯১ সালে এই পরাশক্তির পতন ডেকে আনে।

৬. প্রাচীন রোমান সাম্রাজ্য: অভ্যন্তরীণ গৃহযুদ্ধ, ক্ষমতার লোভ এবং রোমান নাগরিকদের মধ্যে চারিত্রিক ও আদর্শিক অনৈক্য বিশাল এই সাম্রাজ্যকে ভেতর থেকে দুর্বল করে দিয়েছিল, যা পরে বর্বরদের আক্রমণ ঠেকানো অসম্ভব হয়ে পড়ে।

রাজনৈতিক উচ্চাভিলাষ, ক্ষমতালিপ্সা; ব্যক্তিস্বার্থ, গোষ্ঠীস্বার্থ, সংকীর্ণ দলীয় ও গোষ্ঠী স্বার্থের কারণেই আমাদের অতীতের সকল অর্জনই ম্লান হতে চলেছে। ১৯৭১ সালে অনেক ত্যাগ ও কুরবানীর বিনিময়ে আমরা স্বাধীনতা অর্জন করলেও রাজনৈতিক ব্যর্থতার অশুভ গণ্ডি থেকে আমরা বেরিয়ে আসতে পারিনি। ১৯৯০ সালে আমাদের জাতীয় রাজনীতিতে নতুন ধারার সৃষ্টির অবারিত সুযোগ সৃষ্টি হলেও সে সুযোগ আমরা কাজে লাগাতে প্রায় পুরোপুরি ব্যর্থ হয়েছি। ২০২৪ সালের ছাত্র-জনতার যুগপৎ জুলাই বিপ্লব এক নতুন বাংলাদেশের হাতছানি হলেও পশ্চাদমুখী ও নেতিবাচক রাজনীতির কারণে সে অর্জনও ইতোমধ্যেই গোল্লায় যেতে বসেছে। ফলে নতুন রাজনৈতিক সংঘাকের আশঙ্কা সৃষ্টি হয়েছে।

এমতাবস্থায় দেশ ও জাতির বৃহত্তর স্বার্থেই জুলাই চেতনা ও জুলাই সনদকে যথাযথ সম্মান করে সংবিধান সহ রাষ্ট্র সংস্কারের কার্যকর উদ্যোগ গ্রহণ করতে হবে। ইতিহাস স্বাক্ষী আত্মকলহে লিপ্ত কোন জাতি সামনের দিকে অগ্রসর হতে পারে না বরং সে জাতির পতন অনিবার্য হয়ে ওঠে। বিষয়টি সরকার পক্ষ যত তাড়াতাড়ি উপলব্ধি করবে দেশ ও জাতির ততই মঙ্গল। মঙ্গল তাদের জন্যও। জনগণ সকল পক্ষের কাছেই দায়িত্বশীল আচরণ আশা করে।

www.syedmasud.com